বিভাগ: সম্পাদকীয়

বোরো সংগ্রহের পদক্ষেপ জরুরী

হাওরাঞ্চলের বোরো ধান কাটা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বোরো ধানও ৭৫ শতাংশের মতো কাটা হয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বাকি ২৫ শতাংশের ধানও কাটা হয়ে যাবে। অথচ এখনো সরকারের ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়নি। নানা কারণে কৃষকদের পক্ষে ধান ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এই সুযোগে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা অত্যন্ত কম দামে ধান কিনে নিচ্ছে। সরকার যেখানে ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে মণপ্রতি এক হাজার ৪০ টাকা, সেখানে ফড়িয়ারা এখন ধান কিনছে ধানের জাতভেদে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে। অথচ এক মণ ধানের উৎপাদন খরচই পড়েছে প্রায় ৮০০ টাকা। তাই ফলন ভালো হলেও ধানের দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকারের সংগ্রহ অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষকরা যাতে ন্যায্য মূল্য পায় তা নিশ্চিত করা। জানা যায়, খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির গত ৮ এপ্রিলের সভায় নির্ধারিত হয়েছিল, ধানের সংগ্রহ মূল্য হবে কেজিপ্রতি ২৬ টাকা এবং ২ মে থেকে এই সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হবে। অথচ ১৮ মে পর্যন্ত কোথাও সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। এই বিলম্বের কারণে বেশির ভাগ কৃষক তাদের বিক্রিযোগ্য ধানের বেশির ভাগই অত্যন্ত কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে এবং দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের এমন দুর্গতি কেন? এখন বা আরো কয়েক দিন পরে যদি এক হাজার ৪০ টাকা মণ দরে ধান কেনা হয় তাতে কারা লাভবান হবে? নিশ্চয়ই ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাদের লাভবান করার দিকে সংগ্রহ অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের এত আগ্রহ কেন? কেউ কেউ মনে করেন, এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভবান হওয়ার এই প্রক্রিয়ায় সংগ্রহকারীরাও লাভবান হয়। কিন্তু এতে সরকারের আসল উদ্দেশ্য যে ব্যাহত হয় সেদিকে কেউ নজর দেবে না কি? শুধু দাম নয়, সংগ্রহ অভিযানের এলাকাভিত্তিক ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও অনেক অভিযোগ রয়েছে। হাওর অধ্যুষিত এলাকা কিশোরগঞ্জে বোরো ধান তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। এ বছর হাওরগুলোতে ধানের যে বাম্পার ফলন হয়েছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে এই জেলায় চাল উৎপাদিত হবে প্রায় সাত লাখ টন। অথচ এই জেলায় সরকারের চাল কেনার টার্গেট ধরা হয়েছে মাত্র সাত হাজার টন, অর্থাৎ মোট উৎপাদনের ১ শতাংশ মাত্র। পাশের ময়মনসিংহ জেলায় চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার টন।
হাওরাঞ্চলে শুধু কৃষক নয়, কৃষি শ্রমিকরাও ধান বিক্রি করে। কারণ মজুরি হিসেবে তাদের ধান দেওয়া হয়। একেকজন শ্রমিক মৌসুমে ৫০-৬০ মণ ধানও পেয়ে থাকে। তাদের পক্ষে ধান ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। সংগ্রহ অভিযান বিলম্বিত করে নিম্ন আয়ের এসব মানুষকে এভাবে বঞ্চিত করা অত্যন্ত অমানবিক কাজ, যা প্রায় প্রতিবছরই ঘটে থাকে। আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ দ্রুত সংগ্রহ অভিযান শুরু করে উৎপাদক পর্যায়ের হতাশা কিছুটা হলেও কাটাতে চেষ্টা করবে।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া হউক

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করছে। একটি নাজুক অর্থনীতির পক্ষে এটি এক অসহনীয় পরিস্থিতি। অথচ এর কোনো আশু সমাধানও দেখা যাচ্ছে না। মিয়ানমার বলছে, তারা পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে। এ ব্যাপারে গত নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে; কিন্তু প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবের নেতৃত্বে গঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ এ নিয়ে কাজ করছে। এই গ্রুপের প্রথম বৈঠক হয় জানুয়ারিতে নেপিডোতে, আর দ্বিতীয় বৈঠক হয়েছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অস্পষ্টতা থেকেই যাচ্ছে।
প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার যা করছে তাতে সদিচ্ছার ঘাটতি প্রবল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে আট হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার একটি তালিকা হস্তান্তর করে। মিয়ানমার সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার মাত্র ৮৭৮ জনের যাচাই-বাছাই শেষ করেছে। তাদেরও ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারিত হয়নি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো যে পরিবেশ তৈরির কথা ছিল, সে ক্ষেত্রেও বিশেষ কোনো অগ্রগতি নেই। এ অবস্থায় মিয়ানমার ফিরিয়ে নিতে চাইলেও রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরে যাবে না। আর আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বেচ্ছায় ফিরে না গেলে কোনো রোহিঙ্গাকে জোর করে সেখানে ফেরত পাঠানো যাবে না। রোহিঙ্গারা নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যেতে চায়। অথচ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে তাদের নানা রকম স্থাপনা তৈরি করছে। এটি কোনোভাবেই প্রত্যাবাসনের জন্য সহায়ক নয়।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে দৈনিক গড়ে ৬০টি শিশুর জন্ম হচ্ছে। গত ৯ মাসে সেখানে জন্ম নিয়েছে ১৬ হাজার শিশু। প্রায় ১৫ হাজার নারী অন্তঃসত্ত্বা। তাদের অনেকেই মিয়ানমার সেনাদের ধর্ষণের শিকার হয়ে এখানে পালিয়ে এসেছে। এ অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপিডোতে দেশটির সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ড. উইন মিয়াট আয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন, সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অনেক গুরুতর অভিযোগ আছে। তাদের অপকর্মের দায় পুরো বাহিনী কেন নেবে? অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বাংলাদেশে যারা পালিয়ে গেছে তারাও নিপীড়নের প্রতিকার চেয়ে মামলা করতে পারবে। সরকার তাদের সব রকম সহায়তা দেবে, মামলার খরচও জোগাবে। মিয়ানমারের মন্ত্রীর এ ঘোষণাকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা দ্রুত এ ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। আমরা চাই, দুই দেশ হাতে হাত মিলিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাক, সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করুক। রোহিঙ্গা সংকট সেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাঁটা হয়ে থাকুক, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। আমরা আশা করি, উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি রোধ চাই

এবারও রোজার আগে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলো না। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম কোনো কারণ ছাড়াই ঊর্ধ্বমুখী। সরকার কিংবা ব্যবসায়ীদের আশ্বাস কোনো কাজে লাগেনি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সব পণ্যের মজুদ চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি থাকায় মূল্যবৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা নেই। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজারে সব জিনিসের দামই বেড়েছে। রোজার সময় চিনির ব্যবহার বেড়ে যায়। বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা কেজি দরে। অথচ আমদানি ক্ষেত্রে গত ডিসেম্বর থেকে চিনির দাম টনপ্রতি ৫০ ডলার কমেছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ঢাকায় পেঁয়াজের পাইকারি আড়তে অভিযান চালিয়ে বস্তার গায়ে দাম ও পরিমাণ লেখার নির্দেশনা দিয়েছিল। ব্যবসায়ীরা এখনো এ নির্দেশনা মানছেন না। কথা ছিল বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, র‌্যাব-পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং টিমসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আগে থেকে রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও জাল-জালিয়াতি নিয়ে নজর রাখবে। বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও নেই। অনিবার্য প্রভাব পড়েছে বাজারে। নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ইচ্ছামতো জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন খরচ কিংবা আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের ওঠানামা নয়, বাংলাদেশের বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে বাজার সিন্ডিকেটের গোপন ইশারায়। ক্ষেত্র বিশেষে মনে করা যেতে পারে, এই সিন্ডিকেটের কাছে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও অসহায়। প্যাকেটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে প্যাকেটের গায়ে পণ্যের দাম লেখা আছে কি না, উৎপাদন ও মেয়াদ ঠিকঠাক আছে কি না এসব নিয়ে মোবাইল কোর্ট সর্বশেষ কবে পরিচালিত হয়েছে? সাধারণ ভোগ্যপণ্যে ভেজাল মেশানো, পণ্য তৈরির পরিবেশসহ নানা বিষয়ে রোজার মাসে কোনো অভিযান বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কোনো সিদ্ধান্ত কি গত বুধবার পর্যন্ত বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিয়েছে? ওদিকে আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি জানিয়েছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশেরও বেশি সরাসরি পানের জন্য নিরাপদ নয়। ওই দুধ বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া এবং পাঁচটি জেলার ১৫টি হিমাগার থেকে সংগৃহীত নমুনায় মলবাহিত কলিফর্ম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশের নমুনাই কোলাই দ্বারা উচ্চমাত্রায় দূষিত। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, দুগ্ধ খামার থেকে শুরু করে বিক্রির জন্য পাঠানো প্রতিটি পর্যায়ে দুধ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত।
আর এসব ঘটনা ঘটছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক নজরদারি না থাকার কারণেই। প্রায় প্রতিটি পণ্যে ভেজাল দেওয়া যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেহেতু অনৈতিকভাবে দাম বাড়ালে কিংবা ভেজাল দেওয়া হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো খবরদারি থাকে না, শাস্তি হয় না। কাজেই ব্যবসায়ীরাও এখন যেন মওকা পেয়ে গেছে। তবে রোজার মাসে বাজারে নজরদারি না বাড়ালে ভেতরে ভেতরে জন-অসন্তোষ বাড়বে, যার ফল ভালো হবে না। সময় থাকতে বাজারে নজর দিন।

সাধনার মাস রমজান

শুরু হচ্ছে মুসলমানদের সংযম সাধনার মাস পবিত্র রমজান। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম ফরজ ইবাদত রোজা। কুপ্রবৃত্তি দমন ও আত্মশুদ্ধির সর্বোত্তম উপায় রোজা। পুণ্যময় এই মাস রহমত, বরকত ও মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। বিশ্ব মুসলিমকে শিক্ষা দেয় সংযত-সুন্দর জীবন যাপনের। মুসলিম নর-নারীর কাছে রোজার মাস বহু কাক্সিক্ষত। অবিচ্ছিন্ন ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সংযম সাধনা করতে হয় এই মাসে। সেই সঙ্গে নিজেকে বিরত রাখতে হবে সব ধরনের মিথ্যা এবং অন্যায় অপকর্ম থেকে। রমজান আমাদের সংযমী হওয়ার শিক্ষা দেয়। শুধু পানাহার থেকে দিনের বেলায় বিরত থাকাই সিয়াম সাধনার মূল উদ্দেশ্য নয়, পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি নিজের মুখ ও জিহ্বাকে সংযত রাখতে হবে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নয়, পুরো মাসের সবটুকু সময় সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমেই সিয়াম সাধনার প্রকৃত আত্মতৃপ্তি লাভ করা সম্ভব। মহান আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের আশায় মুসলিম জনগোষ্ঠী শ্রদ্ধা ও নির্মল ভালোবাসায় বরণ করে এই মাসকে। পবিত্র এই মাসের মধ্যে নিহিত রয়েছে দুনিয়া এবং পরকালের অশেষ কল্যাণ। মহান আল্লাহ এই মাসের প্রতিটি দিন ও মুহূর্তকে নির্ধারিত করে দিয়েছেন সংযম সাধনার জন্য। প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেকের জন্য সুবেহ সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা ফরজ করেছেন। এর পাশাপাশি তাগিদ দেওয়া হয়েছে জাগতিক সব বিষয়ে সংযত জীবনাচারের। নির্দেশনা রয়েছে সব ধরনের পাপ ও অন্যায় অপকর্ম থেকে দূরে থাকার। রোজার মাসে কথায় ও কাজে মিতাচারী হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এটাই বিধান, এটাই রমজান মাসের শিক্ষা।
পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনার ব্যাপারে আমাদের সমাজে অনেকেই উদাসীন। রোজার মাস এলেই দেখা যায় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এই মাসে বেশি মুনাফার আশায় আগে থেকেই আটঘাট বেঁধে বসে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পবিত্র রমজানের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রোজার মাসে সুবিধা বুঝে ভোগ্যপণ্যের অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা ঘোরতর অন্যায়। অন্যদিকে সিয়াম সাধনার এই মাসে সামর্থ্যবান ও বিত্তশালীদের অনেকেই অপচয় করেন। এই মাসে দেখা যায় বিভিন্ন মার্কেটে আলোকসজ্জা করা হয়। এটাও একধরনের অপচয়। খাওয়াদাওয়ায় বেশি বেশি খরচ না করে পবিত্র এই মাসে মানবতার সেবায় ব্যয় করলে অভাবক্লিষ্ট মানুষের কল্যাণ হয়। রমজানের তাৎপর্য আমাদের প্রত্যেকেরই গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। সিয়াম সাধনার শিক্ষা, এর মাধ্যমে অর্জিত জীবনবোধ যদি জীবনাচরণে প্রতিফলিত হয়, তাহলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে।
এক মাসের সংযম সাধনার ভেতর দিয়ে আমাদের প্রত্যেকের জীবন পরিশুদ্ধ হোক, পবিত্র ও পুণ্যস্নাত হোক। মহান আল্লাহ আমাদের দান করুন সেই তাওফিক, যাতে আমরা পবিত্র রমজানের শিক্ষা সঠিকভাবে উপলব্ধি ও অনুশীলন করতে পারি।

পাসপোর্ট অফিসে অব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের মানুষ ঘরকুনো এ কথা বলার অবকাশ আর নেই। বিভিন্ন কারণে তাদের সংযোগশীলতা বাড়ছে। কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে, চিকিৎসার প্রয়োজনে, শিক্ষার প্রয়োজনে বা ভ্রমণের প্রয়োজনে এ দেশের প্রচুর মানুষ এখন বিদেশে যান। তাঁদের সবার জন্য যে জিনিসটি খুবই জরুরি সেটি হলো পাসপোর্ট। অনেকেই হয়তো বা সত্বর বিদেশে যাবেন না, কিন্তু পাসপোর্ট করে রাখেন। সংযোগশীলতা যে হারে বাড়ছে, সে হারে বাড়ছে না পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সেবা। যে পরিমাণে আধুনিক ও চৌকস সেবা প্রয়োজন, সে পরিমাণে তা দিতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট সংস্থা। ফলে নতুন পাসপোর্টের জন্য বা পাসপোর্ট নবায়নের জন্য আবেদনকারী ব্যক্তিদের ভোগান্তির শেষ নেই। দিনের পর দিন, কখনো মাসের পর মাস তাঁদের আবেদন ঝুলে থাকছে। অথচ সাধারণ পাসপোর্ট ২১ দিনের মধ্যে এবং জরুরি পাসপোর্ট সাত দিনের মধ্যে সরবরাহ করার বিধান রয়েছে। সময়মতো পাসপোর্ট না পাওয়ায় অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে দেশের বাইরে যেতে পারছেন না। ফলে প্রয়োজন মিটছে না। পাসপোর্ট অফিস থেকে এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না। ডিজিটাল যুগে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা, কর্মসম্পাদনে অপটুতা কাম্য হতে পারে না।
মূলত পাসপোর্ট বইয়ের সংকটের কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যে বই সঞ্চয়ে রয়েছে, সেগুলো আগারগাঁও অফিসেই বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। জেলায় জেলায় থাকা পাসপোর্ট অফিসে চাহিদার অর্ধেকও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার আবেদন করা হয় কিন্তু সময়মতো পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রায় আড়াই লাখ পাসপোর্ট আবেদন আটকে আছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে ৫০ লাখ পাসপোর্ট বই ছাপিয়ে আনা হচ্ছে ইংল্যান্ড থেকে। এ পর্যন্ত ১০ লাখ বইয়ের শিপমেন্ট হয়েছে বলে জানা গেছে। অবশ্য এগুলো এখনো হাতে এসে পৌঁছায়নি। কর্তৃপক্ষ বলছে, বইয়ের চেয়েও বড় সমস্যা আবেদনের হার বেড়ে যাওয়া। সবাইকে পাসপোর্ট দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে তারা। দাপ্তরিকভাবে এ কথা বলা হলেও পাসপোর্ট নিয়ে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
পাসপোর্ট সংকটের এ অবস্থার মধ্যেও বিপরীতধর্মী ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিস থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে পাসপোর্ট ইস্যু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার এসব পাসপোর্টের বেশির ভাগই ইস্যু করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য। অন্যদিকে অব্যবস্থাপনার কারণে ই-পাসপোর্টের ব্যবস্থাও চালু হচ্ছে না। ই-পাসপোর্ট বইয়ের জন্য অপেক্ষায় থাকতে থাকতে হাতে থাকা বইও নিঃশেষিত প্রায়। দালালদের তৎপরতাও বড় এক সমস্যা। সঙ্গে রয়েছে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি। এসব সমস্যার সমাধান দরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করি।

রাসায়নিক মুক্ত আম চাই

আমকে বলা হয় ফলের রাজা। কিন্তু কয়জন নিশ্চিন্ত মনে এই ফলের স্বাদ উপভোগ করতে পারবে? রসনার টানে আম মুখে নিলেও মনে ভয় থাকবে, না জানি আমে কী বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হয়েছে। বাজারে বিষমুক্ত আমের সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিবছরই নানা রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য নানা ধরনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়। কিন্তু এসবের খুব একটা সুফল পাচ্ছি কি আমরা?
সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের পশ্চিমাঞ্চল আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। জানা যায়, বাজারে আম আসতে শুরু করায় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন আমে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো বন্ধ করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু অসাধু কিছু ব্যবসায়ী সেসব উদ্যোগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। বাজারে নজরদারি থাকায় তারা বাজার থেকে দূরে বাড়িঘরে অপরিপক্ব আম মজুদ করে এবং সেগুলোতে ক্ষতিকর রাসায়নিক স্প্রে করে রাতের বেলা ট্রাকে চাপায়। ঢাকায় বা দেশের অন্যান্য স্থানে পৌঁছতে পৌঁছতে রাসায়নিকের কারণে সেসব আমের রং বদলে পাকা আমের মতো হয়ে যায়। ক্রেতারা এসব আম কিনে প্রতারিত হয়। এসব আমে পাকা আমের স্বাদ যেমন থাকে না, তেমনি শরীরের জন্যও তা হয় মারাত্মক ক্ষতিকর। এমন কিছু আমের ট্রাক জেলা প্রশাসন আটকও করেছে। তার পরও অনেক ট্রাক নিশ্চয়ই সারা দেশে এমন বহু আম ছড়িয়ে দিয়েছে। ফল পাকাতে যে কার্বাইড ব্যবহার করা হয় তা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তা নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। রেডিও-টেলিভিশনে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! শুধু ফল পাকাতে নয়, ফল যাতে দ্রুত পচে না যায় সে জন্যও ফরমালিনজাতীয় রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ফল বা সবজি যাতে পোকায় নষ্ট না করে সে জন্য যেমন গাছে কীটনাশক ছিটানো হয়, তেমনি ফল বা সবজি সংগ্রহ করেও কীটনাশক মেশানো পানিতে চুবিয়ে নেওয়া হয়। অথচ কীটনাশকভেদে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব ফল বা সবজি খেলে সরাসরি মানবদেহে বিষক্রিয়া ঘটে। কিন্তু কে তা বিবেচনা করে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে তাদের লাভটাই যে মুখ্য।
মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশে অনেক আইন রয়েছে। সেসব বাস্তবায়নের জন্য রয়েছে অনেক কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা। কিন্তু কাজের কাজ প্রায় কিছুই হচ্ছে না। বাজারে ভেজাল বা বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো খাবারের ছড়াছড়ি। আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আরো তৎপর হবে। মানুষ যাতে নিঃশঙ্কচিত্তে বছরের প্রধান ফল আম কিনতে ও খেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

যানজট দূরীকরণ জরুরী

ট্রেনে চলাচল বিষয়ে আমাদের দেশে একটি কথা অনেক দিন ধরে চালু রয়েছে ‘নয়টার গাড়ি কয়টায় ছাড়ে’। প্রান্তিক স্টেশন থেকে ছাড়তে বা পথে বিলম্বজনিত কারণে পরবর্তী স্টেশনগুলোতে ট্রেন যথাসময়ে পৌঁছে না বলে এ কথা চালু হয়েছে। সড়কপথের জন্য এ কথা প্রযোজ্য ছিল না কয়েক বছর আগেও। এখন বাসে-কারে চলার ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। চার লেনের মহাসড়ক হওয়ার পরও সময় মেপে চলা সম্ভব হচ্ছে না।
নির্মাণকাজের জন্য লেন বন্ধ রাখা, প্রবল বৃষ্টিতে সড়কে খানাখন্দ তৈরি হওয়া, মহাসড়কের ওপর বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, মহাসড়কের ওপর হাট-বাজার, লেভেলক্রসিং, ফেরি পারাপার, শহর-গঞ্জের জ্যামে পড়া, ভিড়প্রবণ এলাকায় ফুট ওভারব্রিজ না থাকা প্রভৃতি কারণে মহাসড়কগুলো ‘মহাস্থবির’ দশায় পৌঁছেছে। এসব জটিলতা থেকে কোনো মহাসড়ক মুক্ত নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও নয়। দেশের ব্যস্ততম এই মহাসড়কে প্রায়ই স্থবিরতা নেমে আসে। গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে। রুটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছতে লাগছে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময়। টানা তিন দিন ধরে যানজটে অচল এ মহাসড়ক। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যানজট নিরসনের দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা।
এ পরিস্থিতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এ মহাসড়ক দিয়ে পণ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হয়। চলাচলকারী যানবাহনের ৬০ শতাংশই পণ্যবাহী। কয়েক দিন পর রমজান মাস শুরু হচ্ছে। যানজটের কারণে রমজান উপলক্ষে পণ্য সরবরাহে চরম ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। মহাসড়কের ১৩৯ কিলোমিটারে যানজট ছিল। ফেনী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার সড়কে দীর্ঘ সময় গাড়ি আটকা পড়ে ছিল। যাত্রী ও চালকদের কী দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে তা অনুমেয়। ২০১৬ সালে চার লেন প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেতে বা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে গড়ে সময় লাগত পাঁচ ঘণ্টা। দুই বছরেই মহাসড়কটি বেহাল। মূলত এ কারণেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সওজের হিসাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দিনে গড়ে ২৫ হাজার যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। এ সংখ্যা বর্ধমান। টোল প্লাজার হিসাব অনুযায়ী, দিনে চলাচল করছে ৩০ হাজারের বেশি যান। এমন একটি ব্যস্ত সড়কে এমন অবস্থার কারণে ঢাকার ট্রাকচালকরা ট্রিপ নিতে চাচ্ছেন না। এ মহাসড়ক হয়ে বিভিন্ন জেলায় বাস-মিনিবাস চলাচল প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা চিন্তিত। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আন্তনগর ট্রেনে অতিরিক্ত বগি জোড়া হয়েছে, তাতেও কাজ হচ্ছে না। কিভাবে এ মহাসড়কে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা যায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সতর্কতা

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনসহ বহু আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রলীগের অনেক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। আবার সাম্প্রতিককালে সেই ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর আদর্শবিমুখ, অনৈতিক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জনমনে অসন্তোষেরও কারণ হয়েছে। ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টির কোনো ঘটনা বরদাশত করা হবে না। তিনি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করার এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা নিয়ে কাজ করারও আহ্বান জানান। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ছাত্রলীগের রাজনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সময়োপযোগী একটি বার্তা।
নিকট অতীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খুনাখুনি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো অনেক ঘটনাই ঘটেছে। কিছু ঘটনায় ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে এবং অনেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হয়েছে। ফলে কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে বাড়াবাড়ি করার যে প্রবণতা দেখা যেত, তা অনেকটাই কমে এসেছে। তার পরও প্রধানমন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারি ধ্বংসাত্মক প্রবণতা থেকে ছাত্রলীগকর্মীদের পরিপূর্ণভাবে বিরত রাখবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। ছাত্রলীগ বিরত হলে অন্যদেরও সাহস হবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় লিপ্ত হওয়ার। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা চাই শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাক। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর প্রতি নির্দেশ দেওয়া আছে, ভাঙচুরকারীরা যে দলেরই হোক, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারাও ছাড় পাবে না।
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ বজায় না থাকলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর তাতে অভিভাবকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, সর্বোপরি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক দশক ধরে দেশের শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। এমন কোনো দিন ছিল না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমাবাজি-গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। শিক্ষকরাও রক্ষা পাচ্ছিলেন না সেসব সন্ত্রাস থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু হলে বাইরে থেকে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে জিম্মি করার এবং মুক্তিপণ আদায় করার ঘটনাও ঘটেছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট চরমে উঠেছিল। আজ সেসব মারামারি-হানাহানি থেকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকটাই মুক্ত। সেশনজটও নেই বললেই চলে। তার পরও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি-শৃৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে অনেক কিছুই করার আছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় সেই প্রত্যয়ই ফুটে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তোমাদের ভবিষ্যৎ কিভাবে আরো ভালো হবে, সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি। নীতিমালা হচ্ছে। তোমাদের কাজ হলো শিক্ষায় মনোনিবেশ করা।’ আমরাও চাই, প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী সব কাজ হবে এবং শিক্ষাঙ্গন হয়ে উঠবে বিদ্যাচর্চার অন্যতম পীঠস্থান।

জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন হউক

লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে গিনিপিগ বানিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে এক ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছেন আমাদের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা এমনটাই মনে করেন শিক্ষা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন এমন বিশিষ্টজনরা। আর তার মাসুল দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। দেশের শিক্ষা তার উদ্দেশ্য থেকে শুধু দূরেই সরে যাচ্ছে।
২০০৮ সালে হঠাৎ করেই দেশে সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয়। আগের শিক্ষাপদ্ধতিকে সনাতনি, মান্ধাতা আমলের শিক্ষা, কেরানি তৈরির শিক্ষা এমন নানা অপবাদ দিয়ে ছুড়ে ফেলা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে এসেও দেখা যায়, শিক্ষার্থী দূরে থাক, শিক্ষকরাই এই সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারছেন না। রিসার্চ ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব কমপ্লিট এডুকেশন (রেইস)-এর এক জরিপে দেখা যায়, মোট শিক্ষার্থীর দুই-তৃতীয়াংশই প্রশ্ন বুঝতে বিদ্যালয়ের বাইরে আলাদা শিক্ষকের সহায়তা নেয়। ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী গাইড বইনির্ভর। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সর্বশেষ একাডেমি তদারকি প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪০.৮১ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারেন না। কারণ তাঁরা এই পদ্ধতিই এখনো ভালোভাবে বুঝতে পারছেন না। তাহলে তাঁরা ছাত্রদের শেখাবেন কী করে? হঠাৎ করে এমন আমূল পরিবর্তন কেন করা হলো? তার ফল কী হলো? এসব না ভেবেই একের পর এক এমন পরিবর্তন করাই হচ্ছে। এর আগে এমসিকিউ পদ্ধতির প্রশ্ন করা হলো, এখন আবার তা বাতিল করার কথা বলা হচ্ছে। যেকোনো কাজ করার আগে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত কি না তা বিবেচনা করতে হয়। তা না করে বীজ বপন করলে তাতে ফলোদয় হয় না, সেটি কি আমাদের বিজ্ঞ নীতিনির্ধারকরা বুঝতে অক্ষম?
২০১০ সালে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সেই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে আমাদের মনোযোগ আছে কি? শিক্ষানীতিতে কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হবে প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর একজন শিক্ষার্থীর কারিগরি শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু তা আমরা কতটুকু করতে পেরেছি? জানা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল-মাদরাসার সংখ্যা ৩২ হাজার এবং প্রতিবছর ভর্তি হয় প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী। অথচ কারিগরি শিক্ষার জন্য আছে মাত্র দুই হাজার ৪০০ প্রতিষ্ঠান। আমরা হুটহাট উন্নত দেশের টুকরো অভিজ্ঞতার অনুকরণ করলেও তাদের মূল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবি না। সেখানে শিক্ষার্থীদের মেধা বা আগ্রহ অনুযায়ী কে কোনদিকে যাবে তা নির্ধারণ করা হয়। আমাদের মতো সবাইকে বিএ, এমএ পাস করতে হবে, তারপর শুধুই বেকারের সংখ্যা বাড়াতে হবে এমন ব্যবস্থা সেসব দেশে নেই। সেসব দেশে প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের মতো এমন অবহেলিতও নয়। শিক্ষার এমন নৈরাজ্যকর অবস্থা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

পাকিস্তানের ভন্ডামী

পাকিস্তান নামক নির্লজ্জ রাষ্ট্রের মিথ্যাচারের সীমা পরিসীমা নেই। সম্প্রতি তাদের আরেকটি নির্লজ্জ মিথ্যাচার ফাঁস হয়ে গেছে। সেটি হলো মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ওআইসি সম্মেলনে যোগদানের বিষয়টি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব তেহমিনা জানজুয়া মিথ্যা পরিচয়ে ইসলামী সহযোগিতা সম্মেলনের (ওআইসি) ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ‘পররাষ্ট্র সচিব’ হলেও নিজেকে ‘পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী’ পরিচয় দিয়ে ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। জেনেশুনেই পাকিস্তান এই মিথ্যাচার করেছে। মন্ত্রীর প্রটোকল তো একজন সচিব পেতে পারে না। পরিচয় লুকোনোর বিষয়টি যে দেশের ভাবমূর্তির জন্যে কতটা ক্ষতিকর সেটি পাকিস্তান বুঝেও এড়িয়ে গেছে। তারা ভেবেছিল এই মিথ্যাচার ধরা পড়বে না।
পাকিস্তানের মিথ্যাচার, নির্লজ্জতা ও ধৃষ্টতা নিয়ে বলতে গেলে একটু পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৭১ এর আগে আমাদেরকে অর্থনৈতিক শোষণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আরাম-আয়েশে থাকত। একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজয়ের কষ্ট তারা মন থেকে মুছতে পারেনি। অবশ্য পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর পাকিস্তানের কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কারণ এরপর পাকিস্তানপন্থী সরকারই রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে এবং পথ হারিয়ে ফেলা দেশের চাকাকে আবারও সঠিক রাস্তায় নিয়ে এসে গতিশীলতা দানের পর থেকেই পাকিস্তানের ফের গাত্রদাহ শুরু হয়। বর্তমানে পাকিস্তানের সামাজিক অবস্থার মতো অর্থনৈতিক অবস্থাও সকরুণ। অন্যপক্ষে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে উন্নতি করে চলেছে। ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানের মুদ্রার মান পড়ে গেছে, অথচ বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা বজায় রেখে চলেছে। পাকিস্তানে নিত্যপণ্যের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় যথেষ্ট বেশি। এজাতীয় সুস্পষ্ট ব্যবধান পাকিস্তানের জন্য বিপুল মর্মপীড়ার কারণ হয়ে উঠেছে। কিছুতেই তারা বাংলাদেশেকে সহ্য করতে পারছে না। ফলে মাঝেমধ্যেই তারা উন্মাদের মতো আচরণ করছে, পাগলের মতো প্রলাপ বকছে। তারই আরেকটি উদাহরণ নিউজিল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে বাধা প্রদান।
স্মরণ করা যেতে পারে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যাকে পাকিস্তানের অস্বীকারের পাশাপাশি গণহত্যার জন্য উল্টো মুক্তিবাহিনীর ওপর দোষ চাপানোর মতো বিকৃত তথ্য-চিত্র সংবলিত ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথস এক্সপ্লোডেড’ নামে একটি বই লিখে প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের জনৈক নাগরিক। বাংলাদেশের সৃষ্টি নিয়ে লেখা বিভ্রান্তিমূলক বইটি পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা-আইএসআই পাকিস্তানে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে পাঠিয়ে এটি ‘মূল্যবান দলিল’ হিসাবে সংরক্ষণের জন্য রীতিমতো চিঠি লিখে অনুরোধ জানিয়েছিল। এই অনুরোধ করেন পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল অব ইন্টেলিজেন্স। সে সময়ে সংসদে এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘লাখো শহীদের রক্ত ও মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ নিয়ে এই ধরনের অপপ্রচার অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। এই স্পর্ধা ও সাহস ওরা পেল কোথায়?’
খুনী ও যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানের বিশ্বব্যাপী পরিচিতি অসভ্য ও প্রতিক্রিয়াশীল এক রাষ্ট্র হিসেবে। পাকিস্তান একের পর এক ধৃষ্টতা দেখিয়ে চলেছে। সর্বশেষ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মীর কাশেমের ফাঁসির পর তাদের পেয়ারা পাকিস্তান চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল। সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেছে পাকিস্তান।