বিভাগ: ভেতরের পাতা

নারীর অর্থনৈতিক অধিকার

॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥

অর্থ ছাড়া মানবজীবন চলতে পারে না। মানবজীবনে অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা, মানুষের মৌলিক অধিকার। এগুলোর যোগান দিতে মানুষকে অর্থ উপার্জনের পন্থা বেছে নিতে হয়। অর্থ উপার্জন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষ স্বাভাবিক ভাবে দু-ধরণের পেশা অবলম্বন করে থাকেন। চাকরি বা ব্যবসায়। তবে সেই চাকরি ও ব্যবসাও হতে হবে বৈধ। আর এদুটোই হচ্ছে অর্থ উপার্জনের বৈধ পন্থা। অর্থ উপার্জনের মাধ্যম ছাড়া কারো পক্ষেই এসব মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। অর্থনীতি মানবজীবনের জীবিকানির্বাহের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই আল্লাহ তা‘আলা ফরয ইবাদত সমাপনান্তে জীবিকা নির্বাহে উপার্জন করার লক্ষ্যে যমিনে বিচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, অর্থাৎ‘‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর, এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সুরা: জুমুআ ১০)
ইসলাম সর্বদা নারীদের শালীন পরিবেশে শিক্ষা, কাজ ও চলাফেরার কথা বলে। শরিয়ত নির্ধারিত গণ্ডির মধ্যে থেকে নারীরা অবশ্যই শিক্ষা অর্জনসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ইসলাম কোথাও নারীকে বন্দি করে রাখার কথা বলেনি। ইসলাম নারী শিক্ষার প্রতি যেমন গুরুত্বারোপ করেছে তেমনি নারী-পুরুষের ভোটাধিকারেও কোনো ধরনের পার্থক্য সৃষ্টি করেনি। এমনকি ইসলাম নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকারও প্রদান করেছে। কোরআনে কারিমের সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি ব্যবসাকে হালাল করেছি এবং সুদকে হারাম করেছি।’ এই আয়াতে ব্যবসা হালাল হওয়া এবং সুদ হারাম হওয়া নারী-পুরুষের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। একজন পুরুষ হালাল পন্থায় যেসব ব্যবসা করতে পারবে। নারীও সে ধরনের ব্যবসা করতে পারবে। সে বিবাহিত হোক কিংবা অবিবাহিত হোক। সে তার অর্জিত সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী। সে কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই তার সম্পত্তির ব্যাপারে সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, যা একজন পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। কোরআন ও হাদিসের কোনো স্থানে নারীর কাজকর্মের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ আরোপিত হয়নি। শুধু দু’টি বিষয়ের প্রতি সঙ্গত কারণে নির্দেশ দিয়েছে। শর্ত দু’টি হলো প্রথমত, ব্যবসা হতে হবে হালাল পদ্ধতিতে ও শরিয়ত নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে। দ্বিতীয়ত, পর্দা রক্ষা করতে হবে। তাছাড়া ইসলাম নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী কোনো পেশায় নিয়োজিত হতেও নিষেধ করেছে। বর্তমান যুগ অর্থনৈতিক যুগ, অর্থের প্রয়োজন আজ যেন পূর্বাপেক্ষা অনেক গুণ বেশি বেড়ে গেছে। অর্থ ছাড়া এ যুগের জীবন ধারণ তো দূরের কথা শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণও যেন সম্ভব নয় এমনি এক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে জীবন ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে। তাই পরিবারের একজন লোকের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা, এক ব্যক্তির উপার্জনে গোটা পরিবারের সব রকমের প্রয়োজন পূরণ করা আজ যেন সুদূরপরাহত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের লোকদের মনোভাব এমনি। তারা মনে করে, জীবন বড় কঠিন, সংকটময়, সমস্যা সংকুল। তাই একজন পুরুষের উপার্জনের উপর নির্ভর না করে ঘরের মেয়েদের-স্ত্রীদের উচিত অর্থোপার্জনের জন্য বাইরে বেরিয়ে পড়া। এতে করে একদিকে পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারে স্বামীর সাথে সহযোগিতা করা হবে, জীবন যাত্রার মান উন্নত হবে। অন্যথায় বেচারা স্বামীর একার পক্ষে সংসার সুষ্ঠভাবে চালিয়ে নেয়া কিছুতেই সম্ভব হবে না। আর অন্যদিকে নারীরাও কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের কর্মক্ষমতার বিকাশ সাধনের সুযোগ পাবে। এ হচ্ছে আধুনিক সমাজের মনস্তত্ত্ব। এর আবেদন যে খুবই তীব্র আকর্ষণীয় ও অপ্রত্যাখ্যানীয়, তাতে সন্দেহ নেই। এরই ফলে আজ দেখা যাচ্ছে, দলে দলে মেয়েরা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ছে। অফিসে, ব্যবসাকেন্দ্রে, হাসপাতালে, উড়োজাহাজে, রেড়িও, টিভি স্টেশনে- সর্বত্রই আজ নারীদের প্রচন্ড ভিড়। এ সম্পর্কে দুটো প্রশ্ন অত্যন্ত মৌলিক, একটি পারিবারিক-সামাজিক ও নৈতিক আর দ্বিতীয়টি নিতান্তই অর্থনৈতিক। নারী সমাজ আজ যে ঘর ছেড়ে অর্থোপার্জন কেন্দ্রসমূহে ভিড় জমাচ্ছে, তার বাস্তব ফলটা যে কী হচ্ছে তা আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। পরিবারের মেয়েরা নিজেদের শিশু সন্তানকে ঘরে রেখে দিয়ে কিংবা চাকর-চাকরানীর হাতে সঁপে দিয়ে অফিসে, বিপণীতে উপস্থিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে দিন রাতের প্রায় সময়ই শিশু সন্তানরা মায়ের স্নেহ বঞ্চিত থাকতে বাধ্য হচ্ছে। আর তারা প্রকৃত পক্ষে লালিত পালিত হচ্ছে, চাকর চাকরানীর হতে। ধাত্রী আর চাকর চাকরানীরা যে সন্তানের মা নয়, মায়ের কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করাও তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়- এ কথা যুক্তি দিয়ে বোঝাবার প্রয়োজন পড়ে না অথচ ছোট ছোট মানব শিশুদের পক্ষে মানুষ হিসেবে লালিত-পালিত হওয়ার সবচাইতে বেশি প্রয়োজনীয় হচ্ছে মায়ের স্নেহ-দরদ ও বাৎসল্যপর্ণ ক্রোড়। অপরদিকে স্বামী ও উপার্জনের জন্য বের হয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছে স্ত্রীও। স্বামী এক অফিসে, স্ত্রী অপর অফিসে, স্বামী এক কারখানা, স্ত্রী অপর কারখানায়। স্বামী এক দোকানে, স্ত্রী অপর এক দোকানে। স্বামী এক জায়গায় ভিন মেয়েদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে কাজ করছে, আর স্ত্রী অপর এক স্থানে ভিন পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে রুজী- রোজগারে ব্যস্ত হয়ে আছে। জীবনে একটি বৃহত্তম ক্ষেত্রে স্বামী আর স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের বন্ধনে ফাটল ধরা ছেদ আসা যে অতি স্বাভাবিক তা বলে বোঝাবার অপেক্ষা রাখে না। এতে করে না স্বামীত্ব রক্ষা পায়, না থাকে স্ত্রীর বিশ্বস্ততা। উভয়ই অর্থনৈতিক প্রয়োজনের দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ, আত্মনির্ভরশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজস্ব পদও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আত্মচিন্তায় মশগুল। প্রত্যেকেরই মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভাবধারায় চালিত ও প্রতিফলিত হতে থাকে স্বাভাবিকভাবেই। অত:পর বাকী থাকে শুধু যৌন মিলনের প্রয়োজন পূরণ করার কাজটুকু। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভের পর এ সাধারণ কাজে পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল হওয়া কতটুকু সম্ভব- বিশেষত বাইরে যখন সুযোগ সুবিধার কোন অভাব নেই। বস্তুত এরূপ অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আকর্ষণ ক্ষীণ হয়ে আসতে বাধ্য। অত:পর এমন অবস্থা দেখা দেবে, যখন পরিচয়ের ক্ষেত্রে তারা পরস্পর স্বামী- স্ত্রী হলেও কার্যত তারা এক ঘরে রাত্রি যাপনকারী দুই নারী পুরুষ মাত্র। আর শেষ পর্যন্ত চুড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তাদের ক্ষেত্রে বিচিত্র কিছু নয়। পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা, সম্প্রীতি, নির্লিপ্ততা, গভীর প্রেম- ভালোবাসা শূন্য হয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে অর্থোপার্জনের যন্ত্র বিশেষে পরিণত হয়ে পড়ে। এ ধরণের জীবন যাপনের এ এক অতি স্বাভাবিক পরণতি ছাড়া আর কিছু নয়।
স্ত্রীর ঘাড়ে অর্থ উপার্জনের বোঝা চালানো: ইসলাম নারীর উপর অর্থনৈতিক কোন দায়-দায়িত্ব চাপায়নি। পরিবারের আর্থিক দায়-দায়িত্ব বহন করা পুরুষের উপর  অর্পিত হয়েছে। সেহেতু নারীকে তার জীবিকার জন্য চাকরি করার প্রয়োজন নেই। তবে পুরুষের উপার্জন যদি সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট না হয় এবং প্রকৃত অভাবের সময়, সংকট কালে উভয়েই চাকরি করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে এমন অবস্থায়ও নারীর স্বাধীনতা রয়েছে। ইচ্ছা করলে সে বাইরে চাকরি করতে পারে, ইচ্ছা করলে নাও করতে পারে। কেউ জোর করে তার ঘাড়ে চাকরির বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে না। চাকরি না করে পুরুষের উপার্জন ভোগ করা তার অধিকার। এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তার ঘাড়ে উপার্জনের বোঝা চাপিয়ে দেয়া অন্যায়, জুলুম। নারীর চাকরি করার অধিকার অবশ্যই আছে। ইসলাম নারীকে বাইরে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। কারণ, ইসলাম  বাস্তব ও প্রাকৃতিক ধর্ম । এর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত, এর আয়তন অতি ব্যাপক। তা মানবীয় প্রয়োজনেও জীবনের সর্বাবস্থায় সাড়া দেয়। অনেক মহিলাকে বাইরে কাজ করতে হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতি তাদেরকে বাইরে কাজ করতে বাধ্য করে।যেমন করে বাপ মারা গেলে মাকে চাকরি করতে হয়, চাকরি করে এতিম ছেলে -মেয়েদের মুখে দু, মুঠো ভাত তুলে দিতে হয়। কোন গরীব যুবতীর বিয়ে শাদী না হলে তাকে চাকরি করে জীবন বাঁচাতে হয়। কিন্তু যাদের সংসার সচ্ছল ,স্বামী বা ভাই চাকরি করে, তাদের সংসারেই প্রচুর কাজ রয়ে গেছে। তাদের বাইরে কাজ করার সময় ও সুযোগ কোথায়? যাদের পুরুষরা সারাদিন বাইরে কাজ করে জীবিকা উপার্জন করে, তাদের জন্য বাড়িতে একটা শান্তি পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশ, একটা আরামদায়ক প্রতিবেশ সরবরাহ করা নারীর দায়িত্ব। ইসলামের অসাধারণ সৌন্দর্যগুলোর মধ্যে একটা সৌন্দর্য এই যে, পুরুষকে উপার্জন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নারীর ভরণ-পোষণের কাজে নিয়োজিত রেখে নারী জাতিকে এ সকল দায়িত্ব থেকে মুক্ত রেখে দিয়েছে। আর নারীর উপর পুরুষের জন্য শান্তিপূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি করা, গর্ভে সন্তান ধারণ করা, সন্তান জন্ম দেয়া, তাদের লালন -পালন করা, শিক্ষা- দিক্ষা দিয়ে আদর্শ নাগরিক রূপে গড়ে তোলা ইত্যাদির এক লম্বা ধারাবাহিক কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এভাবে ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারীর প্রধান কাজ ও প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে স্ত্রী ধর্ম ও মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করা। এ গুরু দায়িত্বের উপর যদি তার উপর নিজের ভরণ – পোষণের জন্য এবং ছেলে-মেয়েদের উপার্জনের প্রচন্ড কষ্ট-ক্লেশের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়, তবে সেটা হবে নারীর প্রতি অন্যায়-অবিচার। তাই নবী (সা.) বলেছেন, স্বামীর খেদমত করা, সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা, মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করা: যেমন, সন্তান গর্ভে ধারণ করা, তাদের সুশিক্ষা দান করা, তাদের চরিত্র গঠন করা ও ভবিষ্যৎ জীবনের উন্নতি সাধন করা ইত্যাদি জন্য নারী জাতিকে উৎসাহিত করেছেন। তাছাড়া ঘর গুছানো, ঘর সাজানো, রান্না- বান্না করা, কাপড় সেলাই করা ইত্যাদি গৃহস্থালী কাজের এত ব্যাপক দায়িত্ব প্রকৃতগতভাবেই নারী জাতির উপর ন্যস্ত করে দেয়া হয়েছে। যা হোক, ইসলামে নারী জাতির মূল্য, সমাজে তাদের গুরুত্ব ও মানুষ হিসেবে তাদের কৃতকার্যতার পরিমাণ নির্ণয় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিতে। আর তা হলো, খোদাভীতি ও তার আনুগত্য স্বীকার করা, স্বামীর প্রতি তার কর্তব্য পালন করা, সন্তান গর্ভে ধারণ করা, তাদের লালন- পালন ও শিক্ষা-দিক্ষা দেয়ার যে সকল দায়িত্ব তাদের উপর অর্পিত হয়েছে, সে সকল পূর্ণ করার উপর।
লেখক: প্রবন্ধকার, কলামিস্ট।

স্মরণ ॥ শামছুল আলম চৌধুরী

মাসুক উদ্দিন

Shmsul Amon Chyবিশিষ্ট সমাজসেবী ও রাজনীতিবিদ শামছুল আলম চৌধুরী একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন। যিনি সমাজ উন্নয়নের কারিগর হিসেবে আজীবন দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণ সাধনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তিনি সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সম্মানিত পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ভাইয়ের পিতা। শামছুল আলম চৌধুরী ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত নন বরং একজন সৎ, ন্যায়, নিষ্ঠাবান সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিত। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সিলেট ডায়াবেটিক সমিতি ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, জালালাবাদ অন্ধ কল্যাণ সমিতি, জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতাল, শহর সমাজসেবা পরিষদের সহ-সভাপতি, পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ সমিতি সিলেট ও জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি সিলেট এর সাবেক সভাপতি কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সিলেটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সহ অসংখ্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও কর্মকর্তা ছিলেন। সিলেটের সকল মহলের কাছে তিনি একজন অভিভাবকতুল্য, সজ্জন প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি বাঙালী জাতির স্বাধিকার, স্বায়ত্বশাসন, সামরিক দুঃশাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ষাটের দশকের প্রথম সারির নেতা হিসেবে আপোষহীন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে আদর্শিক লড়াকু নেতা, কর্মী, সংগঠক হিসেবে তিনি তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করেছেন। কর্ম জীবনে এসেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শিক বিশ্বাস লালন করেই সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সকল সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম ছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবনের পরিধি এত বিশাল যা আজ ইতিহাসের বিষয়বস্তু মানুষ মাত্রই মরনশীল এটা চিরন্তন সত্য। শামছুল আলম চৌধুরী চাচাও চলে গেছেন সে পথে আমাদের সবাইকে ছেড়ে। বৃহত্তর সিলেটের সমাজসেবা অঙ্গনের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব রাজপথের লড়াকু সৈনিক শামছুল আলম চৌধুরী কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ করেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সেখান থেকে আর কখনও ফিরে আসবেন না সিলেটের পিচঢালা রাজপথে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। শামছুল আলম চৌধুরী চাচার এই চিরপ্রস্থান সত্যিই বেদনাদায়ক। তিনি রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত গরীব-দুঃখী মেহনতি মানুষদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তার চলনে বলনে তিনি ছিলেন সকলের শ্রদ্ধার পাত্র, ব্যক্তিত্বশালী, সাহসী একজন নেতা। সবদিক বিবেচনায় আমার কাছে মনে হয়েছে একজন সমাজসেবী মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। তিনি সত্যিকার অর্থেই সমাজসেবা অঙ্গনের আলোচিত একজন অভিভাবক। তাঁর ছিল আলাদা একটা ইমেজ। সে কারণে তিনি ছিলেন সিলেট বিভাগের সমাজসেবা অঙ্গনে অপরিহার্য এক মহান নেতা। শামছুল আলম চৌধুরী আপোষহীন মনোভাব, স্পষ্টভাষী বক্তা হিসেবেও সর্বত্র পরিচিত। তাঁর এ সকল কর্মের জন্য তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন সমাজসেবক। তিনি ছিলেন শান্তশিষ্ট সহনশীল, তীক্ষ্ম বুদ্ধি সম্পন্ন একজন মানুষ। একজন সমাজসেবী আদর্শবান রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন সবার কাছে প্রিয়। দলমত নির্বিশেষে তিনি ছিলেন সকলের কাছে একজন গ্রহণ যোগ্য ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ ছাড়াও শোক সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিলেট বিভাগের সমাজসেবা অঙ্গনের বড় মাপের প্রজ্ঞাবান মানুষের অভাব। আমরা তাঁর শূন্যতা আজীবন উপলব্ধি করবো। জাতীয় গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শামছুল আলম চৌধুরীর এই অসাধারণ অবদানের জন্য গোটা বৃহত্তর সিলেটবাসী তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে। শামছুল আলম চৌধুরী ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, শিক্ষাবিদ, অসাম্প্রদায়িক, সমাজ সচেতন ও সুশৃঙ্খল ব্যক্তিত্বের অধিকারী মৃত্যু অনিবার্য জানা সত্বেও প্রিয় মানুষটির চলে যাওয়া আমাদের মাঝে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ হবার নয়। ধ্র“ব সত্য যে, এই পৃথিবীতে আসার ক্রমিক আছে কিন্তু যাবার বেলা কোন নিয়ম নেই। এ পৃথিবী ছেড়ে সবাইকে যেতে হবে কিন্তু যারা কীর্তিমান তারা রবে মানুষের মনে মননে চিন্তা চেতনায় আদর্শে। তেমনি আমাদের সকলের প্রিয় ব্যক্তি শামছুল আলম চৌধুরী। ভালবাসার এ মানুষটির বিদেহী আত্মার জন্য শত সহস্র লাখো মানুষের প্রার্থনা বৃথা যাবে না। প্রতিদিন আমাদের কত আপনজন মারা যান, তাদের মৃত্যুর পর কতজনইবা তাদের জন্য কাঁদে তাদেরকে মনে রাখেই বা ক’জন। কিন্তু কেউ কেউ বেঁচে থাকেন তাদের কর্মগুণে। তারা তাদের জীবনের সুদীর্ঘ কর্মকান্ডে অমর হয়ে থাকেন অনাগত ভবিষ্যতের মাঝে। তাদেরকে আমরা বিদায় দেই শারীরিকভাবে কিন্তু তারা বেঁচে থাকেন জীবিত মানুষের হৃদয়ে। এমনি একজন মানুষ হলেন শামছুল আলম চৌধুরী। তিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল, লোভ, হিংসা, অহংকার মুক্ত একজন সাদা মনের মানুষ। তিনি কখনো অন্যের ক্ষতির কথা চিন্তা করতেন না, কেউ যদি তার ক্ষতি করতো তবুও তিনি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন। অফিসের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কাছে তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। তাদের সকল সমস্যা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন ও সাধ্যমত সমাধানের চেষ্টা করতেন। তিনি সব সময় সাদাসিধে জীবন যাপন পছন্দ করতেন এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ধনী গরীবের ব্যবধান কমানোর। তিনি এককভাবে নয়, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তার স্বপ্ন ছিলো নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসন করার যাতে তারা যে পরিমাণ মাসিক ভাড়া দিয়ে বাসা ভাড়ায় থাকে সেই টাকা দিয়ে তাদের নিজস্ব ঘর তৈরী করতে পারে। তিনি সব সময় দেশ ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের প্রতি অনুগত থাকতেন। নিজের অনেক শখ বিলাসিতা পরিত্যাগ করতেন শুধুমাত্র মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে। তিনি সব সময় স্বপ্ন দেখতেন দারিদ্রতা, ক্ষুধা, অশিক্ষা মুক্ত সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। তিনি সামাজিক কর্মকান্ডের প্রতি জোরদিতেন এবং অবহেলিত মানুষের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। অত্যন্ত প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। এই মহান ব্যক্তিত্ব আমাদেরকে শোক সাগরে ভাসিয়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকাবস্থায় গত ৬ নভেম্বর, ২০১৫ইং শুক্রবার রাত ১০টায় ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মুত্যুকালে তিনি ২ ছেলে, ২ মেয়ে, নাতি-নাতনী, আত্মীয়-স্বজন সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। এই মানুষটির অসময়ে চলে যাওয়াকে কেউ মেনে নিতে পারেনি। তাই প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে তার স্মৃতি ভেসে উঠে নয়নের মনিতে। পরিশেষে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমীনের কাছে আমাদের আকুল আবেদন আল্লাহ পাক যেনো তাকে জান্নাতবাসী করেন। আমীন

লেখক : মাসুক উদ্দিন, কলামিষ্ট, এলএলবি অনার্স, লিডিং ইউনিভার্সি, সিলেট।

ফরমালিনের বিষাক্ত ছোবলে দেশ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

আধুনিক বিশ্বের উন্নতশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও যেমন দ্রুত হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পচ্ছে, তেমনি দিন দিন বেড়েই চলেছে নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ। বর্তমানে অন্যান্য সামাজিক অপরাধের মধ্যে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল মেশানো একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত। বাংলাদেশের বাজারগুলো এখন ভেজাল পণ্যে সয়লাব। শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে পানীয়, শাক-সব্জি, ফল-মূল, মিষ্টি, নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রসহ এমনকি ঔষধেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে। এর ফলে আমাদের জাতীয় জীবনে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ অধিকাংশ জনসাধারণ এ বিষয়ে ভালোভাবে অবহিত নয়। জনসাধারণ জানেন না যে, তারা প্রতিনিয়ত খাদ্য বা পণ্যসামগ্রীতে কী ধরনের ভেজাল বা বিষক্রিয়ার সম্মুখিন হচ্ছেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার লোভে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল দিয়ে ভোক্তা ও ক্রেতাসাধারণকে প্রতারিত করছে। ফলশ্র“তিতে স্বাস্থ্যহানিকর প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরণের জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে দেশের জনসাধারণ। জনস্বাস্থ্য দিন দিন মারাত্মক হুমকির দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রতিবন্ধি, বিকলাঙ্গ, অটিস্টিক ও মানসিক রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। অথচ বিশুদ্ধ, ভেজালমুক্ত পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী প্রাপ্তি ভোক্তা সাধারণের আইনগত অধিকার। এমতাবস্থায় ভেজালমুক্ত, বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পণ্যসামগ্রী প্রাপ্তি বাংলাদেশের গণমানুষের অন্যতম প্রত্যাশা। মানুষ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। আর এ মানুষের জন্যেই মহান আল্লাহ্ পৃথিবীকে অফুরন্ত নেয়ামত দ্বারা সাজিয়েছেন, যাতে তারা সুস্থ, সুন্দর শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে। অথচ আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে মানুষ তাঁর যথাযথ পরিচয় পৃথিবীতে ধরে রাখতে পারছে না স্বীয় কুপ্রবৃত্তির অনুকরণের কারণে। কুপ্রবৃত্তির কারণেই মানুষ শিরক, যুজম, মিথ্যা, সুদ-ঘুষ, মদ্যপান, ধর্ষণ, অপহরণ, জবরদখল, খুন-খারাবী ইত্যাদির মত জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়। এসবের মতোই মানব সমাজের আরেকটি জঘন্যতম ঘৃণ্য অপরাধ হচ্ছে ভেজাল।
বাংলা একাডেমীর ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এ পণ্য শব্দের অর্থ করা হয়েছে- বিক্রেতয় দ্রব্য; বেসাত; মূল্য; মাসুল; ভাড়া। সংকীর্ণ অর্থে পণ্য হলো কতগুলো আপাতক দৃশ্য (ঃধহমরনষব) গুণের সনাক্তকরণযোগ্য (রফবহঃরভরধনষব)  সমাবেশ। এ অর্থে প্রতিটি পণের সর্বজনবোধ্য একটি বর্ণত্মাক নাম আছে; যেমন, আপেল, স্টিল বা ক্রিকেট ব্যাট ইত্যাদি। কিন্তু ব্যাপক অর্থে প্রতিটি পণ্যেও ভিন্ন ভিন্ন বাণিজ্যিক মার্কা (নৎধহফ) হলো ভিন্ন ভিন্ন একটি পণ্য। অুনরূপভাবে ট্যাবলেটের উপরে মার্কায় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও স্কুইব-এর এ্যাসপিরিন ও বায়ার-এর এ্যাসপিরিন হলো দুটো পৃথক পণ্য। কোম্পানি মার্কার এই ভিন্নতা ভোক্তার কাছেও পণ্যে পণ্যে পার্থক্য সূচিত করে এবং এতে পণ্য-সংজ্ঞাতেও ভোক্তার কাঙ্খিত তুষ্টি সাধিত হয়। ‘ভেজাল’ শব্দের অর্থ মিশ্রিত; মেকি; খাঁটি নয় এমন; উৎকৃষ্ট দ্রব্যের সঙ্গে নিকৃষ্ট দ্রব্যের মিশ্রণ; যে খারপ জিনিষ অন্য ভালো জিনিষের সঙ্গে মিশানো হয়; খারাপ জিনিষ মিশ্রণ; বিশুদ্ধ নয় এমন। ইংরেজীতে ভেজালের প্রতিশব্দ উল্লেখ করা হয়েছে-ঞড় পযবধঃ, ংরিহফষব; ঃড় ফড়ঁনষব পৎড়ংং; ঃড় ফবপবরাব, ভড়ড়ষ; ফবষঁফব; নষঁভভ, নবমঁরষব; ঃড় ঃৎরপশ, ফঁঢ়ব; এঁষষ. ভেজালের আবরী প্রতিশব্দ-‘আল-গাশশু’; ‘আল-খিদাউ’। প্রকৃতিগত পরিবর্তনের ফলে বস্তুর পরিচিতি যাই হোক না কেন, তাকে ভেজাল অথবা নকল যা-ই  আখ্যা দেয়া হোক না কেন, বিষয়টি ধর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে না। কিন্তু মানুষ কর্তৃক দ্রব্যটি আংশিক বা পরিপূর্ণ যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন মানবসমাজে তখন বস্তুটি ভেজাল বা নকল নামে অভিহিত হয়। অতি মুনাফার লোভে মানুষ যখন রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে চায়, তখন তাকে যে অনৈতিকতা, অসততার শরণাপন্ন হতে হয়, তাকে ‘ভেজাল’ নামে আখ্যয়িত করা হয়।  বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল প্রতিরোধে প্রচুর আইন (খধংি), অ্যাক্টস (অপঃং), অধ্যাদেশ (ঙৎফরহধহপবং), মাহামান্যরাষ্ট্রপতির আদেশ (চৎবংরফবহঃ ঙৎফবৎ), বিধি-বিধান (জঁষবং) বিদ্যমান আছে। প্রয়োজন শুধু এসব বিদ্যমান আইন-কানুনসমূহের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। প্রচলিত আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতিসমূহ সততা, আন্তরিকতা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হলে বাংলাদেশে পণ্যে ভেজালের সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে বাধ্য। আমাদের অনেক আইন আছে, যেগুলোর প্রয়োগ নেই। আবার অনেক আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। তাই বলা যায়, পণ্যে ভেজাল ও নকল প্রতিরোধে আমাদের পর্যপ্ত পরিমাণে আইন-কানুন বিদ্যমান। প্রয়োজন শুধু এসব সুষ্ঠুভাবে কার্যকরী করা। বাংলাদেশে পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন-কানুনসমূহের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নে তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য ও ঔষধে ভেজাল প্রতিরোধে সবচেয়ে পুরাতন আইন ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি। দন্ডবিধি ২৭২, ২৭৩, ২৭৪, ২৭৫, ২৭৬ ধারায় এ বিষয়ে শাস্তির বিধান যথাক্রমে ছয়মাস কারাদন্ড বা এক হাজার টাকার অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত করার বিধান আছে। তবে এসব আইনে যেমন মামলা হয়না; তেমনি আইন প্রয়োগও হয় না। বাংলাদেশে ২০০৫ সাল থেকে উপরিউক্ত দন্ডবিধিগুলোর ব্যাপক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন শুরু হয়। উক্ত ধারাগুলোতে শাস্তি কম হলেও কারাদন্ড ও অর্থদন্ড উভয় ধারা মিলে ১ (এক) বছর কারাদন্ড দেয়া হলে ভেজালকারীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও ভীতির সঞ্চার হয়। পণ্যসামগ্রী ও খাদ্যসামগ্রীতে ভেজাল প্রতিরোধে আমাদের দ্বিতীয় আইন ১৮৫৯ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ যা ২০০৫ সালে সংশোধন করা হয়। এই অধ্যাদেশ ভেজালকারীদের শাস্তি তিন লক্ষ টাকা, ১ (এক) বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং দোকান বা কারখানার যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী, ঔষধ এবং প্রসাধনসামগ্রীতে ভেজাল প্রতিরোধে সবচেয়ে শক্তিশালী আইন হচ্ছে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন। এই আইনে ভেজাল কারবারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যৃদন্ড, যাবজ্জীবন কারাদন্ড অথবা ১৪ (চৌদ্দ) বছর পর্যন্ত সশ্রম কারদন্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ১৯৮৫ সালে বি.এস.টি.আই অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যা ২০০৩ সালে সংশোধন করা হয়। এতে ভেজাল কারবারীদের সর্বোচ্চ এক্ষ টাকা জরিমানা এবং মামলার বাজেয়াপ্ত ও কারখানা বন্ধ করে দেয়ার বিধান করা হয়। ‘ উল্লেখিত আইনগুলো ছাড়াও বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল প্রতিরোধ ২০০৫ সাল থেকে ভেজালবিরোধী মোবাইল কোর্ট চালু করা হয়। অপরাধের ধরণভেদে এ কোর্ট তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তি দিয়ে থাকে। দেশে পণ্যে ভেজাল মিশ্রণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, অতি মুনাফা অর্জন করার মানসিকতা। এদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষই তার অবস্থাগত দিক থেকে মনে করে, যেভাবেই হোক না কেন যত দ্রুত অর্থ উপার্জন করা যাবে, ততই ধনী হওয়া যাবে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। এ দেশের রাজনীতিতে পরিচ্ছন্নতা ও জবাবদিহিতা লক্ষ্যণীয় ভাবে কম। এর বিরূপ প্রভাব জনজীবনের সর্বস্তরেই পড়েছে। ফলে খাদ্য ও পণ্যদ্রব্যে যে বিষ ঢালাওভাবে মেশানো হচ্ছে এবং তা বন্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ খুবই ক্ষীণ। পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উচ্চ আসনে পৌঁছতে না পারার কারণে এর প্রভাব কেমিক্যাল আমদানিকারক সকল পণ্যের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং ভোক্তার মানসিকতার ওপর গিয়ে পড়েছে। সর্বগ্রাসী ভেজাল ও বিষক্রিয়ার এটি হলো প্রধানতম কারণ। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ শিক্ষিত ও স্বাস্থ্য সচেতন নয়। এ কারণে পণ্যে বা খাদ্যে ভেজাল সম্পর্কে তাদের সচেতনতা খুবই কম। এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যে ভেজাল দিয়ে সরলবিশ্বাসী ক্রেতাসাধারণকে প্রতারিত করছে। বাংলাদেশের হাট-বাজার ও বিপণী-বিতানগুলোতে প্রতিনিয়ত ভেজাল পণ্য কেনা-বেচা হলেও যারা পণ্যে ভেজাল দেয় তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয় না। ফলে পণ্যে ভেজালের মাত্রা দিনদিন বেড়েই চলেছে। তাই যথাযথ শাস্তি না হওয়াও বাংলাদেশে পণ্যে ভেজালের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। পণ্যে বা খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ একটি মারাত্মক সামাজিক অপরাধ। এ বিষয়ে বাংলাদেশে কঠোর আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় না। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া পণ্যে ভেজালের অন্যতম কারণ। পণ্য এবং খাদ্যসামগ্রীতে যেসব কেমিক্যাল ও ভেজাল দ্রব্য ব্যবহার করা হয়, তা বাংলাদেশে অত্যন্ত সস্তা এবং সহজলভ্য। ফলে ভেজাল মিশ্রণকারীরা খুব সহজেই পণ্য এবং খাদ্যসামগ্রীতে ভেজাল মিশ্রণ করে থাকে। বাংলাদেশের হাট-বাজার ও বিপণী-বিতানগুলোতে বিজ্ঞাপন নির্ভর চাকচিক্যময় প্রচুর পণ্যসামগ্রী পাওয়া যায়। এমতাবস্থায় সাধারণ ভোক্তাদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পছন্দ করতে হিমশিম খেতে হয়। স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে চটকদার বিজ্ঞাপন দারুণভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা কথার ফুলঝুরি আর স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ বিজ্ঞাপন প্রচার করে প্রতিনিয়ত সাধারণ ভোক্তাগণকে প্রতারিত করছে। বাংলাদেশে এক সময় পণ্যে ভেজাল দেওয়া ছিল গুটিকয়েক ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমিত, আজ তা ঢুকে পড়েছে সমাজের সর্বত্র। ভেজাল পণ্য বাজারের সর্বত্র বিরাজমান। মুনাফালোভী মানুষ রাতারাতি অর্থ-বিত্তশালী হওয়ার লক্ষ্যে ভেজালের কারবার করে যাচ্ছে। প্রতারিত হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। এখানে সাধারণ-অসাধারণে কোন কথা নেই, পার্থক্য নেই। এক কথায় পণ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়ার শিকার সবাই।
বাংলাদেশে ভেজাল পণ্য, খাদ্যদ্রব্য, পানীয় ও ঔষধের কারণে দেশের প্রতিটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। উদাহরণস্বরূপ যে মিষ্টি বিক্রেতা মিষ্টির মধ্যে সোডিয়াম সাইক্লামেট, স্যাগারিন, কাপড়ের ও চামড়ার ক্ষতিকর রং ব্যবহার করে বিক্রি করছেন, সেই মিষ্টি বিক্রেতা বাজার হতে ফরমালিন দেয়া মাছ অথবা দুধ খাচ্ছেন অথবা ফরমালিন দেয়া মাছ বিক্রেতা বাজার হতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশ্রিত বিস্কুট খাচ্ছেন অথবা তার বাচ্চাকে ক্ষতিকর রঙিন চকলেট খাওয়াচ্ছেন। এভাবে বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ ভেজাল পণ্য এবং খাদ্যদ্রব্যের কারণে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
টিভিচিত্র, সংবাদপত্রে এবং পণ্যের লেবেলে মনলোভা বিজ্ঞাপন দিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান দেশব্যাপী ‘ন্যাচারাল মিনারেল’ ও ‘পিউরিফইড ড্রিংকিং ওয়াটার’ নামে বোতলজাত পানি বারজাত করলেও এসব পনির শতকরা ৯৮ ভাগই বিশুদ্ধ, জীবাণুমুক্ত বা ন্যাচারাল মিনারেল সমৃদ্ধ নয়। অনুসন্ধনে জানা গেছে ইধহমষধফবংয ঝঃধহফধৎফং ধহফ ঞবংঃরহম ওহংঃরঃঁঃরড়হং (ইঝঞও)-এর বিধানমালা অনুযায়ী মিনারেল ওয়াটার ও পিউরিফইড ড্রিংকিং ওয়াটার প্রস্তুত করার জন্য বোতলজাত পানিতে স্বাস্থ্যসম্মত যেসব উপাদান থাকা বাধ্যতামূলক, অধিকাংশ পানিতেই সেসব উপাদানের উপস্থিতি নামমাত্র, আবার শরীরের জন্য ক্ষতিকারক যেসব জীবাণু বা পদার্থ শোধন করা অপরিহার্য, সেসব জীবাণুর প্রকট উপস্থিত রয়েছে এসব বোতলজাত পানিতে। ফলে মিনারেল ও বিশুদ্ধ পানির নামে বোতলজাত পানি কিনে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন এবং মোটা অংকের অর্থের অপচয় করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত এক গবেষণায় দেশের পানি উৎপাদনকারী শিল্পের উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। দেশের প্রথম সারির পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জনপ্রিয় ব্রান্ডের পানিও এ তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়। জানা যায়, পানির মান যাই হোক বাজারে পাওয়া নিম্নমানের প্রায় সবকটি পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানই দেশের একমাত্র পণ্যদ্রব্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বি.এস.টি.আই-এর ছাড়পত্র পেয়েছে। বোতলজাত পানি উৎপাদনের প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়াসার পানি ব্যবহার করে। তাদের নিজেস্ব ল্যাবরেটরি, ডিপটিউবওয়েল নেই।
বর্তমান বিশ্বেও অনুন্নত দেশগুলোতে ভেজাল একটি বড় রকমের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যার কবল থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও মুক্ত নয়। এ দেশে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা অসাধু ব্যবসায়ীদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। অসৎ ব্যবসায়ী সর্বদাই স্বল্প পুঁজিতে এবং স্বল্প সময়ে অত্যধিক মুনাফা অর্জন করতে চায়। এ কারণে তারা নীতি-নৈতিকতা মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য করে না। পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে পরিমাপে ও ওজনে কম দিয়ে, প্রতারণা করে, মজুদদারী করে, নিষিদ্ধ ও হারাম মিশিয়ে বিক্রি করে, অসাধু উপায়ে মানুষকে ঠকিয়ে মুনাফা অর্জন করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। মানুষের অধিকার, জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য সর্বোপরি মানুষের জীবন তাদের কাছে একেবারেই তুচ্ছ বিষয়। অতচ আমাদের দেশের শতকরা নব্বই জন ব্যবসায়ী মুসলিম। তারা সালাত আদায় করেন, রোযা রাখেন, হজ্জ করেন। অনেকে যাকাতও দেন। যাদের মধ্যে এমন ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধ বিরাজমান, তার কিভাবে ব্যক্তি স্বার্থ চিরতার্থ করার জন্য বিভিন্ন কৌশলে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল মেশান? নিম্নমানের পণ্যকে ‘এক নম্বর’ বলে চালিয়ে দিয়ে প্রতারণা করেন? খাদ্য-পণ্য ক্ষতিকর কেমিক্যাল, বিস্ফোরক দ্রব্য, রং ও অরুচিকর উপাদান মেশান? বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। বাংলাদেশের হাট-বাজার, মার্কেট ও বিপণি বিতানগুলো ভেজাল পণ্যে সয়লাব হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা পরকালের মুক্তি ও সাফল্য লাভের চাইতে দুনিয়ার জীবনের সাফল্য ও ভোগ-বিলাসকে অত্যধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে তাদের ঈমানের ভিত্তি ও শক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরী। আর এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক ইসলামী জ্ঞান চর্চা, গণসচেতনতা ও ইসলামের বিধি বিধানগুলোর প্রচারণা। সরকারি-বেসরকারি ও সমম্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এহেন প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি। উপর উল্লেখিত আলোচনা ও পর্যলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধে নিম্নোক্ত সুপারিশমালা গ্রহণ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধে সরকারকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। জনস্বার্থ রক্ষার্থে সরকারকে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের সদিচ্ছাটাই দেশের জনগণের দুর্দশা ঘোচানোর জন্য বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন অত্যন্ত জরুরী। বি.এস.টি.আই-এর কার্যক্রম শক্তিশালী করা ও সারা বছর বাজারে তাদের কার্যকর নজরদারি অব্যহত রাখা। এ ক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য সরকার দু’ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। প্রথমত, খাদ্য ও পণ্য ভেজাল ও বিষাক্রিয়ার চরম ভয়াবহতার দিকগুলো জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভেজাল ও বিষমিশ্রণের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার মতো যথেষ্ট আইন প্রণয়ন এবং তার যথাযথ প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল ও বিষমিশ্রণকে আইনের দৃষ্টিতে চরম অপরাধমূলক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে ভোক্তা অধিকার আইন এবং সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতকরণ যতদিন না আমাদের দেশে হবে, ততদিন পণ্যে ভেজাল চলতেই থাকবে। এ ছাড়া পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে সারা বছর এ অভিযান অব্যহত রাখতে হবে। বাংলাদেশে পণ্য ও খাদ্যসামগ্রীতে ভেজাল প্রতিরোধের লক্ষ্যে আগ্রাসী, অতি দ্রুত মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়িক ধারার এবং ব্যবসায়িক-রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হওয়া অতি জরুরী। ব্যবসায়ীদের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা মনে রেখে সৎভাবে মুনাফা অর্জনের সদিচ্ছা করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে গণমাধ্যম জনস্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে থাকে। পণ্য ও খাদ্যে ভেজালের ঘটনাগুলোকে গণমাধ্যম কর্মীরা বিভিন্ন মিডিয়াতে পরিবেশন করতে পারেন। পাশাপাশি মিডিয়াগুলোকে ‘ফলো-আপ রিপোর্ট’ করতে হবে। অর্থাৎ পণ্যে বা খাদ্যে ভেজাল ও বিষমিশ্রণসহ যে কোন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর থেকে শুরু করে তার শেষ পরিণতি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে লেগে থেকে লাগাতার সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। যেটি আমাদের মিডিয়া জগতের একটি বড় দুর্বলতা। সংঘটিত এ ধরনের অপরাধের ধারাবাহিক সংবাদ যদি পরিবেশন করা যেত, তাহলে দর্শক বা শ্রোতা সরকারের প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সবাই পুরো ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে পারতো। এতে একদিকে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেতো, অন্যদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমূহের দায়িত্বশীল লোকজনের মধ্যে তৎপর থাকার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হতো। এর ফলে নিশ্চিয়ই একটি দীর্ঘমেয়াদী সুফল আমরা পেতাম। বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতি সচেতন। এদেশে অসংখ্য রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে, যারা তৃণমূল পযৃন্ত সর্বস্তরের জনসাধারণের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। তাই রাজনৈতিক সংগঠনগুলো পণ্যে ভেজালের নানাবিধ ক্ষতিকর দিক জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে পারেন। ভেজাল মিশ্রণ বন্ধে জনগণকে সচেতন করে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারেন। সর্বোপরি রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে দেশ শাসন করে। তাই পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরী এবং ফলপ্রসূ হবে বলে আমরা মনে করি। আমরাই প্রতিনিধিত্ব করছি সমাজের, এই দেশের। আমাদের দেশে অসংখ্য সামাজিক সংগঠন রয়েছে যারা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণে কাজ করে। আমাদের চিন্তা-চেতনা, মননশীলতা দিয়ে সমাজকে ভেজাল ও দুষণমুক্ত করা আমাদেরই দায়িত্ব। তাই সামাজিকভাবে একজন ভেজাল মিশ্রণকারী চোর-ডাকাতের মতো হেয় করলে, তার সঙ্গে পরিবারিক সম্পর্ক স্থাপন না করলে, তাকে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে না ডাকলে পরিবর্তন হতে বাধ্য।
জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের অনেক বড় বড় সমস্যার সমাধান হয়েছে। আমাদের ও আমাদের সন্তানদের শরীর-স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য পণ্যে ভেজালকারবারীদের বিরুদ্ধে যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ গণপ্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলি, তা অবশ্যই সফল হবে। তাই বাংলাদেশের পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধ ব্যক্তিগত পর্যায় হতে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সর্বস্তরে সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এক্ষেত্রে জনসাধারণের করণীয় হলো- ১. খাদ্য এবং পণ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া; ২. পণ্যে ভেজাল রোধে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষকে সচেতন করা; ৩. ভোক্তা অধিকার বা ক্রেতার অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হওয়া; ৪. সিটি কর্পোরেশন, মিউনিসিপালিটি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে সক্রিয় ও নিয়মিতভাবে দায়িত্ব পালন করা; ৫. সাময়িকভাবে নয়; বরং সারা বছর ভেজালবিরোধী অভিযান সৎ ও দক্ষ লোকের (ম্যাজিস্ট্রেট) মাধ্যমে পরিচালনা করা; ৬. বি.এস.টি.আই-এর যথাযথ দয়িত্ব পালন এবং সর্বদা বাজার তদারকি করা; ৭. সকল ব্যবসায়ীকে সৎভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা। ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য শুধু অর্থোপার্জনের একটি মাধ্যম নয়, এটি মানবসেবার অন্যতম একটি মাধ্যম। এ কারণে ব্যবাসা- বাণিজ্য সম্পর্কিত বহুবিধ তথ্য পবিত্র কুরআন ও হাদীসে উপস্থাপিত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত পদ্ধতিগুলোর শরীআসম্মত নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, ইসলাম কীভাবে ক্রেতা বিক্রেতা এবং ব্যবসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত করেছে।
সুতরাং আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে পণ্যসামগ্রীতে যেভাবে ভেজাল মিশিয়ে কেনা-বেচা করা হচ্ছে তা জনসাধারণের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরণের ব্যবসায় ইসলামে সর্বাবস্থায় হারাম। একজন মুমিন-মসলিম ব্যবসায়ী এহেন হারাম ব্যবসা পরিত্যাগ করে হালাল ব্যবসা পরিচালনা করবেন, এটাই আমরা আশা করি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যদি সৎভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন, ক্রেতাসাধারণ যদি সঠিক পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করেন, সর্বোপরি সরকারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেন, তাহলে বাংলাদেশে পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

নৈতিকতার অবক্ষয়

ফকীহুল ইসলাম নওরোজ

নৈতিকতার গুরুত্ব শূন্যের কোঠায়। প্রাচুর্য বিত্ত-বৈভবের মাঝে চিত্তের লালন-পালন প্রায় নেই বললেই চলে। আধিপত্য বিস্তারকারী প্রজাতি হিসেবে আমরা যখন বিশ্ব, বিত্ত ও অবস্থান করতলগত করার ঐকান্তিক অভিপ্রায়ে লিপ্ত, তখন আমাদের বিত্ত ভৃত্য সেজে গোলামী করছে নীতিহীনতার; অন্যায় অবিচারের ধারক-বাহক হিসেবে বিপথে চালিত করছে আমাদেরকে। আকাশছোঁয়া জ্ঞান ও বিত্তের পাহাড় একদিকে আমাদের জীবনযাত্রাকে উন্নত করছে, অনদিকে ক্ষয়িষ্ণু নৈতিকতা আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে মানবজীবনকে নিম্নগামী করছে। ফলে এক বিপন্নতার মুখোমুখি আমরা, চরম অবক্ষয়ের সম্মুখীন আমাদের নৈতিকতা। সারবস্তুহীন আধুনিকতার খোলস আমাদের কাঁধে চেপেছে আরব্য রজনীর দৈত্য হয়ে, বিদেশী অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের মধ্যে গা ভাসাচ্ছি আমরা নির্দ্বিধায়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আমাদের কাছে মনে হচ্ছে অপ্রয়োজনীয়। নৈতিক অবক্ষয় তাই বেড়ে চলছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। সমাজের বুকে নেমে এসেছে নৈরাজ্য, অশান্তি আর হতাশা। স্বর্গীয় শান্তির পরিবর্তে নেমে এসেছে নরক যন্ত্রণা, সৃষ্টি হয়েছে অসহনীয় পরিবেশ। নৈতিকতার অবক্ষয়ই এর মূল কারণ।
আমাদের মাতৃভূমি কথা পুরো পৃথিবীতে বিরাজমান অনাচার, অবিচার, নৈরাজ্য, অশান্তি, খুন, রাহাজানি, শোষণ, নিষ্পেষণ চরম আকার ধারন করেছে। নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে মানুষ আজ যে কোন কাজ নির্দ্বিধায় করতে পারে। বোধের নেই স্বচ্ছতা, লাগাম নেই সিদ্ধান্তের, নেই কোন বিবেকের তাড়না বা দংশন। আলো-অন্ধকার, ন্যায়-অন্যায়, ভালোমন্দ, সুন্দর কুৎসিত সবই এক। অবক্ষয়গ্রস্ত মানুষের সমাজের কল্যাণমূলক নেই কোনো ভাবনা। নেই কোন প্রচেষ্টা। ফলে সমাজের বুকে জগদ্দল পাথর হয়ে বসে এরা নানা অনিষ্ট আর অমঙ্গলের ধারক বাহক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এরা সমাজ ও জাতিকে নিক্ষেপ করে নৈরাজ্য ও অন্ধকারের অতলে। এই নারকীয় অবস্থা থেকে রেহাই পাবার জন্য নৈতিকতা ভুলে গেলে চলবে না।
আমাদের পারিপার্শ্বিকতায় আজ লেগেছে ক্ষয়। বনাঞ্চলের ক্ষতির সাথে সাথে মনের অঞ্চলের ক্ষতি একেবারে কম নয়। চারদিকে ক্ষুদ্র গন্ডি থেকে শুরু করে বৃহৎ গন্ডি, ঘরের দরজা থেকে বৃহত্তর সমাজ, পারিবারিক পরিবেশ থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়- সবখানে শুধু নৈতিকতার অধঃগতি। এ অধঃগতির শিকার সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। ছোট থেকে বড়, নবীন থেকে প্রবীণ কেউ বাদ পড়ছে না। নৈতিকতার অবক্ষয়ের জন্য আমাদের পারিপার্শি¦কতা প্রধানভাবে দায়ী।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের শিক্ষার হার আশানুরূপভাবে বাড়লেও নৈতিকতার উন্নতি হয়নি বরং নৈতিকতার অবক্ষয় প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। এ অবক্ষয় ও অবনতি-অশিক্ষা ও কুশিক্ষার ফল। অশিক্ষা বর্তমানে মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। আলোকিত পথ তাই অশিক্ষিত মানুষের নিকট রুদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ক্যাম্পাস বোমা তৈরীর কারখানা। ছাত্র-শিক্ষক আজ অনৈতিক পথ বেছে নেয়াও তার জন্য খুবই সাধারণ ও স্বাভাবিক ব্যাপার। কুশিক্ষার প্রশিক্ষণ সমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষার পাঠ্যক্রম, শিক্ষাদান পদ্ধতি পরিবেশ, ছাত্র-শিক্ষক প্রায়শই কুশিক্ষার পথ প্রশস্ত করছে দিন দিন। কাগজ কলমে শিক্ষিত হলেও অনৈতিক কার্যকলাপ কমছে না। বরং সমাজের উচ্চ শ্রেণী তথা উচ্চ শিক্ষিতরাই আজ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত।
২০১৫ এসেও আমাদের দেশ দারিদ্রের করালগ্রাস থেকে মুক্ত হয়নি। বরং এখনো এই স্বাধীন দেশের  ৩৩.৭% লোক দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ এইসব লোক জীবন ও জীবিকার তাগিদে দিশেহারা হয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কাজে লিপ্ত রয়েছে। দায়ী কে-? বেঁচে থাকার জন্য জগতপ্রবাহের সাথে সমগতিতে চলার জন্য অনৈতিক ও অপকর্মের সহযোগী হয়ে দাঁড়াচ্ছে অগণিত আদর্শ সন্তান।
আজ দেশে শিক্ষিত অশিক্ষিত যুবক-যুবতী বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরীত ও বঞ্চিত। সর্বত্র হাহাকার আর আক্ষেপের দৃশ্য। বেকারত্বের এই চরম অভিশাপ তাদের কাজে না লাগিয়ে সর্বনাশার মতো অনৈতিক কাজে অংশ নেয়। তারা আজ তাদের জীবন ও কর্ম নিয়ে হতাশ। তাদের এই চরম দুঃসময়কে অতিক্রম করার জন্য দায়ী কে?
অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা খোলসযুক্ত অভিজাত্য ও আজন্ম লালিত কুসংস্কার মানুষকে অনৈতিক ও অমানবিক কাজের দিকে ঠেলে দেয়। অভিজাত্যের মিথ্যা অহংকার, সমাজের বুকে চেপে বসার উদ্ভট মানসিকতা মানুষকে নৈতিক বিষয়ে অন্ধ ও অজ্ঞ করে ফেলে। এ চিত্র দেখা যায় বিশেষত গ্রাম্য মাতব্বর ও মোড়লদের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ শুধু গ্রামাঞ্চল নয় শহরের বিভিন্ন অফিস কার্যালয়ে চাটুকার ও বিবেকহীন কর্মকর্তা এসব অশান্তির মূল কারণ। অভিজাত্য ও কুসংস্কার অনেকাংশ দায়ী। আর এসব কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের কোন স্বচ্ছ বিবেচনা নেই। নিজস্ব বিবেক ও বুদ্ধিপ্রসূত কোন মতামত ও সিদ্ধান্ত নেই বলে নৈতিক প্রশ্নেও তারা অন্ধ। কুশিক্ষাই এজন্য দায়ী। সুশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি কোন পরিস্থিতিতে কোন অনৈতিক চিন্তা ও কাজে নিজেকে জড়াতে পারে না, এমনকি সমর্থনও দিতে পারেনা।
নৈতিক অবক্ষয় রোধে দেশের সকলের সর্বাত্মক চেষ্টা ও সমর্থন প্রয়োজন। আদর্শ দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। নৈতিকতার উন্নতি এবং তার পরিচর্যা ও অনুশীলনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি প্রয়োজন। তা করার এখনই সময়। এ অবক্ষয় রোধ সকলের একান্ত দায়িত্ব। এ কর্তব্যে অবজ্ঞা বা অবহেলা করলে চরম দুর্ভোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না কোনোভাবেই।
লেখক : কলামিস্ট।

স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহিত্য আন্দোলনের ভূমিকা শীর্ষক জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ॥ প্রসঙ্গ কথা

মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী

স্বাধীনতা সংগ্রাম কারো একদিনে হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রাম পৃথিবীর প্রত্যেক স্বাধীনতাকামী জাতিকে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করার পরই সে জাতির মুক্তি লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্র কাননে যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার পর-পরই সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। যা অল্প কথায় লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহিত্য আন্দোলনের ইতিহাসও দীর্ঘদিনের।
বিংশ শতাব্দির দোড় গোড়ায় কলিকাতায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও পূর্ব বাংলায় বঙ্গীয় মুসলীম সাহিত্য পরিষদের ভূমিকা কোন অবস্থাতেই খাটো করে দেখার নয়।
মূলত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন ও বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মাধ্যমে-আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা জাগানো হয়েছিল, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। এসব সম্মেলনের মাধ্যমে যারা শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাদেরকে স্মরণ করছি। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি শেরে বাংলা একে ফজলুল হক মহোদয়কে। স্মরণ করছি পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়কে, স্মরণ করছি মহান জ্ঞানতাপস বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে, স্মরণ করছি শহীদ ইসমাইল হোসেন সিরাজীকে, স্মরণ করছি মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীসহ যারা এসব ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন তাদেরকে।
আজ যারা ভিতরে ভিতরে বাংলাদেশ প্রীতি ভুলে পাকিস্তান প্রীতিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন, তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, মুসলিম লীগের আসল উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। যা ১৯৪০ এর লাহোর অধিবেশনে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক মহোদয়ের লাহোর প্রস্তাবের দলিল দেখলেই স্পষ্ট দেখা যাবে। ভারত বর্ষের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা দিয়ে আলাদা আলাদা দুটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। পূর্ব বলতেই আমাদের বাংলাদেশ।
১৯৪৭ পরবর্তী ৫২’র যে ভাষা আন্দোলন তাও মূলত সাহিত্য আন্দোলন। কারণ ভাষা রক্ষা না পেলে সাহিত্য রক্ষা পায় না। ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৮ সালে কাগমারিতে যে ঐতিহাসিক কাগমারি সম্মেলন হয়েছিল তাও একটি শক্তিশালী সাহিত্য আন্দোলন। কারণ সংস্কৃতি হচ্ছে সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনেক ভেবে চিন্তে সেই সম্মেলনের নামকরণ করেছিলেন আফ্রো-এশিয়ান সাংস্কৃতিক মহাসম্মেলন। যাতে রাজনীতির অজুহাত এনে সম্মেলন বানচাল না হয় তাই এই প্রয়াস। যে সম্মেলনে পৃথিবীর বহুদেশের অতিথিরা এসেছিলেন, সেই সম্মেলনের মাধ্যমে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানকে আস্সালামু আলাইকুম বলে বিদায় জানিয়েছিলেন। সেই সম্মেলনে বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমসহ অসংখ্য শিল্পীরা দেশের গান গেয়ে জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জীবিত করেছিলেন। যাহা আমাদের স্বাধীনতার চালিকা শক্তিতে রূপ নিয়েছিল।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক যে, সাহিত্য ভিত্তিক চলচিত্র নির্মাণ করেও পৃথিবীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে মানুষকে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ‘জীবন থেকে নেওয়া’ এবং নবাব ‘সিরাজ উদদৌলা’ এ দুটি ছবিও কাজ করেছিলো জাতীর শিরায় শিরায়।
মধ্যযুগের কয়েকজন কবির নাম এখানে স্মরণ করছি। ষোড়শ শতাব্দির কবি সৈয়দ সুলতান বলেছেন-যারে যেই ভাষে করিলো সৃজন,
সেই ভাষ হয় তার অমূল্য রতন।
কবি আব্দুল হাকিম:- যে সব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী,
সেই সব কাহার জন্ম নির্নয় ন জানি।
দেশি ভাষা বিদ্যা যার মন ন জুড়ায়,
নিজ দেশ ত্যাগে কেন বিদেশ ন যায়।
মাতাপিতামহ ক্রমে বঙ্গতে বসতি
দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।
মাইকেল মধুসুদনঃ পরধন লোভে মত্ত করিনু ভ্রমণ
কাটাইনু বহুদিন সুখ পরিহরি।
রবি ঠাকুরঃ আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি,
তুমি কি অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী।
নজরুলঃ নমঃনমঃনমঃ বাংলাদেশ নমঃ কি মনরোম, কি মধুর।
লতিফ শাহঃ শোন বলি সারাসার বাংলাদেশের অধিকার।
নায়েবর রাসুল-আমার বাবা শাহ্ জালাল।
উপরে উল্লেখিত কবিদের পদাবলীতে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার প্রেরণা শক্তি যা অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে উপরোল্লিখিত বিষয়ের উপর জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন আয়োজনের স্বপ্ন, আমার দীর্ঘদিনের-লালিত একটি স্বপ্ন। দেশের নানা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে উদ্যোগ নেওয়ার সাহস হয়নি বিগত দিনে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সেই উদ্যোগ গ্রহণ করি বিগত ২০০৯এর ১৯এ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউন্সে প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে। আমাদের উৎসাহ দাতাদের অন্যতম ছিলেন, বিটিভির প্রয়াত সাবেক ডিজি কবি কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী, সাবেক সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী এনামুল হক,মোস্তফা শহীদ, সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী ও বর্তমান মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজ্জামেল হক।
আমাদের পাশে যে সব ব্যক্তিরা জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে সময়ে সময়ে আপনজনের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা হচ্ছেন মেজর জেনারেল কে.এম. সফিউল্লাহ (অব.) বীরোত্তম, অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী, কবি মুহম্মদ আব্দুল খালেক, সাংবাদিক খন্দকার মোজ্জাম্মেল হক, সাবেক অতিরিক্ত সচিব এটি.এম গিয়াস উদ্দিন, কবি আসলাম সানি, কবি রবীন্দ্র গোপ, কবি নাহিদ রোকসানা, প্রয়াত সৈয়দ হাবিব রহমান হিরণ, কবি ড. শহিদুল্লাহ আনসারী, কবি মহিউদ্দিন আকবর, কবি শাহরিয়ার মমতাজ, ছড়াকার তাজুল ইসলাম বাঙালি, কবি দেলোয়ার মুহাম্মদ, কবি শামিমরুমি টিটন, এ্যাড. মোস্তাক আহম্মেদ প্রমুখ।
২০০৯ এর ১৯ মার্চের প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন মাননীয় সমাজ কল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ।
২০১০ এ দ্বিতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় খামারবাড়ীস্থ গিয়াস উদ্দিন মিল্কী অডিটরিয়ামে। প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী, এমপি ৩য় ও ৪র্থ সম্মেলন হয় পাবলিক লাইব্রেরী সেমিনার হলে, ৫ম ও ৬ষ্ঠ সম্মেলন হয় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির উপরের তলাস্থ খাজা নিজাম উদ্দিন মিলনায়তনে। এবার দেশে নানা অস্থীতিশীল পরিবেশ থাকায় মার্চ মাসে প্রোগ্রাম করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া আমি অসুস্থ থাকার কারণেও উদ্যোগ নিতে পারিনি। চলতি ১১নভেম্বর ২০১৫ এ আমরা ৭ম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করেছি শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে। এবারের অনুষ্ঠানের নির্ধারিত প্রধান অতিথি বাংলা একাডেমীর চেয়ারম্যান প্রফেসর ইমেরিটার্স অধ্যাপক. ড. আনিসুজ্জামান স্যার’কে হত্যার হুমকি প্রদান করায় নিরাপত্তাজনিত কারণে স্যার অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি। আমরা হুমকি প্রদানকারীর তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। সে সাথে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবী করছি। এবারে আমরা ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন করেছি, যা বর্তমান সময়ে একান্ত প্রয়োজন। কর্মসূচী হচ্ছে কবিতা আবৃত্তি, রচনা ও উপস্থাপনা বিষয়ক কর্মশালা। আমিও একদিন থাকবো না ধরাধামে, নিয়তির বিধানে চলে যেতে হবে। বাংলাদেশ পোয়েটস্ ক্লাব ও বাংলাদেশ পল্লীসাহিত্য গবেষণা পরিষদের কার্যক্রম যাতে জাতির শিল্প সাহিত্যের পাতায় অমর গাথা হয়ে থাকে সে প্রত্যাশা করছি।
এবারে আমরা একজন মানুষকে স্মরণ করছি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। তিনি হচ্ছেন বাংলাবাজারস্থ বিউটি বোর্ডিং এর সত্বাধিকারী স্বর্গীয় প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা, তিনি বাঙালি কবিদের সাহিত্যানুষ্ঠানে সক্রিয় সহযোগীতা করতেন তার বোর্ডিং এ আড্ডা জমিয়ে। যেখানে রয়েছে আমাদের কবি শামসুর রাহমানের নাম। শামসুর রাহমান যে রুমে বসে আড্ডা দিতেন তার নাম সেখানে সুধী কক্ষ নামে এখনও স্টিকার লাগানো আছে। ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার অপরাধ তিনি বাঙালি কবি-লেখকদের তার বোর্ডিং-এ আড্ডা বসিয়ে অনুষ্ঠান করার সহযোগীতা করতেন। বিউটি বোর্ডিং এ বন্ধু সভা এখনও হয়। আমরা এবারের অনুষ্ঠানে সেই মহান ব্যক্তির প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করছি। সেই সাথে আমাদের মহান কবি শামসুর রহমান মহোদয়কে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে। বিগত ২০০৯ থেকে যারা জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের সাথে জড়িত তাদের সকলের মঙ্গল কামনা করছি। তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ।
(প্রবন্ধটি ৭ম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ হিসেবে কবি ফাতেমা ইসরাত রেখা কর্তৃক পঠিত হয়)

ফটো সাংবাদিক সোহেল’র মাতার ইন্তেকাল, দাফন সম্পন্ন

দৈনিক ভোরের কাগজ’র সিলেট আলোকচিত্রী সোহেল আহমদ’র মাতা শামসুন্নেহার বেগম গত শুক্রবার রাত ১ টা ১০ মিনিটে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর। বিস্তারিত

রোটারী ক্লাব অব সিলেট রয়েলস-এর ৩য় অভিষেকে ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন ॥ যেই দেশকে রোটারিয়ানরা এগিয়ে নিতে চায় সেই দেশের অগ্রযাত্রাকে কেউই দমিয়ে রাখতে পারবে না

বাংলাদেশ ব্যাংক এর সাবেক গভর্ণর ও পে এন্ড সার্ভিসেস কমিশন বাংলাদেশের প্রধান ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন বলেছেন, যেই দেশকে রোটারিয়ানরা এগিয়ে নিতে চায় সেই দেশের অগ্রযাত্রাকে কেউই দমিয়ে রাখতে পারবে না। রোটারীর আন্দোলন দেশকে বিস্তারিত

শোক সংবাদ

ঝালোপাড়া নিবাসী মরহুম হাজী আমান উল্লাহ (ফকির মিয়া)’র বড় ছেলে ঝালোপাড়া পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম জুনেদ ও বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব মরহুম সাইরাস আহমেদ এর বড় ভাই লন্ডন প্রবাসী জাকির আহমেদ খালেদ লন্ডনস্থ স্থানীয় বিস্তারিত

ডায়াবেটিক গণসচেতনতা-প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

সৈয়দ সুজাত আলী

১৪ নভেম্বর- বিশ্ব ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস। প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য দিনটি ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। বিগত কয়েক বছর থেকে জাতিসংঘ এই দিবসকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দিয়েছে। এবারে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে-“স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়”। বিশ্ব জুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই দিনকে বিশ্ব ডায়বেটিস সচেতন দিবস ঘোষণা করে। ডায়াবেটিস একটি অনারোগ্য ব্যাধি এবং এটির প্রতিষেধক কোনো কালে ছিল না। এটি একটি কঠিন রোগ। চিকিৎসায় এটি নিরাময়ের কোন ব্যবস্থা নেই, নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে মাত্র। ডায়াবেটিস গ্রীক শব্দ। প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসক এরিটিউস এই নামকরণ করেন। অতিরিক্ত পিপাসা ও অতিরিক্ত মূত্রত্যাগ এই রোগের বৈশিষ্ট্য। ডায়াবেটিস মেলিটাস রোগের মূল কারণ ইনসুলিনের অভাব। বেশী বয়স হলে এমনিতেই শরীরের বিপাক ক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ, পরিশ্রমহীন বা নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপন বিপাক ক্রিয়াকে আরো দুর্বল করে দেয়। এ অবস্থায় ইনসুলিন নামে শরীরের একটি প্রয়োজনীয় হরমোন প্রয়োজন মতো উৎপন্ন হতে পারে না। ফলে খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করা কার্বোহাইড্রেট ঠিকমতো বিপাক হয় না। ওই কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাই প্রস্রাবের সঙ্গে বার বার বের হয়ে আসে। অবশ্য সব বহুমূত্রই শর্করাযুক্ত নয়। শর্করাবিহীন বহুমূত্রও আছে, যাকে বলা হয় ডায়াবেটিস টাইপ-২। আজকাল জ্ঞানী চিকিৎসকরা রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন। এটি নিঃসন্দেহে উত্তম পরামর্শ। দুশ্চিন্তাহীন থাকলে, পরিশ্রমী হলে বা নিয়মিত ব্যায়াম করলে, সৎ চিন্তা ও শুভবুদ্ধি মাথায় রেখে সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করলে ডায়াবেটিস রোগ হতে পারে না।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে আমরা সবাই : ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীতে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ৩৯ কোটি। ২০০৩ সালেও যা ছিল ১৯.৪ কোটি। আর এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৩.৯ কোটি। ২০১০ হতে ২০৩০ এই দু দশকে উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিস রোগী বাড়বে ৬৯% আর উন্নত দেশে বাড়বে ২০%। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশসমূহকে বহন করতে হবে ক্রমবর্ধমান রোগীদের বোঝা, যা উক্ত দেশসমূহের সরকারের জন্য বহন করা কঠিন হবে।  আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের হিসাব মতে, প্রতি ১০ সেকেন্ডে দুজন নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় এবং প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন মৃত্যুবরণ করে ডায়াবেটিস ও তার দ্বারা সৃষ্ট জটিলতার কারণে। কাজেই যে কারও পক্ষেই স¤ভব এর ভয়াবহতা আঁচ করা। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়বে ৫৪%, প্রতি বছরে ২.২% হারে। ৩৬% বৃদ্ধি শুধুমাত্র ভারত ও চীন দেশে। আগামী ২০২০ সাল নাগাদ অর্ধেকের বেশী মার্কিনী নাগরিক ডায়াবেটিকস-এ আক্রান্ত হবে কিংবা ডায়াবেটিসসজনিত কারণে ভুগবে। এর ফলে এক দশকে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় বাড়বে ৩ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবীমা ইউনাইটেড হেলথ গ্র“প কর্পোরেশন এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশও পূর্ণবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির দিক থেকে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিস এসোসিয়েশন এর হিসাব মতে প্রায় ৮৪ লাখ ডায়াবেটিস রোগী থাকলেও আগামী ২০৩০ সালে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর ৭ম বৃহত্তম পূর্ণবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগী বসবাসকারী দেশ, যেখানে বসবাস করবে  ১ কোটি ১১ লক্ষ পূর্ণবয়স্ক রোগী। তাছাড়া শিশু রোগীর সংখ্যা বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশী, যা ক্রমবর্ধমানশীল। উন্নত বিশ্বে যেখানে বেশীর ভাগ ডায়াবেটিস রোগীর বয়স ৬০ বছরের উর্ধ্বে, সেখানে উন্নয়নশীল বিশ্বে সবচেয়ে বেশী রোগীর বয়স ৪০ থেকে ৬০। সংসারের উপার্জনক্ষম ও কর্মক্ষম জনশক্তিরাই মূলত: এ রোগে আক্রান্ত। শহুরে আধুনিক জীবন যাপন পদ্ধতি এর জন্য আংশিক দায়ী। কায়িক পরিশ্রমহীন জীবনযাপন পদ্ধতি ও শরীরের ওজন বৃদ্ধি না থামাতে পারলে ভবিষ্যতে এ রোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
জাতিসংঘ ঘোষণা, এ ভয়াবহতা দূর করতে দরকার সবক্ষেত্রে সম্মিলিত উদ্যোগ। সময়োপযোগী  এবং যথার্থই জাতিসংঘের ঘোষণা- ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদী, অবক্ষয় ও ব্যয়বহুল রোগ, যা অনেক মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে এবং এ রোগ এখন পরিবার, রাষ্ট্র ও সারা বিশ্বের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ ঘোষণার পক্ষে ৬১/২২৫তম প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সে অনুযায়ী ২০০৭ সাল থেকে প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসকে একটি জাতিসংঘ দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ডায়াবেটিস ক্রমেই বাড়ছে পৃথিবীতে এবং এমন অনুমানও হচ্ছে যে, ২০২০ সালে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বর্তমানে যে খরচ হয় এর ৩০% খরচ বেড়ে যাবে। এসব খরচ অনুমান করা হয়েছে ডায়াবেটিস সম্পর্কিত অসুখগুলোকে চিন্তায় রেখে। অর্থাৎ এমন সব অসুখ যেগুলোর ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসকে একটি কারণ বা উপাদান হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয় যেমন হৃদরোগ, ষ্ট্রোক, চোখের রোগ ও বয়স্কদের অন্ধত্ব, কিডনীর রোগ, প্রজনন অক্ষমতা এবং রক্তপ্রবাহের এমন সব সমস্যা যা বাড়লে অঙ্গচ্ছেদ (বিশেষভাবে পায়ের আঙ্গুল বা পা) প্রয়োজন হয়।
ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ :
ঘন ঘন প্রস্রাব, স্বল্প সময়ে ওজন কমে যাওয়া, অধিক তৃষ্ণা এবং মুখ শুকিয়ে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, অতিশয় দুর্বলভাব, অতিরিক্ত ক্ষুধা ও ক্ষত না শুকানো। অধিকাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ওপরের উপসর্গগুলো নাও থাকতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও উপসর্গহীনতা বা অসচেতনতার কারণে প্রায় ৫০% রোগীই জানেন না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে। ক্ষেত্র বিশেষে অনেক দেশে এমন রোগীর সংখ্যা ৮০%।
যাদের ডায়াবেটিস হয় এদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনেরই টাইপ ২ ডায়াবেটিস। এ ধরণের ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য এবং পদক্ষেপ নিলে এ রোগকে অনেক বিলম্বিত করা যায়। এজন্য বড় কোনো আয়োজন প্রয়োজন নেই। সহজ কিছু টিপ্স রয়েছে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য।
* প্রতি বেলার খাবার খেতে হবে সময়মতো আস্তে আস্তে। তাড়াহুড়ো করে খাবার খাবেন না।
* কি পরিমাণ খাওয়া হচ্ছে, এও গুরুত্বপূর্ণ। বড় আয়তনের তৈরী খাবার না খেয়ে ছোট আয়তনেরও তো খাওয়া যায়। বলা হলো ওবেলা ভাত না খেয়ে রুটি খাবেন। এখন ভারি ভারি ছ’টা রুটি খেলে তো আর কাজ হলো না। উল্টো ফল হলো।
* আঁশ, তুষ, গোটা শস্য বেশি বেশি খেতে হবে। ময়দার রুটি আর মিলে ছাটা চালের বদলে লাল আটার রুটি বা ঢেঁকি ছাটা চালের ভাত খেলে ভালো। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের জন্য বাশমতি চালের ভাত ও নতুন আলুর ভাজি ভালো খাবার। তবে পুরনো আলুর ভর্তা বা আলু চপ বেশী না খাওয়াই ভালো।
* অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিজাতীয় খাবার যথাসম্ভব পরিহার করুন। প্রতিদিন কিছু পরিমাণ শাক-সবজি ও ফলমূল খান।
* ফাস্টফুড এবং কোল্ড ড্রিংকস পরিহার করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ আর্সেনিক মুক্ত পানি পান করুন।
* বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে পরিবেশিত রিচফুড যথাসম্ভব পরিহার করুন।
* ওজন নিয়ন্ত্রণের চমৎকার একটি উপায় হচ্ছে হাঁটা। তাই কম দূরত্বের জায়গাগুলোতে হেঁটে চলাচল করুন।
* লিফট এর বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।
* একটানা অধিক সময় বসে কাজ করবেন না।  কম্পিউটার ব্যবহার ও কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ান। একটু পায়চারি করুন ও গেম খেলা কমিয়ে দিন। টিভি দেখতে দেখতে চিপ্স খাবেন না। বেশী ক্ষুধার্ত হলে শসা খান।
* অলসতা দূর করতে সংসারের টুকিটাকি কাজ নিজেই করুন। সুযোগ থাকলে বাগান করুন, খেলাধুলা করুন। টিভির রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার কমিয়ে নিজে উঠে গিয়ে চ্যানেল পরিবর্তন করুন।
* ব্যায়াম শুরু না করে থাকলে জীবনে যোগ হোক শরীর চর্চা। সপ্তাহে তিন/চার দিন কিছু সময় ব্যায়াম করুন। সাঁতার কাটা একটি ভালো ব্যায়াম। নিয়মিত সাইক্লিং ও দ্রুত হাঁটা খুবই ভালো (যদি আপনার ডাক্তার নিষেধ না করেন)।
* ধূমপান বর্জন করুন, কেননা ধূমপান ডায়াবেটিসের একটি কারণ।
* ডায়াবেটিস আক্রান্ত হয়ে থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শমত চিকিৎসা গ্রহণ করুন। ঔষধ, ব্যায়াম, খাদ্যগ্রহণ তথা সার্বিক জীবনযাপন সংক্রান্ত তার সুনির্দিষ্ট এবং বিজ্ঞানসম্মত উপদেশ (যা শুধুমাত্র আপনার জন্য প্রযোজ্য) মেনে চলুন।
লেখক : কার্যকরী কমিটির সদস্য, সিলেট ডায়াবেটিক সমিতি।

যুক্তরাজ্য’র রসডেল সেন্ট্রাল ওয়ার্ড কাউন্সিলার সৈয়দ আলী আহমদ বিমানবন্দরে সংবর্ধিত

রসডেল সেন্ট্রাল ওয়ার্ড কাওন্সিলার, শিক্ষানুরাগী ও সমাজ সেবক, সৈয়দ আলী আহমদ (হাফিজ), বিশিষ্ট সমাজ 20151111_135420(1) copyসেবক সৈয়দ সিরাজ উদ্দীন, তরুণ সমাজ সেবক রসডেল জাসাসের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফারুক আহমদ (রহমান) যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে সংক্ষিপ্ত বিস্তারিত