বিভাগ: ভেতরের পাতা

মাদকের ভয়াবহ পরিণতি!

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
চি
কিৎসার প্রয়োজনে, সামাজিক বিনোদন, ধর্মীয় উৎসবের মাধ্যমে এবং তান্ত্রিক ও আধ্যাত্মিক সাধনার অনুষঙ্গরূপে দীর্ঘদিন ধরে মাদকদ্রব্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আদিবাসীদের মধ্যে উদ্ভিদ থেকে তৈরি ড্রাগ দ্বারা চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। হেরোডোটাস, হিপোক্রাটিস, এরিস্টটল থেকে ভার্জিল, প্নিনি, এন্ডারসহ বহু প্রাচীন গ্রীক ও রোমান লেখকের লেখায় চিকিৎসার জন্য পপি ও আফিম ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। “এ.ই.হক, মাদকাসক্তি : জাতীয় ও বিশ্ব প্রেক্ষিত, ঢাকা : ছায়া প্রকাশনী, ১৯৯৩, পৃ. ২৮” মেসোপটেমিয়া, এশিয়া ও ইউরোপে ঔষধ হিসেবে আফিমের ব্যবহার শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে। ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে মিসরের চিকিৎসকগণ আফিমের ব্যবহার করত এ্যনেসথেকিরূপে। সেখানকার আদিম অধিবাসীগণ তখন কোক পাতা চিবিয়ে খেত। মেক্সিকোর ইন্ডিয়ানগণ খ্রিষ্টপূর্ব ১০০ অব্দে ধর্মীয় উৎসব ও আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য ঐধষষঁপরহড়মবহরপ চংরঃড়পুনরহ সধংযৎড়ড়স’ং নামক উদ্ভিদের নির্যাস গ্রহণ করত; যাকে তারা বলত ‘ঈশ্বরের দেহমাংস’। ফনীমনসা জাতীয় (চুড়ঃব) গাছের নির্যাসও তারা ব্যবহার করত। আমেরিকার গির্জাগুলোতে চযড়ঃব ক্যাকটাস ব্যবহারের নিয়ম ছিল। “শাহীন আকতার, মাদকদ্রব্য ও বর্তমান বিশ্ব, ঢাকা: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ১৯৯০, পৃ. ১১”
খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার যুগে এশিয়ার মাইনরে আফিম ও পপিকে আনন্দ উদ্দীপক নেশা হিসেবে ব্যবহার করত বলে পন্ডিতগণ মনে করেন। তাইওয়ানে প্রস্তর যুগের ১০,০০০ বছর পূর্বেও গাঁজার ব্যবহার ছিল। চীনে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে ‘মাহুয়াং’ নামক ড্রাগ ‘ইনথেলেন্ট’ রূপে ব্যবহারের কথা জানা যায়। প্রায় একই সময়ে চীনের সম্রাট সেনমুঙ্গ-এর শাসনামলে নেশাকর ড্রাগ হিসেবে গাঁজার ব্যবহার ছিল। প্রাচীনকালে চীন ছাড়াও পারস্য, তুরস্ক, মিসর, ইতালী, জার্মানি এবং অন্যান্য দেশে গাঁজার ব্যবহার ছিল। “আব্দুল হাকীম সরকার প্রমুখ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৮”
খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে ভারতীয় উপমহাদেশে ক্যানাবিসের প্রচলন শুরু হয়। সম্ভবত ভারতীয়রাই আফিম, ধুতুরা এবং ভাঙ ব্যবহারের সূচনা করে। বেশ কিছু সংখ্যক হিন্দু সাধক ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা নিবারণের জন্য ক্যানাবিস ব্যবহার করতেন। এটি সম্ভবত ধ্যানে মগ্ন বা মনকে নিবিষ্ট করতে সাহায্য করত। ক্যানাবিস এক ধরনের পানীয় হিসেবে বহু মন্দিরে পরিবেশন করা হত। ক্যানাবিস বিভিন্ন উৎসবাদি যেমন হোলি, শ্রীভারতী এবং বিবাহ উৎসবে ব্যবহার করা হত। “প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৮”। সাধু-সন্ন্যাসী, বাউল, যোগী, তান্ত্রিক ইত্যাদি ধরনের লোক গাঁজা, ভাঙন সিদ্ধি সাধনায় ‘একাগ্রতা সৃষ্টি ও ধ্যানস্থ’ হওয়ার জন্য ব্যবহার করে থাকে। বিভিন্ন পুরাণ ও উপকথায় নানা প্রসঙ্গে গাঁজার কথা পাওয়া যায়। “এ.কে.এম, সিরাজুল ইসলাম, ইসলামে নেশা, ঢাকা : মা প্রকাশনী, ১৯৯৩, পৃ. ৮৬” হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পুরাণ-এ ধর্মীয় মর্যাদা প্রদান করে বলা হয়, ইন্দ্র তাঁর সহস্র চক্ষু, রোগ নাশক শক্তি ও দৈত্যনাশক ক্ষমতা দিয়েছেন এই গাঁজাকে। সেই থেকে হিন্দুদের কাছে গাঁজা গাছ ‘পবিত্রতার’ প্রতীক হয়ে আছে। তাদের কাছে স্বপ্নে গাঁজা গাছ-এর পাতা দেখা সৌভাগ্যস্বরূপ। বেদ-এ গাঁজা ও অন্যান্য দ্রব্য মিশ্রিত পানীয় ভাঙকে দুশ্চিন্তানাশক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। “আবদুল হাকিম সরকার প্রমুখ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৮”। মাদকদ্রব্য সম্পর্কে বাইবেলে বলা হয়েছে, ”ঘড়ৎ ফড়বং ধহু ড়হব ঢ়ঁঃ হবি রিহব রহঃড় ড়ষফ ংশরহ, রভ যব ফড়বং, ঃযব হবি রিহব রিষষ নঁৎংঃ ঃযব ংশরহ, ঃযব রিহব রিষষ নব ধিংঃবফ ধহফ ঃযব ংশরহ ৎঁরহবফ ভৎবংয ংশরহং ভড়ৎ হবি রিহব! অহফ হড় ড়হব ধভঃবৎ ফৎরহশরহম ড়ষফ রিহব ধিহঃং হব,ি ভড়ৎ যব ংধুং, ঃযব ড়ষফ রিহব রং মড়ড়ফ” ”ঞযব ঘবি ঊহমষরংয ইরনষব, ১৯৬১, ঢ়.১০০”
অজ্ঞতার যুগে অন্যান্য অপরাধ ও অপকর্মের পাশাপাশি মদপানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। সুরা পান তখন আভিজাত্য বলে মনে করা হতো। প্রতিটি সামাজিক অনুষ্ঠানে সুরা পান ছিল অপরিহার্য উপাদান। ইসলামের বিকাশ লাভের পূর্বে আরব দেশে সুরা পান ছিল একটি গ্রহণযোগ্য রীতি। কিন্তু নেশাগ্রস্ততা মানুষের জীবনে অনেক ক্ষতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে বলে ইসলাম এর প্রতি পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “হে মু’মিনগণ! মদ, জুয়া মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানী কার্যের  অন্তর্ভুক্ত; সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার”। “আল-কুরআন, ৫ : ৯০”। যা হোক, প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পপি ফুলের শুকনা রস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মনের সূক্ষ্ম অনুভূতির উপরে পপি ফুলের রসের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি গ্রীক ও রোমানগণ অবহিত ছিল। ইংরেজ ভেষজবিদ ১৭০০ সালে সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন যে, অনেক দিন ধরে মাদকদ্রব্য সেবনে এর উপরে প্রচন্ড আসক্তির জন্ম হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আবিষ্কার হয় মরফিনের। মরফিন হচ্ছে আফিমের বিশুদ্ধ প্রকরণ। ১৮৯৮ সাল হতে হিরোইন ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে ধমনীতে এর ইনজেকশন দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। হেরোইন এ সময়ে সর্বাপেক্ষা অধিক ব্যবহৃত এবং আলোচিত ক্ষতিকর মাদকদ্রব্য, সাদা বা বাদামী রঙের পাউডারের মতো। মাদকাসক্তদের কাছে ‘ব্রাউন সুগার’ নামে বেশি পরিচিত। এ মাদকদ্রব্যটির মূল উৎস হচ্ছে আফিম।
পোপাভার সমনিফেরাম নামক এক ধরনের উদ্ভিদের ফুলের রস থেকে আফিম তৈরি হয়। ১৮০৫ সালে মাটারনাম নামে একজন বিজ্ঞানী আফিম থেকে আরো শক্তিশালী বেদনানাশক দ্রব্য প্রস্তুত করেন এবং গ্রীক নিদ্রাদেবী ‘মার্ফিউস’ এর নামানুসারে এর নাম দেয় ‘মরফিন’। পরবর্তীকালে ১৮৯৫ সালে একজন জার্মান ফার্মাসিস্ট মরফিন থেকে অধিক গুণ শক্তিশালী বেদনানাশক দ্রব্য হেরোইন প্রস্তুত করেন। হেরোইনের নেশা মরফিনের তুলনায় ৩ গুণ এবং আফিমের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি। “মুহাম্মদ সামাদ, মাদকাসক্তি এবং মাদকদ্রব্য চোরাচালানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, ৪২ সংখ্যা, ফেব্র“য়ারি, ১৯৯২, পৃ. ১৪৯” গাঁজা তৈরি হয় ক্যানবিস স্যাটাইভা নামের এক ধরনের উদ্ভিদের পাতা, ডাল, ফুল ও বীজ থেকে। গাঁজাতে সাধারণত তামাকের চেয়ে ১২ গুণ টার ও ১০ থেকে ২০ গুণ কার্বন মনোক্সাইড বেশি থাকে, যার ফলে এ মাদকদ্রব্য সেবনে ফুঁসফুঁসে ক্ষত বা ক্যান্সারের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণ আমেরিকার কোকো পাতা হতে তৈরি হয় কোকেন। ১৫৩২ সালে পিজারো এটা আবিষ্কার করেন। ১৮৪৪ সালে কোকো পাতা থেকে কোকেন পৃথক করা হয় এ্যালকালোয়েড রূপে। ১৮৮৪ সালে সিগমন্ড ফ্রয়েড মনস্তাত্বিক চিকিৎসায় কোকেনের ব্যবহার শুরু করেন। পরবর্তীতে অস্ত্রোপচারের সময় এ্যানাসথেটিক রূপে কোকেনের ব্যবহার শুরু হয়। “এ.কে.এম. মনিরুজ্জামান, প্রাগুক্ত, পৃ.৯”
অ্যামফেটামিন এক জাতীয় কৃত্রিম ড্রাগ। ১৯৪০ সালে আমেরিকা, বৃটেন, জার্মানী ও জাপান সরকার সৈন্যদের মানসিক অবসাদ দূর করে কর্মোদ্দীপক করে তোলার জন্য এ্যামফেটামিন চালু করে। কোকেন পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বেশি জনপ্রিয় ড্রাগ। ১৮৬৪ সালে দু’জন জার্মান বৈজ্ঞানিক ফনমেরিং ও ফিশার বারবিচ্যুরেট আবিষ্কার করেন। ১৯০৩ সাল হতে এটা ঔষধ রূপে ব্যবহার হতে থাকে ‘ভারনাল ট্রেড’ নামে। ১৯৪০ সনে গবেষণায় ধরা পড়ে যে, এটা এক আসক্তিজনক দ্রব্য। ট্রাংকুলাইজারসের আবির্ভাব ঘটে ১৯৫০ সনে আমেরিকায়। উদ্ভিদের নির্যাস হতে তৈরি এই ঔষধ ভারতবর্ষে শত শত বর্ষ ধরে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯৩৮-১৯৪৩ সনের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের স্যানডোজ ল্যাবরেটরীর দু’জন কেমিস্ট ড. আলবার্ট হকম্যান ও ডব্লিউ এ স্টোল এল.এস.ডি আবিষ্কার করেন। এটা বন্দীদের নিকট হতে তথ্য বের করতে এবং শত্র“দেরকে অসমর্থ করতে ব্যবহৃত হয়। এটা চিকিৎসার কাজেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ‘‘ ঊহপুষড়ঢ়বফরধ ইৎরঃধহহরপধ (১৯৭৮), ঠড়ষ-২০, ঢ়. ৮৩৯’’। বাংলাদেশে ধূমপানের সূত্রপাত হয় সম্ভবত চট্টগ্রাম বন্দরে পর্তুগীজদের আনাগোনার সাথে সাথে। এভাবে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার চুরুটের ব্যবহার ফ্রান্স, স্পেন, বৃটেনসহ বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ‘‘ ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ইৎরঃধহহরপধ (১৯৭৮), ঠড়ষ-২০, ঢ়. ৮৩৯’’ তাই বলা যায়, অতীতকালে বিভিন্ন চিকিৎসার জন্য বেদনানাশক উপকরণ হিসেবে গাঁজা, মদ প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে এর সাথে সংযোজিত হয়েছে হেরোইন, প্যাথিড্রিন, ফেন্সিডিলের মতো মারাত্মক নেশাকর দ্রব্য। আর এই মাদকদ্রব্য ইতিহাসের ক্রমধারায় এখন শহর, নগর, বন্দর, গ্রাম সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে এবং বর্তমান বিশ্ব সভ্যতার জন্য একটি মারাত্মক হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার ও ব্যবহার : মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব, প্রতিক্রিয়া জানা এবং ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বহুকাল পূর্ব থেকে মাদকাসক্তি সমস্যা বিদ্যমান। ৬০০১০০০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে রচিত চর্যাপদে বাংলাদেশের প্রাচীন গুঁড়িখানায় গাছের ছাল-বাকল দিয়ে চোলাই মদ তৈরির তথ্য পাওয়া যায়। ‘‘আবু তালেব, হেরোইন : আর এক মারণাস্ত্র, খুলনা: অমরাবতী প্রকাশনী, ১৯৮৮, পৃ. ১৩৬’’। বাংলাদেশে চোলাই মদ, তাড়ি, গাঁজা ইত্যাদির প্রচলন অনেক পুরানো হলেও এগুলোর ব্যবহার মূলত সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানাদির মধ্যে সীমিত ছিল। ব্যাপকহারে মাদকের বিস্তার এবং প্রযুক্তির ছত্রছায়ায় লালিত আধুনিক নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার এদেশে খুব পুরানো নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ নেশাজাতীয় দ্রব্য মরফিন বা হেরোইনের মত স্বর্গানন্দ উদ্রেককারী মায়াবিস্তারকারী নেশা দ্রব্যের অনুপ্রবেশ এদেশে ১৯৮৩ সালের দিকে ঘটে বলে অনুমান করা হয়। ‘‘স্মরণিকা-মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ১৯৯৬, পৃ. ৫৭।’’ বর্তমানে আমাদের দেশে বহুল ব্যবহৃত হেরোইন, প্যাথেড্রিন, ফেনসিডিল, বিয়ার, ব্রান্ডি, হুইস্কি, কোকেন, আফিম, ডায়াজেনাস, নাইট্রোজেনাম ইত্যাদি নেশাজাতীয় দ্রব্যের অনুপ্রবেশ বহিরাগত অপসংস্কৃতির হাত ধরে হয়েছে। বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তির ছত্রছায়ায় প্রস্তুত হয়ে সেগুলো আজ যুব সমাজকে সবচেয়ে বেশী আসক্ত করেছে; ধ্বংস করছে তাদের সত্ত্বাকে, দংশন করছে তাদের আত্মাকে। নেশাজাতীয় দ্রব্য মহামারী আকারে সবচেয়ে বেশী প্রবেশ করেছে তরুণ সমাজে। বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা সম্পর্কে তেমন সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে মাসকাসক্তের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে ১৭ লাখ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতে এই সংখ্যা ১৫ লক্ষ যার মধ্যে ৭০% যুব সম্প্রদায় এবং ১০% নারী। ‘‘যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিবেদন, ১৯৯৪, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ঢাকা, পৃ. ১৯।’’
বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারের ব্যাপক প্রসার ঘটে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে। ১৯৭১ সালের পরবর্তী সময়ে দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন কারণে সমাজ ভারসাম্য চ্যুত হতে থাকলে শিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত তরুণ সমাজ যে উৎসাহ উদ্দীপনায় যুদ্ধে নেমেছিল পরবর্তীকালে সেই উদ্দীপনা নানা কারণে গঠনমূলক দিকে না গিয়ে দিকভ্রষ্ট হয়। কলেজ ও জীবনাচরণের প্রভাবে অনেকেই পোষাক-পরিচ্ছদ ও চালচলনে নতুনত্ব আনার চেষ্টা চালায়। অনুষঙ্গ বিষয় হিসেবে দেখা যায় নেশার ভুবনে তরুণদের বিচরণ। হাল ফ্যাশনের যুগে উচ্চবিত্ত, উচ্চ শিক্ষিত, কিছুসংখ্যক শহুরে পরিবারে মাদক দ্রব্যের ব্যবহার অনেকটা কালচারে পরিণত হতে চলেছে।
বাংলাদেশের ২৫৩০ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েরাই সবচেয়ে বেশী মাদকাসক্ত। এ বয়সীরাই মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩০ ভাগ। আবার এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ছেলে-মেয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত। এদের মধ্যেই প্রায় ৭০ শতাংশ মাদকাসক্ত বলে মনে করা হয়। এদেশের শহুরে যুব শ্রেণী আজ নানাবিধ আর্থ-মনো-সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। এদেশের শহুরে যুবশ্রেণীর মধ্যে এর প্রকোপ বেশী। তবে গ্রামে-গঞ্জেও নেশা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। শহরাঞ্চলের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, পাবনা, রংপুর, যশোর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া ও খুলনা শহরের তরুণদের মাঝে নেশা গ্রহণের প্রবণতা আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ঢাকা শহরেই ১ লক্ষ মাদকাসক্ত রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ‘‘সৈয়দ শওকতুজ্জামান, বাংলাদেশ সামাজিক সমস্যা: স্বরূপ ও সমাধান, ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩, পৃ. ২৬৬।’’ শুধু ঢাকার মোহাম্মদপুরেই ২২ হাজার মাদকাসক্ত রয়েছে বলে ‘‘মুক্তি’’ নামের একটি বে-সরকারী ক্লিনিক উল্লেখ করে। ‘‘এম ইমদাদুল হক, মাদকাসক্তি: জাতীয় ও বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিত, স্মরণিকা-১৯৯৬, পৃ. ১৫।’’ অন্য এক তথ্য অনুযায়ী কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ১২,০০০ জন হেরোইন আসক্ত। কয়েক বছর আগের তথ্যে দেশে ৬০,০০০ লাইসেন্স প্রাপ্ত মদ্যপায়ীর মধ্যে ৪০,০০০ তরুণ বয়সী বলে জানা যায়, আবার ১,০০০ জন মদ্যপায়ীর মধ্যে ১০ জনের বেশীর লাইসেন্স নেই। ‘‘দৈনিক জনকণ্ঠ, ২২ এপ্রিল, ১৯৯৮, পৃ. ৪।’’ অন্য এক তথ্যে জানা যায় প্রতি ২,৪৪৩ মদ্যপায়ীর মধ্যে প্রায় ২৮৫ জন অর্থাৎ ১১.৬৭% ছাত্র। ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা সংখ্যা- ৬৮, ২০০০, পৃ. ১৭৮।’’ পেশা অনুযায়ী মাদকাসক্তের হার ‘‘স্মরণিকা-২০০০, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পৃ. ২২।’’ বিভিন্ন কর্মচারী ৪৫%, ব্যবসায়ী-১৯%, চোরাচালানী-৫%, ছাত্রী-৬%, ছাত্র-৬%, বেকার- ১৫%, অন্যান্য ৫%। প্রথম পর্যায়েই ছাত্রদের সংখ্যা প্রায় ৬ শতাংশ। বিশ্বে মাদকাসক্তি বৃদ্ধির হার ২% ভাগ; বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার ৩.৮% অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ। ‘‘স্মরণিকা-২০০০, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পৃ. ৩০।’’ ঠিক এই হারটির সাথে তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকে এদেশের ছাত্রসমাজে মাদকাসক্তির প্রবণতাও। উপর্যুক্ত তথ্যাবলীর বেশিরভাগই আজ থেকে ১৫২০ বছর পূর্বের। বর্তমানে এই সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনুমিত হয়। তবে বাংলাদেশে এ ব্যাপারে কোন ধারাবাহিকতা পরিসংখ্যান নেই বলে সঠিক তথ্য পাওয়া দুষ্কর।
মাদকাসক্তির কারণ : মাদকদ্রব্যে আসক্ত হওয়ার পেছনে একক কোন কারণ দায়ী নয়। কিন্তু তারপরেও বলতে হয় এর মূলে রয়েছে এর সহজ প্রাপ্তি। পেছনে রয়েছে এক সংঘবদ্ধ মাফিয়া চক্র যারা সুকৌশলে এবং কেবল নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য এটিকে বাজারে ছাড়ছে। একজন সমাজবিজ্ঞানীর মতে, মাদকাসক্তি হল বাজার অর্থনীতির কুফল যেখানে একদল স্বার্থান্বেষী কালো টাকা লাভের আশায় সে কাজ করছে; পিছনে রয়েছে আরো নানা আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্বিক কারণ। ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮২।’’  স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে শহরায়ন ও নগরায়নের ফলে সৃষ্ট জটিলতা, ছাত্র-রাজনীতিতে ঢুকে পড়া কু-প্রভাব, রাজনীতিবিদদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া, আধুনিকতার নামে উচ্ছৃঙ্খল হওয়া, সন্ত্রাস, হতাশা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদি মানুষকে মাদকাসক্ত হতে সাহায্য করেছে। এছাড়া বন্ধু-বান্ধবের কুসংসর্গ, পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতা, মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হওয়া এবং মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা এগুলো সমাজে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, সচ্ছল পরিবারের ছেলে-মেয়েদের মধ্যেই মাদকদ্রব্য সেবনের প্রবণতা বেশী। ধনীর দুলাল-দুলালীদের কাছে এটি আভিজাত্যের প্রতীক। সুখের হতাশায় মাদকদ্রব্যের সম্মোহনে হারিয়ে যেতে এরা ভালবাসে। মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে এরা আনাবিল আনন্দ উপভোগ করে। রক্ত প্রবাহে মাদকদ্রব্যের জৈব রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া এদেরকে প্রদান করে এক উষ্ণ অনুভূতি। এই পুলক অনুভূতি, স্বপ্নিল তন্দ্রাচ্ছন্নতা ও নষ্ট আনন্দ এক সময় তাকে আসক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। ‘‘স্মরণিকা-১৯৯৩, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা, পৃ. ৭০।’’
এছাড়াও আমাদের দেশে শিক্ষিত সচেতন মাদকাসক্তদের এমন অনেককেই পাওয়া যায় যারা মনে করেন যে মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে মস্তক স্বচ্ছ থাকে, কাজে আনন্দ পাওয়া যায়, সাফল্য আসে। মাদকদ্রব্যের গুণাগুণ সম্পর্কে যুক্তিগুলোর অধিকাংশই দুর্বল মানসিকতার পরিচায়ক। সুতরাং দেখতে পাচ্ছি যে, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি কারণে আমাদের ছাত্র সমাজ মাদকাসক্ত। উল্লেখ্য, মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে একজন ছাত্রের যেমন একটি কারণ থাকতে পারে, তেমনি একাধিক কারণও থাকতে পারে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মাদকাসক্ত হওয়ার পিছনে একাধিক কারণ দায়ী। তবে তার জন্য পরিবারকে সবচেয়ে বেশী দায়ী করা যায়। পারিবারিক স্নেহ, আদর, ভালোবাসা, পারিবারিক অশান্তি এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক অবস্থাকে এর জন্য দায়ী করা যায়।
মাদকাসক্তির প্রভাব : মাদকাসক্তি ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি করে। মাদকাসক্তির ফলে কিশোরের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের পথ প্রথমেই রুদ্ধ হয়ে যায়। ছাত্র হলে সে আর লেখাপড়া করতে সক্ষম হয় না। সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শ ইত্যাদি থেকে বিচ্যুত হয়ে যখন কেউ মাদক অপসংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয় তখন সে প্রকৃতপক্ষে আত্মহননের পথই বেছে নেয়। এভাবে সমাজের সম্ভাবনাময় একটি অংশ যখন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন উন্নত-অনুন্নত যে কোন দেশের জন্যই তা অত্যন্ত ক্ষতিকর। মাদকাসক্তির কিছু প্রভাব নিম্নে বর্ণনা করা হলো: (১) মাদকদ্রব্যের ব্যবহার শারীরিক ও মানসিক দিককে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে তেমনি নৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে ব্যবহারকারীকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। কিছু মাদকদ্রব্য রয়েছে যা গ্রহণ করলে উঠতি বয়সের ছেলে নিজেকে অত্যধিক শক্তিশালী অনুভব করে। আর এই ‘শক্তির’ সাথে বিভ্রান্তির যোগ হলে তখন ঐ তরুণ যে কোন মারাত্মক অপরাধ ও অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে পারে। এদের কেউ কেউ এক পর্যায়ে ছিনতাই, অবৈধ চাঁদা আদায়, চুরি-খুন, মারামারি, কালোবাজারি, দেহ ব্যবসা ইত্যাদি মারাত্মক ও জঘন্য অপরাধমূলক কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। (২) মাদকাসক্তি ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক দিককে ক্রমাবনতির দিকে নিয়ে যায় এবং তাকে অর্থনৈতিক দিক দিয়েও পঙ্গু করে দেয়। সেই সাথে ব্যক্তিকে নি:সঙ্গ ও মর্যাদাহীনের স্তরে নিয়ে আসে। মাদক নির্ভরতা ব্যক্তির স্বাস্থ্যহানি ঘটায়, রোগ ব্যাধি সৃষ্টি করে; ওজনহীনতা, শক্তিহীনতা ও ক্ষুধামন্দায় ভোগায়। এদের কর্মোদ্দীপনা হ্রাস পায়, মতিভ্রম দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যহীন ও কংকালসার হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। (৩) মদ মানুষের শরীরে বহুমুখী ক্ষতিসাধন করে থাকে। মদের প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মানুষের হজম শক্তি বিনষ্ট হয়ে যায়, খাদ্য স্পৃহা কমে যায়, চেহারা বিকৃত হয়ে পড়ে, স্নায়ু দুর্বল হয়ে আসে, সামগ্রিকভাবে শারীরিক অক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, শারীরিক শক্তি-সামর্থ্য লোপ পায়, মানুষ অকর্মণ্য হয়ে পড়ে, মদ যকৃৎ কিডনী সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করে ফেলে, যক্ষ্মা রোগ মদ পানেরই একটি বিশেষ পরিণতি। বর্তমানে এইডস এর প্রাদুর্ভাবেও মদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ‘‘মাসিক অগ্রপথিক, ২২ বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, মার্চ-২০০৭, পৃ. ৮৭-৮৮।’’ মাদকসেবীদের মধ্যে ৯০% বহুগামিতায় অভ্যস্ত। তবে অওউঝ (অপয়ঁরৎবফ ওসসঁহব উবভরপরবহপু ঝুহফৎড়সব) থেকে নিজেকে সংরক্ষণ করতে সমকামিতা, যৌনাচার পরিহার করা অন্যতম উপায়। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৮।’’ তবে ঐওঠ (ঐঁসধহ ওসসঁহব ঠরৎঁং) শরীরে প্রবেশ করলে তার প্রতিষেধক ঔষধ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি।                                      (চলবে)

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি :

Ad

সমাজের উন্নয়নে যারাই কাজ করে গেছেন তাদের জীবন সার্থক -ড. আশ্রাফুল করিম

আ.ন.ম. শফিক চিকিৎসার জধমানুষ তার কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকে, সমাজের কল্যানে যারাই নিজেদের সম্পৃক্ত করে তারাই সফল, তারাই স্বার্থক মানুষ। গত শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ সোলেমান হলে সোহাগ সাহিত্য গোষ্ঠির আয়োজনে মদরিছ মিয়া মাস্টার ট্রাস্টের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব শাফি আহমদের সম্বর্ধনা বিস্তারিত

বিয়ানীবাজারে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ॥ সব বাধা অতিক্রম করে ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা হবে

Education Minister Pic -(2)শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি বলেছেন, বাংলাদেশের হাজার বছরে শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। আমরা পেয়েছে স্বাধীন লাল সবুজের বাংলাদেশ। ১৯৫২ সালে থেকে শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম তার চূড়ান্ত অর্জন হয় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধুদের মাধ্যমে। সব বাধা অতিক্রম করে বিস্তারিত

সাহিত্য সংসদের বইমেলা সমাপনীতে বক্তারা ॥ বইয়ের প্রতি মানুষকে মনোযোগী করতে কেমুসাস বইমেলা নিয়ামক শক্তি

kemusas boimela somaponi picবিভিন্ন আয়োজন ও বইপ্রকাশনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হলো কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ৮ম বইমেলা। গত বৃহস্পতিবার এ সপ্তাহব্যাপী বইমেলা সম্পন্ন হয়। বইমেলার সমাপনী দিনে বক্তারা বলেন, যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে বইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বইয়ের প্রতি মানুষকে মনোযোগী বিস্তারিত

আত্মত্যাগের দীক্ষা : মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা

ফেরদৌস কবির টিপু

১৯৯৫ সালে একদিন গিয়েছি সেগুনবাগিচাস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দেখতে। ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের নানা নিদর্শন দেখছি। হঠাৎ চোখ পড়ল একটা পোস্টারে। বঙ্গবন্ধুর ছবিওয়ালা ছোট্ট একটা পোস্টার। ছবির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর একটা অটোগ্রাফ। ছয়ের দশকে আন্দোলনমুখর উত্তাল সময়ে কোনও এক স্কুলছাত্রীকে তিনি সেটি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু সেই অটোগ্রাফে লিখেছিলেন ‘এৎবধঃ ঃযরহমং ধৎব ধপযরবাবফ ঃযৎড়ঁময মৎবধঃ ংধপৎরভরপব’ (বিশাল ত্যাগের মাধ্যমেই মহৎ কিছু অর্জন করতে হয়)। মনে আছে, তাঁর কথাটা আমার মনে প্রচন্ড আলোড়ন জাগিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ কিনেছিলাম সেই পোস্টারটি। এত বছর পর আজও তাঁর সেই অমোঘ সত্য উচ্চারণ আমাকে অনুপ্রাণিত করে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর বাণীর যথার্থতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি। জগৎজুড়ে অসংখ্য মহামানবের জীবনীতে এর কার্যকর/বাস্তব প্রতিফলন দেখেছি।
দুনিয়াজুড়ে ব্যক্তিক-পারিবারিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে আত্মত্যাগের প্রয়োজনীয়তা এবং মহিমা আমরা সবাই কমবেশি উপলব্ধি করি। ত্যাগ ছাড়া পৃথিবীতে মহৎ কিছুই অর্জিত হয়নি। আমাদের পূর্বপুরুষদের কারও কারও ত্যাগের নিদর্শন হচ্ছে বর্তমান বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক সভ্যতা। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মহামানবের আত্মত্যাগেরই অভিজ্ঞান। আপন সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য পিতামাতার ত্যাগ যেমন প্রয়োজন ঠিক তেমনই জাতীয় জীবনের সমৃদ্ধির জন্যও সমাজের অসংখ্য মানুষকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ও আমাদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল। তাঁরা তাঁদের বর্তমানকে ত্যাগ করেছিলেন আমাদের নিরাপদ বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ করার জন্য। গত পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে আমরা কি তাঁদের সেই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করেছি? আমরা কি তাঁদের ত্যাগ থেকে উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করেছি? আমরা কি একইভাবে (হয়ত ভিন্নমাত্রায় ভিন্ন প্রেক্ষিতে) আমাদের বর্তমানকে উৎসর্গ করছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নততর এবং উজ্জ্বলতর আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে? এ প্রশ্নের উত্তর নিঃসন্দেহে আমাদের সবাইকে হতাশ করে।
’৭১-এ সামষ্টিকভাবে পুরো জাতি অপরিমেয় দুঃখ-দুর্দশা-দুর্গতি ভোগ করেছিল (স্বল্প সংখ্যক রাজাকার/আলবদর ছাড়া)। দেশের সাধারণ মানুষ সারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারেনি-তারাও নানাভাবে দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করেছে। আর যাঁরা জীবন বাজি রেখে সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাঁরা তো জেনেশুনে সচেতনভাবে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল। হাজার হাজার মুক্তিসেনা লাখ লাখ সাধারণ মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল এটা ভেবে যে, তাঁদের উত্তরপুরুষরা একটা স্বাধীন দেশে আত্মমর্যাদা নিয়ে নিরাপদে সুখে শান্তিতে বাস করবে। তাঁদের সেই স্বপ্ন পূরণে আমরা যে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি এ ব্যাপারে আজ আর কেউ দ্বিমত পোষণ করে না। পঁয়তাল্লিশ বছর পর গণতন্ত্রের পয়লা সবক নির্বাচনটাও পাস করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্রিটেনের গ্রানাডা টেলিভিশন ‘ডড়ৎষফ রহ ধপঃরড়হ’ প্রোগ্রামে ‘গধলড়ৎ কযধষবফ’ং ডধৎ’ নামে একটি ডকুমেন্টারি প্রচার করে। ঢাকা, নোয়াখালি, কুমিল্লা, ফরিদপুর এবং সিলেটের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ২নং সেক্টরের বিভিন্ন যুদ্ধের বর্ণনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাতকার নিয়ে সেটি তৈরি করা হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। সেই সেক্টরের একজন সাবসেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপটেন মালেক চৌধুরী। সেই ডকুমেন্টারিতে মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিটিশ উপস্থাপিকা ভানিয়া কিউলির (ঠধহরুধ কবষিবু) কাছে বর্ণনা করেন, কীভাবে পাকসেনারা সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করছে, নারী নির্যাতন করছে এবং কীভাবে তাঁরা পাকহানাদারদের প্রতিরোধ করছেন। ভানিয়া কিউলি এক পর্যায়ে যুদ্ধরত ক্যাপটেন মালেককে প্রশ্ন করেন: ডবষষ পধঢ়ঃধরহ, যিধঃ ধনড়ঁঃ ুড়ঁৎ ভধসরষু? (ভালো কথা ক্যাপটেন, তোমার পরিবারের খবর কী?)। উত্তরে ক্যাপটেন মালেক বলেন ‘ওহ ভধপঃ ও ফড়হ’ঃ শহড়ি যিধঃ’ং যধঢ়ঢ়বহরহম ঃড় ঃযবস. ও যধাব মরাবহ ঁঢ়. ও যধাব ংববহ ঃযব ভধঃব ড়ভ ড়ঃযবৎ ভধসরষরবং যিবহ ধহ (ইবহমধষবব) ড়ভভরপবৎ ফবংবৎঃবফ ধহফ লড়রহবফ ঃযব গঁশঃরভড়ঁল. ডযধঃ যধঢ়ঢ়বহবফ ঃড় ঃযবরৎ ভধসরষরবং? ঞযবু বিৎব ধষষ পধঢ়ঃঁৎবফ ধং ঢ়ৎরংড়হবৎং ধহফ শবঢ়ঃ রহ ঃযব পধহঃড়হসবহঃ. ও ফড়হ’ঃ শহড়ি যিধঃ’ং নববহ ফড়হব ঃড় ঃযবস. কহড়রিহম ধষষ ঃযরং ও ৎধহ ধধিু. ও লঁংঃ মধাব ঁঢ়. ও লঁংঃ ঃযরহশ ড়ভ মড়ফ ধহফ যিধঃবাবৎ মড়ফ ফড়বং. ঞযধঃ’ং ধষষ. ঝড় ও যধাব হড় ৎরমযঃ ঃড় ঃযরহশ ধনড়ঁঃ ঃযবস, ুড়ঁ ংবব. ঝরহপব ও যধাব ংধপৎরভরপবফ ঃযবস যড়ি পধহ ুড়ঁ ঃযরহশ ধনড়ঁঃ ঃযবস হড়’ি? [সত্যি কথা হলো, আমি জানি না আমার পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যে কী ঘটছে। আমি যে আশা (তাদের পাবার) ছেড়ে দিয়েছি। যে সমস্ত (বাঙালি) অফিসার সেনাবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিফৌজে যোগ দিয়েছে তাদের পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছে আমি তা দেখেছি। জানতে চান তাদের কী হয়েছে? তাদের সবাইকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখা হয়েছে। জানি না তাদের ওপর (নির্যাতন) কি করা হচ্ছে। এসব জেনেশুনেই আমি (সেনাবাহিনী থেকে) পালিয়েছি (যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য)। আমি সব আশা ত্যাগ করেছি (পরিবারের জন্য)। আমি শুধু আল্লাহর চিন্তা করি এবং তাঁর ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি। এই হল আমার (পরিবারের) খবর। সুতরাং তাদের নিয়ে চিন্তা করার কোনও অধিকার আমার নেই। যেহেতু আমি তাদের উৎসর্গ করে দিয়েছি (দেশের জন্য), তুমিই বল এখন আমি কীভাবে তাদের নিয়ে চিন্তা করতে পারি?]
মাত্র ২২/২৩ বছরের এই তরুণ ক্যাপটেনের সাহসী মন্তব্য, দেশের মানুষের মুক্তির জন্য নিজ পরিবারকে উৎসর্গ করার অসংকোচ দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথা শুনে আমার চোখে প্রায় জল এসেছিল। এই তরুণের দেশপ্রেমের বিশালতা দেখে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা আপনি নত হয়ে এলো। জানি না সেই তরুণ অফিসার আজও বেঁচে আছেন কি না। তাঁর মতো হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা এভাবেই অকাতরে নিঃশঙ্কচিত্তে আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য হাসিমুখে তাঁদের সর্বস্ব ত্যাগ করে গেছেন।
আমরা কি তাঁদের ত্যাগের উপযুক্ত মূল্যায়ন করেছি? মূল্যায়ন বলতে আমি শুধু পুরস্কারের কথা বলছি না। বলছি তাঁরা যে মহৎ উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, আমরা পরবর্তী প্রজন্মেরা কি জাতির সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছি? মুক্তিযুদ্ধের পঁয়তাল্লিশ বছর পর আমাদের দুঃখিনী বাংলা মা আজ পেট্রল বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। সহজেই অনুমেয় আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি।
প্রশ্ন হল কেন আমরা পারছি না? এ প্রশ্নের হাজারো উত্তর পাওয়া যাবে। বিশেষজ্ঞরাও তাঁদের নানা মত প্রকাশ করবেন। আমি সে-সব বিচার-বিশ্লেষণ না-করে সেই প্রশ্নের একটা সহজ উত্তর নিয়ে দু’টো কথা বলতে চাই। সেটা হল-’৭১-এ যুদ্ধকালীন দেশের জন্য ত্যাগ করার যে মানসিকতা সর্বস্তরের জনমনে তৈরি হয়েছিল-বিজয় অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তা কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। আমরা কেউ-ই সেই ‘আত্মত্যাগের’ চেতনাকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করিনি। অবশ্যই যুদ্ধকালীন ঐক্য, চেতনা এবং শান্তিকালীন দেশপ্রেমের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংকটের সময় মানুষ যেভাবে ত্যাগের বাসনা নিয়ে দেশের মুক্তির জন্য এগিয়ে যায়-ঠিক একইভাবে শান্তিকালীনও একদল মানুষকে আত্মত্যাগের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দেশ-গড়ায় এগিয়ে আসতে হয়। তা না-হলে সেই দেশ-জাতি কাক্সিক্ষত মুক্তি অর্জন করতে পারে না। এক্ষেত্রে আমাদের অর্জন বলা যায় প্রায় শূন্য। স্বাধীনতা পেয়ে আমরা সবাই এখন মত্ত, ছোট্ট দেশের অল্প পরিমাণ সম্পদ যে-যেভাবে পারি নিজেদের ভোগদখলে নিতে। নেতৃত্ব পেয়ে যে নেতা যত বেশি সম্পদ অবৈধভাবে বাগাতে পারে সেই তত শক্তিশালী। দেশের মানুষও তা নির্জীবভাবে কপালের লিখন বলে মেনে নিয়েছে বলে মনে হয়। নেতা হওয়ার পর কেউ যদি বিশাল সম্পদের মালিক না-হতে পারে তবে তাকে তার আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ব্যর্থ হিসেবেই চিহ্নিত করে, এমনকী তার ‘বোকামির’ (!) জন্য হাসিতামাশা করে! কোনও সৎ, দেশপ্রেমিক নেতা যদি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চায় তবে আশেপাশের সবাই অবাক হয়ে শুধোয় ‘নির্বাচন করতে চান? বস্তা বস্তা টাকা আছে?’ আমার এক উচ্চশিক্ষিত আত্মীয় একবার আমাকে বলল ‘অমুক নাকি নির্বাচন করতে চান? জানো কত টাকা লাগবে? পাঁচ কোটি টাকার কম নির্বাচন ‘খেলা’ যাবে না!’ এটাকে সবাই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে ‘নির্বাচন খেলা’! রাজনীতি আর নির্বাচন তাদের কাছে আর দশটা ক্রীড়ার মতো একটা ক্রীড়া! জনসেবা এবং উন্নয়নের ব্রত কি ‘ক্রীড়ার’ মধ্যে থাকে?
প্রশ্ন হল যে মানুষ ৫ কোটি টাকা বিলিয়ে নির্বাচন জিতবে-তাকে দিয়ে কি জনসেবা বা উন্নয়ন হবে? ক্ষমতা পেয়ে যে তার সদ্য বিনিয়োগকৃত ৫ কোটি টাকা উসুল করে আরও ১৫ কোটি কামাবে নাকি এলাকার উন্নয়ন, জনসেবায় মনোসংযোগ করবে? এই অতি সহজসরল ফরমুলাটাও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে উপলব্ধি করতে দেওয়া হচ্ছে না। ভোটাররাও জনসেবা বা উন্নয়ন পাওয়ার আশা ছেড়ে নির্বাচন এলে বিভিন্ন প্রার্থীর কাছ থেকে যে যা পারে টু-পাইস কামিয়ে নেয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে, গ্রামে মহল্লায় রাতে লোকজন পাহারা বসায় (নির্বাচনের ঠিক আগের দিনগুলোতে) যাতে প্রতিপক্ষের প্রার্থীর লোকজন টাকার বস্তা নিয়ে ঢুকতে না পারে। ভোটার প্রতি ৫০০/১০০০ টাকায় (নির্ভর করে প্রার্থী কতটা পয়সাওয়ালা) ভোট কিনে নির্বাচিত নেতা যখন ৫ বছরেই কোটি কোটি (কেউ কেউ শত কোটি) টাকার মালিক হয় তখন সেই একই ভোটার আবার তাকে ‘দুর্নীতিবাজ/চোর/বাটপাড়/থানার দালাল’ বলে গালি দেয়! ‘সত্যি সেলুকাস (!)’ আবারও পুনরাবৃত্তি করতে হয়। কেউ কেউ অবশ্য তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলে, ‘অমুক ভাই পাঁচ বছরেই লাল হয়ে গেছেন (নিশ্চয়ই টাকার গরমে!), বা ‘অমুক ভাই রাইজ করে ফেলেছে, এত টাকা বানাইছে যে তার চৌদ্দপুরুষও খেয়ে শেষ করতে পারবে না। আর এমপি মন্ত্রী না-হলেও চলবে।’ এখানে হাসির বিষয়, বরং বলা যায় নির্মম রসিকতা হল-একদিকে ভোটাররা নিজেদের পবিত্র আমানত ভোটাধিকার পয়সার বিনিময়ে বিক্রি করে, আবার অন্যদিকে সেই জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে ‘আন্তরিক অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক স্বচ্ছ আচরণ বা জনসেবা আশা করে! ভোট-বাণিজ্য এবং জনসেবা/উন্নয়ন যে দুটো বিপরীত মেরুর জিনিস-তা অনেকে অনুধাবন করতেও ব্যর্থ হয়।
ব্রিটিশ টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচারিত সেই অনুষ্ঠানে মেজর (তৎকালীন) খালেদ মোশাররফ বিমর্ষচিত্তে কিন্তু গর্বভরে, যুদ্ধের ফলে সাধারণ মানুষের অসহনীয় দুর্ভোগ এবং ত্যাগের কথা বলেন। উপস্থাপিকা ভানিয়া কিউলির এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কোনও এলাকায় পাক আর্মির বিরুদ্ধে অপারেশন করে ফিরে আসি, পরবর্তীকালে খবর পাই পাক আর্মি সেই এলাকার গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে, নারীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তখন আমাদের ভয় হয় যে, গ্রামের সাধারণ মানুষরা কৃষক মজুররা বোধহয় আর আমাদের আশ্রয় দেবে না-সহযোগিতা করবে না। কারণ আমাদের কর্মকান্ডের জন্য তারা পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতার শিকার হচ্ছে। কিন্তু না, উলটো গ্রামের মানুষ আমাদের বলে যে আমরা যেন পাক আর্মির বিরুদ্ধে আমাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখি। ঞযবু ংঃরষষ ধিহঃ ঃযধঃ বি ংযড়ঁষফ মড় রহঃড় ধপঃরড়হ (রহ ঃযবরৎ ধৎবধং)… বাবহ রভ ঃযবু যধাব ঃড় ংধপৎরভরপব বাবৎুঃযরহম. ঞযবু ঃবষষ ঁং, ঃযবু (চধশ অৎসু) পধহহড়ঃ ঃধশব ঃযব ংড়রষ ড়ঁঃ ড়ভ ড়ঁৎ পড়ঁহঃৎু. ঊাবহ রভ ঃযবু শরষষ ঁং ধষষ বি ড়িহ’ঃ ষবঃ ঃযবস ঃধশব ড়ঁৎ ংড়রষ. খবঃ ঃযব ংড়রষ ৎবসধরহ.
[তারা (জনগণ) তবু চায় আমরা তাদের এলাকায় অপারেশন করতে যাই, যদিও তাদেরকে সবকিছু ‘ত্যাগ’ করতে হবে। তারা বলে ওরা (পাক আর্মি) আমাদের মাটি নিতে পারবে না। ওরা যদি আমাদের সবাইকে মেরে ফেলে তবু ওদেরকে আমাদের মাটি নিতে দেবো না। আমাদের মাটি আমাদেরই থাকবে।]
ভাবতে অবাক লাগে, যে দেশের মানুষ মাত্র ৪৫ বছর আগে দেশের জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল-সেই দেশের এক শ্রেণির মানুষ আজ কীভাবে টাকার বিনিময়ে তাদের পবিত্র আমানত ভোটাধিকার বিক্রি করে। কোথায় গেল সেই ত্যাগ? আজ আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, বিশেষ করে সুশিক্ষিত সচেতন মানুষের উচিত সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। জাতীয় সংকটের সময় যে ত্যাগ-তিতিক্ষার আকাক্সক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে, শান্তিকালীনও ঠিক একই রকম আত্মত্যাগের অনুভূতি চেতনা অন্তত সমাজের একটা অংশের মধ্যে সদা জাগ্রত থাকতে হবে। তা না-হলে, দেশ-জাতির মুক্তি স্বপ্ন-স্বপ্নই থেকে যাবে। কোনও তন্ত্রমন্ত্রই কাজ দেবে না যদি না অন্তত জাতীয় নেতৃত্বের একটা অংশের মধ্যে আত্মত্যাগের চেতনা থাকে, যা দেশের সাধারণ মানুষকে দেশ গড়ার কাজে উজ্জীবিত করবে। নিঃসন্দেহে এটা একটা সুকঠিন কাজ। কারণ শ্রেষ্ঠ মানবীয় গুণাবলি যেমন সততা, দেশপ্রেম, পরার্থপরতা বা আত্মত্যাগের প্রশংসা করা যত সহজ, তা চর্চা করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। আমার মতে, এটা মানবচরিত্রের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য, যে মানুষ সর্বদা অন্য সৎ, ত্যাগী, পরোপকারী মানুষের প্রশংসায় পঞ্চমুখ-সেই মানুষ নিজে সৎ, ত্যাগী, দেশপ্রেমিক, পরোপকারী হতে চায় না। কিন্তু এ সুকঠিন কাজটিই আমাদের করতে হবে।
আত্মত্যাগের দীক্ষাই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিক্ষা দিয়েছে। এ শিক্ষাকে আত্মস্থ না-করলে আমাদের পরিত্রাণ নেই। পৃথিবীর সব উন্নত জাতিই তাদের মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইতিহাসে তার নজির ভুরি ভুরি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ব্রিটেন প্রবাসী।

মজুদদারীর প্রভাব ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

সা মাজিক জীব হিসেবে মানুষ সমাজবদ্ধভাবে একত্রে মিলেমিশে বসবাস করে। প্রয়োজনের তাগিদে একে অন্যের সাথে পারস্পরিক লেনদেন এবং জিনিসপত্রের আদান-প্রদান করে থাকে। প্রাত্যহিক লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্যবসায়-বাণিজ্য। ব্যবহারিক জীবনে ব্যবসায়-বাণিজ্যে পণ্য ও মূল্যের বিনিময় হয়ে থাকে। ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে পণ্য ও মূল্যে যৌক্তিক বিনিময় আদান প্রদান হওয়া কাম্য হওয়া সত্ত্বেও যখন বিক্রেতা অতি মুনাফার লোভে চড়ামূল্যে বিক্রয় করার জন্য পণ্য সামগ্রী কুক্ষিগত করে, তখন একে বলে মজুদদারি। এর ফলে পণ্যের মূল্য বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায় এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
পারস্পরিক সম্পর্ক ও লেনদেনের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার স্বার্থে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ইসলাম নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে ব্যবসায়-বাণিজ্য। মাওজুদ ও মজুদ শব্দ থেকে মজুদদারি শব্দটি এসেছে। মাওজুদ অর্থ হচ্ছে, সঞ্চিত, জমা, হাজির, উপস্থাপিত ইত্যাদি। আর মজুদদারি অর্থ হচ্ছে, দ্রব্যাদি অন্যায়ভাবে মজুদ বা জমা রাখা। যে ব্যবসায়ী অন্যায়ভাবে দ্রব্যাদি মজুদ করে রাখে তাকে মজুদদার বলা হয়। মজুদদারি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ক্রেতা ও বিক্রেতার উপর নির্ভর করে এর ধরনের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে কয়েকটি ধরন উপস্থাপিত হলো- আংশিক মজুদদারি: অল্প সংখ্যক উৎপাদনকারী বা বিক্রেতা কোন একটি নির্দিষ্ট পণ্য মজুদ করে রাখবে। আর তাদের এই মজুদের কারণে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পাবে। পারস্পরিক মজুদদারি: বিক্রেতা বা উৎপাদনকারী নির্দিষ্ট একটি পণ্য আটকে রাখবে। আর এই পণ্যের ক্রেতা থাকবে একজন। ক্রেতাও এই পণ্যের ক্রয় আটকে রাখবে। এখানে পণ্যের মূল্য এই ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে পারস্পরিক দরকষাকষির উপর নির্ভরশীল থাকবে।
কোন ব্যক্তি একটি পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রয় আটকে রাখবে। আর এই পণ্যের বিকল্প দেশের ভিতরে বা বাইরে কোথাও পাওয়া যাবে না। রাষ্ট্রীয় মজুদদারি: কোন রাষ্ট্র কোন একটি পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করবে। পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি বা পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কখনো পণ্যের উৎপাদন কমিয়ে দিবে বা সরবরাহ যাতে ব্যাহত হয়, সে জন্য বিভিন্ন অপকৌশল গ্রহণ করবে। মজুদদারা হিংস্র মনোভাব পোষণকারী হয়ে থাকে। এরা সব সময় উচ্চ মূল্যের প্রত্যাশায় থাকে। এরা যদি কখনো শুনতে পায় যে, পণ্যমূল্য কমে গেছে, তাহলে বিষণœ হয়ে পড়ে। আর যদি শুনতে পায় মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে তাহলে উল্লসিত হয়। এ জন্য অন্য আরেক হাদীসে এসেছে, পণ্য মজুদকারী ব্যক্তির উপর সমস্ত সৃষ্টিকুলের অভিসম্পাত বর্ষিত হয়।
বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের অর্থব্যবস্থা চালু রয়েছে। অর্থব্যবস্থার ভিন্নতার প্রেক্ষিতে মজুদদারিতেও বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় রাষ্ট্র দ্রব্যসামগ্রী মজুদ করে রাখে। আবার পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তি পণ্য মজুদ করে থাকে। তবে দুই অর্থব্যবস্থাতেই মজুদদারির পরিণতি ভয়াবহ। এ ছাড়াও আরো কিছু ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।  যেমন- ব্যক্তি ও রাষ্ট্রসমূহের মাঝে প্রতিযোগিতার মনোভাব নষ্ট হয়ে যায়। কেননা প্রতিযোগিতা না থাকলে ব্যবসায়-বাণিজ্যে গতি সঞ্চার হয় না এবং উৎপাদনও বৃদ্ধি পায় না। ফলে জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমে যাওয়ার আশংকায় আমদানীকৃত পণ্য সামগ্রী ধ্বংস করে দেয়া হয়। কেননা আমদানীকৃত পণ্যের অবাধ প্রবাহের ফলে দ্রব্যমূল্য কমে যায়। মুনাফা স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীরা আগুনে পুড়িয়ে বা সমুদ্রে ফেলে পণ্য ধ্বংস করে। ফলে খাদ্যের মারাত্মক সংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মজুদদারি সমাজে লোভ, হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ার কারণ হয়। ফলে সামাজিক মূল্যবোধ হ্রাস পায়। মানুষের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এক সময় সমাজের কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়।  সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব বেড়ে যায়। ফলে আইন শৃংখলার মারাত্মক অবনতি ঘটে। আর অর্থনীতিতে চরম মন্দা ও অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করে।
ঊধংঃ ইবহমধষ অপঃ এর আওতায় অত্যাবশকীয় কিছু পণ্যের সরবরাহ, বিতরণ এবং মজুদ নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৫৩ সালে ঞযব ঊংংবহঃরধষ অৎঃরপষবং (চৎরপব ঈড়হঃৎড়ষ ধহফ অহঃর-ঐড়ধৎফরহম) অপঃ, ১৯৫৩ শিরোনামে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয। এই আইনের অধীনে অত্যাবশকীয় পণ্য বলতে ঞযব ঈড়হঃৎড়ষ ড়ভ ঊংংবহঃরধষ ঈড়সসড়ফরঃরবং অপঃ, ১৯৫৬ এর ধারা ২ এ উল্লেখিত পণ্যসমূহকে বুঝানো হয়েছে। ধারা ৮ অনুযায়ী কোন ব্যবসায়ী সরকার কর্তৃক দেয় পূর্ব কর্তৃত্ব ছাড়া কোন ব্যক্তির কাছে কোন অত্যাবশকীয় পণ্যের বিক্রি আটকে রাখতে পারবে না বা বিক্রি করতে অস্বীকার করতে পারবে না।
ঞযব ঊংংবহঃরধষ অৎঃরপষবং (চৎরপব ঈড়হঃৎড়ষ ধহফ অহঃর-ঐড়ধৎফরহম) অপঃ, ১৯৫৩ এর ধারা ৩ অনুযায়ী সরকার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সময়ে সময়ে খুচরা, পাইকারি বা অন্য কোন ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রির ক্ষেত্রে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থাভেদে বিভিন্ন এলাকায় আলাদা আলাদা মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে। জনগণের সুবিধার্থে সরকার ব্যবসায়ীদেরকে পণ্যের নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদেশ প্রদান করতে পারবে। ব্যবসায়ীগণ সুবিধাজনক জায়গায় বা নিজেদের দোকান ও গুদামের সামনে পণ্যের সর্বোচ্চ মূল্য তালিকা প্রদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য থাকবে। নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রয়ের তারিখ ও মেয়াদও সরকার নির্ধারণ করে দিতে পারবে। “ঞযব ঊংংবহঃরধষ অৎঃরপষবং (চৎরপব ঈড়হঃৎড়ষ ধহফ অহঃর-ঐড়ধৎফরহম) অপঃ, ১৯৫৩” যদি কোন ব্যক্তি এই আইনের কোন বিধান লঙ্ঘন করে তবে সে ঞযব ঐড়ধৎফরহম ধহফ ইষধপশ গধৎশবঃ অপঃ, ১৯৪৮ এর ৩নং ধারার অধীনে শাস্তি যোগ্য অপরাধী বিবেচিত হবে।
ঞযব ঈড়হঃৎড়ষ ড়ভ ঊংংবহঃরধষ ঈড়সসড়ফরঃরবং অপঃ, ১৯৫৬ অনুযায়ী সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের পণ্যকে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে অতি জরুরী বলে ঘোষণা করতে পারে এবং অন্য যে কোন পণ্যের উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ, ব্যবহার এবং ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ আইনের আওতায় কিছু পণ্যের বিপণনের ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রদান এবং মূল্য নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রির বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। “ ঞযব ঈড়হঃৎড়ষ ড়ভ ঊংংবহঃরধষ ঈড়সসড়ফরঃরবং অপঃ, ১৯৫৬ এর ৩নং ধারা” ধারা ৬ অনুযায়ী উক্ত আইন ভঙ্গকারীর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর কারাদন্ড অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে।
আলিমগণের সর্বসম্মত মত হলো, যদি সর্বসাধারণের উপর দুর্ভিক্ষের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে বা নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর ঘাটতি দেখা দেয় এবং সর্বসাধারণের মাঝে হাহাকার লেগে যায়, তখন সরকার ন্যায্য মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করতে মজুদদারদের বাধ্য করতে পারবে। বাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে। অতি মুনাফার লোভে খাদ্য সামগ্রী আটক রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপরাধে সরকার ব্যবসায়ীকে শাস্তিও প্রদান করতে পারবে। ইমাম ইবনে আবেদীন র. তাঁর রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেন, মজুদদারির কারণে দেশে খাদ্য শস্যের অভাবে চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সরকার মজুদদার শ্রেণিকে তাদের প্রয়োজনীয় খোরাকী রেখে অবশিষ্ট সমস্ত সম্পদ ন্যায্য মূল্যে বাজারজাত করতে নির্দেশ প্রদান করবে। সরকারের নির্দেশ অগ্রাহ্য করলে সরকার শক্তি প্রয়োগ করে দেশের সকল হাট-বাজারে সুলভ মূল্যে তাদের গুদামজাত খাদ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করবে। এমনকি অভাবের কারণে জনগণ নগদ মূল্য পরিশোধ করতে অক্ষম হলে তাদের সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত মেয়াদ ধার্য করে বাকীতে খাদ্য হস্তান্তর করবে। পরে তাদের হাতে খাদ্য শস্য আসলে সরকার তাদের নিকট থেকে তা উসূল করে দাতার নিকট পৌঁছি দিবে।
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী সহজলভ্য ও ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা সরকারের দায়িত্ব এবং ভোক্তা শ্রেণীর অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থাপনা মজুদদার লুটেরাদের হাতে কুক্ষিগত। অতি মুনাফাখোর অসাধু একদল ব্যবসায়ীর যাঁতাকলে আজ সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত। অসাধু ব্যবসায়ী শ্রেণি সিন্ডিকেট করে পণ্য গুদামজাত করে রাখে এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে পণ্যের মূল্য নিজেদের ইচ্ছাকৃত নির্ধারণ করে। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ভোক্তা সাধারণ যথেষ্ট মনে করেন না। কখনো অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী শ্রেণীর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশ থাকার কথাও গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে দেখা যায়। কর্তৃপক্ষের এই দুর্বলতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে দফায় দফায় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে। ফলে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। আর ক্রেতা সাধারণ আকাশ ছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের কারণে হয়ে পড়ে দিশেহারা। বিশেষত রমযান ও ধর্মীয় উৎসবগুলোতে বাজার ব্যবস্থাপনায় শোচনীয় অবস্থা বিরাজ করে। তখন কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় সকল পণ্য মজুদ করে রাখে। এতে অস্বাভাবিকভাবে পণ্যের মূল্য হু হু করে বাড়তে থাকে। ভোক্তা শ্রেণী প্রয়োজনের তাগিতে চড়ামূল্যে পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতে বাধ্য হয়। ফলে এ সুযোগে অতি মুনাফাখোর একদল অসাধু ব্যবসায়ী সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। আর সাধারণ মানুষ চড়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করে নিঃস্ব থেকে আরো নিঃস্বতর হয়। এ সমস্যা নিয়ে প্রিন্ট মিডিয়ায় অনেক লেখালেখি হয় এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বহু সচিত্র প্রতিবেদন ও প্রচার হয়। বিভিন্ন সময়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়। সেমিনারে এ সমস্যা নিরসনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয় এবং সুপারিশমালা গ্রহণ করা হয়। তখন সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মজুদদারি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণের নানা কথা বলে থাকেন এবং ব্যবসায়ীরা বহু প্রতিশ্র“তি দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে এ সমস্যার প্রতিকার সামান্যই পরিলক্ষিত হয়।
কৃত্রিম সংকট তৈরী করে বেশি মুনাফা অর্জন করা বা দুর্ভিক্ষের অপেক্ষায় থেকে পণ্য চড়া মূল্যে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে পণ্য সামগ্রী মজুদ রাখা একেবারেই নিষিদ্ধ। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় অল্প দিনের জন্য মজুদ করা হলে তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। আর যদি বেশি দিন মজুদ করে রাখা হয় তাহলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। কোন কোন আলিমের মতে, সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে চল্লিশ দিন। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি চল্লিশ রাত্র খাদ্যশষ্য মজুদ করে রাখল, সে আল্লাহ থেকে সম্পর্কহীন হয়ে গেল এবং আল্লাহও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন”। আবার কেউ বলেছেন, এক মাস। কেননা এক মাসের নিচে হলে তা কম হিসেবে ধরা হয়। আর এক মাসের বেশি হলে তা সর্বোচ্চ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু চল্লিশ দিনের অধিক রাখলে দুনিয়াতে তাকে শাস্তি দিতে হবে। মোটকথা শরীয়তের দৃষ্টিতে খাদ্য সামগ্রী ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য আটক রাখা সমীচীন নয়।
মানুষ ও চতুষ্পদ জীব-জন্তুর খাদ্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রচুর পরিমাণে কিনে মজুদ করে চড়া মূল্যের অপেক্ষায় বাজারজাত করা থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পণ্য মজুদ করে রাখার অনুমতি আছে। যেমন- নিজের জমির উৎপাদিত ফসল মজুদ করে রাখা যাবে। অনুরূপভাবে পরিবারের বাৎসরিক ব্যয়ভার বহনের প্রয়োজনীয় পরিমাণ পণ্য মজুদ রাখা যাবে। কেননা উমর রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বনী নযীরের খেজুর গাছ বিক্রি করে দিয়েছিলেন এবং তাদের এক বছরের খাদ্য সামগ্রী তার পরিবারের জন্য মজুদ করে রেখে দিয়েছিলেন”। মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তুর খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া অন্য জিনিসপত্র যা মৌলিক প্রয়োজনে পড়ে না, তা মজুদ করা যাবে। নিজ শহর থেকে নয় বরং দূরবর্তী শহর- যেখান থেকে সাধারণত সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আসে না, সেখান থেকে আমদানী করে মজুদ করে রাখা যাবে। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ এড়াতে অথবা অতিরিক্ত মৌসুমী উৎপাদন অন্য মৌসুমে সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে সরকার প্রয়োজনীয় পরিমাণ পণ্য সামগ্রী মজুদ করতে পারবে। তবে যে কোন অবস্থায় যদি মানুষ বা পশুর প্রয়োজনে মজুদকৃত পণ্য বিক্রির প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে পণ্য সামগ্রী আটকে না রেখে প্রয়োজন ও মানবিক দিক বিবেচনা করে সুলভ মূল্যে বিক্রি করে দেয়া কর্তব্য।
মজুদদারির ফলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যে অস্থিতিশীল ও অরাজকতাপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তা অর্থব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। আর সামাজিক কর্মকান্ডে যে নৈরাজ্যকর ও বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তা সমাজ ব্যবস্থাকে পর্যুদস্ত করে ফেলে। ইসলাম এ ক্ষেত্রে শাশ্বত ও যুগোপযোগী বিধান দিয়েছে। মজুদদারিকে নিষিদ্ধ করেছে এবং এ অবস্থা নিরসনে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়াও এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আরো কিছু পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন: সরকার মজুদদারির কুপ্রভাব সর্বসাধারণের সামলে তুলে ধরবে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী বিধি-নিষেধগুলো প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মজুদদারদেরকে শরয়ী নির্দেশনা পালনে পদক্ষেপ নিবে এবং ভোক্তাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকবে। দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলে সরকার মজুদদারদেরকে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মজুদকৃত পণ্য সুলভ মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করবে। মুজদদার শ্রেণী যদি তা অস্বীকার করে, তাহলে জনসাধারণের দু:খ-দুর্দশা লাঘবে এবং তাদের স্বার্থ ন্যায়সঙ্গতভাবে রক্ষার উদ্দেশ্যে সরকার মজুদকৃত পণ্য সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করে তা ন্যায্য মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সরকার নিত্য প্রয়োজনীয় সে সকল পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে যা মজুদদারির কারণে দু®প্রাপ্য এবং দেশের অভ্যন্তরে সব পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাবে। সরকার অন্যান্য দেশের সাথে পণ্য বিনিময় করবে বা তাদেরকে ব্যবসায়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। বিশেষত দু®প্রাপ্য পণ্য সামগ্রী বাণিজ্যিকীকরণে তাদের উৎসাহিত করবে এবং পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করবে। যদি মুজদদারির কারণে পণ্য সামগ্রীর মূল্য বেড়ে যায় এবং বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সরকার ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শক্রমে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দিবে। আর মজুদদার শ্রেণিকে পণ্য ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করবে। কিন্তু বাজার যখন স্থিতিশীল হয়ে যাবে তখন ক্রেতা-বিক্রেতাকে স্বাধীনতা দেয়া হবে, যাতে তাদের চাহিদার আলোকে পণ্য মূল্য নির্ধারিত হয়। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করবে। মনিটরিং সেলের অধীনে নিজস্ব জনবল দিয়ে প্রতিনিয়ত বাজার পরিদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যদি পরিদর্শকদলের নিকট কোন অনিয়ম পরিলক্ষিত হয় তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। খাদ্য নিজস্ব উদ্যোগে আমদানীর জন্য সরকার একটি বোর্ড গঠন করতে পারে। এ বোর্ডের মাধ্যমে পণ্য আমদানী করবে বা যারা পণ্য আমদানী করবে এ বোর্ড তাদের মনিটরিং করবে। এতে আমদানীকারকরা বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ নিতে পারবে না। এ সকল পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নৈরাজ্যকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে একটি সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করবে এবং ক্রেতা-বিক্রেতার অধিকার সুনিশ্চিত হবে।
ইসলাম মানব জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলাম যুগোপযোগী বিধান দিয়েছে। ব্যবসায়-বাণিজ্যের মত অতীব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ডেও কল্যাণকর নীতি-আদর্শ উপহার দিয়েছে। এ নীতির অন্যতম দিক হলো- মজুদদারি, মুনাফাখোরী, কালোবাজারী ও যে কোন প্রতারণামূলক ব্যবসায়-বাণিজ্যের নিষিদ্ধকরণ। ইসলাম অতি মুনাফার লোভে প্রতারণা করে ও অপকৌশল অবলম্বন করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী আটক রাখাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আধুনিক কালেও যেখানে পৃথিবীর নানা স্থানে মজুদদারির প্রভাবে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে জনসাধারণ বিপর্যপ্ত, সেখানে ইসলাম বহুকাল পূর্বেই এর আইনগত বিধান বর্ণনা করে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের অধিকার নিশ্চিত করেছে। পরিশেষে আমরা বলতে পারি, ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় যদি ব্যবস্থায়-বাণিজ্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা হয় তাহলে শুধু মজুদদারির অপতৎপরতাই নয় ব্যবসায়-বাণিজ্যে কোন ধরণের নৈরাজ্য থাকবে না।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

চিকিৎসা সেবা ও মানব কল্যাণে পূবালী ব্যাংকের দান-অনুদান অব্যাহত থাকবে – হাফিজ মজুমদার

Pubali Bankসামাজিক ও মানবিক সেবায় আরো একটি বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো পূবালী ব্যাংক লিমিটেড। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরীর পুরানলেনস্থ ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিলেট ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ এম.এ. রকিবের হাতে এক কোটি এগারো লক্ষ পয়ঁত্রিশ হাজার টাকার চেক প্রদান করেন বিস্তারিত

প্রকাশিত সংবাদের একাংশের সাথে ভিন্ন মত

গত ১৯ মার্চ দৈনিক কাজিরবাজার পত্রিকায় “তেতলীর উছমান চেয়ারম্যানের বাড়িতে বিএনপি-জামায়াতের হামলা ভাংচুর লুটপাট” প্রথম পৃষ্টায় শিরোনামে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তার ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন মোঃ আব্দুল মুমিন ছইল মিয়া। তিনি লিখিত বক্তব্যে জানান, আমি দক্ষিণ সুরমা বিএনপির সহ-সভাপতি ও আমার নেতৃত্বে ২৫/৩০ জনের বিস্তারিত

দেশকে এগিয়ে নিতে সকলের মধ্যে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা থাকতে হবে -কেয়া চৌধুরী এমপি

SAM_1014সংরক্ষিত আসনের (সিলেট-হবিগঞ্জ) সংসদ সদস্য এডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী গত শনিবার দক্ষিণ সুরমার তেতলী ইউনিয়নের ধরাধরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর উদ্বোধন ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। বিস্তারিত