বিভাগ: সম্পাদকীয়

কোরবানীর হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সতর্কতা

আগামী ২ সেপ্টেম্বর পালিত হবে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। প্রতিবছরের মতো এবারও দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক পশুর হাট বসেছে। এসব হাটে পশু আসতে শুরু করেছে। বহু উৎসাহী ক্রেতা এসব হাটে গিয়ে কোরবানির পশু দেখে আসছেন। এবার নানা পথে ভারতীয় গরু দেশে আসায় হাটগুলোতে পর্যাপ্ত গরুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে কেনাবেচা এখনও পুরোদমে শুরু হয়নি। স্থানীয়ভাবে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে হাসিল নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এতে কোরবানির পশু কেনার ব্যাপারে ভোগান্তি অনেকটা কমবে বলে আশা করা যায়। বেশিরভাগ হাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত, ভেটেরিনারি টিম সদাতৎপর থাকবে বলে জানানো হয়েছে। রয়েছে মোবাইল ব্যাকিং ব্যবস্থাও। কোন কোন হাটে সিসি ক্যামেরা ও জাল নোট শনাক্তকরণ যন্ত্রসহ আনুষঙ্গিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে একটি কুচক্রী মহল সক্রিয় হয়ে ওঠে। চক্রটি হাটে জাল টাকা ছড়িয়ে দেয়। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবারের হাটে জাল টাকা শনাক্তকরণ যন্ত্র থাকলেও এই চক্রটি যেন হাটে ঢুকতে না পারে সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমাদের ঈদ-অর্থনীতির অন্যতম দিক হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া। বাংলাদেশে চামড়া শিল্প প্রসারের অন্যতম কারণ একসঙ্গে প্রায় কোটির মতো পশু কোরবানি দেয়া হয়। এই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে দেশে বিশাল চামড়া শিল্প গড়ে উঠেছে। দেশে প্রায় পাঁচ লাখ ২২ হাজার খামার রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারও কোরবানিকে ঘিরে এক কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার পশু উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ গরু। রয়েছে ভেড়া ও ছাগল। কোরবানি ঘিরে বিপুল পশুর চাহিদা মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে জোগান দেয়া হতো।
কোরবানির এই পশু সঙ্কটের মধ্যে আমাদের দেশে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল পালন বেড়ে যায়, যা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। কোরবানির পশু বিক্রি করে খামারিরা প্রতি বছর বড় ধরনের আয় করেন। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য পশু পালন করেন। সারা বছর পশু পালন করার একটাই লক্ষ্য থাকে, কোরবানির হাটে তা বিক্রি করে বড় অঙ্কের আয় করে নেয়া। এ প্রবণতা বেড়েছে ভারত থেকে পশু আমদানি বন্ধ হওয়ায়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে না এলেও চূড়ান্ত মুহূর্তে প্রতিবেশী দেশ থেকে বানের পানির মতো পশু ঢুকতে থাকে। ফলে দেশীয় উৎপাদকরা লোকসানে পড়েন। এবারও এই আশঙ্কা রয়েছে। পশু কোরবানি আমাদের অর্থনীতির জন্য দারুণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগ আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ঈদ ঘিরে অর্থনৈতিক লাভালাভের সবটুকু আমাদের ঘরে উঠবে। অর্থনৈতিক লাভালাভের এই সুযোগকে সরকারের প্রণোদনা দেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।

প্রবাসীদের নিরাপত্তা জোরদার করুন

দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশের নাগরিকরা বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাজনিত সঙ্কটে পড়েন। নিরাপত্তাহীনতার কারণ ও ধরন একেক দেশে একেক রকম। সম্প্রতি বাংলাদেশীদের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রতিমাসেই দেশটির বিভিন্ন স্থানে দুষ্কৃতকারীদের হাতে একাধিক বাংলাদেশী নিহত হচ্ছেন। বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা প্রদানে দেশটির সরকারের কাছে একাধিকবার আবেদনের পরও এ বিষয়ে সাড়া মিলছে না। গত চার মাসে দেশটিতে নিহত হয়েছেন ১০ বাংলাদেশী। ২০১৫ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন চলছে। তারপর থেকেই অভিবাসীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বেসরকারী উদ্যোগে বিদেশ গিয়ে নানাভাবে প্রতারিত হতে হয় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী জনশক্তিকে। বেতন-ভাতা নিয়ে প্রবঞ্চনা, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা, অবৈধ হিসেবে পরিগণিত হয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপনে বাধ্য হতে হয় তাদের। দেশের জন্য ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উপার্জনকারী প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে বার বার কথা ওঠে। প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বা নিয়োগকর্তার দেশের সরকার তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে কতটুকু খেয়াল রাখে, সেটা প্রশ্ন। বেশকিছু দেশে শ্রমিকদের ভালমন্দ দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং আছে। এসব উইং-এ লেবার এ্যাটাশেও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, থাকার জায়গাসহ নানা ইস্যুতে শ্রমিকরা দূতাবাসে অভিযোগ করলেও তাতে ফল হয় না।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, বর্তমানে প্রায় ৯৬ লাখ বাংলাদেশী অভিবাসী হিসেবে বিশ্বের ১৬০টি দেশে কর্মরত আছেন। তবে এই সংখ্যা আরও বেশি, এক কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি নামক সোনার হরিণের সন্ধানে এ পর্যন্ত যে কতজন প্রাণ দিয়েছেন তার হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট দফতর ও মন্ত্রণালয়ে।
প্রবাসীদের কল্যাণে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন-২০১৭’ খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বোর্ডের কর্মতালিকা দীর্ঘ হলেও বাস্তবে সুফল কতটুকু মিলছে? এই বোর্ড অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণার্থে প্রকল্প গ্রহণ ও পরিচালনা করবে; প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের কল্যাণার্থে তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দেবে; প্রবাসীদের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, বকেয়া বেতন, ইন্স্যুরেন্সের অর্থ ও সার্ভিস বেনিফিট আদায়ে সহায়তা করবে; প্রবাসী কর্মীদের মেধাবী সন্তানদের বৃত্তি প্রদান ও তাদের আইনী সহায়তা দেবে; প্রবাসী কর্মীদের জন্য তথ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করবে। এছাড়া বিদেশে কর্মরত কোন নারী অভিবাসী বিপদগ্রস্ত বা দুর্ঘটনার শিকার হলে তাকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনা, চিকিৎসা ও আইনী সহায়তা প্রদান করা; দেশে প্রত্যাগত নারী অভিবাসী কর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা এবং নারী অভিবাসীদের নিরাপত্তার জন্য দেশে কিংবা বিদেশে সেফ হোম প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা হবে প্রবাসীকল্যাণ বোর্ডের কাজ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বোর্ডের সক্রিয়তা এখনও দৃশ্যমান হচ্ছে না কেন? বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশের মানুষের বিপদে-আপদে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস আন্তরিকভাবে তৎপর হবেÑ এটাই দেশবাসীর চাওয়া।

অতি মুনাফার প্রবণতা রোধ করুন

বন্যার অজুহাতে বাজারে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের খাদ্যপণ্য, ভোজ্য তেল ও মসলার দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অজুহাত একটাই, বন্যা; যদিও বন্যার কারণে সরবরাহে কোনো টান পড়েনি। পরিবহন খরচ সামান্য বাড়লেও বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। বরং পরিবহন খরচের তুলনায় মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক। ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার প্রবণতাই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ বলে ধরা হচ্ছে।
বাজারে মূল্যবৃদ্ধির এ প্রবণতা শুরু হয় চালের মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে। হাওরে বন্যা পরিস্থিতির কারণে ফসল উঠতে পারেনি। সরকার দ্রুত চাল আমদানির ব্যবস্থা নিলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। ওদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। গত বছরের এই সময়ে ভারতীয় যে চালের দাম ছিল ৩৬৭ ডলার, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৪০৪ ডলারে।
থাইল্যান্ডের যে চাল গত বছর টনপ্রতি ৩৯৪ ডলারে বিক্রি হয়েছে, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৪৭ ডলারে। সরকার চালের আমদানি শুল্ক সর্বনিম্ন নির্ধারণ করার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে এখানে দাম স্থির থাকছে না। অবশ্য এর পেছনে ব্যবসায়ীদের কোনো কারসাজি নেই এমন কথাও বলা যাবে না। ঘূর্ণিঝড় মোরা, পাহাড়ধস ও হাওর এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বর্ধিত হারে ত্রাণ বিতরণ এবং বোরো ফসল থেকে কাক্সিক্ষত মাত্রায় চাল সংগ্রহ করতে না পারার জন্য মজুদ হ্রাস পায়। অনিবার্যভাবেই বাজারে তার প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে কাঁচা পণ্যের বাজারেও অব্যাহতভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। উৎপাদন ব্যাহত হলে বা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে গেলে সংকট দেখা দেবে। সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে সরকারকে বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়টি এখন থেকেই ভেবে দেখতে হবে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের বাজার যাতে অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

শোকাবহ ১৫ আগষ্ট

আজ শোকাবহ ১৫ আগষ্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বিপথগামী কতিপয় সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। শোকসন্তপ্ত জাতি আজ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধুকে বিশেষভাবে স্মরণ করছে। যাঁর গৌরবময় নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেই মহান নেতাকে সপরিবারে হত্যা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক ঘটনা। ঘাতক দল ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে তাঁর নাম ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে ফেলবে। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন সফল হয়নি। যে বাড়িতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হয়েছেন সেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি এখন জাতির অন্যতম আবেগময় স্মৃতিচিহ্নে পরিণত হয়েছে। আর তিনি বাঙালি জাতির প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ঘাতকরা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে পথ সৃষ্টি হয়েছিল সেখান থেকে দেশকে সরিয়ে বিপরীতমুখী করার উদ্দেশ্য ছিল তাদের বড় একটি লক্ষ্য। তাদের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলিয়ে দেয়া। মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করা এবং যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্যে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেটা নস্যাৎ করে দেয়া। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে শুরু হয় এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। একটা পর্যায় দেশে এসেছিল যখন বঙ্গবন্ধুর নামটাও জাতীয় প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হতে পারত না। ইতিহাস থেকে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। তরুণদের দীর্ঘকাল জানতে দেয়া হয়নি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুকে শুধু অস্বীকার করাই নয়, নানাভাবে তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। তাঁর অবদানকে নানাভাবে খাটো করা, এমনকি অস্বীকারও করা হয়েছে। কিন্তু কুচক্রীদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। এ দেশের ইতিহাসের সঙ্গে যাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত, দেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় যাঁর স্থান, কোন হুকুম বা ফরমান দিয়ে তাঁর নাম মুছে ফেলা যায় না, তাঁর অবদানকে খাটো করা যায় না। দেশকে তিনি ভালবেসেছেন অকৃত্রিমভাবে, দেশের মানুষও তাঁকে দিয়েছে হৃদয় উজাড় করা ভালবাসা। তাই খুনী, ঘাতকচক্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের সব চক্রান্ত, চেষ্টা, তৎপরতা ব্যর্থ হয়ে গেছে।
বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে আজ না থাকলেও মানুষের হৃদয়জুড়ে তাঁর অবস্থান। তাঁর হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। ঘাতকদের দন্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। তবে এখনও কয়েক ঘাতক পালিয়ে রয়েছে নানা দেশে। তাদের অতিদ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে দন্ডাদেশ কার্যকরের ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা সবার দাবি। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন সোনার বাংলা গড়ার। সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার মাধ্যমেই তাঁর প্রতি সর্বোৎকৃষ্ট শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব। সে কাজটাই এখন করতে হবে।

চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ জরুরী

প্রথমে হাওরে অকালবন্যা, এরপর অতিবৃষ্টি ও ব্লাস্ট রোগে বোরোর ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবধারিতভাবেই এর প্রভাব পড়ে দেশের চালের বাজারে। সব ধরনের চালের দাম বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের মোটা চালের দাম চলে যায় তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। সরকারের মজুদে টান পড়ায় দেখা দেয় বড় ধরনের সংকট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিদ্ধান্ত নিতেও সরকার খুব একটা বিলম্ব করেনি। দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চালের আমদানি শুল্ক ২৮ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার পাশাপাশি শূন্য মার্জিনে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দেওয়া হয়। সরকারও জিটুজি পদ্ধতিতে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যবসায়ীদের চাল এরই মধ্যে দেশের পাইকারি বাজারে পৌঁছে গেছে। সরকারের আমদানি করা চালের প্রথম চালানও চট্টগ্রাম বন্দরে চলে এসেছে। ১৮ জুলাই দ্বিতীয় ও ২২ জুলাই তৃতীয় চালান এসে পৌঁছবে। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই বললেই চলে। পাইকারি বাজারে চালের দাম কিছুটা কমলেও খোলাবাজারে চালের দাম একেবারেই কমেনি। আসেনি সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালে।
বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের বাজারে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট সব সময় সক্রিয়। পণ্যমূল্য ওঠানামায় এই সিন্ডিকেটের হাত থাকে। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও থাকে নানা অজুহাত। এ ছাড়া এখানে কোনো পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে সহজে তা কমানো যায় না। চালের ক্ষেত্রেও তেমনটি হয়েছে বলে ধারণা করা যেতে পারে। আবার এক শ্রেণির মিল মালিক চাল মজুদ করে থাকতে পারে এমন ধারণাও করা হচ্ছে। সরকারের গুদামে চাল বিক্রির কথা থাকলেও অনেক মিল মালিক তা করেনি। এমন ১৬ হাজার মিলারের তালিকা এখন সরকারের হাতে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সবার আগে বাজার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হতে হবে। টিসিবিকে সক্রিয় করে খোলাবাজারে সীমিত আয়ের মানুষের কাছে নিয়মিত চাল বিক্রির উদ্যোগ এখনই নেওয়া গেলে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা যায়। সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা সব সময় দুর্বল বলে অভিযোগ আছে। মনিটরিংয়ের অভাবেও অনেক সময় বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কাজেই এদিকেও সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। সর্বোপরি আমদানি করে হলেও সরকারের মজুদ বাড়াতে হবে। হাওরের বন্যার পর সরকারের মজুদ থেকে চাল বাজারজাত করলে কোনো ব্যবসায়ী দাম বাড়ানোর সুযোগ পেত না। আমরা আশা করব, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেবে।

নগরীতে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ আবশ্যক

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন শহরের সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এবার বর্ষায় এটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। মূলত সময়জ্ঞান ভুলে বর্ষা মৌসুমে অধিকাংশ সড়কজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি এ অবস্থার জন্য দায়ী। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রƒক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না! ফলে নিত্যদিন যানজট-জলাবদ্ধতায় নাকাল হচ্ছে নগরবাসী। সাধারণত বর্ষাকে মানুষ স্বস্তির ঋতু মনে করে। বর্ষা মৌসুমে উন্নয়নের নামে খোঁড়াখুঁড়ির এ মহাযজ্ঞ নগরবাসীর জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়েছে। সড়ক খনন নীতিমালা অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। নীতিমালা কেন মানা হচ্ছে না।
প্রতিবছর জলাবদ্ধতায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়লেও এ থেকে উত্তরণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। বর্ষা মৌসুমে টানা বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাই শুধু ভেঙে পড়ে না, পাশাপাশি রাস্তায় আটকে পড়ে শ্রমজীবী-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। সমন্বয়হীনতা, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব এবং অদূরদর্শী পদক্ষেপের কারণেই জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, এতে কোনো সন্দেহ নেই। জলাবদ্ধতা সমস্যা আমাদের সামনে যে সত্যটি তুলে ধরেছে তা হল- উন্নয়নের নামে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও এর কোনো সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী।
জলাবদ্ধতা সমস্যা কোনো দৈব-দুর্বিপাক নয়। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর অধিকাংশ রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টির মূলে রয়েছে অসময়ে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলেও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন। উচিত সমন্বিত প্রকল্পের আওতায় নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তা সার্বক্ষণিকভাবে পরিষ্কার রাখার ওপর জোর দেয়া। একইসঙ্গে আরও একটি কাজ করা জরুরি : নগরীর চারপাশের নদ-খাল-নালা সংস্কার করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। নয়তো সাংবাৎরিক জলাবদ্ধতার আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়বে নগরবাসী।জলাবদ্ধতা যাতে চলার গতি শ্লথ না করে, সে লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ সমস্যা স্থায়ীভাবে নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে। যা সকল নাগরিকের প্রত্যাশা।

সঞ্চয়পত্রে সুদ

জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হতে পারে—এমন আশঙ্কায় আছেন মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও পেনশনভোগীরা। দেশে বিনিয়োগের কোনো বিশ্বাসযোগ্য ক্ষেত্র নেই। ব্যাংকের সঞ্চয় স্কিমে সুদের হার কমেছে আগেই। এ অবস্থায় মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও পেনশনভোগীদের একমাত্র অবলম্বন ছিল সঞ্চয়পত্র। ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রির হার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ সব সময়ের জন্য নিরাপদ। এই নিরাপত্তাবোধ থেকেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয়। এখন সেখানেও যদি সুদের হার কর্তন করা হয়, তাহলে সমাজের একটি বড় অংশ নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে পারে। পরিবার সঞ্চয়পত্র ও অবসরভোগীদের জন্য পেনশনার সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস জানার বিষয়ে একটি নীতিমালাও সরকার করতে যাচ্ছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ শৃঙ্খলায় আনতে অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হতে পারে। কিন্তু সুদের হার কর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সমাজের একটি বড় অংশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও অবসরভোগী, যাঁরা সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তাঁদের উপার্জনের এই মাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত করা ঠিক হবে না। সমাজে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার যেকোনো নীতিমালা করতেই পারে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুৎসাহ করতে বা বিক্রি কমাতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে তার বিরূপ প্রভাব সম্পর্কেও সজাগ থাকতে হবে। জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরোও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে শৃঙ্খলা আনতে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। নারী, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার আরো আকর্ষণীয় করার প্রস্তাবও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সঞ্চয়পত্র বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, সুদের হারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ঘটলে সুদের হার বাড়ে আর কমলে সুদ কমে। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ঘটলে তা যে আর কমে না, এ বাস্তবতা কি উপেক্ষা করার উপায় আছে?
সর্বোপরি সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর কোনো সুযোগ নেই। আমরা আশা করব, সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু

সিলেট অঞ্চলে অপচিকিৎসা ও ভুল প্রেসক্রিপশনে মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। প্রতিদিনই ২/১টি মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা বা চিকিৎসালয়ের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। চিকিৎসক ও চিকিৎসালয় সাধারণ মানুষের কাছে আতংক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোগে আক্রান্ত জনসাধারণ সুচিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের দারস্থ হয়ে থাকে। কিন্তু নামী-দামি চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপনায় অপ ও ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু ঘটে। যা রোগীসহ সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলে।
সরকার যতই চিকিৎসা সেবা প্রদানে সচেষ্ট হচ্ছে। ততই চিকিৎসকরা দায়সারা ভাব দেখাচ্ছেন। নিজের দায় দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছেন। সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসকরা জনগণের টাকায় বেতন ও সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও প্রকৃত দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। যা লক্ষণীয়।
গত ১০ ফেব্র“য়ারী সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে গেল। মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে ১০ শিশুসহ ৩২ জন রোগীর মৃত্যু ঘটলো। যা নিয়ে সিলেট অঞ্চলসহ দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নিহতদের পক্ষ থেকে শোক হচ্ছে। চিকিৎসকদের খামখেয়ালীপনা ছাড়াও দায়িত্বহীনতার ফলে একসাথে এত মৃত্যু এর আগে এভাবে সিলেট অঞ্চলে ঘটেনি। এ জন্য দায়ী কে?
ওসমানী হাসপাতালে ১০ শিশুসহ ৩২ জনের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দুটো কমিটি গঠনের কথা বললেও বাস্তবে কি কোন তদন্ত হবে না সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করার অপকৌশল মাত্র। ইতিমধ্যে সিলেটের সরকারী-বেসরকারী হাসপাতাল ছাড়াও অসংখ্য ক্লিনিকগুলোতে অপ ও ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের নামে শুধু জন আশ্বাস মাত্র। কোন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের বিচার হয়নি। ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুদের স্বজনরা সুবিচার পায়নি।
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলা আর খাম-খেয়ালীপনার দায়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা কম নয়। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক ঝামেলা হয়েছে।
হাসপাতালের চিকিৎসকদের কর্কশ মেজাজী ভাব সর্বদা পরিলক্ষিত হয়। দিনের বেলা চিকিৎসকরা ঔষধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের সাথে ব্যস্ত থাকতে হয়। এতে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাতের বেলা চিকিৎসক বিহীন হাসপাতালগুলোতে রোগীদের আর্তচিৎকার দিলেও চিকিৎসকের দেখা পাওয়া মুসকিল হয়ে পড়ে।
সরকার যতই ঢাক-ঢোল বাজিয়ে চিকিৎসা দেয়ার জন্য উন্নয়নের কথা বলেন না কেন, বাস্তবে অনেক গরমিল রয়েছে। চিকিৎসকদের অতি লোভের কাছে রোগীরা চিকিৎসা পেতে ব্যর্থ। রোগ থেকে মুক্তি পেতে সহায়-সম্বল বিক্রি করে ভুল চিকিৎসায় সর্বস্বান্ত হতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের দ্রুত বিচারের কাঠগাড়ায় আনার বিকল্প নেই।

আর কত মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব

জাতি আর কত মৃত্যু ও প    ঙ্গুত্বের শিকার হবে। জাতি এত মৃত্যু বহন করবে কীভাবে। গত কয়েক বছরের সহিংসতার শিকার মানুষের দিন কাটছে চরম যন্ত্রণায়। বিভীষিকাময় জীবন নিয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। বার্ণ হাসপাতালগুলোতে অগ্নিদগ্ধের মানুষের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। এ সব দুর্বৃত্তপনা সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
বিরোধীদলের ডাকা অবরোধ-হরতালে বিচ্ছিন্নভাবে কতিপয় দুর্বৃত্তরা চলন্ত যানবাহনে গান পাউডার, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে চলেছে। যা কোন বিবেকবান ব্যক্তি মেনে নিতে পারে না। এ সব হত্যাকান্ডের সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাসপাতালগুলোর বার্ণ ইউনিটগুলোর ধারণ ক্ষমতা কম থাকায় অগ্নিদ্বগ্ধ মানুষের সেবা প্রদানে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন।
দেশে অব্যাহত অবরোধ-হরতালে গান পাউডার, পেট্রোল বোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এ হতাহতের মধ্যে ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী ও শিশুসহ যানবাহনের চালক ও হেলপার রয়েছেন। কর্মসূচীর নামে এসব সাধারণ মানুষের বলি হওয়ার কথা না।
গত ৫ জানুয়ারী থেকে চলমান অবরোধ হরতাল আহবান করে অবরোধ-হরতাল আহবানকারীরা মাঠে না থাকলেও কতিপয় দুর্বৃত্তরা সহিংসতা চালিয়ে সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। যা সম্পূর্ণ মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড। এ হিংসাত্মক কর্মকান্ড রুখতে সকল স্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এলাকা ভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে বিবেকের কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে। এ পর্যন্ত সহিংসতার শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষসহ ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী, অসংখ্য শিশুরা। অবরোধ-হরতালের ফলে সহিংসতায় শিকার হয়েছেন শুধু পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়ে ৫১ জন, সংঘর্ষে ১৩ জন অন্যান্য ভাবে ২১ জন, যানবাহনে আগুন ও ভাংচুর হয়েছে ৯৮৯টি। রেলে ১১ দফায় নাশকতা চালায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে আগুনে পোড়া ১২৩ জনের আহাজারি কে দেখে ?
অব্যাহত অবরোধ-হরতালের ফলে ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থীদের চরম নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বাংলা বিষয়ে পরীক্ষা দিলেও বাকী বিষয়গুলোর পরীক্ষা অনিশ্চিয়তার মধ্যে। এ বিষয়গুলোর পরীক্ষা যদিও শুধু শনিবারে অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা থাকলেও পরীক্ষার্থীদের তীব্র উদ্বেগ উৎকন্ঠায় দিন কাটাতে হচ্ছে।
বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের মতে বিরোধী দলীয় নেত্রীর নিরাপত্তার জন্য ঢাকার গুলশানস্থ রাজনৈতিক কার্যালয়ে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। অথচ দেশের প্রায় ১৬/১৭ কোটি মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে দেশের ১৫ লাখ শিশু কিশোর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জীবন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া কতটুকু যুক্তিসংগত। এতে দেশ প্রেম ও মানব প্রেমের আসল রূপ প্রকাশ পেয়েছে।
সত্যি কথা দেশের ১৬ কোটি মানুষ ও ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থী এ দেশের সন্তান। তাদেরকে আর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে না মেরে অবরোধ-হরতাল বন্ধ করে দেশবাসীর কল্যাণ এগিয়ে আসুন। মানুষের সার্বিক কল্যাণেই আপনার ভবিষ্যৎ জীবন উজ্জ্বল হবে।

এসএসসি পরীক্ষার্থীরা আতঙ্কিত

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ যেমন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন, তেমনি এসএসসি পরীক্ষার্থীরা চরম আতঙ্কিত। এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে অভিভাবক মহল দুশ্চিন্তায় ভোগছেন।
বিরোধীদের টানা অবরোধ আর হরতালের ফলে দেশের অর্থনীতির সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে। অবরোধ আর টানা হরতালের কবলে পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যা সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষার গতিপথে সংকট সৃষ্টি করা হলে একটি জাতি ধ্বংসের পথে এগুতে থাকে। দেশ পুড়লে হিরোদের কিছু আসে যায় না। দেশের কোমলমতি প্রায় ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থী হরতাল-অবরোধের কারণে পরীক্ষা দিতে ভয়ভীতিগ্রস্ত এবং বিরোধীদের ডাকা হরতাল অবরোধের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা চরম হতাশ হয়ে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ২ ফেব্র“য়ারীর স্থলে ৪ ফেব্র“য়ারী এসএসসি পরীক্ষা শুরুর ঘোষণা দিলেও পরীক্ষার্থীদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। বিরোধীদলের ডাকা অবরোধের ২৯ দিন অতিবাহিত হচ্ছে। এ সময়ে সহিংসতার শিকার হচ্ছে অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের নিরীহ জনসাধারণ। সহিংসতার শিকার পেট্রোল বোমা আগুনে পুড়ে প্রায় ৫২ জন। সংঘর্ষে ১০ জন অন্যান্যভাবে ১৬ জন ছাড়াও গত ২৯দিনে প্রায় ৮শ’২টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। এসব সহিংসতার ফলে কোমলমতি শিশুরা আতঙ্কিত। সুস্থ মনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে কি না তাই নিয়ে সচেতন মহল চরম দুশ্চিন্তায় ভোগছেন।
বিরোধদলের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের মধ্যে হরতাল আহবান দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য মরণফাঁদ। দেশের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সাথে তাদের অভিভাবক মহল উৎকন্ঠায় আতঙ্কিত। শিক্ষামন্ত্রী বার বার আল্লাহর ওয়াস্তে হরতাল বন্ধ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থাকল্পে অনুরোধ জানালেও কোন কাজ হচ্ছে না। বিরোধী দলের নেতারা কোন কর্ণপাত করছেন না। তারা তাদের হরতাল ও অবরোধের নামে চালাচ্ছেন সহিংস কর্মকান্ড। এসব সহিংস কর্মকান্ডে দেশবাসী জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এ সব অপরাজনীতির কারণে শিক্ষা ব্যবস্থাসহ গ্রামীণ অর্থনীতি চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ২ ফেব্র“য়ারীর স্থলে ৪ ফেব্র“য়ারী এসএসসি পরীক্ষা শুরুর কথা ঘোষণা করলেও বিরোধীদল আরো ৭২ ঘন্টার হরতাল ঘোষণা দিয়ে প্রমাণ করছে তাদের অপরাজনীতির মুখোশ। ৪ ফেব্র“য়ারী পরীক্ষা কি শুরু হবে? তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল চরম উদ্বিগ্ন।
দেশবাসীর প্রত্যাশা বিরোধীদল কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সময় অন্ততপক্ষে হরতাল প্রত্যাহার করে ১৫ লাখ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথ চলাকে সুগম করার সুযোগ দিক। এটাই সকলের কাম্য।