বিভাগ: সম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রীর জনহিতকর নির্দেশনা

 

প্রতিবছর সকল বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলা প্রশাসকের অংশগ্রহণে রাজধানীতে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এটি একটি রুটিন ওয়ার্ক বা নিয়মিত কার্যবিধি হলেও এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দেশের সার্বিক প্রশাসনিক চিত্র উঠে আসে। একইসঙ্গে সিভিল সার্ভিসের একজন জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের সদস্য ও সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ আমলা হিসেবে জেলা প্রশাসকদের মনোভাব সম্পর্কেও সরাসরি একটি ধারণা লাভ সম্ভব হয়। সরকার প্রধানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাদান সম্মেলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। এ সম্মেলনে মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, মুখ্য সচিব, মুখ্য সমন্বয়কসহ সকল সচিব উপস্থিত থাকেন। ফলে এই সম্মেলনের বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। এবারের সম্মেলনটি এ কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ যে বর্তমান সরকারের আমলে এটিই শেষ সম্মেলন। সম্প্রতি সমাপ্ত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে অনেক বিষয় উঠে এসেছে। যার ভেতর দিয়ে জেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা, ভূমি প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ের বাস্তব চিত্র উপস্থাপিত হয়।
ডিসিদের সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ২৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন, যার মধ্যে নাগরিকদের সর্বোচ্চ সরকারী সেবা নিশ্চিত করা, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ, যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, শিল্পাঞ্চলে শান্তি রক্ষা, পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রফতানি নির্বিঘœ করা, জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করা অগ্রাধিকার পেয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘এখানে আমি বলতে চাই, বিনা দ্বিধায় আপনারা টেন্ডারবাজি, পেশীশক্তি, সন্ত্রাস এবং মাদক নির্মূল করবেন। এখানে কে কোন্ দল করে, কে কী করে সেগুলো দেখার কোন দরকার নেই।’ প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্যের পর তাঁরা কর্তব্য পালনে পিছপা হবেন না এমনটাই প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না এমনটাই দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকবৃন্দ ভাবতে চান। এই সম্মেলনে ডিসিদের পক্ষ থেকেও প্রস্তাব আকারে ২৩টি অনুরোধ রাখা হয়েছে সরকারের কাছে। যার মধ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো থেকে শুরু করে আইনগত কিছু জটিলতা নিরসনের কথাও বলা হয়েছে। সেগুলোরও যৌক্তিক সমাধান অনস্বীকার্য। এবার ডিসিরা ৩৪৭টি সুপারিশ করেছিলেন যা গৃহীত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এগুলো স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই নয়, সামাজিক অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অনেক দেশকে আমরা ছাড়িয়ে গেছি। এ অবস্থা ধরে রাখতে এবং আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দলনিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট।
সাধারণ মানুষ আশা করে জেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকগণ যে জনসেবক সেটি অবশ্যই তারা স্মরণে রাখবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর জনহিতকর ও যুগোপযোগী নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে মান্য করার মধ্য দিয়ে দেশসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন

দেশের একাদশ সাধারণ নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই এই নির্বাচন ঘিরে নানামুখী তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের এলাকায় জনসংযোগ করার জন্য বলা হয়েছে। বিএনপিও সম্প্রতি একটি সমাবেশ থেকে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে বলেছে, দলের চেয়ারপারসনের কারামুক্তির ওপরই তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নির্ভর করছে। অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল ও তাদের জোট। নির্বাচনের আগে উভয় জোটে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছুই। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গত বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুুরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নির্বাচন কমিশন সচিব জানিয়েছেন, এটা ছিল তাঁর বিদায়ী বৈঠক। বৈঠক শেষে মার্শা বার্নিকাট সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই বৈঠকে নির্বাচন প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনে সব দলকে সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মার্শা বার্নিকাট। একাদশ সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলেছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনেই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্শা বার্নিকাট। ওদিকে গত বুধবার রাতে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের প্রতিনিধিসভায় আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপকমিটির শুনানিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর প্রিন্সিপাল ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যালিস জি ওয়েলস জানিয়েছেন, বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নও চায় সংবিধান মেনেই ভোট হোক, তবে অবশ্যই তা অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও আশা করে, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সব দলের সমান উপস্থিতি থাকবে।
মোট কথা, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে দেশের অংশীজনদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমান আগ্রহ রয়েছে। এই নির্বাচন যে সরকার ও ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করার দায়বদ্ধতা ইসির। তবে সরকারের দায়িত্বও কম নয়। নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ইসির অগ্নিপরীক্ষা ৩০ জুলাই। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হলে সাধারণের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হবে। সাধারণের বিশ্বাসের ভিত যত দৃঢ় হবে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করার কাজ তত সহজ হবে।

বর্ষায় জনদুর্ভোগ

মৌসুমী বায়ুর সক্রিয়তায় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ভরা বর্ষায় অবিরাম বৃষ্টির ধারা যেমন শান্ত-স্নিগ্ধ প্রলেপ বুলিয়ে দেয় পাশাপাশি জনজীবনে দুর্ভোগেরও শেষ থাকে না। আষাঢ় মাস গেল প্রায়ই অনাবৃষ্টিতে। তার আগে জ্যৈষ্ঠ মাসের বৃষ্টিতে প্রকৃতি ঠিক তার নিয়মে চলেনি। আর শ্রাবণ মাসের শুরুটা তো ছিল প্রচন্ড রোদের খরতাপে জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের জীবন কাহিল হওয়ার অবস্থায়। ফলে প্রকৃতি যথানিয়মে যা করার তাই করল। অর্থাৎ অত্যধিক জলীয় বাষ্পের পরিণতিতে সারাদেশে নিম্নচাপের মতো প্রাকৃতিক সমন তৈরি হলো। আশঙ্কা করা হচ্ছিল ঝড় এবং অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস। মঙ্গলবার থেকে সেটাই প্রবল বেগে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় বৃষ্টির ধারায় বর্ষিত হলো। সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থার কারণে বৃষ্টির পানি মানেই জলাবদ্ধতা, মাত্রাতিরিক্ত যানজট সঙ্গে আরও তীব্রভাবে সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।
বৃষ্টির কারণে এমনিতেই যানজট অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, সঙ্গে যদি জলাবদ্ধতার মতো অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাহলে সেই দুরবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকে সে কথা বলারও অপেক্ষা থাকে না। বর্ষণস্নাত বাংলার নিরন্তর বৃষ্টির ধারা জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিলেও নাজেহাল করতেও এর জুড়ি নেই। তবে এখানে শুধু প্রকৃতির ওপর দায় চাপালে চলবে না, মানুষের সৃষ্ট কোন সমস্যা কতখানি প্রভাব ফেলছে জনজীবনে সেটাকেও বিবেচনায় আনা অত্যন্ত জরুরী। সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থা আমাদের নিত্য নৈমিত্তিক সমস্যা। তার ওপর রাস্তার চারপাশে খানাখন্দ খোঁড়াও এক ধরনের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা তৈরি করে। প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে যেভাবে রাস্তা কাটা হয়ে থাকে তাকে ঠিকঠাক সংস্কার না করাও এক ধরনের অপরাধ। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা-ই হয়ে থাকে। এ ছাড়াও নর্দমা এবং নালার পানি নিষ্কাশনেও থাকে হরেক রকম বাধাবিপত্তি। বিভিন্ন অপরিশোধ্য বর্জ্য যেখানে সেখানে জমা করে রাখাও সড়ক ব্যবস্থাকে দুর্দশার শেষ পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশেষ করে পলিথিনের মতো বর্জ্য নালা-নর্দমাকে যে পরিমাণ সঙ্কটে আবর্তিত করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে জলাবদ্ধতাকে কোনভাবেই আটকানো যাবে না। ফলে পথচারী এবং যাত্রী দুর্ভোগও কমানো একেবারে অসম্ভব। বর্ষাকাল বাংলার সমৃদ্ধ প্রকৃতির অবারিত দান। এই বর্ষণ যাতে গণমানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কোন ধরনের হুমকি তৈরি করতে না পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত, আধুনিক এবং জনবান্ধব করা এই মুহূর্তে সব থেকে বেশি প্রয়োজন। প্রত্যাশিত বর্ষা তার প্রকৃতিগত আবেদন নিয়ে বার বার ফিরে আসবে কিন্তু তাই বলে জনদুর্ভোগের মতো পরিস্থিতি বেসামাল অবস্থায় নিয়ে যাওয়াও সঙ্গত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহৃদয় বিবেচনায় এসব সমস্যা আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানাচ্ছি।

বেসরকারি চিকিৎসা সেবা শৃংখলাহীন

দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে যে শৃঙ্খলা নেই, ভুক্তভোগীরা সে সম্পর্কে বিলক্ষণ জ্ঞাত। রোগ নির্ণয়ের জন্য একই রোগীর পরীক্ষার ফল একেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একেক রকম। আবার ডায়াগনস্টিক সেন্টারভেদে একই পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়ে থাকে একেক ধরনের ফি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্যাথলজি পরীক্ষার ফি, সেবার মূল্য এবং চিকিৎসকদের চিকিৎসা ফি আলাদা। অথচ প্যাথলজি পরীক্ষা থেকে শুরু করে সব ধরনের পরীক্ষায় যে মান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তা নয়। বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবা নিয়েও মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। অস্বাভাবিক ফি আদায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে ব্যয় বৃদ্ধিসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের ‘পকেট কাটা’ হয়। আবার দেশের অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কোনো নিবন্ধন নেই।
চিকিৎসা পেশা আর দশটা পেশার মতো নয়। এ পেশাকে দুনিয়াব্যাপী মহৎ পেশা হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়। যেখানে রোগীর বাঁচা-মরা তথা জীবন নিয়ে কাজ করা হয়, সেখানে রোগীর গলায় ছুরি ধরে অর্থ আদায় করা কিংবা অনৈতিকভাবে স্বজনদের পকেট কাটার কোনো অবকাশ নেই। চিকিৎসা পেশা একটি মহান পেশা। স্বাস্থ্যসেবা অন্য দশটি ব্যবসার মতো নয়। এখানে মানুষের জীবন থাকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকসহ অন্যদের হাতে। অথচ এগুলো দেখভাল করার জন্য কোনো নীতিমালা নেই। দেখা যায় সামান্য কারণে অনেক সময় চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্মচারীরা ধর্মঘট ডাকে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলা হয়। মানবিকতা, মূল্যবোধ কিংবা সেবার মনোবৃত্তি না থাকলে চিকিৎসাসেবার মান ক্রমাগত নিচেই নামতে থাকবে। দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন পরীক্ষার ফি, সেবার মূল্যতালিকা এবং চিকিৎসকদের চিকিৎসা ফির তালিকা উন্মুক্ত স্থানে টাঙানোর যে নির্দেশনা হাইকোর্ট থেকে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। একই সঙ্গে মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২ অনুযায়ী নীতিমালা তৈরি করতে এবং তা বাস্তবায়নে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমরা আশা করি, সরকার জরুরি ভিত্তিতে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। চিকিৎসাক্ষেত্রে কেউ যাতে প্রতারণার শিকার না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা জরুরি।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হউক

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা কী পরিস্থিতিতে, কেন দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, সে কথা কমবেশি সবার জানা। আন্তর্জাতিক মহলও এ ব্যাপারে অবহিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় মানবাধিকার সংস্থায় তাদের ওপর পরিচালিত নির্যাতন-নিপীড়নের বিভিন্ন ঘটনার নথি এবং ভিডিও রেকর্ড রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে তুলাতলী গ্রামের ঘটনা বেশি আলোচিত। ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট তুলাতলীতে হতাযজ্ঞ চালিয়েছিল মিয়ানমারের সেনারা। সেখানে যে কায়দায় নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের ঘটনা ঘটানো হয় তা অবর্ণনীয়। এমন নৃশংসতার নজির ইতিহাসে খুব কমই আছে। সম্প্রতি তুলাতলীর ওই ঘটনার বিবরণ আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) পেশ করেছে ব্রিটিশ আইনজীবীদের ফোরাম ‘গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্স’।
গত ১২ জুন আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বারে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পেশ করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ওপর বেশ কয়েক দশক ধরেই নিপীড়ন চলছে। গত আগস্টে তা নতুন মাত্রা পায়। তুলাতলী গ্রামের চার হাজার ৭০০ জন বাসিন্দার মধ্যে রাখাইন জনগোষ্ঠীর লোক ছিল মাত্র ৩৫০ জন। ২০১২ সালে রোহিঙ্গারা ভোটাধিকার হারালে সব কর্তৃত্ব চলে যায় রাখাইনদের হাতে। গ্রামপ্রধানও রাখাইনদের মধ্য থেকে করা হয়। ৩০ আগস্টের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে কমপ্লায়েন্স বলেছে, গ্রামপ্রধানের কথায় নদীর পারে জমায়েত হয় রোহিঙ্গারা। সেখানে তাদের ওপর খুব কাছ থেকে গুলি ছোড়ে মিয়ানমারের সেনারা। কাউকে কাউকে ছুরিকাঘাত করা হয়, অনেককে লাঠিপেটা করা হয়। যারা সাঁতরে নদী পাড়ি দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের ওপরও গুলি চালানো হয়েছিল। নারীদের পুরুষদের থেকে আলাদা করে বসানো হয়েছিল। তারা বাবা, স্বামী, ভাই ও সন্তানদের হত্যার দৃশ্য দেখতে বাধ্য হয়। নদীর পারে বড় গর্ত খুঁড়ে হতাহতদের ছুড়ে ফেলে মিয়ানমার বাহিনী। দাহ্যপদার্থ ঢেলে আর হেলিকপ্টার থেকে পেট্রলের ড্রাম ফেলে হতাহতদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মায়েদের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে সে আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়। কাউকে কাউকে নদীর পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়।
পুরুষ ও শিশুদের হত্যার পর রোহিঙ্গা নারীদের গ্রামে নিয়ে যায় মিয়ানমার বাহিনী। সেখানে তাদের গণধর্ষণ করা হয়, হত্যা করা হয়। অনেককে অজ্ঞান অবস্থায় ঘরে রেখে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তুলাতলী থেকে যারা প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে আসতে পেরেছে, তাদের কাছে এমন বিবরণ শোনেন গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের সদস্যরা। তাদের অনেকে দুদিন পর্যন্ত গ্রামের আশপাশে অপেক্ষা করেছিল কাউকে জীবিত পাওয়ার আশায়, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এ তথ্যও তারা জানায় যে নিরাপত্তা বাহিনী তুলাতলী ফিরে গিয়ে হত্যাযজ্ঞের সব আলামত ধ্বংস করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির আউশভিচে পরিচালিত হত্যাযজ্ঞ, নৃশংসতার চেয়ে এ ঘটনা কম কিসে? এমন ঘটনা এখনো ঘটে, সেটাই পরম আশ্চর্যের বিষয়। কমপ্লায়েন্স বিশ্বাস করে, এজাতীয় গণহত্যা ঠেকাতেই আইসিসি গঠিত হয়েছে। আমরাও তা-ই মনে করি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, নিপীড়ন বন্ধ হবে না আইসিসি হস্তক্ষেপ না করলে। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আইসিসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমরা আশা করি।

দেশে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি

তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ দ্রুত এগোচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাতিসংঘের ২০১৮ সালের ই-গভর্নমেন্ট সূচকে বাংলাদেশ ৯ ধাপ এগিয়েছে। ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১১৫তম। একই সঙ্গে ই-পার্টিসিপেশন সূচকে ৩৩ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ হয়েছে ৫১তম দেশ। ইলেকট্রনিক বা ই-গভর্নমেন্ট সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, ভারত ও মালদ্বীপ। ই-পার্টিসিপেশন সূচকে বাংলাদেশের আগে রয়েছে শুধু ভারত।
কোনো দেশে ই-গভর্ন্যান্স ও ই-পার্টিসিপেশন যত শক্তিশালী হয়, সে দেশের সরকারি কাজকর্মের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তত বাড়ে। মানুষ বেশি করে সরকারি কাজকর্ম সম্পর্কে অবহিত হয়। সেবা গ্রহণ সহজ হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য তথা যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতি পায়। একই সঙ্গে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি কাজে হয়রানি ইত্যাদি অনেক কমে যায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ জরিপে বাংলাদেশে দুর্নীতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। দুর্নীতির ধারণা সূচকে ২০১৬ সালে ১৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৫তম, ২০১৭ সালে দুই ধাপ উন্নতি হওয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৪৩তম। এখানে ই-গভর্নমেন্ট ও ই-পার্টিসিপেশনের একটি বড় ভূমিকা থাকতে পারে বলেই ধারণা করা যায়। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের অবস্থান নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাকর। এই কলঙ্ক থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে। গৌরবজনক অবস্থানের দিকে এগোতে হবে। তার জন্য ই-গভর্ন্যান্সকে ক্রমান্বয়ে আরো জোরদার করতে হবে। সাধারণত ই-গভর্ন্যান্স বলতে বোঝায় সরকারি যাবতীয় সেবা, তথ্য আদান-প্রদান, লেনদেন ও বিদ্যমান বিভিন্ন ব্যবস্থার সমন্বয় সাধনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার। তথ্য-প্রযুক্তির এই ব্যবহার হবে সরকার ও জনগণের মধ্যে (জিটুসি), সরকার ও ব্যবসা-বাণিজ্যে (জিটুবি), আন্ত সরকার (জিটুজি) এবং সরকার ও কর্মীদের মধ্যে (জিটুই)।
আমরা একসময় দেখেছি বিভিন্ন সরকারি কাজের দরপত্র নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হতে। শিক্ষা ভবনে প্রায়ই এমন সংঘর্ষ হতো। ইলেকট্রনিক পদ্ধতির ব্যবহার শুরু করার পর তা ক্রমেই কমছে। এখন প্রায় নেই বললেই চলে। এখন দেশব্যাপী ভূমি অফিসগুলোকে বলা হয় দুর্নীতির আখড়া। জমি কেনাবেচা, নামজারিসহ যাবতীয় কাজ তথ্য-প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসা গেলে এখানেও দুর্নীতি অনেক কমবে। পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরো স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আগের তুলনায় বর্তমানে অনেকটাই শক্তিশালী। জনগণের কাছে তাদের কর্মকাণ্ড ক্রমেই বেশি করে দৃশ্যমান হচ্ছে। জনবল, প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিকস দিয়ে তাদের আরো শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, তাদের দুর্নীতি অনুসন্ধানের কাজও তত বেশি সহজ হবে।

গণসংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল শনিবার, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল করা, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো, গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পাওয়া, পশ্চিমবঙ্গের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি অর্জন এবং সরকারের বিভিন্ন অর্জনে অবদান রাখায় তাঁকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁর দল আওয়ামী লীগ এ আয়োজন করেছিল।
প্রদত্ত সংবর্ধনা-সম্মাননা বাংলাদেশের মানুষকে উৎসর্গ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কলি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে…।’ জনগণ কতটুকু পেল সেটাই তাঁর কাছে সর্বাধিক বিবেচ্য বিষয়। এর বাইরে তাঁর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে আওয়ামী লীগকে গোছানো এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সামনে অগ্রসর হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে তাঁর অভিযাত্রার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ করাই আমার লক্ষ্য।…এই সংবর্ধনা আমি উৎসর্গ করছি বাংলার জনগণকে, বাংলার মানুষকে।’
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে দেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন দৃশ্যমান হচ্ছে। আর সে কারণেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আসতে পেরেছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং গ্রামে শহরের মতো নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করার কথা বলেন। এ সবই পূরণ হবে যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের আশার কথাও ব্যক্ত করেন তিনি।
দেশের জন্য, দশের জন্য উন্নয়ন-চিন্তা করাই রাজনীতিকের কর্তব্য এবং ক্ষমতাসীন হলে সেসব পূরণ করা রাজনীতিকের দায়িত্ব। জনগণের সমর্থন-সহযোগিতা নিয়েই কাজ করতে হয়, তাই অর্জনের জন্য প্রশংসা-সংবর্ধনা রাজনীতিক পেলেও মূল প্রাপক জনগণ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই মহানুভবতাই প্রকাশ পেয়েছে।
আমরা আশা করি, বাংলাদেশের এই অগ্রগতি একটি স্থায়ী ও সুদৃঢ় ভিত্তি পাবে। এ জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আইনের শাসন ও গণতন্ত্র চর্চার উন্নয়ন, স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা, দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলার উপযোগী মানসম্মত শিক্ষাসহ সামাজিক উন্নয়নের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।

বেতন ভাতা বৈষম্য

অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রেই নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। আমদানি থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত কোথাও দামদরের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। এতে নিম্ন আয়ের লোকজনের জীবন ধারণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন অবস্থায় সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে। সরকারি খাতের বিভিন্ন কল-কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা যে বেতন পায়, বেসরকারি খাতের অনেক কারখানায় সরকার নির্ধারিত বেতনই তার অর্ধেকেরও কম। আবার এমন বহু বেসরকারি খাত রয়েছে, যেগুলোতে কোনো নিম্নতম মজুরি কখনো নির্ধারণই করা হয়নি। সেসব খাতে নামমাত্র মজুরিতে শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হয়। বেতন-ভাতাও নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না। কথায় কথায় ছাঁটাই করা হয়। কাজের ন্যূনতম নিরাপত্তাও নেই।
জানা যায়, দেশে সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণ করে জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর তাদের মজুরি পুনর্নিধারণ করা হয়। গত বছর নির্ধারণ করা বেতন কাঠামো অনুযায়ী বর্তমানে তাদের নিম্নতম মূল মজুরি আট হাজার ৩০০ টাকা। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাসহ মোট মজুরি হয় ১৬ হাজার টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড। বোর্ড এ পর্যন্ত বেসরকারি ৪২টি খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করেছে। এখনো অর্ধশতাধিক বেসরকারি খাত রয়েছে, যেগুলোতে কখনো কোনো বেতন-ভাতা নির্ধারিত হয়নি। নির্ধারণ করা খাতগুলোতেও বেতন-ভাতায় কোনো সাম্য নেই। বস্ত্র খাতের শ্রমিকদের মূল মজুরি তিন হাজার ৬০০ টাকা, অন্যান্য সুবিধাসহ মোট মজুরি হয় পাঁচ হাজার ৭১০ টাকা। অনেক খাতে আরো কম। কোনো কোনো খাতে গত ৩৫ বছরেও বেতন পুনর্নিধারণ করা হয়নি। যেমন পেট্রলপাম্প শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৯৮৭ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং সেটি এখনো বিদ্যমান। তাদের মূল বেতন ৫৬০ টাকা এবং অন্যান্য সুবিধাসহ মোট প্রাপ্য হয় ৭৯২ টাকা। এই বেতনে এখন হয়তো কোনো শ্রমিক পাওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে মালিকরা যাকে যা দিয়ে পারেন নিয়োগ দেবেন। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় পৌনে সাত কোটি শ্রমিক রয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশেরই কোনো নির্ধারিত মজুরি নেই। তারা নানাভাবে শোষণের শিকার হচ্ছে।
দেশে জনসংখ্যা বেশি, বেকারত্বের হারও বেশি। তার সুযোগ নিয়ে নিম্ন আয়ের এসব মানুষকে কেউ যাতে অনৈতিকভাবে শোষণ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। সে ক্ষেত্রে সরকারই যদি এমন বৈষম্যমূলক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে এসব গরিব মানুষ যাবে কোথায়? আমরা চাই, সরকারি-বেসরকারি খাতগুলোর মধ্যে বেতন-ভাতার বৈষম্য কমিয়ে আনা হোক। জীবনধারণের ন্যূনতম মান বজায় রেখে প্রত্যেকের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা হোক।

প্রচন্ড গরম মোকাবেলায় সচেতনতা

এ বছর গ্রীষ্মকালে গরম তুলনামূলকভাবে কমই অনুভূত হয়েছে। পুরো গ্রীষ্মকালই কমবেশি বৃষ্টিপাত ছিল। কিন্তু শ্রাবণ মাসে এসে হঠাৎ করেই বৃষ্টিপাত কমে গেছে। গত এক সপ্তাহ বৃষ্টিপাত ছিল খুবই কম। বরং কাঠফাটা রোদ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সারা দেশেই রীতিমতো দাবদাহ বিরাজ করেছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর্দ্রতা বেশি থাকায় গরমের অনুভূতি ছিল আরো বেশি, ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছিল, সামান্য বৃষ্টি হতে পারে, তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। শনিবার থেকে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে এবং তাতে গরম অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু শুক্রবারও মানুষ গরমে হাঁসফাঁস করেছে। সেই সঙ্গে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় দুর্ভোগ অনেক বেড়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়েই আবহাওয়া ক্রমে চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠছে। ঠাণ্ডা ও গরমের তীব্রতাও বাড়ছে। বাস্তবেও বিজ্ঞানীদের এমন দাবির সত্যতা মিলছে। উত্তর মেরুর কাছাকাছি থাকা শীতপ্রধান অনেক দেশেই এ বছর রেকর্ড গরম পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সুইডেনে দাবানলে হাজার হাজার একর বন পুড়ে গেছে। আগুন এখনো জ্বলছে। কানাডায় তাপপ্রবাহে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জাপানে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, মারা গেছে দুই শতাধিক মানুষ। কিছুদিন আগে ভারতে ধূলিঝড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদহানি হয়েছে। উত্তর ভারত ও নেপালে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আরো অনেক দেশেই এ রকম পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আমরাও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের বাইরে নই। যেকোনো সময় যেকোনো দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে পড়তে পারি। শ্রাবণ মাসের এই অস্বাভাবিক গরম তেমনই একটি ঘটনা। তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রতিক্রিয়া বা দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা ক্রমে আরো বাড়াতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা রুখতে পারব না; কিন্তু তার ক্ষয়ক্ষতি যেন কম হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই প্রচেষ্টায় আমাদের ঘাটতি সীমাহীন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক নিচু এলাকা বা দ্বীপদেশ এরই মধ্যে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে তলিয়ে গেছে। আমাদের অনেক উপকূলীয় এলাকা এবং প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রবল হুমকির মুখে। একটু অস্বাভাবিক জোয়ার হলেও অনেক এলাকা তলিয়ে যায়, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
দাবদাহ বা গরমে হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়াসহ বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। সেসব সমস্যার ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণা বেড়ে যায় বলে মানুষ যেখানে-সেখানে পানি পান করে। অবিশুদ্ধ পানি পান করে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ জন্য বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্তি সহজ করতে হবে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক গরম মোকাবেলায় মানুষকে সচেতনও করতে হবে।

মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবারও কমেছে। সার্বিকভাবে পাস করেছে ৬৬.৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত বছর এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮.৯১ শতাংশ, জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৩৭ হাজার ৭২৬ জন। সেই হিসাবে এবার উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার কমেছে ২.২৭ শতাংশ। আর পূর্ণাঙ্গ জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে আট হাজার ৪৬৪ জন। দ্বাদশ শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পর্যায়ে পা রাখতে যাওয়া এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে মোট ২৯ হাজার ২৬২ জন। শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও এবার কমেছে। এবার ৪০০ প্রতিষ্ঠান থেকে সবাই পাস করেছে। গতবার এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫৩২। তবে কেউ পাস করেনি, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। গতবার ৭২টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। এবার এমন প্রতিষ্ঠান ৫৫টি। আটটি সাধারণ বোর্ড এবং মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে সারা দেশে দুই হাজার ৫৪১টি কেন্দ্রে এবার মোট ১৩ লাখ ১১ হাজার ৪৫৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় পাসের হার সামান্য বেড়েছে। তবে কমেছে জিপিএ ৫ পাওয়ার সংখ্যা।
বেশ কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে ফাঁস হলেও এবার প্রশ্ন ফাঁসের কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতার পর প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় যে পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে, তার প্রশংসা করে পুরো পরীক্ষার সময় কমিয়ে আনার কথা ভাবতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, এখন পরীক্ষা শেষ করতে যে রকম প্রায় দুই মাস সময় লেগে যায়, তা কমিয়ে আনতে পারলে শিক্ষার্থীদের আরো বেশি মনোযোগী করা যাবে। তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর যে চেষ্টা চলছে তা আরো জোরদার করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারলে এ দেশে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। যেসব প্রতিষ্ঠান খারাপ ফল করেছে, সেগুলোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে না পারলে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যাবে না। আমরা আশা করি সেদিকে সরকার দৃষ্টি দেবে। শতভাগ পাস এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কেন কমেছে, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি কেউ পাস করেনি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে না পারলে শিক্ষার মান যে উন্নত হবে না, এ উপলব্ধি সবারই থাকা দরকার।
এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন। তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ সুন্দর হোক। যারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদের হতাশ হলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, জীবনের অনেক পথ এখনো চলার বাকি। একবার হোঁচট খাওয়া মানে জীবন থেমে যাওয়া নয়।