বিভাগ: ভেতরের পাতা

দেশকে এগিয়ে নিতে সকলের মধ্যে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা থাকতে হবে -কেয়া চৌধুরী এমপি

SAM_1014সংরক্ষিত আসনের (সিলেট-হবিগঞ্জ) সংসদ সদস্য এডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী গত শনিবার দক্ষিণ সুরমার তেতলী ইউনিয়নের ধরাধরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর উদ্বোধন ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। বিস্তারিত

লালাদীঘিরপারে দম্পত্তিকে আহত করার ঘটনায় ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

স্টাফ রিপোর্টার :
পূর্ব শক্রতার জের ধরে নগরীর লালদীঘিরপারে এক দম্পত্তিকে মারপিট করে আহত করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় লালাদিঘীরপাড়ের ৩ নং বাসার বাসিন্দা মৃত আব্দুল আজিজের পুত্র হাজী মোঃ সইদুল হক বাদি হয়ে পথরোধ করে খুন করার উদ্দেশ্যে মারপিটে জখম ও স্ত্রীকে শ্লীলতাহানী করার অপরাধে ৮ দুর্বৃত্তসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৪/৫ বিস্তারিত

আজিজুল মালিকের মৃত্যুতে রাইফেলস ক্লাবের শোক

সিলেট রাইফেলস ক্লাবের সহ সভাপতি এডভোকেট আজিজুল মালিক এর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সিলেট রাইফেলস ক্লাবের সভাপতি ও সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: শহিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক জাহিদ খান সায়েম। এক যুক্ত বিবৃতিতে তারা রুহের মাগফেরাত কামনা করে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। বিজ্ঞপ্তি

এডভোকেট আজিজুল মালিক চৌধুরীর মৃত্যুতে বিভিন্ন মহলের শোক প্রকাশ অব্যাহত

সিলেট উন্নয়ন সংস্থা : সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি প্রবীণ আইনজীবী, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক এডভোকেট আজিজুল মালিক চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সিলেট উন্নয়ন সংস্থার নেতৃবৃন্দ। এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এডভোকেট আজিজুল মালিক চৌধুরী ছিলেন সিলেটের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিস্তারিত

ছাত্রনেতা খান জামাল এর বাসায় পুলিশী তল্লাশিতে জেলা বিএনপির নিন্দা

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুল আহাদ খান জামাল এর মিরাবাজারস্থ বাসায় গত রবিবার রাতে পুলিশী তল্লাশির নামে পরিবারের সদস্যদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দেন সিলেট জেলা বিএনপির আহবায়ক এড. এম. নুরুল হক, যুগ্ম আহবায়ক দিলদার হোসেন সেলিম, বিস্তারিত

টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে লংমার্চ এর দশম বার্ষিকী আজ ॥ নদী আগ্রাসনের মোকাবেলায় চাই জাতীয় ঐক্য

মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী

আজ ১০ মার্চ টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে লংমার্চ এর দশম বার্ষিকী। ২০০৫ সালের  ৯ ও ১০ মার্চ  ’ভারতীয় নদী আগ্রাসন প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির ব্যানারে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের নেতৃত্বে রাজধানীর মুক্তাঙ্গন থেকে সিলেটের জকিগঞ্জ অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মরুভূমিতে পরিণত করতে চায়। দু‘দেশের বিশাল জনগোষ্ঠির প্রবল আপত্তি, আন্দোলন, প্রতিবাদ ও প্রচন্ড ক্ষোভকে পাত্তা না দিয়েই ভারত একতরফা ভাবে সুরমা কুশিয়ারার উৎস মুখ বরাক নদীতে টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণে চূড়ান্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিপাইমুখে বাঁধ নির্মিত হলে ২০৫০ সালে বৃহত্তর সিলেট মরুভূমি হয়ে যাবে। হুমকির মুখে পড়বে ভাটি এলাকার আড়াইকোটি মানুষের জীবনযাত্রা। পাল্টে যাবে নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য। বিশেষজ্ঞদের মতে এই বাঁধ সর্বনাশা আরেক ফারাক্কার ন্যায় অভিশপ্ত মরণফাঁদ! তাদের মতে টিপাইমুখে বাঁধ নির্মিত হলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন মারাত্মক হ্রাস পাবে’। সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে এই বাঁধ নির্মাণের ফলে ৩৫০কিলোমিটার দীর্ঘ সুরমাও ১১১ কিলোমিটার দীর্ঘ কুশিয়ারার নাব্যতা হারিয়ে যাবে।
ভারত শুকনো মওসুমে পানি আটকিয়ে এবং বর্ষায় পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদেরকে মারতে চায়। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ যখন বাংলাদেশের মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, তখন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালে লংমার্চ করেন ফারাক্কা অভিমুখে। তাঁর লংমার্চের উদ্দেশ্য ছিলÑ প্রথমত, ফারাক্কা বাঁধের ফলে ভাঁটির দেশ বাংলাদেশের সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রতিবাদ করা। দ্বিতীয়ত, ফারাক্কার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করা। তৃতীয়ত, “ভারতের পানি আগ্রাসন”-এর ব্যাপারে বিশ্ব জনমতকে আকৃষ্ট করা। ফারাক্কা আর টিপাই বাঁধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। উভয় কারণেই বাংলাদেশের অস্তিত্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই ফারাক্কার বিরুদ্ধে মাওলানা ভাসানীর লংমার্চের পর ঐতিহাসিকভাবেই টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে আরেকটি লংমার্চ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। ২০০৫ সালে রাজধাণীর মুক্তাঙ্গন থেকে সিলেটের জকিগঞ্জ অভিমুখে লংমার্চ করে এই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি পালন করলেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। সেদিন মাওলানা খানের ডাকে প্রবাসীদের একটি কাফেলা সহ দেশের প্রায় ৩০টি ছোট বড় সংগঠন টিপাইমুখ অভিমুখের লংমার্চে যোগদান করেছিল। টিপাইমুখ বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা ব্যক্ত করে সেদিন বলা হয়েছিল: সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে এই বাঁধ নির্মাণের ফলে ৩৫০কিলোমিটার দীর্ঘ সুরমাও ১১১ কিলোমিটার দীর্ঘ কুশিয়ারার নাব্যতা হারিয়ে যাবে, মরুময় হবে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার বিশাল এলাকা। টিপাইমুখে বাঁধ নির্মিত হলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন মারাত্মক হ্রাস পাবে’।
অনুসন্ধানে জানা গেছে ১৯৯০ সালে ভারত প্রথম টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। মনিপুর রাজ্যের জনগণ ও বাংলাদেশের প্রতিবাদের কারণে ২০০৬ সালের ২৫ নভেম্বর এই বাঁধ নির্মাণ থেকে পিছু হটে ভারত।
ঊল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে ফারাক্কা নিয়ে ভারত নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করে। এর মধ্যে ১৯৭২ সালে গঠিত হয় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (জে আর সি)। ১৯৭৪ সালের মুজিবÑইন্দিরা যুক্ত ইশতিহারে বলা হয়েছিল, ফারাক্কা বাঁধ সর্ম্পূণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষ যাতে সমঝোতায় আসতে পারে সে জন্য ভারত প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফিডার ক্যানেল’ চালু করবে। তখন ওই শীর্ষ বৈঠকে আরো স্থির হয় যে, শুষ্ক মৌসুমের পানি ভাগাভাগির পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে কোন চুক্তিতে উপনীত হওয়ার আগে ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হবেনা। সমানভাবে দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করা হবে।’ যুক্ত ইশতিহারের এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। ভারত বাংলাদেশের কাছে ওয়াদা করেছিল, ৪১ দিনের নির্ধারিত সময়ে ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি ফিডার ক্যানেল দিয়ে হুগলী নদীতে নিয়ে যাবে। কিন্তু ৪১ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভারত পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোন সমঝোতা বা চুক্তি না করেই  ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি নিজ দেশের অভ্যন্তরে প্রত্যাহার করে চুক্তি ভঙ্গ করে। ফলে ফারাক্কার পানি বন্টন নিয়ে শুরু থেকেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের মনোমালিন্য চলতেই থাকে। মওলানা ভাসানী লংমার্চের আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে চিঠি লিখে ও এই বাঁধ বন্ধের আহবান জানিয়েছিলেন। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ইন্দিরা গান্ধির কাছে লিখিত চিঠিতে সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা আর ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবের ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলা হয়, ‘বিশ্বের অন্যতম মহাপুরুষ মহাত্মা গান্ধিকে তোমার দেশের বিশ্বাসঘাতক নথুরাম গডসে হত্যা করিয়া যে মহাপাপ করিয়াছে তাহার চেয়ে ও জঘন্য পাপ তোমার দেশের দস্যুরা করিতেছে।’ তিনি চিঠিতে আরো উল্লেখ করেন, ‘আমার আন্তরিক আশা, তুমি স্বচক্ষে দেখিলেই ইহার আশু প্রতিকার হইবে এবং বাংলাদেশ ও হিন্দুস্থানের মধ্যে ঝগড়া-কলহের নিষ্পত্তি হইয়া পুনরায় বন্ধুত্ব কায়েম হইবে। ফারাক্কা বাঁধের দরুন উত্তরবঙ্গের উর্বর ভূমি কিভাবে শ্মশানে পরিণত হইতেছে তাহাও স্বচক্ষে দেখিতে পাইবে।’ এই চিঠির কোনো উত্তর না পেয়েই মওলানা ভাসানী জীবন সায়াহ্নে এসে লংমার্চের আহবান করেন। পরবর্তিতে যদিও ১৯৭৪ সালের ৪মে ইন্দিরা গান্ধি সে চিঠির উত্তর দিতে গিয়ে ‘ব্যথিত ও বিস্মিত’ হন। ১৬ মে‘কে লংমার্চের দিন হিসেবে বেছে নেয়ার পেছনে কারণ যে বিষয়টি কাজ করেছিল তা হলো, ১৯৭৪ সালের ওই দিনটিতেই স্বাক্ষরিত হয়েছিল মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতিসংঘের শরণাপন্ন হলে ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি সর্বসম্মত বিবৃতি গৃহীত হয়, যাতে অন্যান্যের মধ্যে ভারতকে সমস্যার একটি ন্যায্য ও দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে জরুরী ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেওয়া হয়। জাতিসংঘের এই নির্দেশনার পর পানি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা এবং  চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও শর্ত রাখছে না ভারত।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম-বদ্বীপ অঞ্চল। ৫৮টি আর্ন্তজাতিক নদীসহ কমপক্ষে ২৩০টি নদ-নদী বিধৌত একটি প্লাবন ভূমি। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উৎপত্তি  ৩টি মিয়ানমার থেকে এবং ৫৫টির উৎপত্তি ভারত থেকে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সম্পাদিত গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে বাংলাদেশের সাথে ৩০ সালা চুক্তি অনুযায়ী ভারত পানি না দেয়ার ফলে এককালের প্রমত্তা পদ্মা ও খরস্রোতা যমুনা এখন পানি শূন্য। এদেশের অনেক নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। মরে গেছে অনেক। বিলুপ্তির পথে আরো প্রায় ৫০ নদী । বর্ষা মৌসুমে পানি বৃদ্ধির ফলে দেশের প্রায় এক-চর্তুথাংশ স্থলভাগ পানিতে ডুবে যায়, আবার শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ নদীতে প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার ফলে পানির দুর্র্ভিক্ষ দেখা দেয়। উভয় পরিস্থিতিতেই আমাদের জনজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সম্প্রতি বাংলাদেশের হাওর অধ্যুষিত অঞ্চল বলে খ্যাত দেশের ৭টি জেলা যথাক্রমে সিলেটের-৪৩টি, সুনামগঞ্জের-১৩৩টি, হবিগঞ্জের-৩৮টি, মৌলভী বাজারের ৪টি, নেত্রকোণার-৮০টি, কিশোগজ্ঞের-১২২টি ও বি.বাড়ীয়া জেলার-৩টি হাওরের সবকটিই ভারত থেকে নেমে আসা পানিতে তলিয়ে যায়।
ভারত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহারের কনভেনশন (১৯৯৭) সহ কোন আইনই তোয়াক্কা করছেনা। বাংলাদেশ থেকে ১৭ কিলোমিটার উজানে ভারত শুধু গঙ্গায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, আন্তর্জাতিক সকল নিয়ম-নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে গত ২৮ এপ্রিল (২০১০)টিপাইমুখ মাল্টিপারপাস বাঁধ তৈরী শুরু করার জন্য বাঁধ তৈরীর সাথে সংশ্লিষ্ট ভারতের হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি পাওয়ার কর্পোরেশন (এনএইচপিসি), সাটলুজ জলবিদ্যুৎ নির্গম লিমিটেড (এসজেভিএন) এবং মণিপুর সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এনএইচপি লিমিটেডের সিএমডি শ্রী এস.কে গ্রেস, এসডেভিএন লিমিটেডের সিএমডি শ্রী এইচ কে শর্মা, মণিপুর রাজ্য সরকারের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারী এল পি গনমি এ স্মারকে স্বাক্ষর করেন। ১৫০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এ প্রকল্পটি মণিপুর রাজ্যের চূড়াচাদঁপুর জেলায় স্থাপিত হবে। ভারত-বাংলাদেশে অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে গঙ্গা ছাড়া বাকি ৫৩টির পানি বণ্টন চুক্তি আদৌ সম্ভব হবে কি না, হলেও কত বছর লেগে যাবে, চুক্তি মতো পানি পাওয়া যাবে কি নাÑ এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছে না। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সামান্যতম লাভবান না হলেও এবাঁধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ।
ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর ১৯৭৬ সালে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লংমার্চ করে বিশ্ব বিবেকের নজর কেড়েছিল।  উল্লেখ্য যে, ২০০৫ সালের ৯  মার্চ আগ্রাসন প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির আহবায়ক,জমিয়তে ঊলামায়ে ইসলামের নির্বাহী সভাপতি মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের নেতৃত্বে টিপাইমুখ বাঁধ অভিমুখী ঐতিহাসিক লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর মুক্তাঙ্গন থেকে শুরু হয়ে ১০ মার্চ ২০০৫ইং সিলেটের জকিগঞ্জে ঐতিহাসিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। লাখো জনতার উপস্থিতিতে স্মরণ কালের এ বৃহৎ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (র.)। এদিকে ১৯৯৫ সালের ৫ এপ্রিল সিলেট জেলা জমিয়তের উদ্যোগে সর্বপ্রথম  বারঠাকুরিতে বরাক বাঁধের বিরুদ্ধে বিশাল সমাবেশ অনষ্ঠিত হয়। বরাক নদীতে এই বিশাল বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ এবং পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ বরাক নদী বাংলাদেশে যেখানে বিভক্ত হয়েছে সুরমা ও কুশিয়ারা হিসেবে, সেখান থেকে একশ কি .মি. উজানে নির্মাণাধীন এই বাঁধটি অবস্থিত। টিপাইমুখ বাঁধটি যে এলাকায় নির্মিত হচ্ছে সেটি মারাত্মক ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এ বাঁধের বিরুদ্ধে যে শুধু বাংলাদেশের জনগণই প্রতিবাদি হয়ে উঠেছে তা, নয়। বরং এ বাঁধের বিরুদ্ধে ভারতের জনগণও সোচ্চার। ২০০৭ সালের ১৪মার্চ মণিপুরের জনগণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বরাবরে স্মারকলিতে উল্লেখ করেন যে, আমরা এই স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরকারীগণ আপনাকে  স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯৮০ সালের শেষ দিক থেকে  বছরের পর বছর টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে এ ধরনের বহু স্মারক লিপি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে প্রদান করা হয়েছে। মণিপুরবাসী স্মারকলিপিতে আরো বলেন-টিপাইমুখ বাঁধ বাতিল করুন, বরাক নদীকে মুক্তপ্রবাহিত হতে দিন।’
গবেষকদের মতে, দেশের উত্তর-র্পূবাঞ্চলীয়  সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর উপর এর অত্যন্ত মন্দ প্রভাব পড়বে এবং বাংলাদেশের এক বিশাল অঞ্চলের জীবন-জীবিকা, প্রতিবেশ-পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের মতে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বন্ধ করা হলে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৭ টি জেলা- সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্চ, বি বাড়ীয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণায় ফসল সহ কৃষি ও পশু সম্পদ উৎপাদন ব্যাহত হবে। ভারতের নদী আগ্রাসনের মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের সীমাহীন শৈথিল্য ও অনিহার প্রেক্ষিতে দেশের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষায় দেশপ্রেমিক জনগণকেই র্কাযকর ভূমিকা পালন করতে হবে। আর সে আগ্রাসী অপতৎপরতা রোধে চাই সম্মিলিত প্রতিরোধ, গড়ে তোলতে হবে জাতীয় ঐক্য।
লেখক : সিনিয়র সহসভাপতি-অনলাইন জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন সিলেট।

ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিরূপণ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাজ্য ছিলো সে দেশে আর সেখানে ছোট ছোট উপভাষার সংখ্যাও বেশি। ঐসব উপভাষাগুলো আবার দীর্ঘ মিশ্র অঞ্চল দ্বারা বিচ্ছিন্ন। জার্মানির উপভাষা পরিস্থিতি অতীতের রাজনৈতিক স্থিতিহীনতা এবং নিকট অতীতের আঞ্চলিক পটপরিবর্তনের প্রতিফলন। সমাজ কাঠামো বা সামাজিক কার্যকারণ কিভাবে ভাষাকে প্রভাবিত করে লিওনার্ড ব্লুমফিল্ড তা বিশ্লেষণ করেছেন, তাঁর মতে মানব সমাজের ভাষাতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য জনবসতির গভীরতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং ভাষাভাষীর পারস্পরিক যোগাযোগের ব্যাপকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। পূর্বে ভাষাতাত্ত্বিকরা ভাষা ও পরিবেশগত কারণের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতেন, ব্লুমফিল্ড মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ব্যাপারটি ভাষাতাত্ত্বিক ও অভাষাতাত্ত্বিক বিষয়ের মধ্যে মাধ্যমরূপে চিহ্নিত করেছেন। ভাষার মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমন কি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষভাবে প্রতিফলিত বলে তিনি মনে করেন নি, ঐসব বিষয় মানুষের মৌলিক যোগাযোগকে যতটা চালিত করতে পারে ততটুকুই তা ভাষাকে প্রভাবিত করে। ‘‘খবড়হধৎফ ইষড়ড়সভরবষফ, খধহমঁধমব, ঘবি ণড়ৎশ, ঐড়ষঃ, জরহবযধৎঃ ্ ডরহংঃড়হ, ১৯৩৩.’’
অধুনা সামাজিক ভাষাতত্ত্বের লক্ষ্য ভাষাসমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষার ভিত্তিতে সামাজিক ব্যবস্থাসমূহ তুলনা করা। ভাষার কোন্ রূপ কত লোক কি পরিবেশে ব্যবহার করে থাকে এবং ভাষার বিভিন্ন রূপের প্রতি স্থানীয় মনোভাব কি তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়। ঐ বিষয়টি অনুধাবনের জন্যে ভাষার দ্বিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয়। যার একটি ভাষার অভ্যন্তরীণ রূপ, অপরটি যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ভাষার ভূমিকা। ভাষার প্রথম বৈশিষ্ট্যে যেসব বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য যাচাই করা হয় সেগুলো হলো, ‘স্টান্ডার্ড’ বা শিষ্টভাষা, ‘ভারনাকুলার’ বা লোকভাষা, ধ্র“পদী এবং মিশ্রভাষা। ভাষার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বা যোগাযোগ মাধ্যম রূপে যেসব বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য খোঁজা হয় তা হলো, ব্যক্তি বা শ্রেণির ভাষা, বৃহত্তর যোগাযোগের ভাষা, পেশা বা ব্যবসা-বাণিজ্যের ভাষা ইত্যাদি। ‘‘ঔড়যহ ঔ. এঁসঢ়বৎু, ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ, উরৎবপঃরড়হং রহ ঝড়পরড় খরহমঁরংঃরপং, ঘবি ণড়ৎশ, ঐড়ষঃ, জরহবযধৎঃ ্ ডরহংঃড়হ, ১৯৭২, চ ১-২৫.’’
ঐ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আধুনিককালে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জরিপ চালান হয়, এসব জরিপ নাগরিক পরিবেশে ভাষার পরিবর্তন সম্পর্কে আলোকপাত করে। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে স্কটল্যান্ডের ভাষাতাত্ত্বিক জরিপ থেকে দেখা যায়, যেখানে শিক্ষার হার খুব বেশি সেখানে শিষ্ট ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষারও সহ অবস্থান রয়েছে। স্কটল্যান্ডে শিষ্ট ভাষার বৈশিষ্ট্য স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য থেকে ভিন্নতর হওয়ায় বোঝা যায়
ভাষার বৈচিত্র্য মূলত সামাজিক সম্পর্কের ওপরেই নির্ভরশীল, আঞ্চলিক বা ভৌগোলিক প্রভাব সেখানে পরোক্ষ। আমেরিকায় ভাষাতাত্ত্বিক উইলিয়ম লেবভ নিউইয়র্ক মহানগরীর ইংরেজি ভাষার বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ে প্রশ্নমালা ও উত্তর সংগ্রহের প্রচলিত উপভাষা জরিপ পদ্ধতি বর্জন করে নতুন রীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তিনি এক একটি অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের মধ্য থেকে বিশেষ নির্ভরযোগ্য উপভাষাভাষী বেছে নিয়ে তাদের ভাষার সম্ভাব্য সকল বৈশিষ্ট্য জরিপ করেন। শুরুতে তিনি নির্দিষ্ট এলাকার এমন কয়েকটি ধ্বনিতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য জরিপ নির্বাচন করেন যা দৈনন্দিন জীবনে বহুল ব্যবহৃত এবং ঐ এলাকার মানুষের ব্যক্তিভঙ্গির বৈচিত্র্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ, সর্বোপরি যার মধ্যে সামাজিক তথ্যাদি সর্বাধিক ধরা পড়ে। তিনি বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলো লিপিবদ্ধ করেন, প্রতিনিধি স্থানীয় ব্যক্তির কাছ থেকে তার ভাষাতাত্ত্বিক নমুনা সংগ্রহ করেন এবং বিভিন্ন প্রকার ঘরোয়া ও আনুষ্ঠানিক পরিবেশে কথাবার্তার মধ্য দিয়ে তিনি তার উপাদানকে সম্প্রসারিত করেন। এই পদ্ধতিতে ভাষাভাষীর সমাজ শ্রেণীগত ও জাতিগত বৈচিত্র্য নির্ভরযোগ্য রূপে ধরা পড়ে। উইলিয়াম লেবভ তার জটিল ও কার্যকর পদ্ধতির মাধ্যমে ভাষার সমসাময়িক পরিবর্তনকেও সনাক্ত এবং দৃশ্যমান করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। ‘‘ঔড়যহ ঔ. এঁসঢ়বৎু, ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ, উরৎবপঃরড়হং রহ ঝড়পরড় খরহমঁরংঃরপং, ঘবি ণড়ৎশ, ঐড়ষঃ জরহবযধৎঃ ্ ডরহংঃড়হ, ১৯৭২, চ. ১-২৫.’’ বর্তমানকালে ইংরেজি ভাষার স্বরধ্বনি পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতি সমগ্র ইংরেজি ভাষাভাষী জগতের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জরীপ ও বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন। লেবভের যুগান্তকারী ‘নিউইয়র্ক সমীক্ষা’ আমেরিকায় সামাজিক ভাষাতত্ত্বের নতুন ঐতিহ্য ও ধারা সৃষ্টি করেছে। উপভাষাতত্ত্ব আর কেবল মাত্র আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহ ও সংকলন নয় বা ভাষার ভৌগোলিক বৈষম্য অনুসন্ধান নয় বরং ভাষার বহুমুখী সামাজিক ভূমিকার সমীক্ষা।
উপভাষাতত্ত্বের বিবর্তনের যে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা ভাষার বৈচিত্র্য বিশ্লেষণের যে সব প্রয়াস হয়েছে তার আলোচনা করতে পারি। পর্তুগিজ ধর্মযাজক মানোএল দা আস্সুস্পাসাঁও ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ভোকাবুলারিও এম্ ইদিওমা বেন্গাল্লা এ পর্তুগিজ’ নামক বাংলা ভাষার যে প্রথম ব্যাকরণটি ঢাকা জেলার ভাওয়াল পরগানায় বসে রচনা করেছিলেন তাতে ভাওয়াল অঞ্চলের উপভাষা ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৭৩৫ খ্রিষ্টাব্দে রচিত উক্ত লেখকের ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ বেদ’ গ্রন্থেও ভাওয়ালের উপভাষা ব্যবহৃত হয়। শতাধিক বছর পূর্বে পূর্ববাংলার উপভাষার রূপ কেমন ছিল তার যৎকিঞ্চিৎ নমুনা মানোএলের ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ, বেদ’ গ্রন্থে পাওয়া যায়। গ্রন্থটিতে গুরু ও শিষ্যের নিম্নরূপ কথোপকথন রয়েছে:
শি : পূজ্য হোক সিদ্ধি পরম নির্মল ধর্ম।
গু : তিনি তোমার আশীর্বাদ দেক, এবং তোমারে ভাল করুক; আইস পোলা, তুমি কেটা?
শি : আমি খ্রীস্তাও, পরমেশ্বরের কৃপায়।
গু : কোথায় যাও?
শি : বারিতে যাই।
গু : তোমার বারি কোথায়?
শি : ভাওয়াল দেশে; আমি তোমার বাইয়ত। নাগরিতে বসি।
গু : আমি তো সেখানে যাই। আমার সঙ্গে আইস। ‘‘ সবিতা চট্টোপাধ্যায়, বাঙ্গালা ইউরোপীয় লেখক, কলিকাতা, ফার্মা কে.এল. মুখোপাধ্যায়, ১৯৭২, পৃ. ৯৩-৯৯।’’
মানোএলের ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ, বেদ’ গ্রন্থের নাম পৃষ্ঠাতেই উল্লেখ আছে :
ফাদার মনোএল-দা আস্সুস্পাসাঁও লিখিয়াছেন এবং বুঝাইয়াছেন বাঙ্গালাতে ভাওয়াল দেশে, সন, হাজার সাত শত পাইনতিশ বসসর খ্রীস্টর জর্ম বাদে। ‘‘ সবিতা চট্টোপাধ্যায়, বাঙ্গালা ইউরোপীয় লেখক, কলিকাতা, ফার্মা কে.এল. মুখোপাধ্যায়, ১৯৭২, পৃ. ৯৩-৯৯।’’
গ্রন্থটিতে গুরু ও শিষ্যের, সংলাপ থেকে শতাধিক বছর পূর্বের পূর্ববঙ্গের উপভাষার নিম্ন প্রকার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য উদ্ধার করা যায়। ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য-পশ্চাৎ নিম্নমধ্য গোলাকৃতি ‘অ’ স্বরধ্বনির স্থানে পশ্চাৎ উচ্চ গোলাকৃতি ‘উ’ ধ্বনি, যথা শহর > গুহর। পশ্চাৎ উচ্চ মধ্য গোলাকৃতি ‘ও’ ধ্বনির স্থানে পশ্চাৎ উচ্চ গোলাকৃতি ‘উ’ ধ্বনি, মোটা > মুটা। অঘোষ স্বল্পপ্রাণ স্পৃষ্ট কণ্ঠ ‘ক’ ধ্বনির স্থানে ঘোষ স্বল্পপ্রাণ ‘গ’ ধ্বনি, কাক > কাগ, শাক > শাগ। শব্দের আদি অবস্থানে উষ্ম তালব্য ব্যঞ্জন ‘স/শ’ স্থানে ‘হ’ সকল > হগল। স্বরমধ্যবর্তী অঘোষ স্বল্প ও মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট কণ্ঠ ‘ক’ ও ‘খ’ স্থানে ‘হ’, রাখাল > রাহআল। ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ, বেদ’ গ্রন্থে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষার বর্তমানে প্রচলিত রূপ ‘কইন্যা’ বা ‘রাইখ্যা’ নেই আছে ‘কনিয়া’, ‘রাখিয়া’ তবে ‘মধ্যে’ শব্দের রূপ সেখানে ‘মইধে’। শব্দ মধ্যে ‘ই’ আগমের পূর্ববঙ্গীয় রীতির উপস্থিতি রয়েছে, যেমন- বোন > বইন, চার > ছাইর, ষাট > ষাইট ইত্যাদি।
রূপতত্ত্বে, পূর্ববঙ্গীয় রীতিতে কর্তৃকারকে ‘এ’ বিভক্তির ব্যবহার ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ বেদ’ গ্রন্থে লক্ষণীয়, যেমন- ‘মাইয়াএ মরিয়া গেল’, ‘মাতাএ ছাওয়ালের উপরে প্রতি রাইতে সিদ্ধি ক্রুশ করিয়াছিল’ ইত্যাদি।
বাক্যরীতিতেও গ্রন্থটিতে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষার রীতি পাওয়া যায় যেমন- ‘আইস পোলা তুমি কেটা?’ ‘তুমি নি আস্থার নিরূপণ জান?’ ‘হায় জানি।’ ইত্যাদি। উক্ত গ্রন্থে পূর্ববাংলার উপভাষায় ব্যবহৃত অনেক শব্দ পাওয়া যায়, যেমন- যথা, ছাওয়াল, মাইয়া, পোলা, ফাল, লগে ইত্যাদি। ‘‘ সবিতা চট্টোপাধ্যায়, বাঙ্গালা ইউরোপীয় লেখক, কলিকাতা, ফার্মা কে.এল. মুখোপাধ্যায়, ১৯৭২, পৃ. ৯৩-৯৯।’’
উত্তরবঙ্গীয় : দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও পাবনা।
রাজবংশী : রংপুর।
পূর্ববঙ্গীয় : ক. ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালি।
খ. ফরিদপুর, যশোহর, খুলনা।
গ. সিলেট।
দক্ষিণবঙ্গীয়: চট্টগ্রাম, নোয়াখালি।
আধুনিক শিষ্ট বা কথ্য বাংলার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ঐ সব উপভাষার নিম্নরূপ সাধারণ ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য গ্রিয়ার্সন অনুসরণে মুনীর চৌধুরী নির্দেশ করেছেন। ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: তাড়নজাত মূর্ধন্য ব্যঞ্জন ‘ড়’ স্থানে দন্ত্য ‘র’, যথা বড় > বর। তাড়নজাত দন্ত্য ‘র’ স্থানে পার্শ্বিক ‘ল’ যেমন, শরীরে > শরীলে। রাজশাহী অঞ্চলে বিশেষত চাপাইনওয়াবগঞ্জ এলাকায় উষ্ম তালব্য ‘শ’ও উষ্ম দন্ত্য ‘স’ ধ্বনির মধ্যে বিভ্রান্তি। স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে সম্মুখ প্রসৃত উচ্চমধ্য ‘এ’ এবং নিম্নমধ্য ‘এ্যা’ ধ্বনি, পশ্চাৎ গোলাকৃতি নিম্নমধ্য ‘অ’ এবং উচ্চমধ্য ‘ও’ ধ্বনির মধ্যে বিভ্রান্তি। রাজবংশী বা রংপুরের উপভাষায় অঘোষ মহাপ্রাণ তালব্য ব্যঞ্জন ‘ছ’ এবং উষ্ম দন্ত্য ‘স’, ঘোষ স্বল্পপ্রাণ তালব্য ‘জ’ এবং উষ্ম দন্ত্য ‘য’ নাসিক্য দন্ত্য ‘ন’ এবং পার্শ্বিক ‘ল’, ঘোষ অল্পপ্রাণ দন্ত্য ‘দ’ এবং ঘোষ মহাপ্রাণ দন্ত্য ‘ধ’ ধ্বনির মধ্যে ব্যতিক্রম পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গীয়তে স্পৃষ্ট তালব্য ব্যঞ্জন ‘চ’ ‘ছ’ ‘জ’ ‘ঝ’ এর পরিবর্তে ঘৃষ্ট বা উষ্ম ‘ছ’ এবং ‘য’ ধ্বনি পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গীয়তে কোনো কোনো অঞ্চলে একটি স্বরতস্ত্রীয় স্পৃষ্ট ধ্বনি পাওয়া যায়। সিলেটীতে স্পৃষ্ট কণ্ঠ ‘ক’ এবং স্পৃষ্ঠ্য ‘ফ’ ধ্বনির ঘর্ষণজাত রূপ পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গীয়তে অঘোষ স্বল্পপ্রাণ ‘ক’ এবং মহাপ্রাণ ‘খ’ মধ্য অবস্থানে উষ্ম কণ্ঠ ‘হ’ ধ্বনিতে পরিণত হয়, আদি অবস্থানে ‘হ’ ধ্বনি ঊহ্য থাকে। দক্ষিণ বঙ্গীয়তে স্পৃষ্ট কণ্ঠ ‘ক’ ধ্বনি উষ্মতা প্রাপ্ত হয়। পূর্ববঙ্গীয়তে বর্গের চতুর্থ ধ্বনি ঘোষ মহাপ্রাণ ‘ঘ’, ‘ঝ’, ‘ঢ’, ‘ধ’, ‘ভ’ যথাক্রমে স্বল্পপ্রাণ ‘গ’ উষ্ম ‘য’, স্বল্পপ্রাণ ‘ড’ ও ‘দ’ ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়।
মুনীর চৌধুরী গ্রিয়ার্সন অনুসরণে বাংলাদেশের বিভিন্ন উপভাষার নিম্নরূপ রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করেছেন: উত্তরবঙ্গীয়তে কর্তার বহুবচনে তে বিভক্তি, যেমন- ছাওতে। কর্মে ‘দেক’, যেমন- চাকরদেক; গৌণকর্মে ‘গুণে’ যেমন- আমাকগুয়ে, বাপাকগুণে। অপাদানে ‘ত’, যেমন- কষ্টেত, দেশত। ক্রিয়াপদে অসমাপিতা ‘এ্যা’, যেমন- কর‌্যা, হয়্যা। উত্তমপুরুষে ভবিষ্যৎকালে ‘ইম’ ‘আম’, যেমন- বলিম, করিম।
রাজবংশীতে কর্তায় বহুবচনে ‘গুলা’, ‘গিলা’, যেমন- বালকগুলা। সম্বন্ধের বহুবচনে ‘ঘর’- চাকরেরঘর। কর্মকারকে ‘ক’ এবং সম্বন্ধে ‘কার- বালককার। অপাদানে ‘অত’, ‘ওত’- বালকত্। ক্রিয়াপদের রূপ, প্রথম পুরুষ বর্তমান ও পুরাঘটিত ‘ও’, যথা- মুই আছোঁ। অতীতে ‘নু’, আছিনু। ভবিষ্যতে ‘ম’, ‘মু’, ‘মো’, যথা- থাকিমু, থাকিম, থাকমো, থাকম। দ্বিতীয় পুরুষের অতীতে ‘লু’ ‘ল্লু’ ভবিষ্যতে ‘বু’, যেমন- তুই কাইল্লু, তুই করবু। পূর্ববঙ্গীয়তে- কর্মে ‘এরে’, বাপেরে। সম্বন্ধের বহুবচনে ‘গো’ ছাকরগো, তাগো। কর্মের বহুবচনে ‘রারে’, আমরারে, তোমরারে। অপাদানে ‘অ’, ‘ত’,- দিল, গলত।
ক্রিয়াপদের রূপ, প্রথম পুরুষ ভবিষ্যৎ- ‘মু’, কমু। ময়মনসিংহে ‘রাম’- করবাম। তৃতীয় পুরুষ অতীতে ‘ল’। অসমাপিকাকে ‘আ’, ‘ইয়া’- করিয়া, কইরা। কুমিল্লায় দ্বিত্ব বইল্লা, উইঠ্ঠা। কুমিল্লায় অনির্দেশক ‘তো’ ‘তাম’-করতো, কইতাম। ময়মনসিংহে ‘অত’, ‘বার’- বারত, আইগাইবার। সন্দ্বীপে ‘অন’- করন। সিলেটীতে সম্বন্ধের একবচনে। ‘অর’- গরর। আপাদানে ‘ত’, ‘ও’,-গরত, গরো। কর্তায় বহুবচনে ‘আইন’- গরাইন, ‘টাইন’, গরটাইন। অতীতে মধ্যমপুরুষে ‘লাই’- দেখলাই। তৃতীয়াতে ‘লা’- দেখলা। ভূতার্থ অনির্দেশকে ‘তাম’, ‘তায়’, ‘তা’, ‘তাইন’- খাইতাম, খাইতায়, খাইতা, খাইতাইন। ঘটমান বর্তমানে উত্তমপুরুষে ‘ত্রাম’, ‘ইয়ার’, ‘রাম’- যাইত্রাম, যাইয়ার, যাইরাম। দ্বিতীয় পুরুষে ‘ত্রায়’, ‘ত্রে’,- যাইত্রায়। নির্দেশাত্মক ‘উইন’, ‘উকা’, ‘উক্কা’। অনির্দেশক- ‘তায়’, ‘তে’, যেমন- তুই যাইতায় ছাও, হে যাইতো ছায় তাইন যাইতা ছাইন ইত্যাদি।
দক্ষিণ পূর্ববঙ্গীয় চট্টগ্রামীতে কর্তায় ‘এ’, অপাদানের ‘তুন’, সম্বন্ধে ‘অর’, অপাদানে ‘অত’, বহুবচনে ‘গুণ’ ‘উণ’, যথা- কুঁউরগুণ; বর্তমানকালে প্রথম পুরুষে ‘ব’, তৃতীয় পুরুষে ‘তান’। অতীতকালে প্রথম পুরুষে ‘(গ ইয়ম’, গে’, যথা- করগিয়ম, করিয়াম, করগি, অথবা করজিয়ম ইত্যাদি। দ্বিতীয় পুরুষে ‘(গ) ইয়’, ‘লা’; তৃতীয় পুরুষে ‘(গ০ ইয়’; ভবিষ্যত কালে ‘(গ) ইউম’, ‘বঅ’, ‘যাম; দ্বিতীয় পুরুষে ‘বে’, অনুজ্ঞা- ‘অ’ না বাচক ‘ইঅ’ যেমন- নকরিঅ। সম্মানবাচক- করওক। অসমাপিকা ‘ইয়ারে’, যথা- গরিয়ারে।
বাংলাদেশের উপভাষাসমূহে রূপতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য অধিক এবং তা নিম্নোক্ত তিনটি ক্ষেত্রে সর্বাধিক,- সর্বনাম, কারক বিভক্তি, ক্রিয়া বিভক্তি। যেমন- সর্বনামে ‘আমি’র উপভাষা রূপ উত্তরবঙ্গে ‘মুই’, নোয়াখালিতে ‘আই’। ‘আমার’, উত্তরবঙ্গে ‘মোর’, নোয়াখালিতে ‘আর’। ‘আমাদের উত্তরবঙ্গে ‘হামার’, ময়মনসিংহে ‘আমরার’, কুমিল্লায় ‘আমাগো’, বরিশালে ‘মোগো’, দক্ষিণবঙ্গে ‘আমরা’ ইত্যাদি।
কারক বিভক্তিতে ‘চাকরদের’, উত্তরবঙ্গে ‘চাকরদেরকে’, পূর্ববঙ্গীয়তে ‘ছাঅরগো’, দক্ষিণবঙ্গে ‘ছঅরগুণ’। ‘গলায়’, পূর্ববঙ্গে ‘গলাত’।
ক্রিয়া বিভক্তিতে ‘বলব’, উত্তরবঙ্গে ‘বলিম’, পূর্ববঙ্গে ‘কমু’, দক্ষিণবঙ্গে ‘খইয়ুম’ ইত্যাদি। ‘‘ গঁহরবৎ ঈযড়ফিযঁৎু, ওহঃবৎসধঃরড়হধষ ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ অসবৎরপধহ খরহমঁরংঃরপং. ঔঁষু, ১৯৬০ চ. ৬৪-৭৮.’’
গ্রিয়ার্সনের উপাদান বাংলাদেশের সমস্ত অঞ্চল থেকে সংগৃহীত তথ্যভিত্তিক নয়, যেমন- ঢাকা জেলা থেকে কেবল মানিকগঞ্জের নমুনা সংগৃহীত হয়েছিলো, ঢাকা শহরে প্রচলিত উপভাষার নমুনা সেখানে নেই। ফলে গ্রিয়ার্সনের জরিপে আঞ্চলিক বা ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপভাষার সীমানা নির্ণয় ও ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটন বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ণাঙ্গ নয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও বাংলা ভাষার উপভাষা বৈচিত্র্য পূর্ণাঙ্গভাবে নির্ণয় করেননি তবে বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিবর্তনের ইতিহাসে ঐ প্রসঙ্গে তিনি কিছু মূল্যবান মতামত রেখেছেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মত সংক্ষেপে নিম্নরূপ, বাংলা উপভাষাগুলি একটিমাত্র প্রত্মভাষার বিবর্তিত রূপ নয়, বাংলার উপভাষাগুলি সাধুভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত বাংলার ব-দ্বীপ অঞ্চলের নিজস্ব কোনো উপভাষা নেই, বিভিন্ন উপভাষার পারস্পরিক প্রভাবে এ
অঞ্চলের বাংলা ভাষা গড়ে উঠেছে। বাংলা উপভাষাগুলির যে চার প্রধান ভাগ- রাঢ়, বরেন্দ্র বা পু-ু, বঙ্গ এবং কামরূপ তার মধ্যে পূর্ব প্রত্যন্ত বঙ্গে অর্থাৎ সিলেট, ত্রিপুরা, নোয়াখালি এবং চট্টগ্রামের উপভাষাগুলিতে এমন সব ধ্বনিতাত্ত্বিক এবং রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আছে যা বাংলা ভাষার অন্য কোনো উপভাষায় নেই। পূর্ব প্রত্যন্ত বঙ্গের উপভাষার এই বৈশিষ্ট্যের কারণ ঐ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিহিত। উপভাষাগুলির ধ্বনিতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য ছাড়া আভিধানিক ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়, অপনিহিত ‘ই’ ধ্বনি রাঢ় বা অন্যান্য অঞ্চলের উপভাষা অপেক্ষা বঙ্গ ও বরেন্দ্র উপভাষায় অধিকতর রক্ষিত, এই দুটি উপভাষার স্বরধ্বনি-ব্যবস্থা অধিকতর লক্ষণশীল, মধ্যযুগের বাংলা ভাষার লক্ষণ ‘বঙ্গ উপভাষাগুলি’তে সবচেয়ে বেশি অটুট রয়েছে। স্বরমধ্যবর্তী মহাপ্রাণ ধ্বনির মহাপ্রাণহীনতার ফলে বঙ্গ উপভাষাগুলিতে নতুন বৈশিষ্ট্যের আগম ঘটেছে। পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব বাংলার উপভাষাগুলিতে আদ্য ও মধ্য অবস্থানে স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনের ব্যাপক উষ্মীভবন একটি বিশিষ্ট লক্ষণ এবং এই বৈশিষ্ট্য এই উপভাষাসমূহকে বাংলার অন্যান্য উপভাষা থেকে পৃথক করেছে। ‘‘ঝঁহরঃর কঁসধৎ ঈযধঃঃবৎলর, ঞযব ঙৎরমরহ ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ ইবহমধষর খধহমঁধমব. ঠড়ষ. ১, খড়হফড়হ. এবড়ৎমব অষষবহ ্ টহরিহ খঃফ. ১৯৭০, চ. ১৩৭-১৪৭. ’’
বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন ও প্রকাশের কৃতিত্ব বাংলা একাডেমীর, এ অভিধানের প্রধান সম্পাদক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। অভিধানটি বস্তবপক্ষে আঞ্চলিক শব্দের। প্রথমে ছিয়ানব্বই জন সংগ্রাহক প্রায় একুশ হাজার শব্দ সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলেন, পরে আবার চারশত তিপ্পান্ন জন সংগ্রাহক একলক্ষ ছেষট্টি হাজার দুইশত ছেচল্লিশটি আঞ্চলিক শব্দ প্রেরণ করেন। সংগ্রাহকের অর্ধাংশ ছিলেন অধ্যাপক ও শিক্ষক, এক চতুর্থাংশ ছাত্র, আর এক-চতুর্থাংশ বিভিন্ন কর্মজীবী। বাংলাদেশের সব জেলা থেকেই আঞ্চলিক শব্দ সংগৃহীত হলেও, ঢাকা শহরে অবস্থানকারী সংগ্রাহকেরাই ছিলেন সংখ্যাধিক্য, যদিও তাঁরা বিভিন্ন জেলার শব্দ সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলেন। ঢাকা শহরের বাইরে কোনো কোনো জেলার সংগ্রাহকের সংখ্যা তিন-চারজনের বেশি নয়। অধিকাংশ সদস্যই ধ্বনিতত্ত্ব জ্ঞান বা প্রশিক্ষণহীন ফলে শব্দের যথাযথ উচ্চারণ লিপিবদ্ধ করার বা ধ্বনিবৈশিষ্ট্য রক্ষার ক্ষমতাবিহীন কাজেই বিভিন্ন অঞ্চলের ধ্বনিবৈশিষ্ট্য সংগৃহীত শব্দাবলীর মধ্যে রক্ষিত হয়নি। ঐসব কারণে সংগৃহীত শব্দের মধ্যে পঁচাত্তর হাজারের বেশি শব্দ রাখা যায়নি। আলোচ্য অভিধানটির ভূমিকায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উপভাষার শ্রেণিবিন্যাস বা বিভিন্ন উপভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় নেই, সংগৃহীত শব্দাবলীর ভিত্তিতে কোনো ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এ অভিধানের ভূমিকাতে গ্রিয়ার্সন কৃত বাংলা উপভাষার প্রাচ্য বিভাগের পূর্বদেশী ও দক্ষিণ-পূর্ব শাখার নিম্নোক্ত তালিকাটি উদ্ধৃত করেছেন :
১.    পুর্বদেশী- ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বাখরগঞ্জ, দক্ষিণ-পূর্ব ফরিদপুর, সিলেট
ক. ইহার একটি প্রশাখা পূর্বকেন্দ্রিক- যশোহর, খুলনা, ফরিদপুর, (দক্ষিণ-পূর্বাংশ ব্যতীত)
খ. আর একটি প্রশাখা- হাজং (ময়মনসিংহ জেলা)।
২.    দক্ষিণ-পূর্ব- নোয়াখালি, চট্টগ্রাম।
ক.    ইহার একটি প্রশাখা চাকমা। ‘‘মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, (প্রধান সম্পাদক), পূর্ব পাকিস্তানী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ঢাকা, বাঙলা একাডেমী, ১৯৬৫।’’ গ্রিয়ার্সনের উপভাষা বিভাগ সম্পর্কে ভূমিকায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মন্তব্য: ‘গ্রিয়ার্সন সাহেব এই সমস্তউপভাষা বিভাগ, শাখা ও প্রশাখার বিশিষ্ট লক্ষণগুলি বিস্তৃত রূপে প্রদর্শন করেন নাই; কিন্তু ইহার প্রয়োজন আছে। ‘‘ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, (প্রধান সম্পাদক), পূর্ব পাকিস্তানী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ঢাকা, বাঙলা একাডেমী, ১৯৬৫।’’ অবশ্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ও ঐ প্রয়োজন মেটাননি, তিনি নিম্নরূপ মন্তব্য সহ অতি সংক্ষেপে গ্রিয়ার্সন সাহেবের মতামতই উদ্ধৃত করেছেন, আমি গ্রিয়ার্সন সাহেবের শ্রেণিবিভাগ আপাতত স্বীকার করিয়া লইয়া … এই সমস্ত শ্রেণীর বিশিষ্ট লক্ষণগুলি তাঁহার মতানুযায়ী নিম্নে প্রদান করিতেছি। …
ক. পূর্বদেশী শাখা। ধ্বনিতত্ত্ব। প্রাচ্য বিভাগের সাধারণ ধ্বনিতত্ত্ব, চ বর্গের দন্ত্য-তালব্য উচ্চারণ, শ, ষ, স, স্থানে (যুক্ত বর্ণ ব্যতীত) হ উচ্চারণ মূল হ কারের লোপ। মহাপ্রাণ ঘোষ বর্ণের মহাপ্রাণতা লোপ এবং ড়, ঢ় স্থানে র।
রূপতত্ত্ব। প্রাচ্য বিভাগের সাধারণ লক্ষণ রক্ষিত।
ক.    পূর্ব কেন্দ্রীক প্রশাখা। গ্রিয়ার্সন সাহেব যশোর, খুলনা, ফরিদপুরের (দক্ষিণ-পূর্বাংশ ব্যতীত) কথ্য ভাষাকে পূর্বদেশী শাখার একটি প্রশাখা রূপে নির্দেশ করিয়াছেন; কিন্তু ধ্বনিতত্ত্বে একমাত্র ছ স্থানে ঝ এবং ঔ স্থানে ত উচ্চারণ ভিন্ন এবং রূপতত্ত্বে কর্মকারকের একবচনের বিভক্তি ‘রে’ এবং সকর্মক ক্রিয়ার অতীতকালে প্রথম পুরুষে ‘ল’ ভিন্ন ইহা বহু বিষয়ে পাশ্চাত্য বিভাগের বিশিষ্ট ধ্বনি ও রূপতত্ত্বের সহিত অভিন্ন। এইজন্য ইহাকে পাশ্চাত্য বিভাগের পূর্বশাখা রূপে গ্রহণ করা কর্তব্য। ইহার একটি বিশেষত্ব যেতে খেতে ইত্যাদি তুমর্থ ক্রিয়া বিভক্তির ‘তে’ স্থানে ‘তি’ যথা- করতি, খাতি, অধিকরণে ই কার উ কারের পরস্থিত এ কার স্থানে ই কার (যথা- পিঠি, গুড়ি, চুলি) এবং সম্বন্ধের এর স্থানে ‘ইর’ (যথা- পিঠির, গুড়ির, চুলির)।
খ.    দক্ষিণ-পূর্ব শাখা। নোয়াখালি এবং চট্টগ্রামের উপভাষার মধ্যে মাত্র ‘প’ স্থানে ‘ভূ এবং প্রথম পুরুষের সর্বনামের স্ত্রীলিঙ্গের রূপ (নোয়াখালিতে হেতি; চট্টগ্রামে তেই, তাই হিতি) ভিন্ন আর কোনও সাধারণ লক্ষণ নাই। … নোয়াখালিকে পূর্বদেশী শাখার এলাকাধীন করা যাইতে পারে। ইহার স্থানীয় বৈশিষ্ট্য এই যে, ইহাতে ড় ধ্বনি রক্ষিত আছে। …আমরা কেবল চট্টগ্রামের উপভাষাকে এই দক্ষিণ-পূর্ব শাখাভুক্ত মনে করি। … চট্টগ্রামী উপভাষার ধ্বনিতত্ত্ব এই যে,
ক.    ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি রক্ষিত আছে, যেমন- ঘর, ঝর, (ঝড়), ধান, ভাত ইত্যাদি।
খ.    ইহার আদি হ রক্ষিত আছে, যেমন- হাত, হাতী ইত্যাদি।
গ.    পদমধ্যবর্তী ম অনুনাসিক হয়, যথা- আঁই (আমি), আঁর (আমার) তুঁই (তুমি), কুঁআর (কুমার), ছঁই (ছিম), হঁউক (শামুক) ইত্যাদি।
ঘ.    পদমধ্যবর্তী ব্যঞ্জনবর্ণ প্রায়ই লোপ বা বিকৃত হয় যথা- তঅন (তখন), ডাই (ডাকিয়া), খুই (খুলিয়া) ইত্যাদি। রূপতত্ত্বে ইহাতে সর্বনামের প্রথম পুরুষের স্ত্রীলিঙ্গে তেই, তাই, হিতি আছে এবং নিষেধার্থক অব্যয় ‘ন’ ক্রিয়ার পূর্বে বসে, যথা- ন যাই, ন আসিল (ছিল না)। ‘‘ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (প্রধান সম্পাদক), পুর্ব পাকিস্তানী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ঢাকা, বাঙলা একাডেমী, ১৯৬৫।’’
গ্রিয়ার্সন অবলম্বনে বাংলাদেশের বিভিন্ন উপভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন ছাড়া শহীদুল্লাহ্ বাংলাদেশের কয়েকটি উপভাষার কিছু ধ্বনি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তার মতামত দিয়েছেন। সিলেট এবং চট্টগ্রামের ‘ক’ ধ্বনির আরবি ‘খে’ ধ্বনির এবং ময়মনসিংহ, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম প্রভৃতি জেলায় ‘জ’ ধ্বনির আরবি ‘যে’ ধ্বনির অনুরূপ উচ্চারণ সম্পর্কিত কোনো কোনো মহলের ধারণার খন্ডন করে তিনি লিখেছেন,
প্রথমত : এইরূপ বিকৃত উচ্চারণ হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ নির্বিশেষে স্থানীয় সকল অধিবাসীর মধ্যে দেখা যায় :
দ্বিতীয়ত : আরবি ভাষার যখন ‘কাফ’ এবং ‘খে’, ‘জীম’ এবং ‘যে’ দুই ধ্বনিই সমভাবে আছে, তখন কেবল এই ‘খে’ এবং ‘যে’ উচ্চারণের জন্য আরবি প্রভাব স্বীকার করা যায় না। … বহুস্থানে যে শ ষ স স্থানে হ কার উচ্চারণ হয়, তাহা অবশ্য পারসী প্রভাবের ফল নয়। ‘‘ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (প্রধান সম্পাদক), পূর্ব পাকিস্তানী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ঢাকা, বাঙলা একাডেমী, ১৯৬৫।’’
‘আঞ্চলিক ভাষার অভিধানের’ ভূমিকায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলাদেশের বিভিন্ন উপভাষায় রক্ষিত ভাষার কিছু প্রাচীন লক্ষণের উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন বাংলার একবচনের ‘মই’ সর্বনামটির রূপান্তর ‘মুই’ আধুনিক শিষ্ট বাংলায় অসাধু বলে পরিত্যক্ত; কিন্তু কোনো কোনো উপভাষায় তা রক্ষিত, যেমন- পূর্ব সিলেটীতে ‘মুই মারো’, দিনাজপুরে ‘মুইমাঁর’, ‘হামরা মারি’। সাধু বাংলা ভিন্ন উপমহাদেশের সমস্ত আর্য ভাষায় নিষেধাত্মক অব্যয় ক্রিয়ার পূর্বে বসে, এই বৈশিষ্ট্য প্রাচীন ও আদি মধ্য বাংলাতেও রক্ষিত, চট্টগ্রামের উপভাষায় এই বৈশিষ্ট্য রক্ষিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন উপভাষার আরো যে বৈশিষ্ট্যের কথা মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ উল্লেখ করেছেন তা হলো আসামী ভাষার সঙ্গে তার সাদৃশ্য। যেমন- সর্বনামের প্রথম পুরুষের স্ত্রীলিঙ্গ সিলেটীতে ‘তাই’, চট্টগ্রামীতে ‘তেই’, ‘তাই’, ‘হিতি’, ঢাকায় ‘হাতাই’, নোয়াখালিতে ‘হেতি’। আসামী ভাষায় ‘তাই’ রূপ আছে। আসামী ভাষা ও চট্টগ্রামী উপভাষার ধ্বনি ও রূপতত্ত্বে ঐক্যের উদাহরণ, ধ্বনিতত্ত্বে ঘোষ মহাপ্রাণ ‘ঘ’ ‘ধ’ ‘ভ’ এবং আদি অবস্থানে ‘হ’ ধ্বনির উপস্থিতি। রূপতত্ত্বে-সম্বন্ধের একবচনে র্‘’, যেমন- হার্ত, ঘর্র। অধিকরণের একবচনে ‘ত্’ বিভক্তি যথা- বারিত্, ঘরত॥ সর্বনামের প্রথম পুরুষের স্ত্রীলিঙ্গে আসামীতে ‘তাই’, চট্টগ্রামীতে ‘তাই’, ‘তেই’, ‘হিতি’। পদক্রমে নিষেধার্থক অব্যয় ‘ন’ এর ক্রিয়ার পূর্বে ব্যবহার, যথা- ন গেল, ন আছিল্ ইত্যাদি। এই সাদৃশ্য সম্পর্কে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ লিখেছেন,
এই সাদৃশ্যের কারণ কি? উত্তরবঙ্গের ভাষার সহিতও আসামী ভাষার সাদৃশ্য আছে, যেমন- ধ্বনিতত্ত্বে ঘোষ মহাপ্রাণ বর্ণ ও আদি হ কার রক্ষিত এবং রূপতত্ত্বে কর্মকারকে ‘ক’, অধিকরণে ‘ত’ বিভক্তি এবং সকর্মক ক্রিয়া অতীতকালের প্রথম পুরুষে ‘লে’ যথা দিলে। পদক্রমে উত্তর বঙ্গের কোনও কোনও উপভাষায় ক্রিয়ার পূর্বে ‘ন’ বসে। হইতে পারে প্রাচীন বাংলা ভাষার একটি স্রোত উত্তরবঙ্গ হইতে পূর্ব অভিমুখে আসামে প্রবেশ করে। পরে সেই স্রো আসাম হইতে দক্ষিণ অভিমুখে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এককালে বাংলাদেশের এই পূর্ব প্রান্তের ভাষা বোধ হয় আসামীর সহিত একরূপ ছিল; কিন্তু পূর্ব বঙ্গের উপভাষার প্রভাবে তাহার বৈশিষ্ট্য লোপ হইয়া পূর্ববঙ্গের উপভাষা গোষ্ঠীর শামিল হইয়াছে। সিলহেটী উপভাষায় এবং ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চলে ‘তাই’ শব্দ তাহার প্রাচীনত্ব রক্ষা করিয়াছে। ‘‘ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ (প্রধান সম্পাদক), পূর্ব পাকিস্তানী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ঢাকা, বাঙলা একডেমী, ১৯৬৫।’’
বাংলাদেশের উপভাষা নিয়ে আরো কাজ করেছেন,- গোপাল হালদার নোয়াখালি, পূর্ববঙ্গ এবং চট্টগ্রামের; ড. মুহম্মদ এনামুল হক চট্টগ্রামের; কৃষ্ণপদ গোস্বামী ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম এবং উত্তর-পূর্ব বাংলার, শম্ভুনাথ চৌধুরী রংপুর ও উত্তর বাংলার; সুধীর করণ দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার; শিব প্রসন্ন লাহিড়ী সিলেটীর, মুহম্মদ আবদুল হাই ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটের; মুনীর চৌধুরী পূর্ববঙ্গের; অমলেশ চন্দ্র সেন পূর্ববঙ্গীয়; অনিমেষ কান্তি পাল ঢাকার; জ্যাক এ ড্যাব্স পূর্ব বাংলার, নারিহিকো উসিদা চট্টগ্রামের; নীলমাধব সেন বাংলাদেশের কয়েকটি উপভাষার এবং মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির সন্দ্বীপ উপভাষার। উল্লিখিশত আলোচনাগুলোর মধ্যে হুমায়ুন কবিরের সন্দ্বীপ উপভাষার সামাজিক-ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ছাড়া সবগুলোই বাংলাদেশে বাংলাভাষার আঞ্চলিক রূপ বৈচিত্র্যের বিশ্লেষণ, দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে ভৌগোলিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আংশিকভাবে হলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের প্রয়াস রয়েছে। বাংলাদেশের উপভাষা বিশ্লেষণ প্রধানত ভৌগোলিলক এবং প্রচলিত ব্যাকরণের পদ্ধতিতে করা হয়েছে। এ কথা বলা যায় না যে আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশের উপভাষাসমূহ সনাক্তকরণ বা বিভিন্ন উপভাষার পূর্ণাঙ্গ ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হয়েছে। আজ অবধি বাংলাদেশের একটি উপভাষা মানচিত্র প্রণীত হয়নি, ইতোমধ্যে বাইরের পৃথিবীতে উপভাষাতত্ত্ব আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি অতিক্রম করে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও ভাষার নৈচিত্র্য অনুসন্ধান কেবলমাত্র ভাষাতাত্ত্বিলক ভূ-গোলের মধ্যে সীমিত না রেখে সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। আর উপভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাকরণও সাংগঠনিক ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গে জেনারেটিভ পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
লেখক: শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট। (সমাপ্ত)

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও বাংলাদেশে নারী

1_126863জেসমিন জেসি

আজ ৮ই মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতিবছর সারা বিশ্বব্যাপী নারীরা একটি প্রধান উপলক্ষ হিসেবে এই দিবস উদযাপন করে থাকেন। বিশ্বের একেক প্রান্তে নারী দিবস একেক প্রকার হয়।কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনের মুখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও নারীর আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাটি বেশি গুরত্ব পায়।তবে এই দিবসটি উদযাপনের পিছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ মজুরি বৈষম্য, কর্মঘন্টা ১২ঘন্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘন্টা নির্দিষ্ট করা, কর্মক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে মার্কিন যুক্তরাষ্টের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিল সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সে মিছিলে চলছিল সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর দমন-পীড়ন এবং এই আন্দোলনে নামার অপরাধে গ্রেফতার হন বহু নারী। কারাগারে নির্যাতিত হন অনেকেই। তিন বছর পর ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে একই দিনে গঠন করা হয় ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন ‘। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে পোষাক ও বস্ত্রশিল্পের কারখানায় প্রায় দেড় হাজার নারী শ্রমিক একই দাবিতে আন্দোলন করেন। অবশেষে আদায় করে নেন দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ করার অধিকার। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের স্যোশাল ডেমোক্রেট নারী সংগঠনের আয়োজিত নারী সমাবেশে নারী সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বের সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ, জার্মান কমিউনিষ্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন।এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন এবং সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ হতে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে এ দিনটি পালিত হবে। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। বাংলাদেশেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে থাকে। অত:পর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চ কে “আন্তর্জাতিক নারী দিবস”  স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহবান জানায় “জাতিসংঘ “। এরপর থেকে পৃথিবী জুড়েই নারীর সম-অধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে দিনটি পালিত হচ্ছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক ভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। কোনো কোনো দেশে শুধুমাত্র নারীরাই সরকারি ছুটি ভোগ করে। এ দেশগুলো হচ্ছে, চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার ও নেপাল।
বাংলাদেশ ইতোপূর্ব বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারী উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও তা ছিল বিচ্ছিন্ন ও সমন্বয়হীন। কিন্তু ১৯৯৫ সালে বেইজিং সম্মেলনে নারী উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল তার আলোকে প্রথম বারের মতো একটি নারী উন্নয়ন নীতি ও কর্ম পরিকল্পনায় প্রণয়ন করা হয়। যার প্রধান লক্ষ্য নির্যাতিত ও অবহেলিত এদেশের বৃহত্তম নারী সমাজের ভাগ্য উন্নয়ন করা। এর ফলে নারী সমাজ আশার আলো দেখে, কেননা এই নীতিমালা প্রণয়নের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি হাজার বছরের শোষণ ও বৈষম্য বিলোপ হবে, নারী সম-অধিকার লাভ করবে এটিই ছিল সবার আশা। বাংলাদেশে প্রণীত নারী নীতিটি ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সংস্থা (ঘঈডউ) কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দেই ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে এ নীতিটি ঘোষিত হয়। এই পথ দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে তৈরি হয়েছে নারী সমাজ। এখন নারীরা কেবল তাদের অধিকারগুলোই পাচ্ছে না, পাচ্ছে তাদের উন্নয়ন -উত্তরণেরও পথ। যেভাবে বাংলাদেশে সময়ের সাথে বদলেছে নারীদের জীবন জীবিকা আর পথ চলা। নারীরা একজন পুরুষের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে সকলক্ষেত্রে। সর্বক্ষেত্রে নারীরা এখন নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছে। গার্মেন্টস শিল্পে ইতিমধ্যে নারী বিপ্লব ঘটেছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও পিছিয়ে নেই নারীরা। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা যথার্থই প্রমাণিত হয়েছে আজ। “পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী অর্ধেক তার নর…।
এখন নারী মানে পুরুষের ভোগের সামগ্রী আর করুণার পাত্র নয়, নারী মানে চার দেয়ালে বন্দী জীবন নয়, নারী মানে নরপিশাচদের হাতে রক্তাক্ত নয়। নারী এখন যোদ্ধা, নারী এখন সাহসী, নারী এখন প্রতিবাদী, অধিকার আদায়ে প্রত্যাশী, নারী এখন সৈনিক, বৈমানিক, মানুষ গড়ার কারিগর, নারী এখন ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মাঠে, নারী এখন এভারেস্ট বিজয়ী।নারী এখন রাজনৈতিক নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, নারী এখন সংসদ স্পীকার। কোথায় নেই নারী?  নভোচারী নারী, চাঁদে হেঁটেছে নারী, রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে নারী,  দেশের অর্ধেক ভোটার নারী।
নারী নয় অবলা, নয় ফেলনা, নারী ছাড়া উন্নয়ন কখনো হবে না। জীবনের জন্য ভালোবাসা, ভালোবাসার জন্য নারী। নারীদের কষ্ট নয়, সুখের রংধনু উপহার হোক নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য উদ্দেশ্য সমূহ।
নারী মা, নারী সেবাব্রতী, নারী প্রেরণা, নারী ভালোবাসা, নারী অপরাজিতা, নারী জয়িতা। অধিকার আদায়ে নারী নিজেদের জানান দেয়…………………………………
আমি নারী আমি পারি।
শুধু সৃষ্টিই নয়, জানি ধ্বংস।
আমি যে মহাশক্তির অংশ।
আমি পারি প্রেমে বাঁধতে।
পারি ভবিষ্যতকে মুঠোয় ধরতে।
হতে পারি ক্ষুদ্র, কিন্তু উচ্চ আমার আশা।
আমি স্বাধীন।
আমি মুক্ত, তাই আকাশে ভাসা।

ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিরূপণ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

ভাষা ও উপভাষার সীমারেখা সর্বদা স্পষ্ট নয়, যেমন নয় উপভাষা থেকে উপভাষার পার্থক্য। উপভাষা প্রধানত ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বা রূপভেদ কিন্তু সামাজিক উপভাষার অস্তিত্বও গুরুত্বপূর্ণ। এক সময়ে ধারণা করা হতো শিষ্ট বা স্ট্যান্ডার্ড ভাষাই বিশুদ্ধ আর আঞ্চলিক ভাষা বিকৃত বা অশুদ্ধ কিন্তু সে ধারণার অবসান হয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো ভাষার শিষ্ট বা স্ট্যান্ডার্ড রূপ একটি সামাজিক উপভাষা বৈ নয়। সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে কোনো ভাষার একটি বিশেষ রূপ বিশেষ মর্যাদা পেয়ে থাকে এবং সেটি শিষ্ট রূপে গৃহীত হয়। প্রায়শ ভাষার এই আধুনিক শিষ্ট রূপটি কৃত্রিম বা মিশ্রিত হয়ে থাকে তুলনামূলকভাবে আঞ্চলিক বা গ্রাম্য বা লোকরূপের মধ্যেই ভাষার প্রাচীন রূপ কিছুটা অবিকৃত থাকে। অর্থাৎ ভাষার পরিবর্তন শিষ্টরূপ অপেক্ষা আঞ্চলিক রূপে কম ঘটে থাকে। ভাষার ইতিহাস পুনর্গঠনে আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষার বিশ্লেষণ ঐ জন্য প্রয়োজন হতে পারে।
ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পন্ডিতদের ধারণা ছিলো, অনুন্নত জাতি বা সম্প্রদায়ের বিশেষত আদিবাসীদের ভাষা তাদের জীবনযাত্রার মানের মতোই অনুন্নত। কিন্তু আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউগিনির আদিবাসীদের ভাষা বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণ পাওয়া গেছে, ঐ সব অনুন্নত আদিবাসীদের ভাষা অন্যান্য উন্নত জাতির ভাষার মতোই পরিপূর্ণ রূপে বিকশিত। আজকের পৃথিবীতে যে সব মানবগোষ্ঠী একান্তই আদিম রয়ে গেছে, যাদের জীবনযাত্রায় ব্যবহৃত উপাদান কাঠ, হাড় বা পাথরের টুকরোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং যারা পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করছে, তাদের ভাষাও উন্নত ও সুসভ্য মানুষের ভাষার মতোই মানব মনের ভাবের আদান-প্রদানে সক্ষম। আবার শহরের আধুনিক ভাষার তুলনায় গ্রামের আঞ্চলিক ভাষা মোটেও পশ্চাৎপদ নয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে উপভাষা সম্পর্কিত ধারণা খুব স্বচ্ছ ছিলোনা। তখন পর্যন্ত আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা বা গ্রাম্য ভাষাকে শিষ্ট বা সাধু ভাষার বিকৃত ও ভ্রান্তরূপ বলে বিবেচনা করা হতো। ১৯৭৫ থেকে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিভিন্ন ভাষার ইতিহাস বা উদ্ভব ও বিবর্তন স্থির করতে গিয়ে বিভিন্ন ভাষা ও উপভাষার সংগঠন-বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ তথ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড বা শিষ্ট ভাষা বিশেষ ঐতিহাসিক বা সামাজিক কারণে কোনো না কোনো উপভাষা থেকেই উদ্ভুত এবং উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা শিষ্ট বা সাধু ভাষার বিকৃত রূপ নয়। উপভাষাতত্ত্বে অগ্রণী ফরাসিরা; আঞ্চলিক ভাষাতত্ত্বে ইতালিয়ানদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রথম উপভাষা-মানচিত্র প্রণয়ন করেন জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদ জর্জ ওয়েংকার তিনি তাঁর উপভাষা-প্রশ্নমালার উত্তর ভাষাতত্ত্ব-প্রশিক্ষণহীন গ্রাম্য স্কুল-শিক্ষকদের সহায়তায় সংগ্রহ করেছিলেন। ভাষাতাত্ত্বিক ভূগোল শাস্ত্রের উদ্ভাবক ফরাসি পন্ডিত জুল গিলিয়েগাঁ, তিনি ফরাসি উপভাষা জরিপে দুই হাজার প্রশ্ন সম্বলিত একটি প্রশ্নমালা ব্যবহার করেন। এই প্রশ্নমালার উত্তর সংগ্রহে তিনি ই. এডমন্ট নামে একজন দক্ষ কর্মীকে নিযুক্ত করেছিলেন যিনি ফরাসি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে ঐ প্রশ্নমালার উত্তর সংগ্রহ করেন। ফলে ফরাসি উপভাষা মানচিত্র জার্মান মানচিত্র থেকে নির্ভরযোগ্য হতে পেরেছিলো। ফরাসি ১৮৯৭ থেকে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সংগৃহীত উপাদানের ভিত্তিতে ১৯০২-১২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রকাশিত। সমসাময়িক কালে ভারতীয় উপমহাদেশে জর্জ গ্রিয়ার্সন ভাষা জরিপ করেন। তিনি একটি প্রচলিত লোক কাহিনী বা গল্পের সাধুভাষায় লিখিতরূপ বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুল শিক্ষকদের কাছে প্রেরণ করেন, তারা নিজ নিজ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় গল্পটি রূপান্তরিত করে ফেরত পাঠান। এভাবে গ্রিয়ার্সন বিভিন্ন ভাষা ও উপভাষার নমুনা সংগ্রহ করে তাঁর বিশ্লেষণ কয়েক খন্ডে ‘লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে ১৯০৩ থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষার উপভাষা পরিচয় ঐ সার্ভের ৫ম খন্ডের ১ম ভাগে প্রকাশিত হয়। ইতালির ভাষাতাত্ত্বিক ভূগোল প্রকাশিত হয় ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, প্রণেতা কে. জেবার্গ এবং কে. জুড।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে উপভাষাতত্ত্ব মূলত শব্দের বিশ্লেষণে কেন্দ্রীভূত ছিলো। মুখের ভাষায় প্রচলিত শব্দের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে উপভাষাতাত্ত্বিকেরা শব্দার্থ, বিকিরণ এবং বাক্যে তাঁদের ভূমিকা অনুযায়ী শব্দের ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। ভৌগোলিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞানের সহায়তায় শব্দের ইতিহাস ব্যাখ্যার এক ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছিলো, এছাড়াও শব্দের ইতিহাস অনুসন্ধানে জাতীয় মানস এবং পুরাতন ও নতুন ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণাদি সতর্কভাবে পরীক্ষা করা হতো। উপভাষা বিশ্লেষণে একটি ভাষা উদ্ভব ও বিকাশে যেসব উপাদানের সংস্পর্শে আসে সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকৃত হয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শেষ ও প্রথম দিকে ভাষাতাত্ত্বিক ভূগোলের তত্ত্বগত ধারণা ছিলো নিম্নরূপ,
ক.    একটি ভাষার উপভাষাগত পার্থক্য প্রধানত শব্দ ও ধ্বনি সংগঠনে পাওয়া যায়, তুলনামূলকভাবে রূপ ও বাক্ বা ব্যাকরণে পার্থক্য কম।
খ.    সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণ ভাষাতাত্ত্বিক পার্থক্যের জন্যে গুরত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় উপভাষার সংখ্যা বেশি কারণ বিভিন্ন সামন্তের অধীনে বিভিন্ন অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা; অপর দিকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শাসনে বিভিন্ন অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ফলে উপভাষার সংখ্যাও কমে যায়।
গ.    ভাষাতাত্ত্বিক পার্থক্যের জন্যে ভৌগোলিক অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সমতল ভূমির তুলনায় পার্বত্য ভূমিতে ভাষাতাত্ত্বিক প্রান্তিক অঞ্চল বেশি। সহজ যোগাযোগের জন্যে একটি ভাষাতাত্ত্বিক উদ্ভব, আগম বা পরিবর্তন সহজেই সমতল ভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্যদিকে একটি পার্বত্য অঞ্চলের ভাষা ভৌগোলিক কারণে সমতল ভূমিতে পরিব্যাপ্ত মূল ভাষার বিকাশ ও বিবর্তন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
ঘ.    উপভাষা বিলোপ বা অবক্ষয়ের গতি সাম্প্রতিককালে দ্রুততর হয়েছে, কারণ গ্রামের মানুষ শহরের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি অনুকরণ ও গ্রহণের চেষ্টা করছে। ‘‘গরষশধ ষারপয, ‘খরহমঁরংঃরপ এবড়মৎধঢ়যু,’ ঞৎবহফং রহ খরহমঁরংঃরপং. ঞযব ঐধমঁব, গড়ঁঃড়হ, ১৯৭০ ’’
ফরাসি উপভাষাবিদ্ গিলিয়েগাঁ শব্দের উদ্ভব বা আগমের দুইটি কারণ নির্দেশ করেছেন, একই ধ্বনিবিশিষ্ট ভিন্নার্থক শব্দের সংঘাত এবং শব্দ সংগঠনের অনুপযোগিতা। সমধ্বন্যাত্মক শব্দের ভিন্ন পরিবেশের জন্যে নির্দিষ্ট ভিন্ন অর্থ যখন একই পরিবেশে ব্যবহৃত হতে থাকে তখন নির্দিষ্ট তাৎপর্য ব্যাহত হয় এবং একটি নতুন শব্দ ঐ দুইটি ভিন্ন অর্থের একটিকে গ্রহণ করে ফলে অভিন্ন ধ্বনিবিশিষ্ট ভিন্নার্থক পরিবেশের অবসান ঘটে। যেমন, ফরাসি, গালকন উপভাষার ‘গাত’ শব্দটির দুটি অর্থ ছিলো বিড়াল ও মোরগ। অনেক বাক্যে এটা বোঝা যেত না যে কথক কি বলছেন, কুকুরটা কি বেড়াল ধরেছে না মোরগ? ফলে ‘গাত’ শব্দটি এক সময় থেকে কেবল মোরগ অর্থেই ব্যবহৃত হতে থাকে, বেড়ালের জন্যে অন্য শব্দের উদ্ভব হয়। সময়ের বিবর্তনে একটি শব্দের ধ্বনি সংগঠন বদলে যেতে পারে, অনেক সময় দেখা গেছে যে একটি শব্দ হয়তো শুরুতে ব্যবহার উপযোগী ছিলো কিন্তু ক্রমে ক্রমে শব্দটি অতিহ্রস্ব বা দীর্ঘ হয়ে পড়ার ফলে বা নতুন কোনো ধ্বনি উপাদান সংযোজিত হওয়ার ফলে ভিন্ন অনুষঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে। এমতাবস্থায় একটি নতুন উপযোগী শব্দের উদ্ভাবন স্বাভাবিক, এভাবেই সমধ্বনি বিশিষ্ট ভিন্নার্থক শব্দে এবং অনুপযোগী শব্দ সংগঠনের কারণে নতুন শব্দের সৃষ্টি হতে পারে। উপভাষা নির্ণয়ে ফরাসিরা শব্দের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন যেমন দিয়েছিলেন জার্মানরা।
ইতালির নব-ভাষাতত্ত্ববিদরা উপভাষাতত্ত্বে মূল্যবান অবদান রেখেছেন, তাঁদের তত্ত্বের ভিত্তি ছিলো জার্মান ও ফরাসি ভাষাতাত্ত্বিক ভুগোলতত্ত্ব। নব-ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে একটি ভাষার মধ্যে অশুদ্ধ বলে কিছু নেই, যা টিকে থাকে সবই শুদ্ধ। তাদের মতে একটি ভাষার বিবর্তন প্রধানত ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক পটভূমি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সুতরাং তারা উপভাষা বিশ্লেষণে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ করেছেন। তারা সম্পর্কিত উপভাষাসমূহের তুলনামূলক পর্যালোচনায় গুরুত্ব দিয়েছেন। যেসব ভৌগোলিক কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে একটি ভাষার উপভাষা বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয় তার প্রতি খুবই মনোযোগ দেন। এভাবেই ‘এরিয়েল লিঙ্গুইস্টিক্স’ বা আঞ্চলিক ভাষাতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে। তারা ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিরূপণের জন্যে ‘সেস্ট্রাল’ এবং ‘পেরিফেরাল’ বা কেন্দ্র ও প্রাপ্ত অঞ্চলের যে পার্থক্য নির্দেশ করেন উপভাষার সীমানা নির্দেশের জন্যে যে ধারণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভাষা-অঞ্চলের যেখানে একটি ভাষাতাত্ত্বিক আগম বা উদ্ভব ঘটে সেটি কেন্দ্র অঞ্চল একটি ভাষা-অঞ্চলে সমগ্র ভাষাতাত্ত্বিক উপাদানের প্রেক্ষিতে অবশ্য কোনো কেন্দ্র অঞ্চল নেই। ভাষাতাত্ত্বিক প্রান্ত অঞ্চলে (ভৌগোলিক অর্থে) সাধারণত কিছু প্রাচীন বা অপ্রচলিত রূপ রক্ষিত থাকে কিন্তু প্রাপ্ত অঞ্চলে প্রাপ্ত সমস্ত ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যই প্রাচীন বা অপ্রচলিত রূপ নয়। তবে যদি দুইটি ভিন্ন প্রাপ্ত অঞ্চলে অভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক রূপ পাওয়া যায় তাহলে তা অপ্রচলিত বা প্রাচীন রূপ হয়ে থাকে। উপভাষাতত্ত্বের উপরোক্ত ধারণা ইতালিয়ানদের অবদান। ‘ওনরফ’ জার্মান, ফরাসি ও ইতালিয়ান উপভাষাবিদরা ভাষার আঞ্চলি বৈচিত্র্য সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট্যসমূহকে উপভাষা মানচিত্রে দৃশ্যমান করে তোলার পদ্ধতিরও উদ্ভাবক। একটি উপভাষা মানচিত্রে একটি বিশেষ ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের অবস্থান এবং সীমা সমশব্দরেখা বা ‘আইসোগ্লস’ এর সাহায্যে নির্দেশ করা হয়। একটি ভাষার আঞ্চলি বৈচিত্র্যসমূহ যে সব সমশব্দ রেখার সাহায্যে বিবৃত করা হয় সেগুলো সমশব্দ রেখাগুচ্ছ। কোনো ভাষারই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যসমূহ এক প্রকার নয়, তবে উপভাষা মানচিত্রে যেসব অংশে সমশব্দরেখা কম সে সব অঞ্চলকেই ঐ ভাষার বিভিন্ন উপভাষার কেন্দ্র অঞ্চল বা ‘ফোকাল এরিয়াজ’ বলা হয়। নতুন উদ্ভব বা আগম একটি কেন্দ্র অঞ্চল থেকে উদ্ভুত হয়ে সম্প্রসারিত হয় এবং তা ঐ কেন্দ্র অঞ্চলের প্রভাবিত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গৃহীত হয়। একটি উপভাষা অঞ্চলের প্রান্ত বা সীমান্ত অঞ্চলসমূহ উপভাষা বৈশিষ্ট্যের সন্ধি অঞ্চল বা ‘ট্রানজিশান এরিয়াজ,’ আর সম-শব্দরেখা অঞ্চল বহির্ভূত এলাকা সম্প্রসারিত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে দূরবর্তী অঞ্চল বা ‘রেলিক এরিয়াজ’। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক কারণে দূরবর্তী অঞ্চলের সৃষ্টি হতে পারে। ‘‘ডরহভৎবফ চ. খবযসধহহ, ‘ইৎড়ধফবহরহম ড়ভ খধহমঁধমব গধঃবৎরধষং.’ ঐরংঃড়ৎরপধষ খরহমঁরংঃরপং. ঘবি ণড়ৎশ, ঐড়ষঃ, জরহবযধৎঃ ধহফ রিহংঃড়হ, ১৯৬৬, চ. ১২৬-১২৮. ’’
ইতালির নব-ভাষাতাত্ত্বিকেরাই ভাষার ‘সাবস্ট্রেটাম’ বা ‘উপস্তর’ তত্ত্বের উদ্ভাবক। এই তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য, যদি কোনো জনগোষ্ঠী তার মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে অপর কোনো ভাষা গ্রহণ করে তাহলে পরবর্তী ভাষাটি পূর্ববর্তী ভাষার প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং এক্ষেত্রে একটি ভাষাতাত্ত্বিক উপস্তরের প্রতিনিধিত্ব করে। ‘‘গরষশধ ওারপয, ওনরফ’’ উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশে উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলে আর্যভাষা বিস্তারের পূর্বে অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীর মুন্ডা এবং অন্যান্য অনার্যভাষার প্রচলন ছিলো। অনুমান করা যেতে পারে যে এই সব অঞ্চলে আর্যভাষার প্রচলন হলেও সম্ভবত পূর্ববর্তী অনার্য ভাষাসমূহের প্রভাবে পরবর্তী আর্যভাষার সংগঠনে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে, যার প্রমাণ ধরা পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন উপভাষায় বিশেষত পূর্ববঙ্গীয়তে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অনার্যভাষাসমূহকে বিভিন্ন অঞ্চলের বাংলাভাষার উপস্তর বলা যেতে পারে। সম্ভবত ঐ কারণেই বাংলাদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক বাংলা উপভাষায় ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনির অভাব, স্পৃষ্ট তালব্য ধ্বনির পরিবর্তে ঘৃষ্ট বা উষ্ম দন্ত্য ধ্বনির ব্যবহার, স্বরধ্বনিতে সানুনাসিকতার অভাব এবং তাড়নজাত মূর্ধন্য ধ্বনির অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। এই সব ধ্বনিগত উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি আর্যপূর্ব অনার্যভাষাসমূহের ধ্বনি সংগঠনের কারণে হতে পারে। এ সম্পর্কে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মত নিম্নরূপ,
বাঙলাদেশে আর্য-ভাষার আগমনের পূর্বে, কোল আর দ্রাবিড়, আর উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ভোট-চীনা, এই তিনটি ভাষারই অস্তিত্বের প্রমাণ পাই … আর্যদের আগমনের কালে যে ভাষা দ্রাবিড় আর কোল-ই ছিলো, এই অনুমান মেনে নিতে প্রবৃত্তি হয় … সমস্ত উত্তর-ভারতময়- বাঙলাদেশকেও ধরে-দ্রাবিড়- আর কোল-ভাষী লোকদের অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ আর যুক্তি বিস্তর আছে, ‘‘ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ‘বাঙলাভাষা আর বাঙালি জাতের গোড়ার কথা,’ বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫০, পৃ. ৩৩।’’
বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশ দশকে সাংগঠনিক ভাষাতত্ত্বের উদ্ভবের পরে অধিকতর সংখ্যায় বিভিন্ন উপভাষার সংগঠনের বর্ণনামূলক বিশ্লেষণ পাওয়া গেছে। সাংগঠনিক বিশ্লেষণে উপভাষা বৈশিষ্ট্য কেবল তথ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি রবং যে নিয়মে বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট পারস্পরিক-সম্পর্কে-সম্পর্কিত, সেগুলোর ওপরেও আলোক নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সাংগঠনিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন উপভাষার সমান্তরাল ব্যবস্থাসমূহের তুলনামূলক পর্যালোচনায় বিভিন্ন উপভাষার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য স্ফুটনে ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্বের দিগন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সাংগঠনিক বিশ্লেষণের ফলে উপভাষাতত্ত্বে নতুন নতুন সংজ্ঞা ও ধারণা সংযোজিত হয়েছে, যেমন ‘ডায়াসিস্টেম’- গ্রাফের সাহায্যে দুইটি ভাষা বা উপভাষা ব্যবস্থার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যকে প্রদর্শিত করা। ‘ইডিয়লেক্ট’-একজন ভাষাভাষীর বাক-বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করা প্রভৃতি। দ্বিভাষী সম্প্রদায়ে ভাষা ব্যবস্থার অবস্থা পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি নির্ণয় এবং সহ-অবস্থানের কারণে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা বা উপভাষা সংগঠনের পারস্পরিক প্রভাব নির্ণয়ের মাধ্যমে ভাষাতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তে আসা সম্ভবপর হয়েছে। মার্কিন উপভাষাবিদ হ্যানস্ কুরাথ্, র‌্যাভেন ম্যাকডেভিড এবং উইলিয়াম লেবভ ভাষার বৈচিত্র্য অবলোকনে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন, তাঁরা ভাষার ভৌগোলিক বা আঞ্চলিক বৈষম্য অপেক্ষা সামাজিক বৈচিত্র্য অবলোকনে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিংশ শতাব্দীতে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভাষার বৈচিত্র্য অনুসন্ধান করে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। সোয়াবিয়ান উপভাষাবিদ্ ফিশার আবিষ্কার করেছেন যে দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানির আঞ্চলিক উপভাষার সীমানা সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর রাজনৈতিক সীমারেখার সঙ্গে অভিন্ন। জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির উপভাষা সীমানাগুলোর তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে জাবের্গ দেখিয়েছেন যে ঐ সব দেশের উপভাষা বৈচিত্র্য নির্দিষ্ট এলাকার রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের প্রত্যক্ষ ফল। ফ্রান্সে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা, গত কয়েক শতাব্দী যাবৎ এক কেন্দ্রীয় ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে ঐ দেশে উপভাষার সামারেখা খুব স্পষ্ট নয়, বিভিন্ন উপভাষার পার্থক্যও অস্পষ্ট, ব্যতিক্রম কেবল দূরবর্তী অঞ্চলসমূহ। ইতালিতে একক সময়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় শক্তি শাসিত নগর রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিলো ফলে বিভিন্ন উপভাষার সীমারেখাও বেশ স্পষ্ট। জার্মানিতে রাষ্ট্রনৈতিক ভাঙ্গাগড়া গেছে বেশি, অনেক ছোট ছোট    (চলবে)

দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ট্রান্সফরমার চোর চক্রের সদস্যকে গণধোলাই

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় আবারও বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চোরচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত শুক্রবার ভোর রাতে উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের পাগলা ব্রাহ্মণগাঁও এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে জনতার হাতে মোঃ শাহিন মিয়া (২৪) ও আব্দুল আজিজ (৩৪) নামে দুই চোরকে ট্রান্সফরমার সহ আটক করেছে স্থানীয় এলাকাবাসী। বিস্তারিত