বিভাগ: সম্পাদকীয়

পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ চাই

সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই ঈদে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যে যার সাধ্যমতো পশু কোরবানি করবে। পশুর মাংস নিজেরা খাবে, গরিব-দুঃখী কিংবা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিতরণ করবে। এ সময় পেঁয়াজ, আদা-রসুন ও অন্য কিছু মসলার চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়। আর প্রতিবছর এ সুযোগই নেয় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। কোরবানির ঈদের আগে আগে নানা রকম কারসাজি করে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত এক-দেড় মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রমজান মাসের পর দেশি জাতের পেঁয়াজের দাম ছিল ৩৫ টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম হয়েছে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা। অথচ গত সপ্তাহেও যে দামে এই পেঁয়াজের এলসি করা হয়েছে, তাতে কেজিপ্রতি আমদানিমূল্য হবে সর্বোচ্চ ২১ টাকা। এসব পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
দাম বাড়ানোর পেছনে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথাও শোনা যায়। বিগত রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে আগে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রমজান মাসের শুরুতে বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা ও বাড়তি মনিটরিং চালু করায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয় দাম কমাতে। তখনই দেশি পেঁয়াজের দাম নেমে আসে কেজিপ্রতি ৩৫ টাকায় এবং বিদেশি পেঁয়াজ ২০ থেকে ২৫ টাকায়। সম্প্রতি ভারতের বাজারেও পেঁয়াজের দাম সামান্য বেড়েছে। সেই বাড়তি দামে আমদানি করা হলেও কেজিপ্রতি মূল্য পড়বে ২১ টাকার মতো। সেই পেঁয়াজ ৪০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ার পেছনে কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট নানা ধরনের কারসাজি করে ক্রমাগতভাবে দাম বাড়িয়ে চলেছে। তাঁদের মতে, সরকার চাইলে এসব কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও কঠিন কাজ নয়। কিন্তু সেই চাওয়াতেই যেন ঘাটতি রয়েছে।
আমরা চাই অবিলম্বে পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া হোক। সরকারি সংস্থা টিসিবিকে দ্রুত সক্রিয় করতে হবে। প্রয়োজনে টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানিরও উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি খোলাবাজারে পেঁয়াজসহ জরুরি কিছু পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের বাজার যেহেতু কোনো নিয়ম-নৈতিকতা মেনে চলে না, তাই এখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ বাড়াতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনৈতিক মুনাফাখোরদের শাস্তি দিতে হবে। আমরা আশা করি, ঈদুল আজহায়ও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

যানবাহন চলাচলে শৃংখলা

নিরাপদ সড়কের দাবিতে সপ্তম দিনের মতো শনিবারও রাজপথে নামে শিক্ষার্থীরা। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলা হলেও তারা পথ ছেড়ে যায়নি। এদিকে রাজধানীতে গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে ছেড়ে যাচ্ছে না দূরপাল্লার বাস। বিপাকে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। প্রতিদিন যাদের কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়, তাদের ভোগান্তি চরমে। শুক্রবার সকাল থেকে বন্ধ থাকার পর রাতে চলেছিল দূরপাল্লার বাস। শনিবার সকাল থেকে আবার বন্ধ হয়ে যায় সড়ক যোগাযোগ। বাস মালিক সমিতির সভাপতি বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বাস চলাচল করবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাল্টায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এই অঘোষিত ধর্মঘটে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বাস টার্মিনালগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে বাসের দেখা পাননি। বিদেশগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়েছে। অসুস্থদের জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতেও গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া। অভিযোগ উঠেছে, যাত্রীবাহী বাস না থাকায় রাইড শেয়ারিংয়ের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। চলমান আন্দোলনের মধ্যেই শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। শনিবার গাজীপুরে কাভার্ড ভ্যান চাপায় কলেজছাত্রী নিহত হয়েছেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের শিশু-কিশোররা পথে নেমে গত কয়েক দিনে আলোর দিশা দেখিয়েছে। তাদের দাবি পূরণে সম্মত হয়েছে সরকার। এরই মধ্যে দিয়া ও করিমের পরিবারকে অনুদান হিসেবে ২০ লাখ টাকা করে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে বিআরটিসির পাঁচটি বাস দেওয়া হয়েছে। সব স্কুলের সামনে গতিরোধক করে দেওয়া হবে। অনেক দিন ধরে আটকে থাকা সড়ক পরিবহন আইন মন্ত্রিসভায় উঠছে। এরপর শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু তার পরও শিক্ষার্থীরা শনিবার রাজপথে নেমে আসে। এদিকে পরিবহন শ্রমিকরা কোথাও কোথাও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় উভয় পক্ষের মুখোমুখি হওয়া এবং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করা যেতেই পারে। বিশেষ করে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অঘোষিত ধর্মঘটে যাওয়ার বিষয়টি জনমনে নানা গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। শিশু-কিশোররা অসংগঠিত। এই সুযোগটি নিতে পারে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। তার ইঙ্গিতও মিলতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তুলে নিয়ে যাওয়া এমনকি নিহত হওয়ার খবর পর্যন্ত ছড়ানো হচ্ছে। এই সুযোগে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেকোনো স্থানে অঘটন ঘটিয়ে ফেললে তার দায় কে নেবে? এরই মধ্যে পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। অনভিপ্রেত এসব ঘটনা একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাস করে না এই আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ফিরে যেতে হবে শ্রেণিকক্ষে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের। অন্যদিকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দ্রুত এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে সামনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যাংকিং বিনিয়োগ বান্ধব হোক

দেশের অগ্রগতির ধারা টেকসই করতে প্রয়োজন প্রচুর বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ব্যাংকিং খাত সেখানে খুব বেশি অবদান রাখতে পারছে না। এর বড় কারণ ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার। ১৫ শতাংশ বা এরও বেশি সুদে ঋণ নিয়ে লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব। তাই ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা অনেক দিন ধরেই ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই তা কমছিল না। অবশেষে ঋণের সুদ এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী কিছু নির্দেশনা দেন। সেই অনুযায়ী বাজেটে করপোরেট কর কমিয়ে আনা হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা নগদ সংরক্ষণ অনুপাত কমিয়ে আনা হয়। এসবের ভিত্তিতে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বা বিএবি বলেছিল, ১ জুলাই থেকে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা হবে। বাস্তবে তা হয়নি। কয়েকটি ব্যাংক সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনলেও বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক তা করেনি। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ বা এবিবির সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের জানান, ৯ আগস্ট থেকে ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমানতের সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। অবশ্য ভোক্তাঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণ এর বাইরে থাকবে।
ব্যাংকিং খাতে সুদের হার নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছিল। অনেক ব্যাংক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপায়ে ঋণের ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করত, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা মানসম্মত না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি হয়ে যায়। সেই সঙ্গে মন্দ ঋণের ধাক্কা তো আছেই। তাই ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণের সুদের হারের পার্থক্য ক্রমাগতভাবে বাড়িয়েছে। কিন্তু এমন ব্যাংকঋণ দেশের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে না। তাঁদের মতে, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। অবিলম্বে সব ব্যাংকে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ভোক্তাঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদের হারেও পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুদের হার শুধু অযৌক্তিক নয়, অনৈতিকও।
অর্থমন্ত্রী একই সঙ্গে জানিয়েছেন, সরকারের সঞ্চয়পত্রের সুদহারও ৮ আগস্ট পর্যালোচনা করা হবে। অর্থাৎ তা কিছুটা কমিয়ে আনা হতে পারে। আর তা নিয়ে আমানতকারীরা, বিশেষ করে অবসর জীবনযাপনকারীরা এক ধরনের শঙ্কায় রয়েছেন। এই দিকটি বিশেষ বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
আমরা চাই, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বিনিয়োগবান্ধব হোক।

পাহাড় ধস রোধে পদক্ষেপ

বর্ষা এলেই পার্বত্যাঞ্চলের মানুষ এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে দিন কাটায়। না জানি কখন পাহাড় থেকে নেমে আসে এক দঙ্গল কাদামাটি, পরিবারসুদ্ধ সবার জীবন কেড়ে নেয়। তার পরও ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই পাহাড়ের নিচে থাকা ছোট খুপরিঘরেই বাস করতে বাধ্য হয়। প্রতিবছরই পাহাড়ধসের এমন দুঃখজনক বহু ঘটনা ঘটে। এ বছর এরই মধ্যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলায় অর্ধডজন পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। প্রাণও হারিয়েছে অনেকে। পাহাড়ধসের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল চট্টগ্রামে ২০০৭ সালের জুন মাসে। সেই ঘটনায় মারা গিয়েছিল ১২৭ জন। গত বছরও ব্যাপক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং চার সেনা কর্মকর্তাসহ ১৬৮ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পর সরকার পাহাড়ধসের কারণ খুঁজতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছিল। ৯ মাস ধরে অনুসন্ধানের পর সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে সম্ভাব্য কারণগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। এতে বাস্তব অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হবে কি, নাকি আগের সব প্রতিবেদনের মতোই এটিও ফাইলচাপা পড়ে যাবে?
জানা যায়, এক শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর সহায়তায় কিছু প্রভাবশালী লোক পাহাড়ের নিচে সরকারি জমিতে খুপরিঘর তৈরি করে ভাড়া দেয়। ভাড়া কম হওয়ায় দরিদ্র লোকজন সেখানে গিয়ে ভিড় জমায়। বড় বৃষ্টিপাতের আগে কর্তৃপক্ষ মাইকিং করে তাদের সরে যেতে বলে এবং তাদের দায়িত্ব সারে। মাইকিং শুনেও অনেকের পক্ষে অন্যত্র সরে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাদেরই ভাগ্যে নেমে আসে এমন আকস্মিক মৃত্যু। অথচ আমাদের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অবৈধ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারেনি। কমিটির অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে, পাহাড়ধসে করুণ মৃত্যুর জন্য এই অবৈধ বসতি স্থাপন মূলত দায়ী। অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পাহাড় কাটা, পাহাড়ের গাছপালা কেটে ন্যাড়া করে দেওয়া, রক্ষাবেষ্টনী ও নালা না থাকা ইত্যাদি। আগের প্রতিবেদনগুলোতেও একই কথা বলা হয়েছিল এবং পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঠেকাতে একই ধরনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়? এখনো চলছে অবাধে বৃক্ষ নিধন ও পাহাড় কাটা। যাদের তা নিয়ন্ত্রণ করার কথা, অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও। জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পাহাড় কাটা নিয়ে খবরের কাগজগুলোতে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কমিটির পর কমিটি করে কোনো লাভ হবে না। প্রয়োজন এসব কমিটির সুপারিশগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার সে অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

পরিবহনে শৃংখলার বিকল্প নেই

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ৯ দফা দাবিও জানিয়েছে তারা। দুই সহপাঠীকে হারিয়ে সড়কে নামা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা স্বীকার করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী তাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যেতে বলেছেন। টানা চতুর্থ দিনের মতো শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করায় বিড়ম্বনায় পড়ে শহরবাসী। এদিকে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া দুই বাসের নিবন্ধন সাময়িকভাবে বাতিল করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এই দুটি বাসের একটির ফিটনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ১৮ মে। রুট পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ১৯ মে। ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদও শেষ হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। অর্থাৎ বাসটি ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন ও রুট পারমিট ছাড়াই চলাচল করছিল। অন্য আরেকটি প্রতিবেদনে জানা যায়, জাবালে নূর পরিবহনের আটক চালকদের কারো বাস চালানোর লাইসেন্স ছিল না। এদিকে কুমিল্লায় দুই ছাত্রীর ওপর ট্রাক উঠে যাওয়ায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনা নিয়ে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক বৈঠকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অবৈধ গাড়িচালকদের ধরতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী ও নগর পরিবহনে কোনোভাবেই শৃঙ্খলা আনা যাচ্ছে না। মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষেরই আইনভঙ্গের প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। আইনগত ব্যবস্থা নিতে গেলেই যানবাহন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। নগর পরিবহনে সরকারি সড়ক পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির অনুপস্থিতির কারণেই একচ্ছত্র ব্যবসা করছে বেসরকারি বাস কম্পানিগুলো। যাত্রীদের জিম্মি করে ফেলেছে তারা। সিটিং সার্ভিসের নামে অরাজক ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে। বাসভাড়ায় কোনো শৃঙ্খলা নেই। একেক কম্পানি একেক ধরনের ভাড়া আদায় করে। এসব বাসে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য কোনো হাফ ভাড়া নেই। ভাড়া আদায়ের নামে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। অথচ যখন টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা ছিল, তখন সব বাস নির্দিষ্ট স্টপেজে থামত।
ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাসের বাধ্যবাধকতা ও গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল গত বছর মার্চ মাসে। প্রায় দেড় বছর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সেই আইনের অনুমোদন দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। আইনের খসড়াটি এখন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। মন্ত্রিসভা এই আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর তা পাস করতে সংসদে তোলা হবে।
রাজধানী সহ নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত আইন পাস ও সব রুটে বিআরটিসির বাস চালু করা গেলে বেসরকারি বাস মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে।

আসামে বাঙালি নাগরিকত্ব

ভারতের আসাম রাজ্য প্রায়ই বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মূলত বাঙালি তথা বাংলাভাষী অধিবাসীদের সূত্রে। অহমিয়া জাত্যভিমান-প্রসূত ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযানও পরিচালিত হয়েছে বেশ কয়েকবার। কখনো এসবে জড়িত ছিল অহমিয়া জনগোষ্ঠী, কখনো রাজ্য সরকার, কখনো উভয়ে। রক্তপাতের ঘটনাও ঘটেছে। ভাষাকেন্দ্রিক বিরোধও ঘটেছে। রাজ্য সরকারের অহমিয়া ভাষাকে আসাম রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলন হয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১১ জন বাঙালি। বাঙালি তথা বাংলাভাষীদের সঙ্গে বৈরী আচরণ এর পরও অনেকবার হয়েছে। এ আচরণের পক্ষে সংশ্লিষ্টদের যুক্তি হলো বাঙালিরা অভিবাসী, তারা আসামের বা অহমিয়া জনগোষ্ঠীর স্বকীয়তায় বাধা সৃষ্টি করছে। এসব অজুহাতে দশক দেড়েক আগে গণহারে পুশব্যাকের ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল।
এবার সমস্যা দেখা দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে। ‘অবৈধ বিদেশি’ চিহ্নিত করতে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী সোমবার হালনাগাদ ‘জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি)’-এর চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে আসাম রাজ্য সরকার। এতে রাজ্যের ৪০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। নিজ ভূখণ্ডে তারা ‘উদ্বাস্তু’ হয়ে পড়েছে এ দাবি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এনআরসিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। এর পরও নিশ্চিন্ত থাকার উপায় যে নেই, সে কথা সবাই বোঝে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাদপড়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশি নয়। বাংলাদেশ তাদের ফিরিয়ে নিতে পারবে না। ভারত অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, এনআরসি নিয়ে তারা এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা হয়।
সমস্যার কিছু কারণ তার পরও থেকে যাচ্ছে। ভারতের একজন বিশেষজ্ঞের অভিমত, আসামে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি যারা, তাদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার খুব একটা ভাবেনি। এখন পর্যন্ত সরকারি নীতি খুবই অস্পষ্ট। বাদপড়াদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে পরে ধীরে ধীরে ‘ন্যাচারালাইজেশন’-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়া হতে পারে। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এমনও হতে পারে, তাদের ধীরে ধীরে অন্যান্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে এ সমস্যার চাপ একা আসামকে সামলাতে না হয়। অবশ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী এনআরসি প্রকাশের পরই রাজ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার কথা বলেছেন। আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, যারা বাদ পড়েছে, তাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। এটি খসড়া তালিকা। তারা আবারও আবেদন করার সুযোগ পাবে।
রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকার বাদপড়া লোকদের নিয়ে যা বলেছে, তা বাহ্যত স্বস্তিদায়ক। কিন্তু ঐতিহাসিক যে নজির রয়েছে তাতে আশঙ্কিত হওয়ার কারণ রয়েছে। রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে জাত্যভিমান রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারে যাঁরা আছেন তাঁদের কারো কারো অতীতের বক্তব্য ভরসাযোগ্য বিষয় নয়। বাংলাদেশ সরকার এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো বেচালের বড় ঝাপটা প্রথমে বাংলাদেশের ওপরই পড়বে।

প্রধানমন্ত্রীর জনহিতকর নির্দেশনা

 

প্রতিবছর সকল বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলা প্রশাসকের অংশগ্রহণে রাজধানীতে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এটি একটি রুটিন ওয়ার্ক বা নিয়মিত কার্যবিধি হলেও এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দেশের সার্বিক প্রশাসনিক চিত্র উঠে আসে। একইসঙ্গে সিভিল সার্ভিসের একজন জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের সদস্য ও সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ আমলা হিসেবে জেলা প্রশাসকদের মনোভাব সম্পর্কেও সরাসরি একটি ধারণা লাভ সম্ভব হয়। সরকার প্রধানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাদান সম্মেলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। এ সম্মেলনে মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, মুখ্য সচিব, মুখ্য সমন্বয়কসহ সকল সচিব উপস্থিত থাকেন। ফলে এই সম্মেলনের বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। এবারের সম্মেলনটি এ কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ যে বর্তমান সরকারের আমলে এটিই শেষ সম্মেলন। সম্প্রতি সমাপ্ত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে অনেক বিষয় উঠে এসেছে। যার ভেতর দিয়ে জেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা, ভূমি প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ের বাস্তব চিত্র উপস্থাপিত হয়।
ডিসিদের সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ২৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন, যার মধ্যে নাগরিকদের সর্বোচ্চ সরকারী সেবা নিশ্চিত করা, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ, যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, শিল্পাঞ্চলে শান্তি রক্ষা, পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রফতানি নির্বিঘœ করা, জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করা অগ্রাধিকার পেয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘এখানে আমি বলতে চাই, বিনা দ্বিধায় আপনারা টেন্ডারবাজি, পেশীশক্তি, সন্ত্রাস এবং মাদক নির্মূল করবেন। এখানে কে কোন্ দল করে, কে কী করে সেগুলো দেখার কোন দরকার নেই।’ প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্যের পর তাঁরা কর্তব্য পালনে পিছপা হবেন না এমনটাই প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না এমনটাই দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকবৃন্দ ভাবতে চান। এই সম্মেলনে ডিসিদের পক্ষ থেকেও প্রস্তাব আকারে ২৩টি অনুরোধ রাখা হয়েছে সরকারের কাছে। যার মধ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো থেকে শুরু করে আইনগত কিছু জটিলতা নিরসনের কথাও বলা হয়েছে। সেগুলোরও যৌক্তিক সমাধান অনস্বীকার্য। এবার ডিসিরা ৩৪৭টি সুপারিশ করেছিলেন যা গৃহীত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এগুলো স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই নয়, সামাজিক অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অনেক দেশকে আমরা ছাড়িয়ে গেছি। এ অবস্থা ধরে রাখতে এবং আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দলনিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট।
সাধারণ মানুষ আশা করে জেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকগণ যে জনসেবক সেটি অবশ্যই তারা স্মরণে রাখবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর জনহিতকর ও যুগোপযোগী নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে মান্য করার মধ্য দিয়ে দেশসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন

দেশের একাদশ সাধারণ নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই এই নির্বাচন ঘিরে নানামুখী তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের এলাকায় জনসংযোগ করার জন্য বলা হয়েছে। বিএনপিও সম্প্রতি একটি সমাবেশ থেকে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে বলেছে, দলের চেয়ারপারসনের কারামুক্তির ওপরই তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নির্ভর করছে। অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল ও তাদের জোট। নির্বাচনের আগে উভয় জোটে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছুই। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গত বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুুরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নির্বাচন কমিশন সচিব জানিয়েছেন, এটা ছিল তাঁর বিদায়ী বৈঠক। বৈঠক শেষে মার্শা বার্নিকাট সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই বৈঠকে নির্বাচন প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনে সব দলকে সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মার্শা বার্নিকাট। একাদশ সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলেছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনেই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্শা বার্নিকাট। ওদিকে গত বুধবার রাতে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের প্রতিনিধিসভায় আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপকমিটির শুনানিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর প্রিন্সিপাল ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যালিস জি ওয়েলস জানিয়েছেন, বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নও চায় সংবিধান মেনেই ভোট হোক, তবে অবশ্যই তা অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও আশা করে, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সব দলের সমান উপস্থিতি থাকবে।
মোট কথা, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে দেশের অংশীজনদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমান আগ্রহ রয়েছে। এই নির্বাচন যে সরকার ও ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করার দায়বদ্ধতা ইসির। তবে সরকারের দায়িত্বও কম নয়। নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ইসির অগ্নিপরীক্ষা ৩০ জুলাই। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হলে সাধারণের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হবে। সাধারণের বিশ্বাসের ভিত যত দৃঢ় হবে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করার কাজ তত সহজ হবে।

বর্ষায় জনদুর্ভোগ

মৌসুমী বায়ুর সক্রিয়তায় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ভরা বর্ষায় অবিরাম বৃষ্টির ধারা যেমন শান্ত-স্নিগ্ধ প্রলেপ বুলিয়ে দেয় পাশাপাশি জনজীবনে দুর্ভোগেরও শেষ থাকে না। আষাঢ় মাস গেল প্রায়ই অনাবৃষ্টিতে। তার আগে জ্যৈষ্ঠ মাসের বৃষ্টিতে প্রকৃতি ঠিক তার নিয়মে চলেনি। আর শ্রাবণ মাসের শুরুটা তো ছিল প্রচন্ড রোদের খরতাপে জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের জীবন কাহিল হওয়ার অবস্থায়। ফলে প্রকৃতি যথানিয়মে যা করার তাই করল। অর্থাৎ অত্যধিক জলীয় বাষ্পের পরিণতিতে সারাদেশে নিম্নচাপের মতো প্রাকৃতিক সমন তৈরি হলো। আশঙ্কা করা হচ্ছিল ঝড় এবং অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস। মঙ্গলবার থেকে সেটাই প্রবল বেগে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় বৃষ্টির ধারায় বর্ষিত হলো। সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থার কারণে বৃষ্টির পানি মানেই জলাবদ্ধতা, মাত্রাতিরিক্ত যানজট সঙ্গে আরও তীব্রভাবে সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।
বৃষ্টির কারণে এমনিতেই যানজট অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, সঙ্গে যদি জলাবদ্ধতার মতো অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাহলে সেই দুরবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকে সে কথা বলারও অপেক্ষা থাকে না। বর্ষণস্নাত বাংলার নিরন্তর বৃষ্টির ধারা জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিলেও নাজেহাল করতেও এর জুড়ি নেই। তবে এখানে শুধু প্রকৃতির ওপর দায় চাপালে চলবে না, মানুষের সৃষ্ট কোন সমস্যা কতখানি প্রভাব ফেলছে জনজীবনে সেটাকেও বিবেচনায় আনা অত্যন্ত জরুরী। সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থা আমাদের নিত্য নৈমিত্তিক সমস্যা। তার ওপর রাস্তার চারপাশে খানাখন্দ খোঁড়াও এক ধরনের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা তৈরি করে। প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে যেভাবে রাস্তা কাটা হয়ে থাকে তাকে ঠিকঠাক সংস্কার না করাও এক ধরনের অপরাধ। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা-ই হয়ে থাকে। এ ছাড়াও নর্দমা এবং নালার পানি নিষ্কাশনেও থাকে হরেক রকম বাধাবিপত্তি। বিভিন্ন অপরিশোধ্য বর্জ্য যেখানে সেখানে জমা করে রাখাও সড়ক ব্যবস্থাকে দুর্দশার শেষ পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশেষ করে পলিথিনের মতো বর্জ্য নালা-নর্দমাকে যে পরিমাণ সঙ্কটে আবর্তিত করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে জলাবদ্ধতাকে কোনভাবেই আটকানো যাবে না। ফলে পথচারী এবং যাত্রী দুর্ভোগও কমানো একেবারে অসম্ভব। বর্ষাকাল বাংলার সমৃদ্ধ প্রকৃতির অবারিত দান। এই বর্ষণ যাতে গণমানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কোন ধরনের হুমকি তৈরি করতে না পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত, আধুনিক এবং জনবান্ধব করা এই মুহূর্তে সব থেকে বেশি প্রয়োজন। প্রত্যাশিত বর্ষা তার প্রকৃতিগত আবেদন নিয়ে বার বার ফিরে আসবে কিন্তু তাই বলে জনদুর্ভোগের মতো পরিস্থিতি বেসামাল অবস্থায় নিয়ে যাওয়াও সঙ্গত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহৃদয় বিবেচনায় এসব সমস্যা আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানাচ্ছি।

বেসরকারি চিকিৎসা সেবা শৃংখলাহীন

দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে যে শৃঙ্খলা নেই, ভুক্তভোগীরা সে সম্পর্কে বিলক্ষণ জ্ঞাত। রোগ নির্ণয়ের জন্য একই রোগীর পরীক্ষার ফল একেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একেক রকম। আবার ডায়াগনস্টিক সেন্টারভেদে একই পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়ে থাকে একেক ধরনের ফি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্যাথলজি পরীক্ষার ফি, সেবার মূল্য এবং চিকিৎসকদের চিকিৎসা ফি আলাদা। অথচ প্যাথলজি পরীক্ষা থেকে শুরু করে সব ধরনের পরীক্ষায় যে মান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তা নয়। বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবা নিয়েও মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। অস্বাভাবিক ফি আদায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে ব্যয় বৃদ্ধিসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের ‘পকেট কাটা’ হয়। আবার দেশের অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কোনো নিবন্ধন নেই।
চিকিৎসা পেশা আর দশটা পেশার মতো নয়। এ পেশাকে দুনিয়াব্যাপী মহৎ পেশা হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়। যেখানে রোগীর বাঁচা-মরা তথা জীবন নিয়ে কাজ করা হয়, সেখানে রোগীর গলায় ছুরি ধরে অর্থ আদায় করা কিংবা অনৈতিকভাবে স্বজনদের পকেট কাটার কোনো অবকাশ নেই। চিকিৎসা পেশা একটি মহান পেশা। স্বাস্থ্যসেবা অন্য দশটি ব্যবসার মতো নয়। এখানে মানুষের জীবন থাকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকসহ অন্যদের হাতে। অথচ এগুলো দেখভাল করার জন্য কোনো নীতিমালা নেই। দেখা যায় সামান্য কারণে অনেক সময় চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্মচারীরা ধর্মঘট ডাকে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলা হয়। মানবিকতা, মূল্যবোধ কিংবা সেবার মনোবৃত্তি না থাকলে চিকিৎসাসেবার মান ক্রমাগত নিচেই নামতে থাকবে। দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন পরীক্ষার ফি, সেবার মূল্যতালিকা এবং চিকিৎসকদের চিকিৎসা ফির তালিকা উন্মুক্ত স্থানে টাঙানোর যে নির্দেশনা হাইকোর্ট থেকে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। একই সঙ্গে মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২ অনুযায়ী নীতিমালা তৈরি করতে এবং তা বাস্তবায়নে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমরা আশা করি, সরকার জরুরি ভিত্তিতে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। চিকিৎসাক্ষেত্রে কেউ যাতে প্রতারণার শিকার না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা জরুরি।