বিভাগ: সম্পাদকীয়

বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া কোন নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না ——– জেলা ও মহানগর ছাত্রদল

অবৈধভাবে কারা অভ্যন্তরে আদালত স্থানান্তরের এর প্রতিবাদে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করন ও অবিলম্বে নি:শর্ত মুক্তির দাবিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ শনিবার বেলা ২টায় নগরীর মির্জাজাঙ্গাল বিস্তারিত

রোহিঙ্গা হত্যার বিচার

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের যে অভিযোগ উঠেছে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) সে ব্যাপারে একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। মিয়ানমার আইসিসির সদস্য না হওয়ায় আইসিসি দেশটির দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে এক ধরনের সংশয় ছিল। গত বৃহস্পতিবার আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১-এর রায়ে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করে বাংলাদেশে পাঠানোসহ অন্যান্য অভিযোগ আইসিসি তদন্ত করতে পারবেন। রায়ে আইসিসির প্রসিকিউটরকে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে সদস্য নয় এমন কোনো দেশের অপরাধ তদন্তের ব্যাপারে আইসিসি এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশ্বব্যাপী অনেকেই আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সম্প্রতি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর যে ১৩২ জন এমপি আইসিসিতে বিচারের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাঁরাও এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন।
মিয়ানমার অনেক দিন ধরেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে আসছে এবং জোরপূর্বক তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। একইভাবে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত নিলেও বেশির ভাগ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থেকে যায়। কারণ দেশটিতে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকার বা সম্মানজনক বসবাসের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এ অবস্থায় ২০১৭ সালে আবারও দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর বেপরোয়া আক্রমণ চালায়। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ এমন কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধ নেই, যা তারা করেনি। ফলে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বিষয়টি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নানাভাবে এগিয়ে আসে। একই প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিও জোরদার হতে থাকে। মালয়েশিয়াসহ অনেক স্থানেই প্রতীকী বিচারের আয়োজন করা হয় এবং মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু আইসিসির মতো একটি আন্তর্জাতিক আদালতের এমন উদ্যোগ এবারই প্রথম। মিয়ানমার আইসিসিকে যতই অস্বীকার করুক, এই আদালতের রায়ের একটি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মিয়ানমারকে তার ফল ভোগ করতেই হবে।
বাংলাদেশ এখনো দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান আশা করে। কিন্তু এ ব্যাপারে মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে প্রায় এক বছর আগে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে, এখনো প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে সেখানে যেসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল, তার প্রায় কিছুই করা হয়নি। এ অবস্থায় রোহিঙ্গারাও সেখানে যেতে চাইবে না। আর তারা স্বেচ্ছায় যেতে না চাইলে তাদের জোর করেও পাঠানো যাবে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করতেই হবে। আমরা আশা করি, আইসিসির বর্তমান উদ্যোগ মিয়ানমারের সংবিৎ ফেরাবে এবং তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে।

ক্যান্সার শনাক্তকরণ

নানা ধরনের ক্যান্সারে আমাদের দেশে প্রতিবছর বহু মানুষ মারা যায়। মৃত্যুহার বিবেচনায় তা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এর অন্যতম কারণ রোগ যথাসময়ে শনাক্ত না হওয়া। সাধারণত বেশির ভাগ ক্যান্সার প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে চিকিৎসা না হলে পরের ধাপে তা আর নিরাময়যোগ্য থাকে না। যথাসময়ে ক্যান্সার শনাক্ত না হওয়ার মূল কারণ দারিদ্র্য ও অসচেতনতা। রোগ নির্ণয়ের ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই অসুস্থতার প্রথম দিকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করে না। যখন যায় তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। এর ফল হয় অত্যন্ত করুণ। সেই করুণ পরিণতি রোধ করতে এগিয়ে এসেছেন এক দল গবেষক। তাঁরা এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যাতে মাত্র পাঁচ মিনিটে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বলে দেওয়া যাবে, রোগীর ক্যান্সার আছে কি নেই। এতে ব্যয় হবে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। গৌরবের কথা, যে গবেষকরা এই আবিষ্কার সম্পন্ন করেছেন, তাঁরা সবাই বাংলাদেশি এবং গবেষণাটিও সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশেরই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক।
বাংলাদেশ যে এগিয়ে চলেছে, তারই প্রমাণ উন্নততর এসব গবেষণা। এর আগে বাংলাদেশের গবেষকরা পাটের জিনোম আবিষ্কার করেছেন। ধানের নতুন নতুন উন্নততর জাত আবিষ্কারের গবেষণা সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। অন্যান্য ফল, ফসল ও মাছের গবেষণায়ও বাংলাদেশের অনেক সুনাম রয়েছে। আর এসবই সম্ভব হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চতর গবেষণায় সরকারের বর্ধিত সহযোগিতার কারণে। সেই ধারায় এবার সাফল্যের খাতায় যুক্ত হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা। গত বুধবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিলেটের শাবিপ্রবিতে উদ্ভাবিত ক্যান্সার শনাক্তকরণ প্রযুক্তির নানা দিক তুলে ধরা হয়। জানা যায়, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প হেকেপের আওতায় ২০১৬ সালে শাবিপ্রবিতে ‘নন-লিনিয়ার অপটিকস ব্যবহার করে বায়োমার্কার নির্ণয়’ শীর্ষক প্রকল্পটি গৃহীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরিচালিত এই গবেষণা প্রকল্পে শাবিপ্রবির ২৫ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের দিনরাত পরিশ্রমের ফসল এই আবিষ্কার, যা জাতি হিসেবে আমাদের গৌরবান্বিত করছে।
শুধু অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেই কোনো দেশ উন্নত হয় না শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যসহ সব ক্ষেত্রেই সামগ্রিকভাবে দেশটিকে এগিয়ে যেতে হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ধারাবাহিক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা দেশকে সেভাবেই এগিয়ে নিচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা প্রায় ছিলই না। সেখানে ক্রমাগতভাবে বরাদ্দ বাড়িয়ে, অবকাঠামো তৈরি করে এবং সঠিক নীতিকৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার ক্ষেত্রকে অনেক গতিশীল করা হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে এবং উত্তরোত্তর তা আরো বেগবান করতে হবে। শাবিপ্রবির যে গবেষণা আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে, সেই গবেষকদলের সব সদস্যের প্রতি আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন।

অসহনীয় অবস্থায় নারী শ্রমিকরা

বাংলাদেশ উন্নয়নের গতিধারায় সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ের বিভিন্ন সূচকে অর্ধাংশ নারীও সমানতালে ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে সরকারী, বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট পেশা থেকে শুরু করে কৃষি, নির্মাণ প্রকল্প, পোশাক শিল্প কারখানায় নারীর সচেতন কর্মযোগ সামগ্রিক সমৃদ্ধির নিয়ামক। শারীরিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং সামাজিক রক্ষণশীলতার জালে আবদ্ধ নারীদের হরেক রকম বিপত্তি আর বিভ্রান্তির শিকার হতে হয় কর্ম জীবনের উপস্থিত পরিস্থিতিকে সামলাতে গিয়ে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে পেশাগত জীবনে সিংহভাগ নারীই অবহেলা, অপমান আর অবিচারের আবর্তে পড়ে। সামাজিক বিধি নিষেধের কঠোর বেড়াজাল আজ অবধি বহু নারীর চলার পথ নিরাপদ, নির্বিঘœ আর মুক্ত করতে পারেনি। সংসার সামলিয়ে নারীকে তার পেশাগত জীবনের দায়-দায়িত্ব সম্পন্ন করতে হয়। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই চাকরিজীবী। কিন্তু সন্তান পালন থেকে আরম্ভ করে তার শিক্ষা কার্যক্রম ছাড়াও সব ধরনের ঝক্কি ঝামেলা এসে পড়ে মায়ের কাঁধে। পারিবারিক সমস্ত কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যখন কোন নারী তার অফিসের গন্তব্যের দিকে রওনা হয় তখন তাকে নতুন আর এক বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয় সড়ক পরিবহনে। গণপরিবহনে নারীদের দুরবস্থার চিত্র এখন নিত্য সহনীয় অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে। চালক থেকে আরম্ভ করে হেলপারের অসৌজন্যমূলক আচরণে নারী যাত্রী যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে, তা নতুন করে বলার আর কিছুই নেই। তার ওপর যদি পুরুষ সহযাত্রীর রোষানলে পড়ে তাহলে তো ষোলোকলা পূর্ণ হয়।
অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের সম্মানজনক পেশায় নিযুক্ত নারীদের কর্মস্থল অনেকটা শোভন এবং শালীন। কিন্তু নির্মাণ শ্রমিক থেকে শুরু করে পোশাক শিল্পে নিয়োজিত নারী পেশাজীবীদের জীবন যে কত দুর্বিষহ এবং সমস্যায় আবর্তিত তা বলে শেষ করা যায় না। পুরুষ সহকর্মীর কটূক্তি, অশালীন ব্যবহার তার চেয়েও বেশি প্রাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চনার শিকার হওয়া-সব মিলিয়ে এক অসহনীয় অবস্থায় পড়ে নারী শ্রমিকরা। মজুরির বেলায়ও হয় চরম বৈষম্য। তার ওপর আছে শিল্প কারখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, যার সরাসরি প্রভাবে আক্রান্ত হয় নারীরাই বেশি। সেনিটেশন সমস্যা এসব গতরখাটা প্রতিষ্ঠানের নিত্য নৈমিত্তিক দুঃসহ যন্ত্রণা। নারীদের জন্য উপযোগী এবং স্বাস্থ্যসম্মত কোন ওয়াশরুমও থাকে না, যেখানে তারা প্রয়োজনীয় সঙ্কট নিরসন করতে পারে। নিম্ন কর্মজীবী নারী শ্রমিকরা তাদের বক্তব্যে কারখানার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্ট করার দায়ভাগ চাপায় পুরুষ সহকর্মীদের ওপর। তাদের উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য এমনকি অনেক সময় শারীরিকিভাবেও নিগৃহীত হতে হয় পুরুষ সহকর্মী কাছ থেকে। কর্মক্ষেত্রে নারীরা যদি নিশ্চিন্তে, নির্বিঘেœ তাদের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয় তাহলে উন্নয়নের নিরবচ্ছিন্ন গতিধারায় তার প্রভাব দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে না। অবাধ ও মুক্ত পরিবেশে নারীরা তাদের পেশাগত জীবনকে যেন সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ নজর দিতে হবে। কর্মস্থলের পরিবেশ-পরিস্থিতি স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হওয়া একান্ত আবশ্যক।

 

শ্রম আইন যুগোপযোগী হোক

শ্রম আইনকে শ্রমিকবান্ধব করার দাবি অনেক দিনের। দেশের শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো এ দাবি জানিয়ে আসছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনও সরকারকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে। ২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছিল। সেটি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে এসব সংস্থা-সংগঠন আইনটিকে শ্রমিকবান্ধব করার কথা বলে। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৮’-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। দশম সংসদের শেষ অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট বিল পাস করানোর চেষ্টা করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
প্রস্তাবিত খসড়ায় শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য এখন ৩০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন লাগে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ২০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা যাবে। আবেদন পাওয়ার ৫৫ দিনের মধ্যে সরকারকে ট্রেড ইউনিয়ন অনুমোদন করতে হবে। নারী শ্রমিক প্রসূতিকল্যাণ সুবিধাসহ প্রসবের পরে আট সপ্তাহ পর্যন্ত ছুটি পাবে। এ সুবিধা না দিলে মালিককে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। কারখানায় ২৫ জনের বেশি শ্রমিক থাকলে তাদের জন্য পানির ব্যবস্থাসহ খাবার ঘর রাখতে হবে, বিশ্রামের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। শ্রমিকরা ইচ্ছা করলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করে পরে তা উৎসব ছুটির সঙ্গে ভোগ করতে পারবে। উৎসবের ছুটিতে কাজ করালে এক দিনের বিকল্প ছুটিসহ দুই দিনের ‘ক্ষতিপূরণ মজুরি’ দিতে হবে। কোনো শ্রমিককে দিয়ে টানা ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। খসড়ায় শ্রমিকের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আরো কিছু প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিধিবহির্ভূত উপায়ে মালিককে কোনো কিছু মানতে বাধ্য করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। শ্রম আদালতগুলোকে মামলা দায়েরের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে রায় দিতে হবে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে আবশ্যিকভাবে রায় দিতে হবে। আপিল ট্রাইব্যুনালে রায় দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই বিধান। খসড়ায় কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও শ্রমিকের বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি কমানোর কথা বলা হয়েছে। তবে সংশোধিত আইন ইপিজেডের কারখানায় প্রযোজ্য নয়। উল্লেখ্য, বৈঠকে সাংবাদিকরা কেন শ্রম আইনের আওতাভুক্ত, সে প্রশ্নও ওঠে। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
বলা যায়, প্রস্তাবিত খসড়া শ্রমিকবান্ধব; মালিকের স্বার্থও রক্ষা করা হয়েছে। আইনকে যুগোপযোগী করে নেওয়া সুশাসনের লক্ষণ। সরকার সময়োপযোগী কাজই করেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত প্রস্তাবিত খসড়াকে আইনে পরিণত করতে হবে। সরকার সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থে জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই বিল পাসের ব্যবস্থা করবে বলে আমরা আশা করি।

দেশের অগ্রগতিই কাম্য

গত ৩০ ও ৩১ আগষ্ট নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিমসটেক সম্মেলনের নানা বিষয় অবহিত করতে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে লিখিত বক্তব্যে বিমসটেক সম্মেলনের নানা দিক তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য দেন। এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে দেশের সাম্প্রতিক নানা প্রসঙ্গ। একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। সংগত কারণেই এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসব প্রশ্নের খোলামেলা উত্তর দেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল ইতিবাচক। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন তিনি।
চলতি বছরের শেষার্ধেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনেক আগেই বলেছেন, এবারের নির্বাচন হবে সব দলের অংশগ্রহণে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সবারই লক্ষ্য। কিন্তু বিএনপি সম্প্রতি তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের শর্ত হিসেবে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি করেছে। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে দলগুলোরও যে রাজনৈতিক দায়িত্ব আছে, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উচ্চারণ করেছেন, ‘আমরা আর অনির্বাচিত সরকারের হস্তক্ষেপ দেখতে চাই না।’ অন্যদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। একটি পক্ষ ইভিএম ব্যবহারকে দেখছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হিসেবে। অন্যপক্ষ মনে করছে এই যন্ত্রের মাধ্যমে ডিজিটাল জালিয়াতি করা হবে। ইভিএম সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে, তবে তা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমবে বলে আশা করা যায়। দেশের উন্নয়ন ও আগামী দিনের বাংলাদেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, তাতে একজন দূরদর্শী নেতাকে খুঁজে পাওয়া যায়, আগামী ১০০ বছরে বাংলাদেশ কোন পর্যায়ে যেতে পারে, সেই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এর আগে নির্বাচনী ইশতেহারে দিনবদলের সনদ দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত কী করা হবে, দেশকে কোন পর্যায়ে উন্নীত করা হবে তার পরিকল্পনা দেওয়া হচ্ছে। দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ হাতে নেওয়া হচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন তিনি।
সব দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করলে সংবাদ সম্মেলনটি ছিল অনেক পরিপক্ক ও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী এখানে যেমন তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পেরেছেন, তেমনি উন্নত বাংলাদেশের একটি ছবিও তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে তিনি তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

মাদক রোধে গণসচেতনতা

মাদকদ্রব্যের ব্যবসা ও ব্যবহার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশে প্রায় ৭০ লাখ লোক মাদকাসক্ত। তাদের বেশির ভাগ ইয়াবাসেবী। অন্যান্য ধরনের মাদকের ব্যবহারও রয়েছে। যেমন হেরোইন, কোকেন, ফেনসিডিল। মাদকের ব্যবহার থাকতে হলে এর সরবরাহও থাকতে হয়। সরবরাহের প্রায় পুরোটাই চোরাচালানের মাধ্যমে আসে। বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের একটি রুট, সে কথা গণমাধ্যমে বহুবার উল্লিখিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও এ ব্যাপারে অবহিত।
গত শুক্রবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘খাত’ নামের নিউ সাইকোট্রপিক সাবস্টেনসেস (এনপিএস) ক্যাটাগরির মাদকের একটি চালান আটক করা হয়েছে। ‘গ্রিন টি’র প্যাকেটে ভরে পাচার করা হচ্ছিল। গন্তব্য আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। চালানটিতে ৪৬৮ কেজি ‘খাত’ রয়েছে। পরে পাচারকারীর শান্তিনগরের অফিসে তল্লাশি চালিয়ে আরো প্রায় ৪০০ কেজি জব্দ করা হয়। এটি আমাদের দেশে এখনো পরিচিত নয়। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে এর প্রচলন রয়েছে। এ দ্রব্যও যে দেশে প্রচলিত হবে না, সে নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
মাদকের ব্যবসা ও ব্যবহার বন্ধের জন্য অভিযান পরিচালনা করছে সরকার। ‘জিরো টলারেন্স নীতি’প্রসূত এ অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শ লোক নিহত হয়েছে। মাদকের ব্যবসা ও ব্যবহার ঠেকাতে এ জাতীয় কর্মসূচি যথাযথ কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, মাদক একটি বৈশ্বিক সমস্যা, এর সমাধান অবশ্যই কাম্য। তবে যে পদ্ধতিতে মোকাবেলা করা হচ্ছে, তাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এ জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আইন যাতে ঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায় সে জন্য আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে।
মাদক সমস্যার সমাধানে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া দরকার। জনসচেতনতার বিকল্প নেই। জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠান ভূমিকা পালন করতে পারে। এ বিষয়ে ভিন্নধর্মী একটি উদ্যোগ নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। চলতি মাসেই এক দিন এক মিনিটের কর্মসূচি পালন করা হবে ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে ‘মাদককে না’ বলবে মানুষ। অবশ্যই এটি সমর্থনযোগ্য কর্মসূচি। সাংস্কৃতিক প্রচারণা চালানোও জরুরি।
মাদকের চাহিদা, সরবরাহ, চিকিৎসা অনেক দিক বিবেচনা করে সমন্বিত কর্মসূচি নিতে হবে। একক কোনো উপায়ে এ সমস্যার মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশে সরকারি অভিযানে টার্গেট করা হচ্ছে মূলত খুচরা মাদক বিক্রেতাদের। গডফাদাররা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গাঢাকা দেওয়ার ফুরসত পায়। তাই আইনি সমস্যায় পড়তে হয় কর্তৃপক্ষকে, তাদের পেছনে লাগলেও প্রমাণ পাওয়া যায় না। গডফাদারদের কথা সরকার জানে। তাদের হয় শাস্তি দিতে হবে অথবা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর এ কাজটি করতে হলে রাজনৈতিক কপটাচার বন্ধ করতে হবে।

মেধা চর্চার আহবান

জাতীয় শোক দিবসের আলোচনাসভায় ছাত্রলীগকে আদর্শিক সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এমন অভিযোগ হরহামেশাই শোনা যায়। কিছুদিন আগেও ছাত্রলীগের নামে যথেচ্ছাচারের অভিযোগ শোনা গেছে। অথচ এই ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া সংগঠন। দেশের সব রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রলীগ সব সময় নেতৃত্ব দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের রয়েছে উজ্জ্বল ভূমিকা। অথচ গত কয়েক বছরে দেশের ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রলীগের ভূমিকা নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
দেশের ছাত্ররাজনীতি অনেক আগেই বিপথে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আগের দিনে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সম্মানের চোখে দেখা হতো। এই সামাজিক অবস্থান এখন আর আছে বলে মনে হয় না। ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে সবার মধ্যেই একধরনের নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়েছে। এর সংগত কারণও রয়েছে। দেশের ছাত্রসংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলেই তা স্পষ্ট হয়। সরকারি দলের সহযোগী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের দায় সবচেয়ে বেশি। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব আজকের দিনের ছাত্রনেতৃত্বের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে। কাজেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের দায় ও দায়িত্ব অনেক বেশি। নতুন করে উদ্যোগ নিতে পারলে দেশের ছাত্ররাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। অবশ্য ছাত্রলীগের নতুন কমিটির নানা উদ্যোগ এরই মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। সংগঠনের নতুন সাধারণ সম্পাদক সম্প্রতি এক বার্তায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে সাইবার ইউনিট গঠনের কথাও বলা হয়েছে। চলতি মাসেই একটি ট্রাফিক ক্যাম্পেইন করার কথাও ছাত্রলীগ ভাবছে বলে খবরে প্রকাশ। গত ঈদুল আজহার পর কক্সবাজারে বর্জ্য অপসারণের কাজ করে ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এভাবে একের পর এক ভালো কাজের সঙ্গে জড়িত হতে পারলে ছাত্রলীগ যেমন মানুষের মধ্যে স্থায়ী আসন করে নিতে পারবে, তেমনি ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে মানুষের মনে নতুন করে ইতিবাচক ধারণার জন্ম হবে। সংগঠনের অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ইতিবাচক দিক নিয়েই কথা বলেছেন। যে সংগঠনের নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্ম, সেই সংগঠন সম্পর্কে মানুষের মনে নতুন করে ইতিবাচক ধারণা জন্ম দিতে হবে।
ছাত্রলীগের আদর্শ হচ্ছে শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি। শিক্ষার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক ছাত্রলীগের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশে একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ছাত্রলীগ এখন থেকেই কর্মসূচি হাতে নিতে পারে। আগের মতো পাঠচক্র ফিরিয়ে এনে সংগঠনের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত তা ছড়িয়ে দিতে পারে। ক্ষমতা নয়, মেধার চর্চায় মনোনিবেশ করুক ছাত্রলীগ।

 

বন্ধুত্ব সম্পর্ক অব্যাহত থাকুক

বাংলাদেশ ও ভারত, দুই প্রতিবেশী দেশ। দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে উষ্ণ, গভীর ও কার্যকর। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা বর্তমানে দৃশ্যমান, তা অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। দুই দেশের এই সম্পর্ক উত্তরোত্তর আরো এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় আবারও ব্যক্ত করেছেন দুই দেশের দুই প্রধানমন্ত্রী। বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন বা বিমসটেকের চলমান শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে গত বৃহস্পতিবার নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। এতে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয় এবং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এক টুইট বার্তায় নরেন্দ্র মোদি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থেই দুই দেশ একে অপরকে সহযোগিতা করছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন, এক কোটিরও বেশি মানুষকে আশ্রয়দান ও দীর্ঘ ৯ মাস তাদের ভরণপোষণ, ভারতের কয়েক হাজার সৈনিকের প্রাণ উৎসর্গ করা, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন আদায়ে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অক্লান্ত পরিশ্রম কোনো কিছুকেই ছোট করে দেখার উপায় নেই। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের ক্ষমতায় আসে পাকিস্তানি ভাবধারার শাসকরা। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আবার তলানিতে চলে যায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে সেই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এরই মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, গঙ্গার পানিবণ্টন, স্থলসীমান্ত নির্ধারণ ও ছিটমহল বিনিময়সহ দুই দেশের মধ্যকার অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান হয়েছে। তার পরও অনেক সমস্যা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। দীর্ঘ সীমান্তযুক্ত দুই প্রতিবেশীর মধ্যে এমনটাই স্বাভাবিক। সর্বশেষ বৈঠকে তিস্তা চুক্তি নিয়ে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা জানা না গেলেও আমরা আশাবাদী শিগগিরই এই চুক্তিও স্বাক্ষরিত হবে। ট্রানজিট, যৌথ বিদ্যুৎ উৎপাদন, আঞ্চলিক গ্রিড স্থাপনসহ আরো অনেক বিষয়েই দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। আমরা আশা করি, দুই প্রতিবেশী দেশ একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একইভাবে এগিয়ে যাবে।
আঞ্চলিক উন্নয়নে বিমসটেক খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ নেতৃত্বে সার্ক, বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) ও অন্যান্য আঞ্চলিক উদ্যোগ ক্রমেই গতিশীল হচ্ছে। ১৮ দফা কাঠমাণ্ডু ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে বিমসটেক সম্মেলন। এতে বিমসটেকভুক্ত সাতটি দেশের মধ্যে গ্রিড কানেক্টিভিটি প্রতিষ্ঠা এবং ফৌজদারি ও আইনি বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্পর্কিত দুটি এমওইউ সই হয়েছে। আশা করা যায়, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতার এক দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

নির্বাচনে ইভিএম

স্থানীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন তথা ইভিএম পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে; ফল সন্তোষজনক। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহারের কথা কয়েকবার তুলেছে নির্বাচন কমিশন। ক্ষমতাসীন দল এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও অন্যান্য দলের, বিশেষ করে বিএনপির আপত্তি রয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি না হলে ইভিএম নয়, এ কথাই বলেছিল কমিশন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। এখন আবার তোড়জোড় শুরু করেছে কমিশন, যাতে ইভিএমের বিষয়টি নির্বাচনী আইনে (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আরপিও) অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আরপিও সংশোধনের উদ্দেশ্যেই বসেছিল নির্বাচন কমিশন।
ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন হতে পারে। সে বিষয়ক প্রস্তুতির মধ্যেই ইভিএম ব্যবহারের জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচনী আইনে সংশোধনী আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এ উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি। তারা শুরু থেকেই ইভিএম-বিরোধী। ভোট চুরির জন্য ইভিএম ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, দলটির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য এ দাবি করেছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার তাঁরা মানবেন না। আরপিও সংশোধনের চেষ্টা তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিপরীত অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। তারা বরাবর ইভিএমের পক্ষে। দলটির সাধারণ সম্পাদক এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
আগামী নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তো রয়েছেই, খোদ কমিশনেই মতভেদ রয়েছে। ইভিএম ব্যবহার নিয়ে আইন সংশোধনের উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছেন একজন নির্বাচন কমিশনার। আরপিও সংশোধন প্রস্তাববিষয়ক সভা শুরুর আধাঘণ্টার মাথায় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সভা ছেড়ে চলে যান। পরে কর্মচারীর মাধ্যমে তাঁর আপত্তিপত্র (নোট অব ডিসেন্ট) কমিশনে পাঠান। তাঁর অভিমত, স্থানীয় নির্বাচনে ধীরে ধীরে ইভিএম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটা ব্যবহারের জন্য আরপিও সংশোধন সমর্থনযোগ্য নয়। রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং দক্ষ জনবলের অভাবের কথা তিনি আপত্তিপত্রে উল্লেখ করেছেন।
এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ২০১০ সালে ইভিএম চালু করেছিল স্থানীয় নির্বাচনে। তখন বলা হয়েছিল, ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বাড়ানো হবে। এতে অর্থ ও সময়ের সাশ্রয় হবে। ফলও দ্রুত পাওয়া যাবে। ২০১৩ সালের পর এর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান কমিশন নতুন করে উদ্যোগ নেয়। তবে জাতীয় পর্যায়ে ইভিএমের ব্যবহার এখনো হয়নি। প্রযুক্তির যুগে প্রযুক্তিকে দূরে ঠেলে রাখা বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। তবে এর সঙ্গে রাজনীতি জড়িত থাকলে আপত্তি-অনাপত্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে বৈকি। এ প্রযুক্তি নয়ছয় করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন ধারণা আমাদের মতো অনেক দেশেই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পক্ষ-বিপক্ষের অভিমত ও পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।