বিভাগ: সম্পাদকীয়

কোটা সংস্কার সমস্যা

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রবিবার রাতভর পুলিশের সংঘর্ষের পর সোমবার সকাল থেকে থমথমে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে বেশ কিছুদিন থেকেই সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের আন্দোলন চলছে। গত রবিবার পদযাত্রার কর্মসূচি দিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেয় তারা। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখা হয়। রাতে পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের উঠিয়ে দেয় বলে সংবাদমাধ্যমের খবর। এরপর বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিতে থাকে। মধ্যরাতের পর আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অবগত আছেন বলে জানান। তাঁর নির্দেশনায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসবেন বলেও জানান তিনি। কিন্তু আন্দোলনকারীরা ক্ষান্ত হয়নি। দফায় দফায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। মধ্যরাতে একদল আন্দোলনকারী উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালায়। উপাচার্য ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোনো রকমে জীবন রক্ষা করেন। হামলাকারীরা উপাচার্য ভবনের ঘরে ঘরে তাণ্ডব চালায়।
সোমবার সকালে নিজের কার্যালয়ে গিয়ে উপাচার্য জানান, এটা সাধারণ বিক্ষোভকারীদের হামলা ছিল না। প্রশিক্ষিত হামলাকারীরা মুখোশ পরে তাঁর প্রাণনাশের জন্য গিয়েছিল বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে এক ব্রিফিংয়ে দাবি করা হয়েছে, উপাচার্যের বাসায় হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ কাজ করেছে বাইরের সন্ত্রাসীরা। ওই সন্ত্রাসীরা কারা? তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী? এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। ‘উপাচার্যের বাসায় হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই’ আন্দোলনকারীদের এ বক্তব্য সঠিক হলে ধরে নিতে হবে, আন্দোলনে ছদ্মবেশে ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের লোকজনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকার বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের উত্তাপ বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়েছে। রবিবার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। সোমবার ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে রাস্তায় নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিষয়টির যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সরকারপক্ষ কোটাব্যবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশ্বাস দিয়েছে। এ আশ্বাসে ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়। বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘সরকার চাকরির কোটা পদ্ধতি আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আমরা মনে করি, বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যৌক্তিক ও কার্যকর সমাধান মিলবে। সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের জায়গা হোক, এটা সবাই চায়। কিন্তু আন্দোলনের নামে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবমূল্যায়ন কাম্য হতে পারে না।

লক্কড়ঝক্কড় গাড়ী বন্ধ হউক

দেশের সড়ক-মহাসড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন তুলে দিতে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ। ১০ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী যাত্রী ও পণ্যবাহী ৫২ হাজার ৬৭০টি গাড়ির চলতি মাসের মধ্যে ফিটনেস পরীক্ষা না করালে সেগুলোর অস্তিত্ব তালিকা থেকে মুছে ফেলবে তারা। ফিটনেস সনদবিহীন এসব গাড়ি যাতে রাস্তায় চলাচল করতে না পারে, সে জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জনের প্রাণহানি ঘটছে। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকরা যেমন এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, তেমনি দায়ী ফিটনেসবিহীন যানবাহন। সারা দেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চলাচলের অনুপযোগী এসব গাড়ি। ফিটনেসবিহীন গাড়ির তালিকায় আছে যাত্রীবাহী বাস, মিনিবাস ও পণ্যবাহী যানবাহন। রাজধানী সহ সারা দেশে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের ৮৮ শতাংশই ফিটনেসবিহীন। এসব যানবাহনে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। লক্কড়ঝক্কড় মার্কা অনেক গাড়িই রাজধানীর পথে চলাচল করছে, যেগুলোর আয়ু শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এসব গাড়ির লুকিং গ্লাস নেই। আসনগুলোও বসার অনুপযুক্ত। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৬০ হাজার ৬৬১টি গাড়ি ত্রুটিপূর্ণ ছিল।
মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য সব যানবাহনের ক্ষেত্রে বিআরটিএ থেকে নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা করিয়ে সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০০১ সালে গাড়ির ফিটনেস নেওয়ার পর অনেক মালিকই নতুন করে ফিটনেস সনদ নেননি। অর্থাৎ গাড়ির মালিক হওয়া সত্ত্বেও প্রচলিত আইন অবজ্ঞা করেছেন তাঁরা। ফিটনেস সনদহীন গাড়ির তালিকায় সরকারি গাড়ির সংখ্যাও একেবারে কম নয়। সরকারি সংস্থাগুলো তাদের যানবাহনের ক্ষেত্রে কিভাবে আইন অমান্য করে? অন্যদিকে বিআরটিএ এত বছর এ বিষয়ে কেন নীরব ছিল, তা-ও অজানা। এবার বিআরটিএ যেন সিদ্ধান্তে অটল থাকে। মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। ফিটনেস সনদহীন সব ধরনের যানবাহন রাস্তা থেকে তুলে দিতে হবে। সরকারি গাড়ির ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া চলবে না। নির্ধারিত সময়ের পর কঠোর অভিযান চালাতে হবে। ফিটনেস সনদহীন গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে দেওয়া গেলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।

বৈকালিক সেবা বাড়াতে হবে

দেশে প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরো কম। অথচ দেশের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এ অবস্থায় বিদ্যমান সরকারি হাসপাতালগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি অনেক দিনের। তার মধ্যে একটি হচ্ছে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু বাস্তব নানা কারণে তা হয়ে উঠছে না। সরকারি হাসপাতালে এই সুযোগটি করা না গেলেও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে বেশ কিছুদিন ধরেই চালু রয়েছে এই বিশেষায়িত সেবা কার্যক্রম। হাসপাতালের ২৫টি বিভাগে মাত্র ২০০ টাকার বিনিময়ে রোগীরা বৈকালিক স্পেশালাইজড আউটডোর সেবা নিতে পারছে। প্রতিদিন অন্তত এক হাজার রোগী এই সেবা পাচ্ছে। এতে রোগীরাও খুশি। সরকারি কিছু হাসপাতালে, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কয়েকটি হাসপাতালে সীমিত পরিসরে এই সেবা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাবে সেগুলো খুব একটা সফল হয়নি। রোগীর আধিক্য ও চিকিৎসক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকরা কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে ভেবে দেখতে পারেন।
বহু কোটি টাকার বিনিময়ে একেকটি সরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠে এবং আরো কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ হাসপাতালেই দুপুরের পর সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বহু রোগী সেবা না পেয়েই ফিরে যায়। এটি কোনোভাবেই হাসপাতালগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নয়। এর নানা কারণ রয়েছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগ দিলেও দেখা যায় অর্ধেকের বেশি চিকিৎসক কর্মস্থলে থাকেন না। আবার যে পরিমাণ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার কথা, নিয়োগ হয় তার চেয়ে অনেক কম। ফলে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। হাসপাতালগুলোতে যেসব সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়, বাস্তবে দেখা যায় মেয়াদের আগেই সেগুলো অচল হয়ে পড়ে থাকে। অভিযোগ আছে, আশপাশের প্রাইভেট ক্লিনিকের ব্যবসা ঠিক রাখার স্বার্থে ইচ্ছাকৃতভাবেও যন্ত্রপাতি অচল করে রাখা হয়। ফলে স্থানীয় রোগীরা বৈকালিক সেবা তো দূরে থাক, স্বাভাবিক দৈনন্দিন সেবাও পায় না। সরকারি হাসপাতালের এই ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। সেই সঙ্গে চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের মানসিকতার পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি। যেসব উপজেলা হাসপাতালে বৈকালিক সেবা এখনো কোনো রকমে ধরে রাখা হয়েছে, সেগুলো সম্ভব হয়েছে শুধু সেখানকার সেবাদানকারীদের উন্নত মানসিকতা ও আন্তরিকতার কারণে। এই আন্তরিকতা সারা দেশেই থাকা প্রয়োজন।
চিকিৎসাসেবা এখন বাণিজ্যের বিষয় হয়ে গেছে। সরকারি হাসপাতালের অনেক চিকিৎসকও এই বাণিজ্যিক ধারায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। এমনকি তা করতে গিয়ে কেউ কেউ হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলা করছেন। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা চাই, সবার সহযোগিতায় সরকারি হাসপাতালের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হোক।

ক্যান্সার রোধে পদক্ষেপ জরুরী

দূষণ, ভেজাল ও খাদ্যাভ্যাসজনিত নানা কারণেই রোগব্যাধি বাড়ছে। একইভাবে বাড়ছে নানা ধরনের ক্যান্সারও। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্য মতে, ২০১২ সালেও হাসপাতালটির বহির্বিভাগে রোগী ছিল বছরে ৫৯ হাজার। গত বছর এ সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। হাসপাতালে আসা পুরুষ রোগীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি, নারীদের মধ্যে বেশি স্তন ক্যান্সার। জরায়ুর ক্যান্সারও বাড়ছে খুব বেশি পরিমাণে। এ ছাড়া খাদ্যনালি, মুখ, পরিপাকতন্ত্র ও লিভারের ক্যান্সারও বাড়ছে। এভাবে ক্যান্সার বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান, মুখে তামাক গ্রহণ, মারাত্মক পরিবেশদূষণ, খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণ, শাকসবজি-ফলমূলে কীটনাশক প্রয়োগ, নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভের ব্যবহার ইত্যাদি। ক্যান্সারসহ অন্যান্য রোগ সৃষ্টির এই কারণগুলো রোধ করার কার্যকর উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অনুপস্থিত। চিকিৎসার সুবিধাও খুবই কম। ফলে ক্যান্সারে মৃৎত্যুর হারও দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থা কি চলতেই থাকবে?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশে এখন ১২ লাখের মতো ক্যান্সার রোগী। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে আরো প্রায় তিন লাখ। তাদের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসার আওতায় আসছে বছরে মাত্র ৫০ হাজার। বাকিরা চিকিৎসার বাইরে থেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রোগের শেষ ধাপে কাউকে কাউকে হাসপাতালে আনা হলেও কোনো লাভ হয় না। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে নারীরা। রোগের প্রথম দিকে তারা লজ্জায় কাউকে তা বলতে চায় না। এরপর বলা হলেও পরিবারের পুরুষ কর্তা সেটিকে তেমন আমলে নেন না। চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক নারীর চিকিৎসা মাঝপথেও থেমে যায়। এসব ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রীয় নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। দরিদ্র নারীদের জন্য চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে অন্তত উপজেলা পর্যায়ে ক্যান্সারের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
ক্যান্সারের দ্রুত প্রসার ঠেকাতে হলে প্রতিরোধের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোরতর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভেজালকারীদের বিচার দ্রুততর করা এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদনকারীরা শাকসবজি ও ফলমূলে যেন ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক বা ফরমালিন মেশাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাজারগুলোতে নিয়মিত এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে। মাছ, মাংস, দুধেও ক্ষতিকর রাসায়নিক বা বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাই এগুলোও পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। পরিবেশদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা এখন সারা পৃথিবীতেই একটি নিকৃষ্ট শহর। এটিও ফুসফুসের ক্যান্সার বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ। সেই সঙ্গে আছে পানিদূষণ, মাটিদূষণ। এগুলো কমাতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ক্যান্সার বৃদ্ধির এই গতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

 

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপ

উদ্বেগজনক হারে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে বাংলাদেশে। ঘটছে প্রাণহানি। পথে বসছে অনেক পরিবার। দেশের অনেক প্রতিভাবান মানুষের প্রাণ গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। অনেক পরিবারের আশার আলো যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়েছে। প্রতিদিনই আসছে মর্মান্তিক সব সড়ক বিস্তারিত

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নীতিমালা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) প্রস্তাবের খসড়াটি যাচাই করে দেখছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিবর্তনের প্রয়োজন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে প্রণীত বিধিমালায় প্রধান শিক্ষক পদে সরাসরি ৩৫ শতাংশ ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে ৬৫ শতাংশ নিয়োগ করার বিধান রয়েছে। ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষক পদ দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হয়। এখন এ পদে নিয়োগ-পদোন্নতি পিএসসির আওতাধীন। ফলে বিধিমালায় পরিবর্তন আবশ্যক। প্রস্তাবে আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান বিধিমালায় পুরুষ ও নারীর জন্য আলাদা শিক্ষাগত যোগ্যতার উল্লেখ রয়েছে। সহকারী শিক্ষক হতে হলে পুরুষদের স্নাতক আর নারীদের উচ্চ মাধ্যমিক পাস হতে হয়। প্রস্তাবে উভয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতাই স্নাতক করতে বলা হয়েছে। অবশ্য নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা থাকছে। সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্নাতক পাস হলেই আবেদন করা যায়। প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, এ পদের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাগবে। এখন প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ২৫ থেকে ৩৫ বছর। পিএসসির নীতিমালার সঙ্গে সংগতি রেখে বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ৬৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষকের পদ পদোন্নতির মাধ্যমেই পূরণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলযোগ্য। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন যেকোনো বিষয়ে পাস প্রার্থীর সমান সুযোগ রয়েছে। গণিত ও বিজ্ঞানের কথা বিবেচনা করে সহকারী শিক্ষক পদে ২০ শতাংশ বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। ক্লাস্টার বা উপজেলাভিত্তিক আর্ট ও সংগীত শিক্ষক রাখতে বলা হয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগ আগের মতোই উপজেলা বা থানাভিত্তিক হবে। তবে কেন্দ্রীয় সহকারী শিক্ষক নির্বাচন কমিটির সুপারিশ লাগবে। বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা না হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়া যাবে না। ওই ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী অথবা বাগদত্ত বা বাগদত্তা, যিনি বাংলাদেশের নাগরিক নন, তিনিও নিয়োগ পাবেন না। শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা যাবে, তবে পিএসসির সুপারিশ দরকার। বর্তমানে শিক্ষক পদে যোগদানের তিন বছরের মধ্যে প্রশিক্ষণ বা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, প্রস্তাবিত বিধিমালায় তা থাকছে না।
নীতিমালা অনড় বিষয় নয়। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আনাই কাম্য। তবে তা যথোচিত হতে হবে। অভিজ্ঞতা বলে, বিদ্যমান বিধিমালায় অস্পষ্টতা তো থাকেই, পরিবর্তনের নামে প্রায়ই সেটিকে আরো জটিল করে তোলা হয়। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব বিষয় স্পষ্ট করে তবেই প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুমোদন করবে।

মশাবাহিত রোগ

মশার উৎপাতে এরই মধ্যে নগরবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ছড়িয়ে পড়ছে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ। বর্ষা জেঁকে বসলে অবস্থা কী হবে তা ভাবতেও কষ্ট হয়। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা বড় বড় যন্ত্রে বিকট আওয়াজ তুলে ওষুধ ছিটালেও মশার উৎপাত কমছে না। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গত বছর চিকুনগুনিয়া ব্যাপক আকারে ছড়িয়েছিল। অনেকেরই ধকল কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। তাই চিকুনগুনিয়া এখনো আতঙ্কের কারণ হয়ে আছে। ডেঙ্গুতেও ভুগেছে অনেকে। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। আছে ডেঙ্গুর ভীতিও। এ বছর এরই মধ্যে কয়েকজন ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বর্ষায় ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে ছড়াতে পারে। তাই এখনই মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানি ও মশাবাহিত রোগ বেড়ে যাবে বলে অনেক আগেই জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এখন আমরা তা প্রত্যক্ষ করছি কিন্তু এসব রোগ প্রতিরোধে যা যা করণীয় তা ঠিকমতো করছি না। মশার প্রজননের জন্য পানি প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রজাতির মশা বিভিন্ন ধরনের পানিতে ডিম-বাচ্চা দেয়। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম-বাচ্চা দেয়। পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, যত্রতত্র ফেলে রাখা কৌটা, এমনকি ঘরের ভেতরে কম ব্যবহৃত কোনো পাত্রে জমে থাকা পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই এই মশার বংশ বৃদ্ধিতে নাগরিক অসচেতনতাকেও একটি বড় কারণ বলে মনে করা হয়। ঢাকার যেসব এলাকায় হাজামজা ডোবা, খাল, বিল বা জলাশয় বেশি সেসব এলাকায় কিউলেক্স মশার উৎপাত বেশি। এগুলোর সংস্কার বা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওয়াসাসহ যেসব সংস্থার হাতে তারা সেই দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে না। পার্বত্য এলাকাসহ পূর্বাঞ্চলের ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি বেশি। সারা দুনিয়ায় মশাবাহিত ৯টি রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলেও বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ছয়টি রোগের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও ফাইলেরিয়া (গোদ রোগ) আগে থেকেই আছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকুনগুনিয়া, জাপানিজ অ্যানসেফালাইটিস ও জিকা। দেশে জিকা সংক্রমণের অল্প কয়েকটি ঘটনা জানা গেলেও অনেক দেশে এটি রীতিমতো আতঙ্কের কারণ।
মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য মশা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। আর মশা নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হচ্ছে মশা জন্মানোর উৎসস্থল ধ্বংস করা, সেটা ঘরে হোক কিংবা ঘরের বাইরেই হোক। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংস্থাগুলোকে তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ড জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। মশা নিধন ও লার্ভা নিধনে নিয়মিত ওষুধ ছিটাতে হবে। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ময়লা ও পরিত্যক্ত দ্রব্যাদি যেখানে সেখানে না ফেলে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে ফেলতে হবে। ফুলের টব, ফুলদানি বা অন্য কোনো পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। মশাবাহিত ভয়ংকর সব রোগের হাত থেকে বাঁচতে সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।

ব্যাংক ঋণের সুদ

আধুনিক বিশ্বে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মূলধনের ঘাটতি মিটিয়ে ব্যাংক দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে গতি সঞ্চার করে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়া বাংলাদেশে ব্যাংকের এই ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নানা বাস্তবসম্মত কারণে বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে সেই ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এখানে ব্যাংকঋণের সুদের হার অত্যন্ত বেশি। উদ্যোক্তারা এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিপদে পড়েন। বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না। তাই অনেক দিন ধরেই তাঁরা ঋণের সুদ এক অঙ্কে নামিয়ে আনার দাবি করে আসছিলেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ঋণের সুদ এক অঙ্কে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত রবিবার জানিয়েছেন, এক মাসের মধ্যেই ঋণের সুদ এক অঙ্কে বা ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। তার আগে তিনি বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর স্বার্থ রক্ষায় কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন।
সাধারণত ব্যাংকগুলো মানুষের ক্ষুদ্র সঞ্চয় থেকে আমানত সংগ্রহ করে এবং একটি নির্দিষ্ট হারে তাদের সুদ দেয়। ফলে মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ে। সংগৃহীত এই অর্থ কিছুটা বেশি সুদে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সরবরাহ করা হয়। সুদের এই পার্থক্যই ব্যাংকের লাভ এবং তা দিয়েই ব্যাংকগুলো পরিচালিত হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এই পার্থক্য অনেক বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তাদের এত দুশ্চিন্তা। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায় এবং উদ্যোক্তাদের পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগের গতিও শ্লথ হয়ে যায়। অথচ দেশ এগিয়ে নিতে হলে বিনিয়োগের গতি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সংগত কারণেই প্রধানমন্ত্রীকে এখানে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হয়েছে। আশা করি, শিগগিরই এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাব এবং ঋণের সুদহার এক অঙ্কে চলে আসবে। বাংলাদেশে ঋণের সুদহার বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হচ্ছে খেলাপি ঋণ বা কুঋণ। এতে ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং সেই ক্ষতি পূরণ করতে গিয়ে তারা বাধ্য হয় ঋণের সুদ বাড়িয়ে দিতে। আবার ব্যাংকগুলোর অত্যধিক পরিচালন ব্যয়ও ঋণের সুদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ঋণের সুদ কমিয়ে রাখার স্বার্থে ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলোতে নজর দিতে হবে। ব্যাংকগুলো অনেক সময় তারল্য সংকট নিয়েও হিমশিম খায়। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা ব্যাংকগুলোর সিআরআর (নগদ সংরক্ষণ অনুপাত) ১ শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টি আরো বিবেচনার দাবি রাখে।
আমরা চাই, অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো যাতে তাদের ব্যবসা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে, আমানতকারীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং উদ্যোক্তারা যাতে অল্প সুদে ঋণ পায় সব দিকের মধ্যে একটি সুসমন্বয় তৈরি করতে হবে।

পাঁচ সিটি নির্বাচন

গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১৫ মে এ দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১২ এপ্রিল। যাচাই-বাছাই ১৫ ও ১৬ এপ্রিল। প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৩ এপ্রিল। দুই সিটির নির্বাচনের জন্য রিটার্নিং অফিসারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো আইনি জটিলতা নেই, সরকারের কাছ থেকে এমন সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলো। গাজীপুর সিটিতে ভোট হয়েছে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই। প্রথম সভা হয় ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। আইন অনুযায়ী এ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ পূর্ণ হবে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর। খুলনা সিটিতে ভোট হয়েছে ২০১৩ সালের ১৫ জুন। প্রথম সভা হয় একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর। এ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ পূর্ণ হবে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে যেকোনো সময় ভোট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পাঁচ বছর আগে নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হলেও এবার মেয়র পদে দলীয়ভাবে ভোট হবে খুলনা ও গাজীপুরে। সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালের নির্বাচনের বিষয়ে রমজানের পর সিদ্ধান্ত জানাবে ইসি।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হলেও সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাজীপুর রাজধানীসংলগ্ন সিটি করপোরেশন। দুই সিটিরই বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। খুলনা ও গাজীপুর এখন শিল্পনগরী। নতুন নির্বাচন কমিশন বেশ কয়েকটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করায় জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেকে মনে করছে, এই পাঁচ সিটির ভোটের ভেতর দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অবস্থা কিছুটা হলেও আঁচ করা সম্ভব হবে। পাঁচ সিটির নির্বাচন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রমাণের সুযোগ রয়েছে এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে।
বাংলাদেশে যেকোনো নির্বাচনেই এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনসংযোগ ও শুভেচ্ছা বিনিময় শুরু করে দিয়েছেন। প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল থেকে মেয়র পদে কারা মনোনয়ন পাচ্ছেন, তা নিয়ে এলাকায় নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। বাংলাদেশের যেকোনো নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার দেখা যায়। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এসব ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রভাব পড়বে অন্যান্য সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে, এমনকি জাতীয় নির্বাচনেও। কাজেই গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হবে।

কালবৈশাখী ঝড়ে সর্বস্বান্ত

বছরের প্রথম কালবৈশাখী আঘাত হেনেছে গত শুক্রবার। প্রথম আঘাতেই কাবু হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরের অর্ধেক অঞ্চল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও সিলেট অঞ্চলে। ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টিতে মোট ছয়জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে প্রধান মৌসুমি ফল আম ও লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। টমেটো, ভুট্টাসহ অনেক ফসল প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া ক্রমেই চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠছে। গরমের সময় গরম পড়ছে অনেক বেশি। কোথাও কোথাও মরুপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। শীতের সময় শীতের তীব্রতাও বাড়ছে। এবার শীতে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পারদ নেমে গিয়েছিল সব রেকর্ড ছাড়িয়ে। শুরু হয়েছে কালবৈশাখী। আসতে পারে টর্নেডোর একের পর এক আঘাত। অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানতে পারে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগগুলো আটকানো যাবে না। কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সে কারণেই দেশে দেশে তৈরি হচ্ছে জলবায়ু তহবিল। বাংলাদেশেও রয়েছে জলবায়ু তহবিল। এখন প্রয়োজন প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা। ঝড়ে প্রধানত ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রামাঞ্চলের অতি দরিদ্র মানুষের নড়বড়ে ঘরগুলো। শুক্রবারের ঝড়ে সিলেটে ঘরচাপায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। গৃহনির্মাণে উপযুক্ত সহায়তা দিয়ে এই দরিদ্রদের পাকাপোক্ত ঘর করে দেওয়া গেলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। একইভাবে দক্ষিণাঞ্চলে উপকূল রক্ষা বাঁধ আরো উঁচু ও শক্ত করে নির্মাণ করতে পারলে এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যুও অনেক কম হবে। দুঃখের বিষয়, এসব কাজে আমাদের অগ্রগতি এখনো খুব ধীরগতিতে হচ্ছে। এই আত্মঘাতী ধীরগতি দূর করতে হবে। ভারতে সরকারিভাবে গৃহযোজনা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য পাকাপোক্ত ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার বেশ বড়সড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদেরও অবিলম্বে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। গত বছর বন্যায় হাওরাঞ্চলে ফসলের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, সেই ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি হাওরবাসী। এবারও যদি একই রকম অবস্থা হয়, তাহলে তাদের অস্তিত্বই সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। জানা যায়, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে এ বছরও দুর্নীতির অনেক অভিযোগ রয়েছে। তাই হাওরবাসীদের রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।
উত্তরাঞ্চলে কালবৈশাখীর আঘাতে অনেক দরিদ্র পরিবারই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের চিহ্নিত করে কিছুটা হলেও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আহতদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হবে। ফসলের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় কৃষি সহায়তা দিতে হবে। সর্বোপরি স্থায়ী উদ্যোগগুলো দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।