বিভাগ: ভেতরের পাতা

জননেতা মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজী স্মরণে

v-on‡-এ. জেড. রওশন জেবীন (রুবা)

আজ আমার পিতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী। যদিও তিনি আমার পিতা তবুও তাঁর সম্বন্ধে লিখতে বসে আমাকে অনেক কিছু চিন্তা-ভাবনা করে লিখতে হচ্ছে। তাঁর নামটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে সিলেটের সকল সংগ্রাম আন্দোলন ও ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। আমি যতটুকু পেরেছি বিভিন্ন বই-ইতিহাস পড়ে এবং আমার জানামতে তা শুদ্ধ করে লিখার চেষ্টা করেছি। তারপরও যদি কোন ভুল-ভ্রান্তি আপনারা পেয়ে থাকেন আমাকে বলে দিবেন, মাফ করবেন। এখনও বেঁচে আছেন আমার পিতার অনেক সহযোদ্ধা।
দেওয়ান ফরিদ গাজী ছিলেন হযরত শাহজালাল (রহ.) সহচর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ তাজউদ্দীন কোরেশী (রঃ) বংশধর। ১৯২৪ খৃঃ ১লা মার্চ বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানা দিনারপুর পরগণার দেবপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে। আমার দাদার নাম মরহুম দেওয়ান হামিদ গাজী ও দাদী মোছাম্মত ছলিমা খাতুন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মা-বাবার ২য় সন্তান। আমার আম্মা মরহুমা আলম রওশন চৌধুরী (পুষ্প)। আমার আম্মা ছিলেন ফুলবাড়ী নিবাসী মরহুম আব্দুজ জহির চৌধুরীর মেয়ে, আম্মার নানা ছিলেন দেওয়ান একলিমুর রাজা (মরমী কবি হাছন রাজার ছেলে)। আমার পিতার রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য ও জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা লাভের পিছনে আম্মার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। ১৯৯৫ সালের ৩রা নভেম্বর আমার আম্মা ইন্তেকাল করেন। আমরা ভাই-বোন ৭ জন।
দেওয়ান ফরিদ গাজী একটি সংগ্রামী জীবনের নাম। একটি ইতিহাসের নাম। তিনি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় তাঁর বাবা মারা যান। উনার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন মৌলভীবাজার জুনিয়র মাদ্রাসায়। থাকতেন মোস্তফাপুর উনার আত্মীয়ের বাসায়। কৃতি ছাত্র হিসেবে বৃত্তিও লাভ করেন। পরে সিলেটে এসে সরকারী আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। কিছু দিন সেখানে লেখাপড়া করে মাদ্রাসা শিক্ষা পরিবর্তন করে ভর্তি হন রসময় মেমোরিয়াল হাই স্কুলে। রসময় থেকে ১৯৪৫ সালে কৃতিত্বের সাথে পাস করেন মেট্রিক পরীক্ষা। ভর্তি হন এম.সি. কলেজে (তখন কলকাতার অধীনে ছিল)। সেখান থেকে আই.এ. পাস করেন। তারপর ভর্তি হন মদন মোহন কলেজ, সিলেটে (তখন ঢাকা ভার্সিটির অধীনে)। সেখান থেকে বি.এ. পাস করেন। যদিও জমিদার পরিবারে জন্ম, তবুও জন্মের পর দেখেছেন আপন সমাজ ও দেশের পশ্চাৎপদতা দারিদ্র, হতাশায় নিমজ্জিত, শোষিত, নিপীড়িত মানুষের  বঞ্চনা ও বেদনার করুণচিত্র। তিনি ভোগ ত্যাগ করে জমিদারের আভিজাত্য ছেড়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাদের অধিকার আদায় করতে গিয়ে দেশ, জাতি ও সমাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনে অতি অল্প বয়সে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
১৯৪২ খৃঃ দেওয়ান ফরিদ গাজী যখন স্কুলের ছাত্র তখন থেকেই ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের মাধ্যমে কংগ্রেসের সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট কংগ্রেস’ এর সাথে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে এম.সি কলেজে পড়া অবস্থায় শুরু হয় তাঁর ছাত্র রাজনীতির জীবন। মুসলিমলীগের অংগসংগঠন আসাম মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন গঠিত হলে দেওয়ান ফরিদ গাজী আসাম প্রাদেশিক শাখার সহ-সম্পাদক এবং এম.সি. কলেজ শাখার সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময়ের আরো ছাত্রনেতারা ছিলেন মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ, তছদ্দুক আহমদ চৌধুরী, এ.টি.এম. মাসুদ, পীর হাবিবুর রহমান প্রমুখ নেতাগণ। মৌলানা ভাসানীর আহ্বানে আসামে বাঙাল খেদাও অভিযানের প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই গাজী সাহেবের প্রতিবাদী রাজনৈতিক জীবনের শুরু।
১৯৪৬ সালে আসামের গোয়ালপাড়া শহরে আসাম মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের এক বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট জেলা ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি এ সম্মেলনে যোগদান করেন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। ১৯৪৬ খৃঃ নয়াসড়ক জামে মসজিদে সিলেটের সংগ্রামী মুসলিম ছাত্রজনতা ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সমর্থকদের মাঝে এক তুমুল সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে তখনকার ছাত্রনেতা ফরিদ গাজী মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হন এবং বেশ কিছুদিন লাগে সুস্থ হতে।
১৯৪৭ সালে সিলেটে গণভোটের সময় ছাত্রনেতা ফরিদ গাজী এডভোকেট আব্দুল হাফিজ সাহেবের (আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রীর পিতা) একখানা চিঠি  নিয়ে শিলং যান আসাম মুসলিমলীগ নেতা ও আসাম প্রাদেশিক সরকারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী স্যার মোহাম্মদ সাদুল্লাহর কাছে। স্যার সাদুল্লাহ নিজস্ব তহবিল থেকে গণভোটের আর্থিক অনুদান নগদ ২০ হাজার টাকা ও একটা চিঠি দেন গাজী সাহেবের কাছে। শিলং থেকে ফেরার পথে সারী নদীতে ফেরি নৌকা পাহাড়ী ঢলে ভেসে আসা একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। তিনি নদীর তীব্র স্রোতে ভাসতে ভাসতে অনেক দূর গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকেন। তখন চ.ড.উ এর উদ্ধারকারী দল তাঁকে উদ্ধার করে আনে এবং হরিপুর ডাকবাংলাতে উনার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে তিনি টাকা ও চিঠি খুঁজতে থাকেন। কোটের ভেতরের পকেটে একটি ছোট ব্যাগে টাকা ও চিঠি যেভাবে ছিল সেভাবেই আছে দেখে তিনি আল্লাহ্র কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। এই ২০ হাজার টাকা এখনকার ২০ লাখ টাকা। পরের দিন সুস্থ হয়ে শহরে পৌঁছে টাকা ও চিঠি আব্দুল হাফিজ সাহেবের কাছে দিলেন। গাজী সাহেবের দুর্ঘটনা ও দুঃসাহসিক অভিযাত্রার কথা শুনে সবাই অবাক হলেন। এমনি ভাবে দেশপ্রেমিক, নির্ভিক ছাত্রনেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু। ১৯৪৭ সালে গণভোটে দেওয়ান ফরিদ গাজী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুসলিমলীগ ও মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের নেতাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৪৭ সনে ৬ই এবং ৭ই জুলাই অনুষ্ঠিত গণভোটে জয়লাভ করে সিলেট জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। গণভোটের সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ রাজনৈতিক নেতারা সিলেটে আসেন এবং তাঁদের সাথে ফরিদ গাজী ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত হন। একজন উদীয়মান, দক্ষ ছাত্রনেতা হিসেবে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বঙ্গবন্ধু যখন সিলেট আসেন অন্যান্য নেতাদের সাথে তখন তিনি ছিলেন ছাত্রনেতা ইসলামিয়া কলেজ, কোলকাতা ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। ঐ সময় বঙ্গবন্ধু ও দেওয়ান ফরিদ গাজীর পরিচয় হয়। এই তরুণ ছাত্রনেতার কর্তব্যনিষ্ঠা, অসীম সাহস, অমায়িক ব্যবহার ও বিচক্ষণতা বঙ্গবন্ধুকে আকৃষ্ট করে এবং তিনি হয়ে যান বঙ্গবন্ধুর প্রিয়পাত্র ও ঘনিষ্ঠ সহচর। কলকাতা থেকে আগত ছাত্রনেতারা থাকতেন শিবগঞ্জ সোনারপাড়া বখতিয়ার বিবি বালিকা বিদ্যালয়ে। নির্বাচনী কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে গাজী সাহেবের উপর বখতিয়ার বিবি বালিকা বিদ্যালয়ে মুসলিম ছাত্রনেতাদের দেখাশুনার দায়িত্ব অর্পিত হয়। তাই গাজী সাহেব প্রায় সব সময়ই থাকতেন শেখ সাহেবের সাথে। ফলে গাজী সাহেব শেখ সাহেবের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু কিন্তু সে স্কুলটির কথা স্মরণ রেখেছিলেন এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে স্কুলটির জন্য অনুদানও দিয়েছিলেন।
১৯৫০ খৃঃ হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। সে সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক স্বল্পতা দেখা দিলে তিনি কিছুদিন সিলেট গভঃমেন্ট হাই স্কুলে এবং রসময় স্কুলে শিক্ষকতাও করেন। ১৯৫২ইং থেকে ১৯৫৫ইং পর্যন্ত তিনি সিলেটের প্রাচীনতম ‘সাপ্তাহিক যুগভেরী’ পত্রিকার পাশাপাশি ইংরেজী পত্রিকা ‘ইস্টার্ন হেরাল্ড’ এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন  করেন। রাজনীতি, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা- তিনটি অঙ্গনে তিনি একসাথে বিচরণ করেছেন এক সময়। (চলবে)

ইভটিজিং এর কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

মহান আল্লাহ এক মানব আদম (আ.) থেকে তার স্ত্রী, অতঃপর এতদুভয় হতে সমগ্র মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। সৃৃষ্টজীব হিসেবে যেমন রয়েছে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা; তেমনি আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য ইত্যাদি দিক থেকেও রয়েছে নারী-পুরুষের সাম্য। মায়ের জাতি নারী সমাজ আজ সমাজের নানা প্রান্তে নানা প্রকার অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত। নারীজাতি তথাকথিত আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামী বিধান বাদ দিয়ে অপসংস্কৃতি চর্চায় উদগ্রীব; যার ফলশ্র“তিতে আইয়ামে জাহেলিয়্যাতের ন্যায় এ দেশের নারী সমাজ আজও পদে পদে নির্যাতিত হচ্ছে। ইভটিজিং হলো নারী নির্যাতনের একটি আধুনিক সংস্করণ। ইভটিজিং কী? এর উৎপত্তি এবং এ বিষয়ে দেশীয় ও ইসলামী আইনের তুলনামূলক পর্যালোচনাপূর্বক ইসলামী আইনের উপযোগিতা তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ইভটিজিং একটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা। যা অন্য সকল অপরাধকে হার মানিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা সংস্কৃতি, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে চরিত্রহনন, বিভিন্ন দিবস পালনের নামে তরুণ-তরুণীদের অবাধ উন্মাদনা, আধুনিক পোষাকের নামে উলঙ্গপনা, ফেইসবুকে তরুণ-তরুণীদের অবাধ হৃদয় বন্ধন ইত্যাদি নানাবিধ অনৈতিক কাজের ফলাফল স্বরূপই আজকের সমাজে নেমে এসেছে ভয়াল ইভটিজিং। ইভটিজিং আইন, সমাজ, রাষ্ট্র কারো দ্বারাই প্রতিরোধ সম্ভব হচ্ছে না। মুসলিম সমাজে নৈতিক মূল্যবোধকে পাশ কাটিয়ে ইভটিজিং ঠেকানোও সম্ভব নয়। তাই আজকের সমাজে ইভটিজিং থেকে বাঁচতে হলে ইসলামী অনুশাসন ও এর আইনী ব্যবস্থা মেনে চলা অপরিহার্য। কেননা একমাত্র ইসলামী অনুশাসনই হতে পারে ইভটিজিং প্রতিরোধের সর্বোত্তম পন্থা। ইভটিজিং এর পরিচিতি, এর সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যয়সমূহ, ইভটিজিং প্রতিরোধে দেশীয় ও ইসলামী আইন সমূহ, সর্বোপরি ইভটিজিং প্রতিরোধে একটি সুপারিশমালা পেশ করাই এ প্রবন্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
ইভটিজিং বলতে কী বুঝায়? ইভটিজিং শব্দটি যৌন হয়রানির একটি অমার্জিত (ংষধহম) ভাষা। ইভ (ঊাব) দ্বার বাইবেলে বর্ণিত প্রথম নারী হাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। “অফধস হধসবফ যরং রিভব ঊাব, নবপধঁংব ংযব ড়িঁষফ নবপড়সব ঃযব সড়ঃযবৎ ড়ভ ধষষ ঃযব ষরারহম. (ঞযব ঐড়ষু ইরনষব, এবহবংরং, ৩:২০)” আর ইভটিজিং (ঞবধংরহম) বলতে ঠাট্টা করা, বিরক্ত করা, বিব্রত করা ইত্যাদি বুঝায়। “ঊফরঃড়ৎরষ ইড়ধৎফ, ইৎরঃধহহরপধ, টঝঅ, ঊহপুপষড়ঢ়ধবফরধ ইৎরঃধহহরপধ, ওহপ, ১৭৬৮,ঠড়ষ.৫,ঢ়.১১৯” সুতরাং ইভটিজিং (ঊাবঃবধংরহম) বলতে নারীর প্রতি বিব্রতকর, লজ্জাকর, নিপীড়নমূলক যে কোনো আচরণ বুঝায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ শব্দটি (ঝবীঁধষ ঐধৎধংংসবহঃ) এর পতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত। ১৯৯৯ সালে সাংবাদিক সুসান ব্রাউন মিলার সর্বপ্রথম (ঝবীঁধষ ঐধৎধংংসবহঃ) শব্দটি ব্যবহার করেন। “ঝঁংধহ ইৎড়হি সরষষবৎ, রহ ড়ঁৎ ঃরসব; সবসড়রৎ ড়ভ ধ জবাড়ষঁঃরড়হ, ঘবি ুড়ৎশ, উরধষ ঢ়ৎরংং, ১৯৯৯. উক্ত গ্রন্থেও ভূমিকায় উল্লেখ আছে, ঞযবৎব ড়হপব ধিং ধ ঃরসব যিবহ ঃযব পড়হপবঢ়ঃ ড়ভ বয়ঁধষ ঢ়ধু ভড়ৎ বয়ঁধষ ড়িৎশ ফরফ হড়ঃ বীরংঃ, যিবহ ড়িসবহ ড়ভ ধষষ ধমবং বিৎব “মরৎষং,” যিবহ ধনড়ৎঃরড়হ ধিং ধ নধপশ-ধষষবু ঢ়ৎড়পবফঁৎব, যিবহ ঃযবৎব ধিং হড় ংঁপয ঃযরহম ধং ধ ৎধঢ়ব পৎরংরং পবহঃবৎ ড়ৎ ধ ংযবষঃবৎ ভড়ৎ নধঃঃবৎবফ ড়িসবহ, “ংবীঁধষ যধৎধংংসবহঃ” যধফ হড়ঃ ুবঃ নববহ হধসবফ ধহফ ফবভরহবফ.
পরিভাষায় ইভটিজিং একটি ব্যাপকার্থক পরিভাষা, যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো- হাইকোর্ট বিভাগের রায় অনুসারে ইভটিজিং (যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন) বলতে বুঝায়: শারীরিক ম্পর্শের মত অপ্রত্যাশিত যৌনকাক্সক্ষামূলক ব্যবহার। প্রশাসনিক, কর্তৃত্বমূূলক অথবা পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উদ্বেগ বা চেষ্টা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষাগত আচরণ, যৌন সম্পর্কের দাবি বা অনুরোধ, পর্ণোগ্রাফি প্রদর্শন, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি। অশালীন অঙ্গভঙ্গি, অশালীন ভাষায় প্রয়োগসহ যৌন কামনা থেকে হয়রানি। চিঠি, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, এসএমএস, পোষ্টার, নোটিশ, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল, নোটিশ বোর্ড, দেয়ালে লিখনের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা। ব্ল্যাকমেইলিং এবং চরিত্র হনন-এর উদ্দেশ্য স্থির বা ভিডিও চিত্র ধারণ। লিঙ্গীয় ধারণা থেকে বা যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে শিক্ষা, খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতায় বাধা প্রদান। প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া এবং প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণে চাপ সৃষ্টি ও হুমকি প্রদান। মিথ্যা আশ্বাস, প্রলোভন বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা। “২০০৮ সালে যৌন হয়রানি রোধে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক রীট আবেদনের  প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের  ১৪ই মে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নরোধের লক্ষ্যে দিক নির্দেশনা প্রদানপূর্বক নির্দেশনাবলী জারি করেন।
এ. এফ. সোলায়মান চৌধুরী বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে আরেক ব্যক্তি সভ্যতা, ভদ্রতা ও নীতি নৈতিকতা জলাঞ্জলি দিয়ে অশালীন ও আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি বা বাক্য প্রয়োগ করার একটি মারাত্মক রূপ ইভটিজিং। “উপ-সম্পাদকীয় কলাম, ইভটিজিং আপন বেঁধে রাখি, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ঢাকা, ৬ নভেম্বর ২০১০।
সর্বোপরি ইভটিজিং হলো ব্যক্তি চরিত্রের নগ্ন রূপের এক চরম বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ আচরণ, যা শারীরিক নির্যাতন, “পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ (২০১০ সালের ৫৮নং আইন) এর ‘৩’ নং ধারার ‘ক’ নং উপধারা: “শারীরিক নির্যাতন” অর্থে এমন কোন কাজ বা আচরণ করা, যাহা দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা শারীরের কোন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হইবার সম্ভাবনা থাকে এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে অপরাধমূলক অপরাধমূলক কাজ করিতে বাধ্য করা বা প্ররোচণা প্রদান করা বা বলপ্রয়োগও ইহার অন্তর্ভূক্ত হইবে”, মানসিক নির্যাতন “প্রাগুক্ত, ‘৩’ নং ধারার ‘খ’ নং উপধারাা: “মানসিক নির্যাতন” অর্থে নিম্নবর্ণিত বিষয়সমূহও অন্তর্ভূক্ত হইবে, যথাঃ (অ) মৌখিক নির্যাতন, অপমান, অবজ্ঞা, ভীতি প্রদর্শন বা এমন কোন উক্তি করা, যাহা দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি-মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; (আ) হয়রানি; অথবা (ই) ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অর্থাৎ স্বাভাবিক চলাচল, যোগাযোগ বা ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা মতামত প্রকাশের উপর হস্তক্ষেপ, যৌন নির্যাতন “প্রাগুক্ত, ‘৩’ নং ধারার ‘গ’ নং উপধারা: “যৌন নির্যাতন” অর্থে যৌন প্রকৃতির এমন আচরণও অন্তর্ভূক্ত হইবে, যাহা দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সম্ভ্রম, সম্মান বা সুনামের ক্ষতি হয়’’, নারী নির্যাতন “জাতিসংঘ কতৃক ঘোষিত (১৯৯৩-এর ডিসেম্বর) নারী নির্যাতন বিষয়ক ঘোষণার (উবপষধৎধঃরড়হ ড়হ ঠঅড) এর ধারা (১) : এই ঘোষণা মতে নারী নির্যাতন বলতে বুঝাবে সেই ধরনের জেন্ডারভিত্তিক সহিংস আচরণ যাতে নারীর শারীরিক মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি ও দুঃখ কষ্টের কারণ হবে এবং যাতে কোনো নারীর ব্যক্তিগত ও বাইরের জীবনে নিষ্ঠুরভাবে কোনো স্বাধীনতায় আঘাত ও বাধা সৃষ্টি করে”, মানহানি “বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৪৯৯ ধারা “মানহানি (উবভভধসধঃরড়হ) : যদি কোন ব্যক্তি জেনে বা ইচ্ছাকৃতভাবে অপর কোন ব্যক্তির নিন্দাবাদ প্রণয়ন করে কিংবা সুনাম নষ্ট করার জন্য কোন কার্য করে, তবে সেই ব্যক্তি উক্ত অপর ব্যক্তির মানাহানি করেছে বলে গণ্য হবে।’’ ইসলামী আইনে মানহানি বলতে : মিথ্যা রটনা, ভুল ধারণা, বিদ্রƒপ করা, হেয় প্রতিপন্ন করা ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। মানহানি সম্পর্কে মনাহানি সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের কতিপয় আয়াত, ৪৯ (আল-হুজরাত) : ৬,১১-১২. ২৪ (আন-নূর) : ০৪, ১৭ (আল-ইসরা) : ৩৬, ১০৪ (আল-হুমাযাহ) : ০১। (তারেক মোহাম্মদ জায়েদ ও শহীদুল ইসলাম, প্রচলিত ও ইসলামী আইনে মানহানি : এক তুলনামূলক বিশ্লেষণ, ইসলামী আইন ও বিচার, বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ এন্ড লিগেল এইড সেন্টার, বর্ষ: সংখ্যা: ২৩, জুলাই-সেপ্টেম্বর: ২০১০, পৃ. ১২৯-১৪৭” ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করে যা ফৌজদারী কার্যবিধি “ফৌজদারী কার্যাবলী’’ ঈড়ফব ড়ভ পৎরসরহধষ ঢ়ৎড়পবফঁৎব, ১৮৯৮ (অপঃ ৫ ড়ভ ১৮৯৮)”  অর্থ, মোতাবেক অপরাধ বলে গণ্য, যা শিশু, “শিশু’’ আঠারো বৎসর পূর্ণ হয় নাই এমন কোন ব্যক্তি। (পরিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ (২০১০ সালের ৫৮ নং আইন) এর ‘২’ নং ধারার ‘১৮’নং উপধারা)। ইসলামী দৃষ্টিকোণে “শিশু” হলো, ১৪/১৫ বৎসরের পূর্ব পর্যন্ত। (মুহাম্মদ মাকসুদুর রহমান, ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুর বয়স-সীমা: সমস্যা ও সমাধান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বর্ষ: ৪৮, সংখ্যা: ৪র্থ, এপ্রিল-জুন: ২০০৯, পৃ. ১৯৫)” সাবালক, “বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী অন্য সব ব্যক্তি (১ম অনুচ্ছেদেও অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিগণ ব্যতীত) আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার পর সাবালকত্ব লাভ করেছে মর্মে গণ্য হবে এবং তদ্পূর্বে নয়। (সাবালকত্ব আইন, ১৮৭৫ (১৮৭৫ সালের ৯নং আইন) এর ‘৩’ নং ধারার ২য় অনুচ্ছে)”, সকল শ্রেণীর নারীর প্রতি হতে পারে।
উত্যক্ত করা ও মানহানি করা অর্থে পবিত্র কোরআনে ইভটিজিং শব্দের ব্যবহার হয়েছে। মহান আল্লাহর বাণী: হে নবী! আপনি আপনার পতœীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে (পর্দানশীন হিসেবে) চিনতে পারা যায় ও এর ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। “আল-কোরআন, ৩৩ : ৫৯”। এছাড়া কুরআনে একে অপবাদ নামের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে- এরা সতী-সধ্বী, সরলমনা নারীদের প্রতি অপবাদ দেয়, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। “আল-কুরআন, ২৪ : ২৩”
সুতরাং বুঝা যায় যে, ইভটিজিং মূলত মানুষের একটি বিকৃত আচরণ ও অনৈতিক কর্ম। যার সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য সমাধান দেয়া হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কোরআন ও আল-হাদীসে।
ইভটিজিং-এর ধরণ ও এর অন্তর্ভুক্ত কাজ ঃ ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি, সমাজে নানাভাবে-নানারূপে ইভটিজিং লক্ষণীয়।
ক. বাচনিক কার্যাবলী: অশালীন মন্তব্য, শিস বাজানো, যৌন আবেদনময়ী গান, হুমকি প্রদান, যৌন সম্পর্কের আবেদন, প্রস্তাব, অনভিপ্রেত বিয়ের প্রস্তাব। খ. অবাচনিক কার্যাবলী : লোলপ চাহনি, উস্কানিমূলক তালি, কুরুচিপূর্ণ ছবি প্রদর্শন, কমোদ্দীপক গানবাজনা, অশুভ ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টি, পিছু নেয়া, মোবাইলে কুরুচিপূর্ণ ম্যাসেজ দেয়া, মিসকল দেয়া, ভষরহম শরংং (উড়ন্ত চুমু), চলার পথে বাধা দান, ই-মেইল কুরুচিপূর্ণ ম্যাসেজ দেয়া ইত্যাদি। গ. শারীরিক কার্যাবলী : ঘাড় ও কাঁধে হাত দেয়া, গা ঘেঁষে দাঁড়ানো, জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া, শরীরে ধাক্কা দেওয়া, ব্লাকমেইল করার অভিপ্রায়ে চিত্র ধারণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইভটিজিং ঃ ইভটিজিং বর্তমান সময়ে একটি মারাত্মক সমস্যা। যার ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের পারিবারিক, সামাজিক সহ সকল ক্ষেত্রকে আক্রান্ত করছে। বাংলাদেশে সংঘটিত ‘ইভটিজিং’ এর একটি সমীক্ষা নিম্নে প্রদান করা হলো:
* পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, গত এক বছরে ইভটিজিং এর অপরাধে মামলা হয়েছে ১০৫টি, জিডি ৩৩৭টি, থানায় অভিযোগ ১২৯৬ জনের বিরুদ্ধে। গ্রেফতার হয়েছে মাত্র ৫২০ জন। ‘‘দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ অক্টোবর ২০১০, পৃ. ০৯”
* জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির গবেষণা অনুযায়ী ২০০৯ সালে ৭ মেয়ে বখাটেদের উৎপাতে আত্মহত্যা করে। আর ২০১০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫তে এবং মোট ইভটিজিং এর প্রত্যক্ষ শিকার হয় ৫২ জন। “প্রাগুক্ত”
* বিভাগভিত্তিক কয়েক মাসের ইভটিজিং এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়; রাজশাহীতে ১৩টি মামলা, সিলেটে ১৮টি মামলা, বরিশালে ২৭টি মামলা, ৪টি জিডি, রংপুরে ৫টি মামলা, চট্রগ্রামে ২৩৭টি ইভটিজিং এর ঘটনা ঘটে। “প্রাগুক্ত”
ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে এখন আক্রমণের শিকার হচ্ছে অভিভাবক। যেমন: নাটোরের মিজনুর রহমান, ফরিদপুরের চাঁপা রাণী ভৌমিক। এমতাবস্থায় দেশব্যাপী ইভটিজিং এর প্রতিরোধ সভা, সেমিনার, প্রবন্ধ রচনা, আইন প্রণয়ন, মিছিল, মানব বন্ধনসহ নানা আয়োজন চলছে।
ইভটিজিং এর কারণ ঃ ইভটিজিং একটি অপরাধ, এ অপরাধের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অপরাধ সংগঠনের পেছনে স্থান-কাল, অবস্থান, ব্যক্তির মূল্যবোধ ইত্যাদি জড়িত। ইভটিজিং সংগঠনের কারণগুলোর অন্যতম কয়েকটি হলো- ১. স্বভাবজাত ঝোঁক, ২. ইসলামী শিক্ষার অভাব, ৩. ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি উদাসীনতা, ৪. অশালীন পোশাক , ৫. মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি, ৬. পারিবারিক শিক্ষার অভাব, ৭. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ৮. অপসংস্কৃতির প্রভাব, ৯. আইন ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, ১০. নেশা ও মাদকতা, ১১. বেকারত্ব, ১২ . সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকা, “মুহাম্মদ আমিনুল হক, ইভটিজিং ১৩. তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার, ১৪. পারিবারিক শৃংখলার অভাব, ১৫. হতাশাব্যঞ্জক জীবন, ১৬. সুস্থ বিনোদনের অভাব , ১৭, প্রশাসনিক অবহেলা, ১৮. অর্থ-সামাজিক কর্মকান্ড, ১৯. একে অপরের প্রতি মর্যাদা ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব। “নাজনীন আখতার, ইভটিজিং-১, দৈনিক জনকণ্ঠ, ঢাক, ২৯মে ২০১০, পৃ. ১” ২১. মিডিয়ায় অশ্লীলতা, ২২. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ২৩. মাতা-পিতার অবাধ্যতা, ২৪. নৈতিক অবক্ষয়, ২৫. যথাযথ আইনের অভাব, ২৬. আইনের প্রয়োগ না থাকা, ২৭. নারীর প্রতি সমাজের (পুরুষদের) নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, ২৮. রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মধ্যে বৈষম্যমূলক সম্পর্ক, ২৯. পর্ণোগ্রাফির ব্যাপক ছড়াছড়ি এবং ৩০. মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি।
ইভটিজিং সম্পর্কিত বাংলাদেশের আইন
বাংলাদেশে ইভটিজিং সম্পর্কিত অনেক আইন রয়েছে। নিম্নে প্রচলিত কয়েকটি আইনের ধারা উল্লেখ করা হলো,
* নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, ধারা: ১০।
“যৌন পীড়ন, ইত্যাদি দন্ড। যদি কোন ব্যক্তি অবৈধভাবে তাহার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তাহার শরীরের যে কোন অঙ্গ বা কোন বস্তু দ্বারা কোন নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোন অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোন নারীর শ্লীলতাহানি করেন তাহা হইলে এই কাজ হইবে যৌন পীড়ন এবং তজ্জন্য উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন তিন বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।” “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশেধন) আইন, ২০০৩ (২০০৩ সনের ৩০ নং আইন) এর ধারা ৫ বলে নতুন ধারা ১০ প্রতিস্থাপিত”
* নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০০৩, ধারা: ১০।
“নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা, ইত্যাদিও শাস্তি। কোন নারীর সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত (ডরষৎঁষ) কোন কার্য দ্বারা সম্ভ্রমহানি হইবার প্রত্যক্ষ কারণে কোন নারী আত্মহত্যা করিলে উক্ত ব্যক্তি উক্ত নারীকে অনুরূপ কার্য দ্বারা আত্মহত্যা করিতে প্ররোচিত করিবার অপরাধে অপরাধী হইবেন এবং উক্ত অপরাধের জন্য তিনি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।” “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০০৩ (২০০৩ সনের ৩০নং আইন) এর ধারা ৪ বলে নতুন ধারা ৯ক প্রতিস্থাপিত। উল্লেখ্য ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০(২) ধারায় যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞায় অন্যান্য বিষয়ের সাথে (অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি’ শব্দটি ২০০৩ সালের সংশোধনীতে বাদ দেয়া হয়েছে।
* বাংলাদেশে দ-বিধি ১৮৬০ (সংশোধিত) ২০০৪ এর ২৯০, ২৯৪, ৩৫৪, ৫০৯ ধারা।
* ঢাকা মেট্রোপলিটন পুুলিশ অধ্যাদেশ, ০৯৭৬ ধারা: ৭৬।
* গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছেদেও ২নং ধারা।
“রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। “এছড়াও সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১০, ১৯-১,২, ২৭ ২৮-১,২,৩, ২৯-১,২-ধারাগুলো দ্বারা নারী পুরুষের সমতা বিধানের কথা ঘোষণার দ্বারা ইভটিজিং এর প্রতি আইনগত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে” এদেশের অধিকাংশ মানুষ ইভটিজিং প্রতিরোধে এসব আইন সম্পর্কে জানেন না। “সারনি-১ দেখুন” সুতরাং তাদরকে এসব আইন সম্পর্কে জানাতে এবং আইনের সুফল ভোগ করতে সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী।
ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন ঃ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবধর্মী যুগোপযোগী জীবন ব্যবস্থা। জীবনের প্রতিটি দিকের সমাধান এ ধর্মে ব্যবস্থা থেকে পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, আমি এ কুরআনকে সকল কিছুর সমাধান স্বরূপ নাযিল করেছি। “আল-কুরআন, ১৬: ৮৯”। এমতাবস্থায় ইসলামী অনুশাসন অনুযায়ী ইভটিজিং প্রতিরোধের কারণসমূহের সাথে ইসলামী আইনের কতটুকু সামঞ্জস্য রয়েছে তা আলোচনা করা যায়-
দৃষ্টিশক্তির হেফাজত ঃ ইভটিজিং এর পেছনে সবচেয়ে ক্ষতিকর যে কারণ তা হল: অবাধ দৃষ্টি প্রয়োগ। ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলাম বর্ণিত দৃষ্টি সম্পর্কিত ফৌজদারী আইনের অনুশীলন জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, (হে রাসূল) ঈমানদার পুরুষদেরকে বলুন, তার যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে। “আল-কুরআন, ২৪: ৩০”
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেন, (অসংযত) দৃষ্টি হচ্ছে ইবলিসের বিষাক্ত তীরগুলো থেকে একটি তীর। যে ব্যক্তি আমাকে ভয় করে তা ত্যাগ করবে, আমি তার বদলে তাকে এমন ঈমান দান করবো, যার স্বাদ সে নিজের হৃদয়ে অনুভব করবে। “সুলায়মান বিন আহমদ বিন আয়ুব তাবরানী, আল-মুজামুল ওয়াসীত, কায়রো: দারুল হারামাইন, তাবি, হাদীস নং: ১০৩৬২”। পূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি, দৃষ্টিশক্তির অবাধ নিয়ন্ত্রণহীনতার ফলেই ইভটিজিং ঘটছে। সুতরাং ইভটিজিং বন্ধে ইসলাম প্রদর্শিত পন্থায় দৃৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সতর ঢেকে রাস্তায় চলাচল ঃ সতর না ঢেকে উগ্র, অর্ধ উলঙ্গ চলাচলের প্রভাবে সমাজের যুবকদের সুপ্ত যৌন আকাঙ্খা উস্কে দেয়া হয়। যার প্রভাবে ইভটিজিং এর মতো অনৈতিক কর্মকান্ডের উদ্ভব হয়। সুতরাং ইভটিজিং প্রতিরোধে শালীন পোশাক পরিচ্ছদের অনুশীলন জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, যে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জস্থানকে আবৃত করে রাখবে এবং যা হবে ভূষণ। আর পরহেযগারীর, পোশাক এটি সর্বোত্তম। “আল-কুরআন,৭: ২৬”। সতরের সীমারেখা সম্পর্কে হাদীসের বাণী, আম্র বিন শুআইব রা . সূত্রে বর্ণিত, তিনি রাসূলূল্লাহ সা. থেকে বর্ণনা করেন , নিশ্চয় পুরুষের সতর হলো নাভি ও হাঁটুর মধ্যবর্তী স্থান। “সুলায়মান বিন আহমদ বিন আয়ুব তাবরানী, আল-মুজামুল সাগীর, বৈরূত: কুতুবুল ইসলামিয়্যা, ১৪০৫ হি., হাদীস নং: ৩২২”। আল্লহ তাআলার বাণী, “তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে যা এমনিতেই প্রকাশিত হয়ে যায়। “আল-কোরআন, ২৪: ৩১” আয়তে ‘যা এমনিতেই প্রকাশিত হয়ে যায়’ দ্বারা অধিকাংশ ইমামের মতে- মুখম-ল, হতের তালু ও বহিরাবরণকে বোঝানো হয়েছে। “ইবনু আব্বাস (রা.) মুজাহিদ ও ‘আতা (রা.) ঊলেন, “এর অর্থ হচ্ছে চেহারা ও হাতের তুলুতে ব্যবহৃত রং ও সুরমা। ইবনু উমর ও আনস (রা.) প্রমুখ থেকেও বর্ণিত রয়েছে। ইবনু আব্বাস (রা.)-এর অন্য বর্ণনায় রয়েছে, এর অর্থ হলো- হাতের তালু, চেহারা ও আংটি। আবু বকর আল- জাস্সাস, আহকামুল করআন বৈরুত: দারু ইহয়িয়া আত তুরাসিল আরাবী, ১৪০৫ হি., খ. ৫, পৃ. ১৭২”
সর্বোপরি নারীর সতর সম্পর্কে কতিপয় আলিমের মতভেদ থাকা সত্ত্বেও পরপরুষের সামনে বিনা প্রয়োজনে চেহারা খোলা রাখা নিষিদ্ধ হবার ব্যাপারে সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেছেন। সুতরাং প্রতিটি নারীর জন্য উচিত হবে, রাস্তায় চলাচল অথবা মাহরাম ব্যতীত অন্য কারো সামনে যেতে হলে অবশ্যই দেহ আবৃত রাখা। পর্দা সংক্রান্ত সূরা আহযাব ও সূরা নূরের সবগুলো আয়াত অধ্যয়ন করলে এবং সাহাবায়ে কিরামের আমল পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, পরপুরুষের ক্ষেত্রে মহিলাদের মুখমন্ডলও সতরের অন্তর্ভূক্ত হবে। মহিলাদের মুখমন্ডলের গুরুত্ব সম্পর্কে মুহাম্মদ আলী আস সাবুনী বলেন, “মুখমন্ডল হচ্ছে সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং বিপর্যয়ের উৎস ও বিপদের ঘাঁটি। “মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী,রাওয়ায়িউল বায়ান ফী তাফসীরি আয়াতিল আহকামি মিনাল কুরআন, দামেস্ক: মাকতাবাতুল গাজালী, ১৯৮০ খ্রি., খি. ২, পৃ. ১৫৬”, “ইমাম কুরতুবী বলেন, “মুখমন্ডল হচ্ছে রূপ সৌন্দর্যেও কেন্দস্থল, সৃষ্টিগত সৌন্দর্য এবং নারী জীবনের মাহাত্ম-মাধুর্য এখানেই।” “আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ উবনু আহমদ আল-কুরতুবী, আল-জমিউ লি আহকামিল কুরআন, কায়রো: দারু কুতুবিল মিসরিয়াহ, ১৯৮৪ হি., খ. ১২, পৃ.২২৯” উপযুক্ত আলোচনার সারমর্ম হিসেবে আল্লামা মুহাম্মদ আলী আস সাবুনী রাহ.-এর মতামত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “মহিলাদের দিকে থাকানো জায়িয নয় শুধু ফিতনার আশঙ্কায়। আর চেহারা খোলা তাকলে যে ফিতনার সৃষ্টি হয় তা পা, নলা এবং চুল খোলা রাখার চেয়েও মারাত্মক। যেখানে পায়ের নলা এবং চুলের দিকে তাকানো সর্বসম্মতভাবে হারাম, সেখানে চেহারার দিকে তাকানো আরো বেশি হারাম হওয়া উচিত। কারণ তা হচ্ছে সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু ও ফিতনার উৎস। “মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৫”। সুতরাং বোঝা গেলো যে, ইভটিজিং বন্ধে মহিলাদেরকে সতর হিসেবে তাদের মুখমন্ডলসহ সমস্ত শরীরই ঢেকে রাখতে হবে। সাধারণত কিশোরী, তরুণী ও যুবতীরাই ইভটিজিং এর শিকার হয়ে হয়ে থাকে। কারণ এ সময় তারা নিজেদেরকে আবেদনময়ী সাজসজ্জা করে পরপুরুষের কাছে উপস্থাপন করা। “সারণি-২ দেখুন।”
রাস্তায় আড্ডা না দেয়া ঃ আজকের সমাজে যে সব স্থানে ইভটিজিং হয় তা হল রাস্তা, ঘাট, বাজার, বিপনী বিতান, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, অতচ এসব ব্যাপাওে ইসলামের বিধান যদি মানা হত তাহলে মনে হয় ইভটিজিং নামক শব্দটির উদ্ভব হত না। এ প্রসংঙ্গে আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী বলেছেন, তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকো। সাহাবীগণ বলেন, আমাদের তো রাস্তার উপরে বসা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। আমরা তো সেখানে বসেই আলাপ করে থাকি। রাসূলূল্লাহ (সা.) বললেন- যদি তোমরা একান্তই রাস্তায় বসতে চাও, তাহলে তোমরা রাস্তার হক আদায় করবে। তারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল। রাস্তার হক কী? রাসূলূল্লাহ সা. বললেন, “রাস্তার হক হল- চক্ষু অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেয়া, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজে বাধাদান করা। “ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: আল-মাজালিম ওল গাদাব, অনুচ্ছেদ: আফনিয়াতি আদদাউরি ওলজুলুসি ফীহা ওলজুলুুসি আলাস সাউদাত, দামেশক: দারু ত’কুন নাজাত, ১৪২২ হি. ঘাদীস নং- ২৪৬৫; ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: আল-লিবাস ওয যীনা,, অনুচ্ছেদ: আন-নাহি আন জুলুসি ফী তুরুকাত ও ইতাইত তারিকি হাক্কাহু, বৈরুত: দারে ইহইয়া আত তুরাস আল-আরাবী, তা.বি., হাদীস নং-২১২১/১১৪”। আলোচ্য হাদীসের নির্দেশনা যদি সমাজে বাস্তবায়িত হতো, তাহলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে এত আড্ডার আসর হত না এবং ইভটিজিংও হত না। সুতরাং ইভটিজিং বন্ধে রাস্তার হকসমূহের যথাযথ অনুশীলন জরুরী। বাংলাদেশে সংঘটিত ইভটিজিং এর অধিকাংশ ঘটে রাস্তা ঘাটে, স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন গার্মেন্টস-এর সামনে অবস্থানকারী বখাটে উগ্র যুবকদের দ্বারা। “সারণি-৩ দেখুন”। (চলবে)

নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন নিশ্চিত করতে হবে -শফি চৌধুরী

DSC_1830সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আলহাজ্ব শফি আহমদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এদেশের মাটি ও মানুষের সংগঠন। এই সংগঠন দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। বিএনপির সুনাম অক্ষুণœ রাখতে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে হবে। সম্মেলনের মাধ্যমে নবগঠিত কমিটির গতিশীল বিস্তারিত

সকলকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে – কামরান

সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগ সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেছেন, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে বিএনপি জামায়াত একের পর এক ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। শ্রমিকরা দিনের পর বিস্তারিত

ইসলামের বাণী নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিন ——– ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইমাদ উদ্দিন নাসিরী

দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ মোঃ ইমাদ উদ্দিন নাসিরী বলেছেন, আল্লাহর পর রাসূল (সা.) এর আনুগত্য করতে হবে। যুগে যুগে নবী-রাসুল ও আউলিয়াগণ ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমান সমাজে অপসংস্কৃতি আমাদের মধ্যে প্রবেশ করেছে, যা আমরা আল্লাহ ও রাসূল (সা.) এর পথ থেকে দূরে আছি। এমনকি আমাদের নতুন প্রজন্ম দিন দিন ইসলাম থেকে অপসংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করেছে। বিস্তারিত

আল হামরা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির চৌধুরী’র ইন্তেকাল

আল-হামরা গ্র“পের চেয়ারম্যান জগন্নাথপুরের রসুলগঞ্জস্থ আব্দুল কাদির-মেহেরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, জগন্নাথপুর বৃটিশ বাংলা এডুকেশন ট্রাষ্টের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাষ্টি সহ দেশ বিদেশে বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত  শিক্ষানুরাগী ও সফল ব্যবসায়ী মোঃ আব্দুল কাদির চৌধুরী গত কাল (১৩/১১/২০১৪ইং) বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে ইবনেসিনা হাসপাতাল, সিলেট এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিস্তারিত

ডায়াবেটিস : সুস্থ থাকার উপায়

আফতাব চৌধুরী

আজকাল হাটে-ঘাটে, বাজারে, অফিসে, ছেলে-মেয়ের স্কুলের সামনে জটলায়, পার্টিতে সব জায়গাতেই এই কথাগুলোই বলছেন একজন অন্যজনকে ‘দূর ছাই! ডায়াবেটিক আমার জীনবটাকে একেবারে তছনছ করে দিল’। বুফে পার্টিতে থলথলে মোটা বয়কাট কেশী সুতনুকা ম্যাডাম হয়তো ডিশ হাতে নিয়ে ক্যাটারার সাদাসিধে ছেলেটাকে বুঝাতে উঠে পড়ে লেগে যান যে, তাঁর ডায়াবেটিস, ডাক্তারের বারণ তাই পনির-পকোড়াটা তিনি খাবেন না। বলি, এতদিনে কেন হুঁশ হল? আগে থেকেই কেন আপনি পরিমিত খেলেন না। এখন চার্ব-ভূড়ি ইয়া বড়ো একটা বানিয়ে বলছেন খাবেন না! নইলে এক বছর ধরে আপনি ডায়েটিং করছেনÑসবাইকে জাহির করে বলছেন, অথচ ওজন মাপার যন্ত্রটা আপনার মুখ রক্ষা করছে না। শত্র“তা আছে কিনা তা দেখার যন্ত্রটার সাথে আপনার কি পরিচয় নেই।
পৃথিবী জুড়েই বাড়ছে ডায়াবেটিস। যে ধরনের ডায়াবেটিস বেশি হচ্ছে এদের বলা হয় টাইপ ২ ডায়াবেটিস। এ ধরনের ডায়াবেটিসকে বলা হয় বয়স্কদের ডায়াবেটিস, যদিও আজকাল শিশু ও তরুণদেরও ডায়াবেটিস হচ্ছে। টাইপ ২ ডায়াবেটিস। জীবনাচরণে পরিবর্তন হওয়া শিশু ও তরুণরা ফাস্টফুড খাচ্ছে, খাচ্ছে কোমল পানীয়। শরীরচর্চা করছে না তেমন, স্থুল হচ্ছে এরা। আর তাই টাইপ ২ ডায়াবেটিস হলে শরীরে যেমন ইনসুলিন কম তৈরি হতে পারে অথবা যে ইনসুলিন তৈরি হলে সে ইনসুলিন দেহকোষ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না। রক্তের গ¬ুকোজকে কোষের ভেতর প্রবেশ করানোর জন্য প্রয়োজন হয় ইনসুলিনের। গ¬ুকোজ দেহকোষে ঢোকার পর এর দহন শুরু হয়। ইনসুলিন যদি কাজ না করতে পারে গ¬ুকোজও যদি রক্তে জমা হতে থাকে এবং এ অবস্থা চলতে থাকে তাহলে কালক্রমে অনেক জটিলতা হয় যেমন হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া, øায়ুর ক্ষতি এবং অন্ধত্বের মতো সমস্যা। দেখা যাচ্ছে অনেকেরই টাইপ ২ ডায়াবেটিস রয়েছে অথচ তারা অনেকেই তা জানেন না। ডায়াবেটিস আছে অথচ চিহ্নিত হয়নি এমন লোকের সংখ্যা কম হবে না। সূচনা পর্যায়েই কোনো লক্ষণ-উপসর্গ ছাড়াই টাইপ ২ ডায়াবেটিস শরীরে বড়ো ক্ষতি অজান্তে করে ফেলতে পারে। এজন্যই হয়তো ৬০ লাখ আমেরিকান, যাদের তিনজন পূর্ণবয়স্কদের মধ্যে একজনেরই টাইপ ২, তারা জানেই না যে তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সূচনায় উপসর্গ থাকে না এবং উপসর্গ দেখা দিলেও মনে হয় নিরীহ এবং অস্পষ্ট অন্যান্য সমস্যার অনুকৃতি বলে ভ্রম হতে পারে। উপসর্গ দেখা দিলে যা যা হতে পারে-
প্রবল পিপাসা, খুব ক্ষুধা, ওজন হ্রাস, অবসন্ন বোধ, ঝাপসা দৃষ্টি, বার বার প্রস্রাব, হাতে ও পায়ে ঝিন ঝিন, যৌন সমস্যা, ক্ষত যা শুকায় না। ডায়াবেটিসের সহজ পরীক্ষা হল রক্তের সুগার নিরূপণ। আঙ্গুলের ডগা থেকে সামান্য রক্তের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা। কখনও খালিপেটে রক্তে গ¬ুকোজ মাপা এবং প্রয়োজনে গ¬ুকোজ দ্রবণ পান করিয়ে দু’ঘন্টা পর আবার রক্তের নমুনা নিয়ে গ¬ুকোজ নিরূপণ। ফলাফল তিন রকম হতে পারে। স্বাভাবিক রক্তের সুগার মান। মধ্যবর্তী অবস্থা বা প্রি- ডায়াবেটিস। এক্ষেত্রে রক্তের সুগার মান স্বাভাবিকের বেশি থাকলেও ডায়াবেটিস হওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায় না এবং ডায়াবেটিস হলে ডাক্তার খাদ্যবিধি পরিবর্তন করতে বলতে পারেন, শরীরচর্চা করার উপদেশ দেবেন এবং ওজন বেশি হলে হ্রাস করার পরামর্শও দেবেন।
ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন ডায়াবেটিসের জন্য কতবার টেস্ট করানো উচিত। কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
হ্যা ডাক্তারের পরামর্শে হয়তো আপনার জীবনশৈলী কিছুটা পাল্টাতে হয়েছে। ডায়াবেটিস রোগটা আসলে কি? যখন শরীর যথাযথ ভাবে সুগার বা গ¬ুকোজ বা শর্করা ব্যবহার করতে পারে না, তখন রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়। দেহের কোষগুলোতে সুগারের সহজভাবে প্রবেশের জন্য ইনস্যুলিন নামে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের প্রয়োজন হয়। এই পদার্থটি আমাদের পেটের পাকস্থলির বাম দিকে প্যানক্রিয়াস বা অগ্নাশয় নামে অঙ্গটি সৃষ্টি করে রক্তে সেটা চালান করে। যখন অগ্নাশয় এবেবারেই ইনস্যুলিন তৈরী যথাযথভাবে করে না (ইনস্যুলিন রেসিস্ট্যান্স) তখন রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়, অথচ কোষগুলো সুগার বঞ্চিত থাকে এবং একটা লিমিটের পর উল্টোপাল্টা রাসায়নিক ক্রিয়া শুরু করে। এই সব কিছুর সমষ্টিকেই ডায়াবেটিস বলে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আগে নিয়ম-নীতি মেনে চললে এবং খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকলে ডায়াবেটিস থেকে রেহাই পাওয়া যায়। ডায়াবেটিস হয়ে গেলেও খাওয়া-দাওয়া এবং চলাফেরার ব্যাপারে সব নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে। ডায়াবেটিস রোগ ধরা পড়লে দিনে একবার করে সবুজ শাকসবজি খান। টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়া আটকায়। যেদিন শাকসবজি খাচ্ছেন না তিন দফায় নানা রঙা ফল মিশিয়ে খান। কপির ডাটাপাতা,ডাটাশাক, লাউ-কুমড়ো, বেতো, শালগম শাক, মুলোর শাক, সরষে, ছোলা, লেটুস, পার্সলে, পালংশাক, ঢেঁকি শাক, এরকম শাকসবজি খান। প্রতিদিন কোনো না কোনোটি খাওয়াই যায়। টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন মানুষদের অবিলম্বে সবুজ শাকসবজি খেতে শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। তুলেন স্কুল অফ পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং হার্ভার্ড স্কুল অব পারলিক হেলথের গবেষক বিজ্ঞানীরা ১৯৮৪ থেকে ২০০০ সালের নানা ধরনের ডায়েট তথা খাদ্যসামগ্রীর প্রভাব যাচাই করার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তুলেনের মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. লিডিয়া বাজ্জানোর বক্তব্য, ফল খাওয়ার সময় খোসাসহ আপেল খাবেন আস্ত। কলা খাবেন। কমলা খাবেন। তরমুজ-খরমুজ খাবেন। পেয়ারা খাবেন। ফ্রুট জুস খাবেন না কারণ যে, জুস সুগার চড়চড় করে বাড়িয়ে দেয়। পারলে মিলÑছাঁটা ফাইন চালের বদলে ঢেঁকিছাঁটা চাল খান। ময়দা খাওয়া ছেড়ে দিন। আলু যেটুকু খাবেন সবসময় খোসাসহ। এদিকে, কানাডা-হ্যামিলটনের ম্যাকমাষ্টার ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ৫০ বছরের গবেষণা প্রতিবেদন যাচাই করে জানিয়েছেন, নিয়মিত শাকসবজি, বাদাম, মাঝে মধ্যে ফলটল মাছও। এরকম চালিয়ে যেতে পারলে হার্টের রোগ ভোগ হবে না সহজে। সাদা পাউরুটি, বিস্কুট, পাস্তা, মিলে ছাঁটা চাল, ভাজা-পোড়া, তৈলাক্ত ফাস্টফুড, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট এসব খাওয়া ছেড়ে দিন। অন্যদিকে, আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে জানানো হয়েছে, যাঁরা মাঝেমধ্যেই বার্গার, মুরগির মাংসের চটপট বা মাংস ভাজা খেতে অভ্যস্ত, তাঁদের টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা খুব। বার্গার, ফ্রায়েড চিকেন এসব হাইক্যালোরি খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে সংশ্লিষ্টদের ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ ১০ বছর বাদেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে যান।
ডায়াবেটিস চিকিৎসাটা কিন্তু আপনার হাতে। ডাক্তার শুধু আপনাকে ভালোমন্দ খুলে বুঝিয়ে আপনাকে সঠিক রাস্তার সন্ধান দেন। এই রোগের চিকিৎসাটা ধরুন একটি টেবিল, যার চারটি পা আছে। এই চিকিৎসা টেবিলটা যে চারটি পায়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে এর একটিও যদি নড়েবড়ে হয় তাহলে টেবিলটা কিন্তু সঠিকভাবে থাকতে পারবে না।
প্রথম পা ঃ নিয়মিত রক্তপরীক্ষা করে সঠিক মাত্রায় সঠিক ঔষধ খাওয়া। অপ্রয়োজনীয় ঔষধ বা প্রয়োজনের চেয়ে কম ঔষধ খাওয়া দুটিই ক্ষতিকর। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শে বাড়তি কিছু টেস্ট করা উচিত যা দিয়ে আপনার ডায়াবেটিসের বিভিন্ন জটিলতা নিরূপণ করা যায়। এর মধ্যে কিডনি, হার্ট, চোখ, পা-এগুলোর পরীক্ষা করা হয়। একটি জরুরি কথা-যে কোনো ডায়াবেটিস রোগীর নিজের পা দুটোই মুখের মতো যতœ করা উচিত।
দ্বিতীয় পা ঃ সঠিক পরিমাণে সঠিক খাদ্য। আপনার উচ্চতা, ওজন, দৈহিক শারীরিক পরিশ্রমের কথা মাথায় রেখে আপনার দৈহিক প্রয়োজনীয় ক্যালোরি হিসাব করে আপনার খাদ্য তালিকা তৈরী করতে হবে। আপনার পছন্দের কোনো খাদ্য খেতে হলে তার সম ক্যালোরি মূল্যের অন্য খাদ্য আপনার দৈহিক খাদ্য থেকে বাদ দিতে হবে, লক্ষ্য রাখতে হবে সেদিনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালোরি যেন শরীরে বেশি না ঢুকে। ব্যাপারটা একটু কঠিন মনে হচ্ছে, তাই না? অভ্যাস করুনÑসহজ হয়ে যাবে।
তৃতীয় পা ঃ সঠিক ব্যায়াম, আপনার শারীরিক অবস্থা হাত-পা জয়েন্টের কথা মাথায় রেখে আপনাকে ব্যায়াম করতে হবে। তাতে হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতার, সাইক্লিং, ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ বা অন্য ব্যায়াম যেটা আপনার জন্য সঠিক হবে তা নিরূপণ করতে হবে। সাধারণ ভাবে প্রতিদিন কুড়ি  থেকে ত্রিশ মিনিট ঘাম ঝরানো ব্যায়াম করা উচিত। মনে রাখবেন আপনি যত ব্যায়াম করবেন, আপনার রক্তে সুগারের পরিমাণ কমবে।
চতুর্থ পা ঃ সুশৃঙ্খল জীবন শৈলী। মনে রাখবেন আপনার ডায়াবেটিস রোগটির জন্য অনেকাংশে দায়ী আপনার অলস বা সেডেন্টারি লাইফস্টাইল। চেষ্টা করতে হবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমস্ত কিছু একটা রুটিনের মধ্যে ফেলা। যখন তখন না খেয়ে রুটিন মোতাবেক খাওয়া-দাওয়া, হাটা ও ঘুমানো উচিত। এছাড়া মদ্যপান, ধূমপান, অলস জীবনযাপন এগুলো আস্তে আস্তে পরিহার করা উচিত।

কমলগঞ্জে গ্রাম বিদ্যুতায়ন কর্মসূচীর উদ্বোধন

কমলগঞ্জ থেকে সংবাদদাতা :
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে ৩৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয়ে ২.৫০১ কিলোমিটার লাইনের পল্লী বিদ্যুতায়নের শুভ উদ্বোধন করেছেন জাতীয় সংসদের সাবেক চীফ হুইপ উপাধ্যক্ষ মোঃ আব্দুুস শহীদ এমপি। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নোয়াগাঁও ডা: রইছ উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে সুইচ টিপে এ লাইনের উদ্বোধন করেন তিনি। এলাকার ১০ বিস্তারিত

কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামীলীগের ৯টি ইউনিয়নের আহবায়ক কমিটি গঠন

কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামীলীগের ৯টি ইউনিয়নের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামীলীগের আহবায়ক পৌর মেয়র লুৎফুর রহমান এর সভাপতিত্বে ও সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলামের পরিচালনায় মেয়রের অফিস কক্ষে কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম আহবায়ক রফিক আহমদ, মাসুদ আহমদ, লোকমান হোসেন, কমিশনার শামীম আহমদ, ফারুক আহমদ চৌধুরী, বিস্তারিত

ইসলামী চিন্তা-গবেষণার গুরুত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে প্রতিনিয়ত মানুষ মুখোমুখি হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যার। জীবনযাত্রায় যুক্ত হচ্ছে এমন অনেক বিষয় কোরআন, সুন্নাহ’র সরাসরি যে সম্পর্কে কোন বিধান বর্ণিত হয়নি, হয়নি কোন সর্বসম্মত ইজতিহাদ। ইসলামের গতিশীলতা ও উপযোগিতার প্রশ্নে এসব সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান উপস্থাপন অপরিহার্য। যাদের জন্য এ অপরিহার্যতা, যারা ফরযে কিফায়ার এ দায়িত্ব পালন করবেন তাদের জন্য রয়েছে অনেক করণীয়- যার কিছু এ সংক্রান্ত গবেষণা শুরুর পূর্বে এবং কিছু রয়েছে গবেষণা কর্ম শুরু করার সময়। শরীআহ অভিযোজন ও সম্মিলিত ইজতিহাদের মত বিষয়ও করণীয় কার্যাবলির অন্তর্ভূক্ত। সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) সাহাবী ও তাবেঈগণ বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করতেন। তাদের অনুসৃত সে পদ্ধতির আলোকে সমকালীন সমস্যার সমাধানের পথনির্দেশ নিয়ে আলোচনা করাই এ প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য।
যুগের আবর্তন ও মানুষের জীবনাচারের পরিবর্তন মহান আল্লাহর অন্যতম অনুপম নিদর্শন। এ কারণে প্রত্যেক যুগের মানুষের জীবনযাত্রা, এর পদ্ধতি, ধরণ ও উপকরণের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়। মানুষের বস্তুতান্ত্রিক জীবনের উৎকর্ষতার ফলে প্রতি নিয়ত আলাদা বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়। আজ যে বিষয়টি নতুন, আগামী কাল তা পুরাতন। বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্পনাতীত অগ্রগতি বর্তমান যুগকে অন্য সব যুগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে। এসব আবিষ্কার মানুষের নানামুখি কর্মকান্ড সম্পাদন ও বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণকে সহজিকরণের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে। ফলে তারা তাদের জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসবের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এমনকি এসব নতুন নতুন বিষয়কে উপেক্ষার কল্পনাও বর্তমান সময়ে অসম্ভব হয়ে দেখা দিয়েছে।
মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক ছুঁয়ে যাওয়া এসব নতুন বিষয়ের শরঈ বিধান জানা একান্ত প্রয়োজন। বিশেষত এ কারণে যে, পূর্ববর্তী ফিকহের কিতাবে এসব বিষয়ের শরঈ বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণিত নেই। ফলে বৈধতা ও অবৈধতার প্রশ্নে মুসলিমগণ এসব বিষয়ের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। ইসলাম সর্বকালের সর্বযুগের মানুষের জন্য উপযোগী একমাত্র জীবন ব্যবস্থা। কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যেসব বিষয়ের মুখোমুখি হবে তার বিধান এ ব্যবস্থায় বর্তমান থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ এমন অনেক বিষয়ের সম্মুখিন হয় যার কোন বিধান সরাসরি এতে পাওয়া যাচ্ছে না। নবুওয়ত ও রিসালাতের ধারা সমাপ্ত হওয়ায় ওহীর মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে ওহীভিত্তিক এমন পদ্ধতি অবশিষ্ট রয়েছে যার মাধ্যমে প্রত্যেক যুগের যে কোন নতুন বিষয়ের সমাধান সম্ভব।
পৃথিবীর প্রতিটি কাজেরই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি থাকে। একইভাবে ওহীভিত্তিক উক্ত পদ্ধতির আলোকে সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান উদ্ভাবনেরও নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। যার উপর ভিত্তি করে আইন গবেষককে কাক্সিক্ষত বিধান নির্ণয়ের পথ চলতে হয়। আলোচ্য প্রবন্ধে সেই নীতিমালাকে ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে আনুষঙ্গিক হিসেবে সাম্প্রতিক বিষয়ের আরবী পরিভাষা, এর গুরুত্ব, এক্ষেত্রে আইন গবেষকের জন্য করণীয় ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। সাথে সাথে মহানবী সা. সাহাবী ও তাবিঈগণ কীভাবে সাম্প্রতিক সমস্যার আইনী সমাধান করতে তা বর্ণনা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিষয় বলতে কী বুঝায়? : সাম্প্রতিক বিষয় বলতে এমন বিষয়কে বুঝায় যার ইসলামী বিধান নির্ণয়ের দাবি রাখে। অর্থাৎ এমন বিষয় যার শরঈ বিধান বর্ণনার জন্য ফাতওয়া ও ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়। তাই উক্ত বিষয়টি একেবারেই বিরল হোক বা পুরাতন বিষয় নতুন আঙ্গিকে আসুক অথবা নতুন হোক। সাম্প্রতিক বিষয়ের সংজ্ঞায় আমরা কয়েকজন মনীষীর অভিমত উল্লেখ করতে পারি- প্রফেসর আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, এটি এমন অবস্থা ও বিষয় ইসলামী ফিকহের আলোকে যার বিধান বিশ্লেষণের দাবি রাখে। “ইবনে আব্দুল্লাহ, আব্দুল আযীয, ফিকহুন নাওয়াযিল, মাজাল্লাতু দাওয়াতুল হক, মরক্কো: আওকাফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংখ্যা-‘‘২৪, ১৪০২ হি. পৃ.৪২” শায়খ সালমান আওদাহ বলেন, এমন নতুন বিষয় যার অধিকাংশ দিক আধুনিক যুগের অনুগামী যার শরঈ বিধান জটিলতা ও দুর্বোধ্যতায় আচ্ছাদিত। “আল-আওদাহ, সালমান ইবনে ফাহাদ, জাওয়াবিতুত দিরাসাত আল-ফিকহিয়্যাহ, রিয়াদ: দারুল ওয়াতান, ১৪১২ হি. পৃ. ৮৯। আল-বারযালী ‘জামিউ মাসাঈলিল আহকাম’ গ্রন্থ পর্যালোচনা করতে যেয়ে বলা হয়েছে, “এটি আকীদা ও চরিত্র সংক্রান্ত এমন সমস্যা যা একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলত তিনি ইসলামী নীতিমালার আলোকে এর উপযুক্ত সমাধান ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রচেষ্টা করছে। “আল-বারযালী, মুনাকাশাহ আলা জামি মাসাঈলিল আহকাম, মাজাল্লাতু কুল্লিয়াতিল আদাব ওয়াল উলুমিল ইনসানিয়্যাহ, রাবাত: মুহাম্মদ আল-খামিস বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ৫ ও ৬, ১৯৭৯, পৃ. ১৭২। ড. হাসান ফিলানী বলেন, “কোন ব্যক্তির উপর এমন কোন অবস্থা আপতিত হওয়া যাতে ঐ ব্যক্তি এ বিষয়ের শরঈ বিধান জানার জন্য যে ব্যক্তি তা অবগত করাতে পারেন তার শরণাপন্ন হন। তাই উক্ত বিষয় ইবাদত বা লেনদেন বা আচরণ বা চারিত্রিক যে বিষয়েই সংশ্লিষ্ট হোক না কেন। “ফিলানী, ডক্টর হাসান, ফিকহুন নাওয়াযিল, রিয়াদ: মুনতাকা আল-কীরওয়ান, হিজরী পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চত্যে মালিকী মাযহাবের সম্প্রসার শীর্ষক প্রতিবেদন, ১৪১৪ হি. পৃ. ৩২০। অতএব সাম্প্রতিক বিষয় বলতে এমন নতুন বিষয়কে বুঝায় যার বিধানের ব্যাপারে শরীআতে সরাসরি কোন নস বর্ণিত হয়নি এবং সর্বসম্মত কোন ইজতিহাদ হয়নি।
সমার্থক কিছু আরবী পরিভাষা : সাম্প্রতিক বিষয় ও এ সংক্রান্ত ইসলামী বিধান বুঝাতে আরবী কিছু পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। এ সংক্রান্ত প্রসিদ্ধ পরিভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে- হাওয়াদিস শব্দটি ‘হাদীসাহ’ এর বহুবচন। নতুন কিছু ঘটাকে ‘হাদাসা’ বলে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে হাদিসাহ অর্থ-নতুন বিষয়। এ জন্য বছরের শুরুতে নতুন বৃষ্টিকে হাদিসাহ বলে। “ইবনে মানযুর, জামালুদ্দীন, লিসানুল আরব, বৈরূত: দারুল ফিকর, ১৪১০ হি. খ. ২, পৃ. ১৩২। আর এ সংক্রান্ত ফিকহকে বলা হয় ‘ফিকহুল-হাওয়াদিস’।
আন-নাওয়াযিল: এ শব্দটিও বহুবচন, একবচন ‘নাযিলাহ’। এর অর্থ বর্ণনায় আল-জাওহারী বলেন, সময়ের কোন কষ্টকর বিষয় বা জনসাধারণের উপর পতিত হয়। এ সংক্রান্ত ফিকহকে বলা হয় ‘ফিকহুন নাওয়াযিল’। “আল-জাওহারী, ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ, আসসিহাহ ফীল লুগাত, বিশ্লেষণ: আহমদ আব্দুল গফুর আতা, বৈরূত: মাকতাবাতুর রিসালাহ, খ. ৫, পৃ. ১৮২৯।
আল-অকায়িঈ শব্দটি ‘অকিয়াহ’ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ ঘটনা। লিসানুল আরব গ্রন্থকারের মতে, দুর্যোগ ও সময়ের দুর্বিপাক বুঝানোর জন্যও আকিয়াহ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। “ইবনে, মানযুর, জালালুদ্দীন, লিসানুল আরব, প্রাগুক্ত, খ. ৮, পৃ. ৪০৩। এ শব্দের সাথে সম্পৃক্ত করে এ সংক্রান্ত ফিকহকে বলা হয় ‘ফিকহুল অকিই’।
মুসতাজিদ্দাহ : শব্দটি ‘জুদুদ’ শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ-নতুন। আর মুসতাজিদ্দাহ অর্থ- সাম্প্রতিক, সর্বশেষ অবস্থা, নতুন নতুন অবস্থা। “রহমান ড. মুহাম্মদ ফজলুর, আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান, ঢাকা: রিয়াদ প্রকাশনী, ২০০৯ পৃ. ৯৩৬। আর এ সংক্রান্ত ফিকহকে বলা হয় ‘ফিকহুল-মুসতাজিদ্দাহ’।
কাদায় মুআসিরাহ: কাদায়া শব্দটি ‘কাদিয়াহ’ শব্দের বহুবচন। যার অর্থ অমীমাংসিত বিষয়। যে অমীমাংসিত বিষয় ফয়সালার জন্য কাযী বা বিচারকের সম্মুখে পেশ করা হয় তাকে কাদিয়াহ বা মামলা বলা হয়। “আল-ফাইয়ূমী, আহমদ মুহাম্মদ, আল-মিসবাহ আল-মুনীর, বৈরূত: মাকতাবাহ আসরিয়্যাহ, ১৩১৮ হি. খ. ২, পৃ. ৬৯৬। আর মুআসিরাহ শব্দটি ‘আসর’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ সমসাময়িক, সমকালীন। “রহমান, ড. মুহাম্মদ ফজলুর, আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান, পৃ. ৯৬৬।
অতএব কাদায়া মুআসিরাহ অর্থ সমকালীন অমীমাংসিত বিষয়। ফিকহের সাথে সম্পৃক্ত করে একে বলা হয় ‘কাদায়া মুআসিরাহ ‘ফিকহিয়্যাহ’। যেসব সাম্প্রতিক বিষয়ের শরঈ বিধান নির্মিত হয়নি সেসব বিষয়কে বুঝাতে বর্তমানে এই পরিভাষাটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয়ের গুরুত্ব : বিভিন্ন কারণে সাম্প্রতিক বিষয়কসমূহের ইসলামী বিধান নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে এর মধ্যে থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আলোচিত হল- ইসলামের গতিশীলতা ও পূর্ণতা প্রমাণ করা: ইসলামী একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে এ পূর্ণতার ঘোষণা এসেছে। “আল-কোরআন, ৫: ৩’’ মহান আল্লাহ বলেন, আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিআমত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে নির্ধারিত করলাম।” একই সাথে এ ব্যবস্থা শাশ্বত ও গতিশীল। কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত প্রতিটি মানুষ স্থান, কাল, পাত্র ও পরিস্থিতি ভেদে যে অবস্থার মুখোমুখী হোক না কেন সে ক্ষেত্রে ইসলামের একটি নির্দেশনা থাকতে হবেই। নতুবা এটি হয়তো অপূর্ণাঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত হবে অথবা যুগের উৎকর্ষতার বিপরীতের এটি অনুপযোগী হিসেবে প্রমাণিত হবে। অতএব নির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতে সাম্প্রতিক বিষয়সমূহের বিধান নির্ণয়ের মাধ্যমে একদিকে ইসলামের গতিশীলতা ও পূর্ণতা প্রমাণ করা ও অন্যদিকে ইসলাম বিরোধী শক্তি যারা আধুনিক যুগে ইসলামের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তাদের প্রতিউত্তর দান করা সম্ভব হয়।
মুসলিম উম্মাহ’র কষ্ট লাঘব করা : এমন অনেক নতুন বিষয় সৃষ্টি হয় যার বিধান নির্ণিত না থাকার কারণে মুসলিম উম্মাহ কষ্টের সম্মুখীন হন। আবার দেখা যায় অমুসলিমরা নিত্যনতুন আষ্কিারের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে অতিক্রম করে, যা তাদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এ কষ্ট দূর করার জন্য ঐসব বিষয়ের ইসলামী বিধান নির্ণয় করার কোন বিকল্প নেই। যদি উক্ত বিষয় বৈধ হয় তাহলে মুসলমানগণ তা গ্রহণ করতে পারবেন। আর অবৈধ হলে এর বিকল্প পদ্ধতি আবিষ্কার করার প্রতি সচেষ্ট হবেন এবং উক্ত অবৈধ পদ্ধতি বর্জন করবেন।
ইজতিহাদের ধারা চলমান রাখা : ইজতিহাদ তথা ইসলামী বিধান উদ্ভাবনের গবেষণা একদল মানুষের জন্য অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, “তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে”। “আল-কুরআন, ৯: ১২২’’।
ইজতিহাদের মূল উদ্দেশ্যই হয়ে থাকে নতুন নতুন বিষয় গবেষণা করে এর বিধান উদ্ভাবন করা। যাকে আমরা ‘ইস্তিখরাজ, ‘ইস্তিম্বাত’ ইত্যাদি নামে চিনি। অতএব এ বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে ইজতিহাদের ধারা চলমান রাখা জরুরী।
সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান উদ্ভাবনে করণীয়: সাম্প্রতিক বিষয়ের ইসলামী বিধান উদ্ভাবনে ক্ষেত্রে করণীয়সমূহ থেকে এখানে আমরা চারটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় নিয়ে আলোচনা করব। সেগুলো হলো- ১. বিধান নির্ণয়ের পূর্বে করণীয় ২. বিধান উদ্ভাবনের সময় করণীয় ৩. শরীআহ অভিযোজন (ঝযধৎরয অফধঢ়ঃধঃরড়হ) ৪. সম্মিলিত গবেষণা (এৎড়ঁঢ় ওলঃরযধফ)
বিধান নির্ণয়ের পূর্বে করণীয়: সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের পূর্বে সংশ্লিষ্ট গবেষকের যেসব করণীয় রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ঘটনার বাস্তবতা নিশ্চিত হওয়া: অবাস্তব বিষয় সম্পর্কে ইসলামের বিধান তলব ও প্রদান করা সালফে সালিহীন অপছন্দ করতেন। ইবনে উমর (রা.) এর নিকট এক ব্যক্তি এসে কোন এক বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যে বিষয়ের কোন বাস্তবতা নেই সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। কেননা আমি উমর ইবনুল খাত্তাব কর্তৃক ঐ ব্যক্তিকে অভিশাপ দিতে শুনেছি যে ব্যক্তি অবাস্তব বিষয়ে প্রশ্ন করে। “আদদারিমী, আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ রহমান, সুনান আদদারিমী, বিশ্লেষণ: ফাওয়ায আহমদ আযযামরালী ও খালিদ আসসাবআ, বৈরূত: দারুল কিতাব আল-আরাবী, ১৪০৭ হি. বাবু কারাহিয়্যাতুল ফাতওয়া, খ. ১, পৃ. ৬২।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবীগণের চেয়ে উত্তম মানবগোষ্ঠী আমি দেখিনি। তাঁরা তাঁর কাছে তেরটি প্রশ্ন ছাড়া কোন কিছু জিজ্ঞেস করেননি। আর এর সবগুলোই কোরআনে বিধৃত হয়েছে। তাঁদের উপকারে আসত এমন বিষয় ছাড়া তাঁরা অন্য কিছু জিজ্ঞেস করতেন না। ‘‘আদ্দারিমী, আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আব্দুর রহমান, সুনান আদ্দারিমী, প্রাগুক্ত, বাবু কারাহিয়্যাতুল ফাতওয়া, খ-১, পৃ. ৬৩’’
বিষয়টি বিশ্লেষণযোগ্য হওয়া: গবেষককে দৃষ্টি দিতে হবে উদ্ভূত পরিস্থিতি আদৌ বিশ্লেষণের যোগ্য কি না? কেননা এমন অনেক বিষয় আছে যাতে মানুষের দ্বীন- দুনিয়ার কোন কল্যাণ নেই। অযথা এর পিছনে সময় ও মেধা খরচ করা উচিত নয়। যদি কেউ কোন আলিম বা মুফতীকে বিপদে ফেলানোর জন্য বা তাকে অসম্মান করার জন্য অথবা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইসলামের বিধান জানতে চায় তবে তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত। কেননা মহানবী (সা.) কুটিল প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। “আবু দাউদ, সুলাইমান ইবনে আশআস, আসসুনান, বিশ্লেষণ: মুহাম্মদ আওয়ামাহ, মক্কা: আল-মাকতাবাহ মাক্কীআহ, ১ম প্রকাশ-১৪১৯ হি. অধ্যায়: আল-ইলম, বাবুত অনুচ্ছেদ: তাওয়াক্কী ফীল ফাতওয়া, খ. ৪, পৃ. ২৪৩।
একইভাবে যেসব বিষয়ে শরীয়তের নস রয়েছে সেসব বিষয়ে ইজতিহাদ না করা। কেননা ফিকহী মূলনীতি হল, “নস থাকলে সেখানে ইজতিহাদের অনুমতি নেই। “যারকা, আহমদ, শারহু কাওয়াঈদুল ফিকহিয়্যাহ, বৈরূত: দারুল কালাম, ১৪০৯ হি. পৃ. ১৪৭।
সাম্প্রতিক যেসব বিষয় বিশ্লেষণযোগ্য তা হল-“জাসসাস, আবু বকর, আল-ফুসুল ফীল উসুল, বিশ্লেষণ: ড. আজীল নাশমী, কুয়েত: আওকাফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ১৪১৪ হি. খ. ৪, পৃ. ১৩: ইবনে কাইয়্যিম ইলামুল মুকিয়ীণ আন রাব্বিল আলামীন, লেবানন: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৪০৮ হি. খ. ১, পৃ. ৫৪-৫৬: আল-কারাফী, শিহাবুদ্দীন, আল-আহকাম ফী তাময়্যিযুল ফাতাওয়া আনিল আহকাম, বিশ্লেষণ: আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, হালব: মাকতাবাতুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যাহ, ২য় প্রকাশ- ১৪১৬ হি. পৃ. ১৯২।
১. যে বিষয়ে কোন অকাট্য দলীল বা ইজমা থাকবে না। ২. যদি উক্ত বিষয়ে অকাট্য দলীল থাকে তবে সে দলীল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তথা তাবিলের পর্যায়ভুক্ত হতে হবে। ৩. এমন মতবিরোধপূর্ণ বিষয় যার ক্ষেত্রে শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে যেয়ে একপক্ষ তাকে বৈধ বলেছেন অন্যপক্ষ তাকে অবৈধ বলেছেন। ৪. বিষয়টি আকীদা বা তাওহীদের মূলনীতি কিংবা কোরআন- সুন্নাহ’র মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভূক্ত হবে না। ৫. বিষয়টি এমন সাম্প্রতিক সমস্যা যা ইতোমধ্যে সমাজে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বা এমন আবশ্যম্ভাবী যার শরঈ বিধান আবশ্যক।
সূক্ষ্ম অনুধাবন : সাম্প্রতিকতার ফিকহ তথা আধুনিক বিষয়ের ইসলামী সমাধান অতি সূক্ষ্ম একটি বিষয়। এ এমন এক জিজ্ঞাসা যে সম্পর্কে সরাসরি কোন বিধান বর্ণিত নেই। এ জন্য এ বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের পূর্বে এর খুঁটিনাটি সব কিছু ভালভাবে অনুধাবন অপরিহার্য। খলিফা উমর (রা.) কর্র্তৃক আবু মুসা আশয়ারী (রা.) কে লেখা পত্রে তিনি বলেন- “নিশ্চয় বিচার-ফয়সালা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যা প্রত্যেক যুগে চলে আসছে। তোমার কাছে কোন কোন মামলা আসলে তা ভালভাবে অনুধাবন করবে (অতঃপর তা কার্যকর করবে)। কেননা মৌখিক ফয়সালার কোন অর্থ হয় না, যতক্ষণ না তা কার্যকর হয়। যেসব মামলার ফয়সালা কোরআন ও হাদীসে না পাওয়া যাবে সেগুলোকে খুব গভীরভাবে অনুধাবন করবে। “ফারিক, খুরশীদ আহমদ, হযরত উমর (রা.) এর সরকারী পত্রাবলী, অনুবাদ: মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৪ পৃ. ২১৮-২১৯।
প্রাজ্ঞজনের পরামর্শ গ্রহণ : আধুনিক বিষয়টি সম্পর্কে প্রাজ্ঞজনের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর নির্দেশও রয়েছে: “জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান”। “আল-কোরআন, ২১:৭। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্র“টির কারণে বর্তমান সময়ে একজন আলিমের পক্ষে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ব্যবসায় সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় যথার্থভাবে জানার সুযোগ নেই। এজন্যই উদ্ভূত যাবতীয় বিষয় সংশ্লিষ্ট প্রাজ্ঞজনের কাছ থেকে ভালভাবে অবগত হওয়া কর্তব্য। যেমন- কেউ যদি টেস্ট টিউব বেবী, জরায়ূ ভাড়াদান, মরণোত্তর অঙ্গদান, শেয়ার মার্কেট, ব্যাংক কার্ড ইত্যাদি বিষয়ের বিধান নির্ণয় করতে চান তবে নিশ্চয় তাকে এসবের প্রক্রিয়া ও আনুষঙ্গিক সব বিষয় সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি থেকে জানতে হবে।
মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা : বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ যেন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন তার জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করা অবশ্য কর্তব্য। আমরা কোনভাবেই এ আত্মিক দিককে অবহেলা করতে পারি না। মহান আল্লাহ ফিরিশতাদের ঘটনা বর্ণনা করে এ সংক্রান্ত আদব আমাদেরকে শিখিয়েছেন। নিজের অক্ষমতার ক্ষেত্রে তিনি আমাদেরকে বলতে বলেছেন: “আপনার পবিত্রতা, আপনি আমাদেরকে যা শিখিয়েছেন তার চেয়ে বেশি কোন জ্ঞান আমাদের নেই। “আল-কোরআন, ২: ৩২। মহান আল্লাহ আরও বলেন, “বল, হে আমার প্রতিালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি কর।” “আল-কোরআন, ২০: ১১৪।
বিধান উদ্ভাবনের সময়ে করণীয়: সমসাময়িক সমস্যার সমাধান উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গবেষকের যেসব করণীয় তা হল- ক. দলীল, প্রস্তাব ও প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা:
১. বিধানের দলীল বর্ণনা করা: ইমাম ইবনে কাইয়্যিম বলেন, মুফতি বা মুজতাহিদের উচিত বিধানের দলীল ও সূত্র বর্ণনা করা এবং ফাতওয়া জিজ্ঞেসকারীকে দলীলবিহীন উত্তর না দেয়া। “ইবনে কাইয়্যিম, ইলামুল মুয়াক্বিইন আন-রাব্বিল আলামীন, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১২৩।
২. বিকল্প প্রস্তাবনা পেশ করা: যেহেতু সাম্প্রতিক আবিষ্কারের অধিকাংশই অমুসলিম কর্তৃক উদ্ভাবিত সেহেতু মুসলিম গবেষকের উচিত এসব বিষয়ের যে যে দিক শরীআহ’র সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলো পরিত্যাগ করে এর বিকল্প পদ্ধতি বের করা। ইমাম ইবনে কাইয়্যিম বলেন, মুফতি বা মুজতাহিদের জন্য আবশ্যক যদি তিনি ফাতওয়া তলবকারী তা সমাধান প্রত্যাশীদেরকে কোন কাজ থেকে নিষেধ করেন অথচ বিষয়টি তার জন্য অতি জরুরী তবে তিনি তাকে বা তাদেরকে উক্ত কাজের বিকল্প পথ বলে দিবেন। যাতে উক্ত ব্যক্তির জন্য হারামের দরজা বন্ধ হয়ে যায় ও শরীআহ অনুমোদিত পদ্ধতির দরজা উন্মুক্ত থাকে। “প্রাগুক্ত”।
৩. বিধান বর্ণনার পূর্বে প্রেক্ষাপট বর্ণনা: সাম্প্রতিক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিধান বর্ণনার পূর্বে ভূমিকাস্বরূপ উক্ত বিষয়ের আনুষঙ্গিক বিভিন্ন দিক আলোচনা করতে হবে, যাতে উক্ত বিষয়ের বিধান মানুষ সহজে বুঝতে পারে। যেমন মহান আল্লাহ যাকারিয়া (আ.) এর ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, বার্ধক্যের এমন পর্যায় তাঁর সন্তান হয়েছিল যে পর্যায়ে সাধারণত সন্তান হয় না। মহান আল্লাহ এ ঘটনাটি ঈসা (আ.) এর পিতা ছাড়া জন্ম হওয়ার ঘটনা বর্ণনার পূর্বে ভূমিকাস্বরূপ উল্লেখ করেছেন। যাতে অতিশয় বৃদ্ধ দম্পতি থেকে সন্তান জন্ম নেয়ার ঘটনা বিশ্বাস করানোর মাধ্যমে পিতা ছাড়া সন্তান জন্ম হওয়ার ঘটনা বিশ্বাস করা সহজ হয়। “সূরা মারইয়াম (আল-কোরআর: ১৯) এ সংক্রান্ত আলোচনা বর্ণিত হয়েছে’’।
প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সাথে সাথে সম্পূরক বিভিন্ন তথ্য প্রদান করাও মুজতাহিদের কর্তব্য। ইমাম বুখারী র. তার সহীহ বুখারীতে “মান আজাবাস সাঈল বিআকসারি মিমমা সাআলাহু আনহু” শীর্ষক একটি অধ্যায় অন্তর্ভূক্ত করে দেখিয়েছেন। মহানবী সা. অনেক প্রশ্নের জবাবের সাথে সাথে অতিরিক্ত তথ্য প্রদান করেছেন।
মাকাসিদে শরীআহ’র প্রতি দৃষ্টি রাখা : মাকাসিদে শরীআহ বলা হয়, বান্দার কল্যাণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে যেসব নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে ইসলামী আইন প্রণীত হয়েছে যেসব উদ্দেশ্যকে। সাম্প্রতিক বিষয় পর্যাবেক্ষণকারী গবেষকের জন্য মাকাসিদে শরীআহ’র গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক এখানে উল্লেখ করা হল।
“আল-গাযালী, আবু হামিদ, আল-মুসতাসফা, সিরিয়া: আল-মাকবাআহ আল- আমীরিয়্যাহ, ১৩২২ হি. খ. ১, পৃ. ২৯৬।  ১. কল্যাণ নিশ্চিত করা। ২. কষ্ট দূরীভূত করার নীতি বাস্তবায়ন করা। ৩. ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা।
সাম্প্রতিক বিষয় সম্পর্কিত বর্তমান কোন বিধান থাকলে তার বিশ্লেষণ : এর দ্বারা উদ্দেশ্য গবেষক সাম্প্রতিক বিষয়ের বিধান নির্ণয়ের সময় এ সংক্রান্ত কোন গবেষণাপ্রসূত বিধান আছে কি না এবং সে বিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না তা দেখবেন। লক্ষ্য করবেন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে উক্ত বিধান পরিবর্তনযোগ্য কি না? কেননা শরীয়াতের ইজতিহাদপ্রসূত অনেক বিধান স্থান-কাল-সমাজ পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এ কারণে একই মাযহাবের মুতাক্কাদিমীন ও মুতাআখখিরীনের মধ্যে ফাতওয়ার ভিন্নতা দেখা যায়। এরই প্রেক্ষিতে ইসলামী আইনের মূলনীতি শাস্ত্রের সূত্র রয়েছে: “যুগের পরিবর্তনে বিধানের পরিবর্তন স্বীকৃতি”। “যারকা, শেখ আহমদ, আল-কাওয়াঈদ আল-ফিকহিয়্যাহ, তা. বি. পৃ. ২২৭। আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম তাঁর ইলামুল মুয়াক্বিয়ীনের মধ্যে শীর্ষক একটি অধ্যায় অন্তর্ভূক্ত করেছেন’’।         (চলবে)