বিভাগ: ভেতরের পাতা

মাদক সেবন ও পাচার : অন্ধকার জীবনে পথশিশু

আফতাব চৌধুরী

মাদকের বিষে ছেয়ে গেছে সিলেট নগরী। সর্বনাশা মাদকের ছোবলে যুবক, বয়স্কদের পাশাপাশি আসক্ত হয়ে পড়ছে নগরীর শত শত পথশিশু। এসব পথশিশু মাদক নির্ভর হয়ে চলে যাচ্ছে অন্ধকার জীবনে। এদের বেশিরভাগের বয়স ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে নেশার আসরে বয়স্কদের পাশাপাশি পথ শিশুরাও চলে আসছে এ লাইনে। গত কয়েকদিনে নগরীর বিভিন্ন বস্তি এবং রেললাইনসহ কয়েকটি এলাকায় সরজমিন এ চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে নগরীর রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকায় দিবা রাত্রির বেশির ভাগ সময় অসংখ্য পথশিশু নেশার আসরে ডুবে থাকে।
এদের থাকার কোনো জায়গা নাই। সারা দিন ষ্টেশনে থাকে। কাগজ কুড়িয়ে বা কোনখানে শ্রমবিক্রি করে পারিশ্রমিক হিসেবে যা পায় তা দিয়েই চলে এদের মাদক সেবন। আর এ সুযোগে এসব শিশুদের ব্যবহার করে গাঁজা, ফেনসিডিল, চোরাই মদসহ বিভিন্ন প্রকারের মাদক ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে মাদকের বিষ এসব শিশুদের জীবন কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। অন্ধকার জগতে ঘুরপাক খাচ্ছে ভয়াবহ মাদকের ছোবলে আক্রান্ত ওইসব পথশিশুরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পথশিশুদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রচলন রয়েছে মরণঘাতী নেশা ড্যান্ডি।
নগরীর বাসস্ট্যান্ড, রেলষ্টেশন ও বস্তিগুলোতে শিশুদের মাদক হিসেবে এটি নতুন সংযোজন। নগরীর ষ্টেশন রোডের পুরাতন রেলওয়ে ষ্টেশনের ফ্ল্যাটফর্ম ডিঙিয়ে ওয়াগনের পাশে নির্জন ঝোপের ধারে ড্যান্ডি আসক্ত একদল শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়। জানা গেলো এখানে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী পথশিশুরা নেশা করে আসছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠে পথশিশুদের ড্যান্টি টানার আসর। দেখা গেলো একদল শিশু বসে ঝিমোচ্ছে আর কেউ কেউ পলিথিনের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। নাম জিজ্ঞেস করতেই একে একে বলে উঠে-কাউসার, বিল্লাল, রাজু, আজমল, মনির, সেলিম, কবির।
তোমরা এখানে কি করছো ? প্রশ্ন শেষ না হতেই একজন চোখ বুজে জড়ানো গলায় বলে উঠে ড্যান্ডি বানাইয়া খাই, বুঝছেন? আর একজন বলে, বুঝে নাই মনে হয়। তাহলে আপনারে কই-এই বলে দলের একজন দেখাতে শুরু করলো ড্যান্ডি তৈরির কায়দা-কানুন।
ওদের কাছ থেকে জানা গেলো ড্যান্ডি খুব সহজলভ্য নেশা। জুতা জোড়া লাগানোর কাজে ব্যবহৃত বিশেষভাবে তৈরি আইকা গাম ড্যান্ডির প্রধান উপকরণ। কৌটা থেকে সামান্য আইকা গাম নিয়ে ছোট পলিথিন ব্যাগের ভেতরে লেপ্টে দেয়ার পর পলিথিনে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে এর ভেতরে নাক মুখ ঢুকিয়ে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিলে মাথায় ঝিমুনি ধরে, নেশা হয়। পথশিশু সেলিম জানায়, এ নেশার খরচ কম, ড্যান্ডি খেলে ক্ষুধা লাগে না, মনে কোনো দুঃখ থাকে না। ছোট বেলা থেইক্যা বাপরে দেহি নাই, কয়দিন হয় মা আরেক জনের লগে বিয়া বইছে। নতুন বাপের লগে আমার বনে না।
এহন ষ্টেশনে থাকি। আরো কয়েকজন পথশিশুর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ষ্টেশনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বস্তি ও নির্জন স্থানগুলোতে মদ, ফেনসিডিল গাঁজা, হেরোইন, এসব পাচার করে যে অর্থ পায় তা দিয়ে খাবার খায় আর বিভিন্ন মাদক কিনে নেশায় বুদ হয়ে থাকে এসব পথশিশু। একদিন খাবার না খেলে তাদের চলে, কিন্তু নেশা না করলে তাদের চলে না। ঘুম হয় না, বুক জ্বলে।
পরিণত বয়সের আসক্তদের মতো আধশোয়া অবস্থায় ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কথাগুলো বলছিল আনুমানিক ১২-১৩ বছর বয়সী পথশিশু আলম। এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, মাদকের ভয়াবহ ছোবলে পথশিশুদের আসক্ত হওয়ার খবর অনেক আগে থেকেই শুনে আসছি। তবে এতে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও জেনেছি। এ ব্যাপারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে অধিকারভিত্তিক সেবা প্রদানকারী বেসরকারি সংস্থা অপরাজয়ের বাংলাদেশের হিসাবে সিলেট বিভাগে বর্তমানে পথশিশুর সংখ্যা ২৫ হাজার। এর মধ্যে সিলেট রেলওয়ে ষ্টেশনে, কোতোয়ালি এলাকা ছাড়াও নগরীরর বিভিন্ন স্থানে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার।
এদের অধিকাংশই সামান্য অর্থের বিনিময়ে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। নিজেরাও হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত। এ প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, পথশিশুদের নেশার কবল থেকে রক্ষা করতে আমাদের চাইল্ড টু চাইল্ড কন্ট্রাক্ট কার্যক্রম আরো জোরদার করেছি। নগরীতে পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে মাদক সেবনকারীর সংখ্যাও।
মাদক ব্যবসায়ীরা যাতে পথশিশুদের ব্যবহার করতে না পারে সে লক্ষ্যে আমরা পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেছি।
এসব কোমলমতি পথশিশুদের থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই, যেখানেই রাত সেখানেই কাত। বিভিন্ন ফুটপাত, রাস্তা, কাঁচাবাজার ও শহরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনের নিচে তারা রাত কাটায়।
দরিদ্র ও সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা, এমনকি নগরীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা মাদকের আস্তানা দিন দিন পথশিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। একমাত্র অভাব আর বেকারত্বের সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা মাদকদ্রব্য বেচা-কেনা ও পাচারের কাজে পথশিশুদের ব্যবহার করে।
এর ফলেই আসক্ত হয়ে পড়েছে কোমলমতি পথ শিশুরা। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি পথশিশুদের আশ্রয়, খাদ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে তারাও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশেষ ভূমিকা থাকা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সাংবাদিক-কলামিস্ট।

জুড়ীতে এএসপি কুলাউড়ার সার্কেলকে সংবর্ধনা প্রদান

জুড়ী থেকে সংবাদদাতা :
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সিএনজি মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে এএসপি  কুলাউড়া সার্কেল এর সম্মনে সংবর্ধনা প্রদান অনুষ্ঠিত। গত ৮ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭ টায় জুড়ী নিউ মার্কেটের সম্মুখে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এম এ মোহসিন মুহিন এর পরিচালনায় সভাপতিত্ব করেন সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব আয়াজ উদ্দিন আহমদ। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এএসপি কুলাউড়া সার্কেল বিস্তারিত

৭ নভেম্বর-এর সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থানের নায়ক কর্ণেল তাহের তোমায় লাল সালাম

॥ মনির উদ্দিন মাষ্টার ॥

সে তো কর্ণেল তাহের/ সে তো দেশপ্রেমিক/ সে তো বিপ্লবে করেনি ভয়/ সে তো শ্রেণী সংগ্রামে করেনি ভয়/ সে তো ফাঁসিতে করেনি ভয়/ সে তো চির অমর/ নতি শিকারে বেঁচে থাকার করেনি লোভ/ সে হলো বীর উত্তম কর্ণেল তাহের। তাকে স্মরণ করেই তাহারই দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এদেশের জনগণ আরো একবার তাদের অধিকার আদায়ে এগিয়ে যাবে, সেটা আমাদের প্রত্যাশা। যারা ৭ নভেম্বরের গণঅভ্যুত্থানকে জোরে বলে মিথ্যার বেসাতী বলে তাদের বিপ্লব বলে জাহির করতেছে। তারা মূলত একটি প্রগতিশীল রাজনীতিকে ধ্বংস করে সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতিকে স্বাধীন দেশে এনে গণহত্যা চালাচ্ছেন এবং মৌলবাদের উত্থান ঘটিয়ে তারাই মূলত: সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপের জন্য দায়ী। মেজর জিয়া মুক্তিযুদ্ধের একটি প্রগতিশীল শক্তিকে ধ্বংস করে মৌলবাদ এবং সাম্রাজ্যাবাদের উত্থান ঘটিয়ে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। তার রেখে যাওয়া উত্তরসূরী জাতীয়তাবাদী দল এখনো মিথ্যার বেসাতি করে যাচ্ছ। মেজর জিয়া কিভাবে বন্দিদশা থেকে বিপ্লব করেছিলেন? জনগণ তা জানতে চায়? আজকে নতুন করে আবার মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে হচ্ছে। অনেকে বলেন দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’র দিন, অনেকে বলেন ‘সেনা হত্যার’ দিন, আবার অনেকে বলেন ‘সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান দিবস’। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এইসব ‘অনেকেই’ তাদের দৃষ্টিকোণ বিশেষত শ্রেণীদৃষ্টিকোণ থেকে বলেন। যারা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’র দিন বলেন তারা এটা বলতেই পারেন। কারণ তাদের ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’ মানেই জাতীয় শোষক-ধনিক এবং তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে এই কথিত বিপ্লব ও সংহতি। আসলে প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে এ দিনের আসল বিপ্লবকে হত্যা করা হয়েছিল। তাই প্রতিবিপ্লবীদের জন্য ৭ নভেম্বর দিনটি বিপ্লব ও তাদেরই সংহতির দিবস। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ এবং তাদের গড়া কথিত রাজনৈতিক দলসহ ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী-মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো এই দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। হয়তো বর্তমান ‘আর্মি ব্যাকড’ ও ‘জামায়াতীদের রক্ষক’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এই নামেই দিবসটি পালন করেছিলেন। এর বাইরে যারা দিবসটিকে ‘সেনা হত্যার দিন’ হিসেবে বলে থাকেন তাদেরও যুক্তি আছে। তারা মনে করেন, দিনটিতে নির্বিচারে সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে, তাই দিনটি ‘হত্যার’ দিন। তারা শ্রেণীগত বৈষম্যের বাইরে বিষয়টিকে দেখতে চান, শ্রেণীগত দিকটিকে সামনে আনতে চাননা। আর যাঁরা ‘সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে দেখেন তাঁরা শ্রেণীগত দিকটিসহ প্রকৃত বিপ্লবের বিষয়টি ধারন করেন।
আজ থেকে ৩৯ বছর আগের এই দিনটিতে, বা ’৭৫-এর ৭ নভেম্বরে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ভিতর থেকে যে ঘটনা ঘটেছিল তার প্রকৃত নায়ক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ১১নং সেক্টর কমান্ডার লে, কর্ণেল (অব:) আবু তাহের বীর উত্তম। তিনিই এ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তিনিই বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন, সেই সঙ্গে জিয়াকে ক্ষমতায়ও বসিয়েছিলেন সিপাহী-জনতার স্বার্থরক্ষা করার শর্তে। কিন্তু জিয়া ক্ষমতা হাতে পেয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ-মৌলবাদ এবং দেশীয় ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায়। জিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করেন ক্ষমতায় বসার শর্তের সঙ্গে, এবং ঘটনা এখানেই শেষ নয়। তিনি তার প্রাণরক্ষক তাহেরকে গ্রেফতার করেন, তারপর তার বিরুদ্ধে ৭ নভেম্বরের ঘটনার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দোষী করেন এবং এক প্রহসনের বিচার বসিয়ে তাঁকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেন। এরপর এই বিশ্বাসঘাতক জিয়া ৭ নভেম্বরের কৃতিত্ব (এবং নেতৃত্ব) নিজে নিয়ে নেন, দিনটিকে ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’-এর বদলে কথিত বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে প্রচার করেন। আর এর সঙ্গে সঙ্গে সেনা ছাউনিগুলো থেকে বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সিপাহী ও অফিসারদের আটক করে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুপ্ত হত্যাকান্ড ঘটাতে থাকেন। হাজার হাজার সিপাহী-অফিসারকে হত্যা করা হয় এভাবে। হাজার হাজার সিপাহী-অফিসার এবং জাসদ সংগঠকদের জেলখানায় আটক রেখে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। মাসের পর মাস ধরে চলতে থাকে এসব কান্ড। আরেকটি ব্যাপার হলো, যেহেতু এই হত্যাযজ্ঞের মূল পরিকল্পনায় ছিল সাম্রাজ্যবাদ সেহেতু ৭ নভেম্বরে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের লোকেরাও প্রতিবিপ্লবের জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিল। এ তৎপরতা সেনা ছাউনি এবং বে-সামরিক উভয় পর্যায়েই পরিচালিত হয়। সেনা ছাউনিতে তৎপর ছিল হীনস্বার্থান্বেষী অফিসাররা এবং বে-সামরিক পর্যায়ে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী-মৌলবাদী-চরম প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীসমূহ। পরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত জিয়াউর রহমানের সঙ্গে একাকার হয়ে এরা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে থাকে।
আজকের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ যে কর্ণেল তাহের কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে ৭ নভেম্বরে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান পরিকল্পনা করেছিলেন? যদিও আজ সামরিক বাহিনীর বিষয়ে দাবি করা হচ্ছে যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এক নয়। কিন্তু পাকিস্তানি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পাল্টানোর জন্যই ৭ নভেম্বর প্রয়োজন হয়েছিল, এমন কি ওই বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে আসতেই ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন হয়েছিল, দেশকে স্বাধীন করার প্রয়োজন হয়েছিল। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে প্রাপ্ত এই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক, জনকল্যাণমুখী, জনগণসম্পৃক্ত গণবাহিনী। মোটেই পাকিস্তানের মতো ক্যাণ্টনমেণ্টভিত্তিক, জনসম্পৃক্ততাহীন বা জনবিচ্ছিন্ন, জবাবদিহিতাহীন, অগণতান্ত্রিক বা অফিসারদের হুকুমের দাসভিত্তিক সেনাবাহিনী কাম্য ছিল না। জনগণের জন্য সত্যিকারের সামরিক বাহিনী বা গণবাহিনীর জন্যই কর্নেল তাহের ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আর তখনই প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে এখানে কারা পাকিস্তানি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে চায়। অর্থাৎ নেতৃত্ব থেকে  পাকিস্তানি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পক্ষেই অবস্থান দেখা যায়। এমনকি এ প্রশ্নে তাহের যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও কথা বলেন, তখন তিনিও তাহেরের সঙ্গে একমত হতে ব্যর্থ হন। ফলে তাহেরকে চাকরী থেকে সরে আসতে হয় এবং বিকল্প পথে লক্ষ্য অর্জনের চিন্তা করতে হয়। এখানে উল্লেখ করতেই হয় যে ক্যাণ্টনমেণ্টভিত্তিক, জনসম্পৃক্ততাহীন বা জনবিচ্ছিন্ন, জবাবদিহিতাহীন, অগণতান্ত্রিক বা অফিসারদের হুকুমের দাসভিত্তিক সেনাবাহিনী না হয়ে তখন যদি আমাদের সেনাবাহিনী জনগণের গণবাহিনী হতো তাহলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিহত হতে হতো না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হতো না, দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হতো না, সামরিক শাসন আসতো না এবং মুক্তিযুদ্ধের শত্র“রা ক্ষমতা দখল করতে পারতো না, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত ’৭২-এর সংবিধানও ক্ষত-বিক্ষত হতো না।
কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান প্রচেষ্টার কারণ এখানেই। তিনি পাকিস্তানি আদলের সেনাবাহিনীকে সত্যিকারের গণবাহিনীতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। শ্রেণী-বৈষম্যের ব্যবস্থাকে ভেঙে শ্রেণীহীন ব্যবস্থাপনা কায়েম করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। আর সেজন্যই বৃহত্তর সৈনিকগোষ্ঠীর সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্মিলনে সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সফল পরিণতি ঘটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি, তাদের এদেশীয় এজেণ্ট ও দালালগোষ্ঠী, ’৭১-এর পরাজিত যুদ্ধাপরাধী চক্র এবং স্বার্থান্বেষী মহলগুলো ছিল অনেক বেশী সতর্ক ও সংগঠিত। যে কারণে ৭ নভেম্বরে সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান বিজয়ী হতে বা সফল পরিণতি লাভ করতে পারেনি। এতে বিজয়ী হয়েছে প্রতিশক্তি এবং এর ফলশ্র“তিতে প্রাণ দিতে হয়েছে কর্নেল তাহেরকে, প্রাণ দিতে হয়েছে আরও বহু মানুষকে। আসলে ’৭১-এর পর আরও এক গণহত্যাযজ্ঞের মধ্যদিয়ে নিধন করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে প্রতিশক্তিকে। ফলে আজও পর্যন্ত আমাদের সেনাবাহিনী পূর্বসূরীদের আদল বা বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা কিছু হয়েছে এমন বলার সময় আসেনি।
সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মর্মকথা : আমাদের উপমহাদেশে সামরিক বাহিনীর জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশদের উপনিবেশের স্বার্থে। এই বাহিনীই পরে ভেঙে ভারতীয় এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হয়। এরপর এই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাহিনীর নাম পরিবর্তিত হলেও এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা আদল কিন্তু থেকে যায় সেই গোড়াতেই। অর্থাৎ এই বাহিনী থেকে যায় দেশের মালিক জনগণের বদলে শোষক বা ধনিক গোষ্ঠীর নিজস্ব স্বার্থরক্ষাকারী লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে, এবং শোষকগোষ্ঠী যখন সাম্রাজ্যবাদী মহাশত্র“র তাঁবেদার তখন এই বাহিনীও হয় একই বৈশিষ্ট্যের। ফলে যখনই সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের তাঁবেদারদের স্বার্থে আঘাত লাগে, জনগণ শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তখন এই বাহিনী দেশরক্ষার নামে সাম্রাজ্যবাদী তাঁবেদারদের রক্ষার জন্য নেমে পড়ে। আবার এই বাহিনীর নিজস্ব আদল হলো অফিসাররা সব প্রভু, এবং সিপাহী বা ছোটরা সব দাস। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই দাসরাই অনেক বেশী সংখ্যাগুরু, আর প্রভুরা গুটি কয়েক বা সংখ্যালঘু। তারপরেও সংখ্যালঘুদের ক্রিতদাস হিসেবে চলতে হয় এই সংখ্যাগুরুদের। এসব কারণেই মূলত এই উপমহাদেশে (বিশেষ করে ব্রিটিশ শাসনামলে) অনেকবারই সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে, যা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস হয়ে আছে। কেননা এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো না ঘটলে হয়তো ব্রিটিশদের বিতাড়নে বেশী বেগ পেতে হতো।
বাংলাদেশে কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন ‘সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থান’ দর্শনে বিশ্বাসীদের ভিতরে যে ধারণাটি কাজ করেছে তার মূল কথা হলো মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি আদলের প্রচলিত এই বাহিনী মানেই বুর্জোয়া বা ধনিক শ্রেণীর রক্ষক। অথচ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি ছিল গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং শোষণমুক্তি বা সমাজতন্ত্র। এই শোষণমুক্তির জন্য অবশ্যই শোষক শ্রেণীর শক্তিভিতকে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন। আর এ রকম একটি বিপ্লবী কাজের জন্য প্রয়োজন এমন একটি গণঅভ্যুত্থান যে অভ্যুত্থানের নায়ক হবে শোষিত-বঞ্চিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এবং শোষিত-বঞ্চিত বৃহত্তর সিপাহীগোষ্ঠী। এই দুইয়ের মিলনেই সম্ভব মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশিত শোষণমুক্ত বাংলাদেশ কায়েম করা। যেহেতু ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরও এই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি এবং রাষ্ট্র-সমাজ-লক্ষ্য-আদর্শের বৈশিষ্ট্যসমূহ মুক্তিযুদ্ধের আগের অবস্থায়ই থেকে গিয়েছিল সেহেতু শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি হয়ে উঠেছিল এই সিপাহী-জনতার গণঅভ্যুত্থানের। এজন্যই সিপাহী এবং জনতার সম্মিলন ঘটানো এবং সেইসঙ্গে সম্মিলিত গণঅভ্যুত্থান প্রয়োজন হয়েছিল। এই কাজটির জন্যই তখন সামরিক পর্যায়ে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং বে-সামরিক পর্যায়ে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিপ্লবী গণবাহিনী ও জাসদ তৎপরতা চালিয়েছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের এদেশীয় তাঁবেদারচক্র-ধনিকগোষ্ঠী-’৭১-এর যুদ্ধাপরার্দী শক্তিসহ অন্যান্য গণবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সংহতি বা সম্মিলিত প্রতিবিপ্লবের সাফল্যেই কার্যত ব্যর্থ হয় সিপাহী-জনতার ওই গণঅভ্যুত্থান। ফলে ৭ নভেম্বর পরবর্তী সফল হয় প্রতিবিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবীদের সংহতি।
শেষ কথা : সেই ৭ নভেম্বরের প্রত্যাশা যদি পূরণ হতো তাহলে বাংলাদেশ আজ অন্য বাংলাদেশ হতো। বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে থাকতো ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের দর্শনে। এই বাংলাদেশে জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী জনগণের বাহিনী ছাড়া কখনই সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের প্রতিভূদের ক্রীড়নক হিসেবে কোন শক্তি থাকতো না, দেশে যুদ্ধাপরাধী বা মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তির অস্তিত্ব থাকতো না। এমনকি দেশে কথিত ওয়ান ইলেভেন ঘটিয়ে সাম্রাজ্যবাদ-বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ চক্রের জয়জয়কার ঘটানোর অবকাশ থাকতো না, সামরিক শাসকদের সৃষ্ট বিএনপি-জামায়াত জোটকে নানা কৌশলে গণরোষ থেকে রক্ষা করে ফের রাজনীতি করার ব্যবস্থা করে দেওয়ার সুযোগও ঘটতো না। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষত-বিক্ষত করে বৃহত্তর জনগণের প্লাটফর্মকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টাও সম্ভব ছিল না। সুতরাং এখানে ৭ নভেম্বরের আসল প্রত্যাশাগুলো পূরণ হয়নি। আর পূরণ হয়নি বলেই শোষিত-বঞ্চিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর লড়াইও শেষ হয়নি। একই কারণে কর্ণেল তাহের এবং তাঁর ৭ নভেম্বরও শেষ হয়নি। শেষ হবে না যতোদিন না বিপ্লবের বিজয় আসবে। সমাজতান্ত্রিক সমাজ কায়েম হবে।

ইউএস প্রতিনিধিদের সাথে সিলেটে বিচারকদের মতবিনিময়

jela daira joj  pic  (05.11.14)সিলেট জেলা জজ কোটের জেলা ও দায়রা জজ মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, ইউএস ডিপাটমেন্ট অব জাস্টিস বাংলাদেশে পিপি ও এপিপিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। এভাবে যদি তারা আমেরিকা ও বাংলাদেশের বিচারকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয় তা হলে বিচার প্রার্থী মানুষরা আরো বেশি উপকৃত হবে। বিস্তারিত