বিভাগ: সম্পাদকীয়

পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়ন

ঢাকায় তিন দিনব্যাপী ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পর্যটনমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এটি ১০ম সম্মেলন। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সম্মেলন থেকে ঢাকাকে ‘ইসলামিক ট্যুরিজম সিটি’ ঘোষণা করা হয়। ওআইসিভুক্ত দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে আগামীতে বৃহত্তর পরিসরে সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়াতে এই সম্মেলনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অর্থনৈতিক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরস্পরের কাছাকাছি আসা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে এ সম্মেলন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সম্মেলনের রীতি অনুযায়ী বিদায়ী চেয়ারপার্সন আহমেদ বথু বক্তৃতার পর পরই পরবর্তী দুই বছরের জন্য আইসিটিএমের চেয়ারপার্সনশিপ বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আকম শাহজাহান কামালের কাছে হস্তান্তর করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ৩০টি রাষ্ট্রের ১৫ জন পর্যটনমন্ত্রী এবং প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাপী পর্যটন একটি দ্রুত বিকাশমান খাত যা বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পর্যটন শিল্প অন্যতম ক্ষেত্র যেখানে একসঙ্গে কাজ করার বড় সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে উন্নত করতে তাঁর সরকার বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। সেই লক্ষ্যে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। কক্সবাজারকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে আমাদের দেশে সম্পদের অভাব নেই। সুদীর্ঘ মেরিন ড্রাইভসহ বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবন বাংলাদেশে অবস্থিত। রয়েছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা, যা অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এসব স্থান পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে। জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে শত শত নদী যা ছবির মতো সুন্দর। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে শত শত সবুজ চা বাগান যা অবকাশ যাপনের চোখ জুড়ানো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও প্রতœ-সমৃদ্ধ স্থানসমূহ। পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে দরকার প্রশিক্ষিত জনবল। রক্ষা করতে হবে পর্যটন এলাকাগুলো। বর্তমান বিশ্বে পর্যটনের যে বিশাল বাজার তা ধরে রাখা গেলে বদলে যেতে পারে আমাদের অর্থনীতি।

পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ

বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ হয় না। ফলে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশে আমদানি করা পেঁয়াজের বড় অংশই আসে ভারত থেকে। ফলে ভারতে পেঁয়াজের দাম ওঠানামা করলে বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক। ভারত সরকার মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য বা এমইপি নির্ধারণ করে দেওয়ার পর বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ে। ভারতে পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য বাড়িয়ে প্রতি মেট্রিক টন ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করা হলে বাংলাদেশের খোলাবাজারেও বেড়ে যায় পেঁয়াজের দাম। কিন্তু ভারত সরকার পেঁয়াজের ন্যূনতম দাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর তার কোনো প্রভাব পড়েনি বাজারে। বরং দাম আরো বেড়েছে। ভারতে ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য প্রত্যাহারের কোনো প্রভাব দেশের বাজারে পড়েনি। বরং ব্যবসায়ীদের অজুহাতে দাম বেড়েছে। অনিবার্যভাবেই তার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। ভোক্তাদের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে এত দিন ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভারত পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করার পর থেকেই দেশের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। পরে এই দাম কমিয়ে যখন ৭০০ ডলার করা হয় তখনো তার কোনো প্রভাব বাজারে ছিল না। এখন ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য একেবারে তুলে নেওয়ার পরও তার কোনো প্রভাব বাজারে পড়ছে না। উল্টো পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের এবারের অজুহাত, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। যে কারণে পেঁয়াজের দাম কমছে না।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে, আমদানি করা পণ্যের দাম কোথাও বেড়েছে জানতে পারলেই দেশের বাজারে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটে। ব্যবসায়ীদের আরেকটি প্রবণতা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতির কথা বলে মাঝেমধ্যেই বাজার অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। যেমনটি এখন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর পেঁয়াজের চাহিদা কমবেশি ২২ লাখ টন বলে ধরে নেওয়া হয়। গত বছর দেশে উৎপাদিত হয় ১৮ লাখ টন পেঁয়াজ। উৎপাদনে এই চার লাখ টনের ঘাটতিকেই বড় করে দেখিয়ে আবার বাজার অস্থিতিশীল করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা এবারও লক্ষ করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিই পারে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা প্রসার

আগামী ২০১৮-১৯ অর্ধবছরের বাজেটে প্রায় এক কোটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশের দুস্থ, অবহেলিত, সমস্যাগ্রস্ত ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীসহ হাওড় অঞ্চলের দরিদ্রদের নিয়ে আসা হবে এই কর্মসূচীর বিস্তারিত

বাজার স্থিতিশীল করতে পদক্ষেপ জরুরী

নির্বাচনের বছরে এসে ব্যাংকঋণ কমানো এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার গুজবে আবার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। সপ্তাহের প্রথম দিন রবিবার বড় ধরনের ধস নামে। প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দরপতনের ঘটনা ঘটে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে। সূচকে ব্যাপক পতনের পাশাপাশি দুই বাজারে লেনদেনে থাকা কম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ৯০ শতাংশের বেশি শেয়ারের দাম কমে যায়। সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন প্রথম আড়াই ঘণ্টায় পুঁজিবাজারের মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে কিছুটা নেতিবাচক ছিল। পরে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়। ব্যাংক আমানতে সুদের হার বৃদ্ধি, মুদ্রানীতি, ব্যাংক আমানত-ঋণের অনুপাত কমানো নিয়ে কয়েক দিন ধরেই পুঁজিবাজার ধুঁকছিল। ক্রমাগত নিম্নমুখী হওয়ায় অনেকে আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করেছে। পুঁজিবাজারের দরপতন নিয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ৩০ ব্রোকারেজ হাউস জরুরি সভা করেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ব্যাংকের ঋণ-আমানত ইস্যুকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আতঙ্ক থেকে শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়ায় বাজারে পতন ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ব্যাংক আমানত-ঋণের হার কমানোর কোনো প্রভাব বাজারে পড়ার কথা নয়। তাদের মতে, পুঁজিবাজার নিয়ে ভয় পাওয়ার মতো কিছুই এখনো ঘটেনি। মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, আমানতের হার বাড়ানো হলে পুঁজিবাজারে অনাগ্রহ সৃষ্টি হবে। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি হওয়ায় এখনো বিনিয়োগযোগ্য বড় ফান্ড বাইরে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে বাজারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তা সামাল দিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন বা অস্থিরতার প্রধান কারণ হতে পারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার গুজব। কিন্তু একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ২০১৪ সালের বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়ও বাজারে এত দরপতন হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহ সংকোচনের যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তার প্রভাবও বাজারে পড়বে। কিন্তু এভাবে বাজারের পতন হওয়ার কথা নয়। পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ধস নামার আগে উল্লম্ফন দেখা যায়। এবার তা হয়নি। কাজেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

কৃষি জমির মাটি পরীক্ষা

১৬ কোটি মানুষের খাদ্য জোগাতে গিয়ে বেশির ভাগ জমিতে তিন ফসল, এমনকি চার ফসলও করা হয়। একই ফসল বারবার করা হচ্ছে। কোনো বিরতি না দিয়েই জমিতে একের পর এক ফসল করায় মাটির পুষ্টিগুণ যে একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে আমরা নজরই দিচ্ছি না। ফলে দিন দিনই রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে সার ব্যবহৃত হয়েছিল ৩৬ লাখ ৮২ হাজার টন, সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যবহৃত হয়েছে ৪৮ লাখ টন। সার ব্যবহারের ধরনও বদলাচ্ছে। আগে সাধারণত দুই ধরনের সার ব্যবহৃত হতো, এখন ব্যবহৃত হয় আট ধরনের সার। এর একটা বড় অংশই আমদানি করতে হয়। এতে একদিকে ফসল উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে রাসায়নিক সারের অসম ব্যবহারেও মাটির পুষ্টিগুণ আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক সময়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট আবাদি জমির ৬১ দশমিক ৬ শতাংশেই জৈবপদার্থের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে এবং এই ঘাটতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় কৃষিবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আবাদি জমির পুষ্টিগুণ রক্ষায় মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার ওপর দ্রুত নজর দিতে হবে।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ফসল ফলাতে কৃষকরা রাসায়নিক সার ব্যবহারের কথা চিন্তাও করত না। জৈব সারই ছিল তাদের প্রধান ভরসা। আর এখন জৈব সারের ব্যবহার নেই বললেই চলে। তখন একবার ফসল ফলানোর পর জমিগুলো কিছুটা সময় পতিত রাখা হতো। নানা রকম ডাল, সরিষা, পেঁয়াজ, মরিচ ইত্যাদির চাষ করা হতো। এখন সেসবের জায়গা দখল করেছে উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষ, যা মাটি থেকে অতিমাত্রায় পুষ্টি শোষণ করে। ফলে ক্রমেই বেশি করে সার ব্যবহারের প্রয়োজন বাড়ছে। আবার বিরতি না পাওয়ায় মাটি নিজে থেকেও পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মাটির স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা এতটাই কমে যাবে যে তখন মাটির নিজস্ব উর্বরতা বা উৎপাদন ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাবে এবং তা পুরোপুরি সারনির্ভর হয়ে পড়বে। সে অবস্থায় কৃষিতে যে মহাবিপর্যয় নেমে আসবে, তা কি আমরা মোকাবেলা করতে পারব?
কৃষকরা এখন অনুমানের ওপর জমিতে সার দেয়। যে জমিতে ১০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োজন সেখানে ২০ কেজি বা তারও বেশি ব্যবহার করে। মাটি পরীক্ষা করে চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া গেলে সারের প্রয়োজন যেমন কম হতো, তেমনি মাটিও কম ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু মাটি পরীক্ষা করার সুযোগ তাদের নেই। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগও তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে পারছে না। আমরা আশা করি, সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিষয়গুলো বিবেচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন

চলতি বছরের শেষার্ধে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন সে লক্ষ্যে কাজ করছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে। দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি এখনো প্রচারে নামেনি। অন্তত চলতি মাসের ৮ তারিখ পর্যন্ত তাদের ব্যস্ততা জিয়া অরফানেজ মামলার রায় নিয়ে। এই রায় সামনে রেখে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়েছে। বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আর সে কারণেই নির্বাচনের বছরে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেশি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী এরই মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক হয়েছে। সেসব বৈঠকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁদের পরামর্শ তুলে ধরেছেন। নির্বাচন কমিশনও বলেছে, সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে তাদের সদিচ্ছার কোনো অভাব নেই। গত শুক্রবার সিইসির বক্তব্যেও ঠিক একই কথার পুনরাবৃত্তি হলো। একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখন যে প্রশ্নটি সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না। দেখা যাচ্ছে, রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে পরস্পরের দোষারোপ করে যাচ্ছে। বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। বিএনপির এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির দায়িত্ব। তাদের ভোটে আনা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নয়। আওয়ামী লীগ মনে করে, বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার জন্য টালবাহানা করছে। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, সে প্রসঙ্গে বক্তব্য রেখেছেন। অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি। বিএনপির নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য নয় বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ৮ ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে বিএনপি বলছে, সাজানো রায় দিয়ে তাদের নেত্রীকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চক্রান্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘বিএনপি একটি বড় দল। তাদের ছাড়া সব দলের অংশগ্রহণ হয় কী করে? বিএনপি ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না।’
গণতন্ত্রে নির্বাচনই শেষ কথা নয়। কিন্তু তার পরও নির্বাচন হতে হবে। কোনোভাবেই তা বিতর্কিত হতে দেওয়া যাবে না। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কমিশনকেই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আমরা আশা করব, নির্বাচন কমিশন যেমন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোও দায়িত্বশীল হবে। সবার সহযোহিতায় একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে।

মাদকমুক্ত শিক্ষাঙ্গন

সর্বনাশা মাদকের ভয়াবহ থাবায় আক্রান্ত সারা দেশ। মাদক কারবারিদের লক্ষ্য অপেক্ষাকৃত তরুণ ও যুবারা। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। গোয়েন্দারা সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে মাদক কারবারে জড়িত শিক্ষার্থীদের তালিকাও করেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান চালাতে চেয়েও পারেনি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণে। ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ও আটটি কলেজে ৪২৭ মাদক কারবারির তালিকা করেছে গোয়েন্দারা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের নেতা ও পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের বেচাকেনা চলে। গোয়েন্দাদের তালিকাভুক্ত অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে যাওয়ার পরও ক্যাম্পাসভিত্তিক মাদক বাণিজ্যে জড়িত। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক মাদক কারবারিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশসহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চানখাঁর পুল, পলাশী, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে মাদক বিক্রি করে থাকে। মাদক বিক্রির কাজে টোকাইদেরও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের নেতাদের নাম ভাঙানোর কারণে কেউ কিছু বলতে সাহস করে না। এই সুযোগে অভিযান না চালিয়ে পুলিশও নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। হাত বাড়ালেই মিলছে নানা মাদকদ্রব্য।
বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এখানে উচ্চতর গবেষণা হবে। হবে জ্ঞান সাধনা। সভ্যতার মানদণ্ডে বিশ্বমানের মানুষ এখান থেকে বেরিয়ে আসবে। উন্নত রুচির পরিচয় দিয়ে তারাই জাতির হাল ধরবে। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি মাদকের আসর বসে, শিক্ষার্থীরাই যদি মাদকের কারবারি হয়ে যায়, তাহলে তো ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হতেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট কিংবা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ নয় দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের পাঠান বুকভরা আশা নিয়ে। সেই সন্তান যদি শিক্ষার পরিবর্তে মাদকাসক্ত হয়ে ফিরে আসে, তাহলে সেই পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসাটাই তো স্বাভাবিক। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাবীরাই ভর্তির সুযোগ পায়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়লে তার দায় কে নেবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কি কোনো দায় নেই? মাদকাসক্তরা নিজেদের যেমন ধ্বংস করছে, তেমনি পরিবারকেও ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে মাদকসেবী ও কারবারিদের দ্বারা। মাদক সেবনই শুধু নয়, নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে তারা।
এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকেই ভূমিকা রাখতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যেমন অভিযান চালাতে পারে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও গোয়েন্দাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ছাত্রসংগঠন বা ছাত্রনেতার কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হতে পারে না। কয়েকজনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। আমরা আশা করি, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ মাদক দূর করতে ভূমিকা রাখবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় মাদকমুক্ত হবে।

পুঁজিবাজার স্থিতিশীল হউক

নির্বাচনের বছরে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ঘোষণার পর থেকেই দেশের দুই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। লোকসান কিংবা কম দামে শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগকারীরা সরে যাচ্ছে এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে গণমাধ্যমে। গুজব ছড়ানো হয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রায় নিয়েও। বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করার মিথ্যা তথ্য ও গুজবের কারণে এরই মধ্যে বাজারে পতন ঘটেছে। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী মুদ্রানীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দোহাই দিয়ে বাজার প্রভাবিত করতে চাইছে। সাম্প্রতিক দরপতনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ডিএসইর ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বিনিয়োগকারীদের গুজবে কান দিয়ে ভালো শেয়ার বিক্রি না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, সুযোগসন্ধানীরা গুজব ছড়িয়ে বাজার অস্থির করতে চাইছে। এই সুযোগসন্ধানীরাই কম দামে কেনা শেয়ার বেশি দামে বাজারে বিক্রি করবে। উভয় সংগঠনের নেতাদের ভাষ্য মতে, দ্রুতই বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। বাজার বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, মুদ্রানীতিতে এমন নেতিবাচক কোনো কিছু নেই, যার জন্য বাজারের পতন ঘটতে পারে। মুদ্রানীতিতে টাকাপ্রবাহ, মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে নির্দেশনা থাকে। এর প্রভাব শেয়ারবাজারে কেন পড়বে? বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, তাতে পুঁজিবাজার করপোরেট গ্রাহক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে গ্রহণযোগ্য করবে। তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। ব্যাংকে আমানতের সুদ বাড়লে তাতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিছুটা কমতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক হওয়াটা স্বাভাবিক; কিন্তু তার ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার কথা নয়। মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে বাজার প্রভাবিত করতে ব্যাংকের ঋণ ও আমানত অনুপাতের দোহাই দেওয়া হয়েছে। আগের ব্যাংক কম্পানি অ্যাক্ট অনুযায়ী মোট দায়ের ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সীমা ছিল। বর্তমান ব্যাংক কম্পানি অ্যাক্ট অনুযায়ী রেগুলেটরি ক্যাপিটালের ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘোষিত মুদ্রানীতির কোনো প্রভাব বাজারে পড়বে না এমন পরিস্থিতি দেখার পর ছড়ানো হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতার গুজব।
এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে ডিএসই ও সিএসই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে মূল বিষয়টি তাদের অবহিত করা প্রয়োজন। আমরা আশা করব, পুঁজিবাজারের অস্থিরতা কাটাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাঁচা পাট রফতানি

কাঁচা পাটের রপ্তানি আবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা, মূলত বিভিন্ন পণ্যের জন্য মোড়ক তৈরির প্রয়োজন মেটাতে সরবরাহ পর্যাপ্ত মাত্রায় রাখা। কাঁচা পাটের রপ্তানি আগেও নিষিদ্ধ হয়েছে। কোনোবারই রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি, এবারও হয়নি। তাই তাঁরা ক্ষুব্ধ। তাঁদের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে, পাটের দাম কমে যাবে, উৎপাদকরা পাট উৎপাদনে নিরুৎসাহী হবেন। তাঁদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার কারণ স্পষ্ট করেনি সরকার। রপ্তানিকারকরা আগের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠছিলেন মাত্র, তখনই আবার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। এটা তাঁদের জন্য মারাত্মক আঘাত। অনেকের বিদেশি ক্রয়াদেশ আছে, আচমকা নিষেধাজ্ঞায় তাঁদের বড় ক্ষতি হবে। তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল। এ সিদ্ধান্তে পাট উৎপাদকরাও শঙ্কিত।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় গত ১৮ জানুয়ারি তিন ধরনের কাঁচা পাট রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আদেশ জারি করেছে। বলা হয়েছে, নতুন আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলা তোষা রিজেকশন (বিটিআর), আনকাট ও বাংলা হোয়াইট রিজেকশন (বিডাব্লিউআর)—এ তিন ধরনের কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকবে; তবে অন্যান্য ধরনের কাঁচা পাট রপ্তানি করা যাবে। বাংলা অঞ্চলে ব্যাপক মাত্রায় পাটের চাষ ও পাটের ব্যবসার শুরু প্রায় ২০০ বছর আগে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিয়ামক ভূমিকার কারণেই পাট সোনালি আঁশ আখ্যা পেয়েছিল। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক বাজারে কৃত্রিম সুতার সরবরাহ বাড়ায় পাটের চাহিদায় টান পড়ে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে পাটের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে পাট নিয়ে আমাদের গর্ব চূর্ণ হয়। উৎপাদনে ধস নামে। পরবর্তী সময়ে সরকার পাটের উৎপাদন, বাজার ও গৌরব ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। এতে কিছু কাজ হলেও সোনালি পর্বের প্রত্যাবর্তন এখনো হয়নি।
বাংলাদেশ পর্বে কাঁচা পাটের রপ্তানি বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ১৯৮৪, ২০১০ বা ২০১৫ সালে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার আগে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। ২০১০ সালে পাটদ্রব্য দিয়ে পণ্যের মোড়ক তৈরি বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন দেশের পাটকলগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এক মাস কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ রাখা হয়েছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলো মূলত পণ্য মোড়কজাত করার জন্য চট বা বস্তা তৈরি করে। আর বেসরকারি মিলগুলো মূলত স্পিনিং অর্থাৎ সুতা তৈরি করে। পাটের দেশি ভোক্তা মূলত তারাই। সরকার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটাতে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে; তবে উৎপাদক, রপ্তানিকারক, প্রস্তুতকারক সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া উচিত। উৎপাদিত সব পাট যদি অভ্যন্তরীণভাবে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা ক্ষতিরই কারণ হবে। সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ রক্ষা করে, তাদের মতকে সম্মান দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তথ্য প্রযুক্তি আইন

তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে একটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এই ধারার কারণে বহু সাংবাদিককে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়েছে। অনেককে কারাগারেও যেতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে এই ধারার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো ফলোদয় হয়নি বলেই মনে করছেন নেতৃস্থানীয় সাংবাদিকরা। সোমবার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’-এর যে খসড়াটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে, তার ৩২ ধারা এবং বাতিল হওয়া ৫৭ ধারার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই বলেই মনে করেন তাঁরা। তাঁদের মতে, ৫৭ ধারার মতোই এই ধারার কারণেও সাংবাদিকদের হয়রানির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এর ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ব্যাহত হবে।
সভ্য দুনিয়ায় গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের অসংগতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ইত্যাদির তথ্য তুলে ধরে জনগণের অর্থের অপচয় রোধ করে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে। গণমাধ্যমের সেই কাজগুলো এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার গোপনীয় বা অতিগোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কেউ ধারণ করলে তা হবে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির শামিল। প্রথমবারের অপরাধে শাস্তি হবে ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা। দ্বিতীয়বার কেউ একই অপরাধ করলে শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা। এ অপরাধে গ্রেপ্তার হলে জামিনও পাওয়া যাবে না। এসব সংস্থার প্রায় সব ফাইলেই গোপনীয় বা অতিগোপনীয় কথাটি লেখা থাকে। বিভিন্ন সূত্রে সেসব নথির কপি সংগ্রহ করে তা যাচাই-বাছাইয়ের পর সাংবাদিকরা সাধারণত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে থাকেন। এখন তাঁকে যদি গুপ্তচরবৃত্তির মতো কঠিন অপরাধের পর্যায়ভুক্ত করা হয় এবং এমন কঠোর দণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে কোনো সাংবাদিকই সেই ঝুঁকি নিতে রাজি হবেন না। তাতে লাভ হবে দুর্নীতিকারীদের। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও দেশের মানুষ। শুধু সাংবাদিক নয়, অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষও এই আইনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। খসড়া আইনে মোট ১৪টি ধারার অপরাধকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আদালতে অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই অনেককে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হতে পারে। তাই একে অনেকে মৌলিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করছেন।
প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে সংগতি রেখে স্বাধীন সাংবাদিকতাও এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। সে ক্ষেত্রে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা মোটেও কাম্য হবে না, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে কিংবা মানুষের বাক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে। আমরা মনে করি, সংসদে পাস হওয়ার আগে আইনটি আবার বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।