বিভাগ: ভেতরের পাতা

অদম্য স্বত:স্ফূর্ত বীর

খালেদ উদ-দীন

একবার এক আড্ডায় কথা প্রসঙ্গে মহম্মদ আশরাফ আলীর (মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নিজে যুদ্ধও করেছেন, সাবেক সাংসদ) কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন বঙ্গবীর ওসমানী সাহেবকে ব্যতিক্রমী যুদ্ধনেতা বলা হয়ে থাকে? বা তাঁর যুদ্ধকৌশলে এমনকী ছিল যা আপনাদের চমকে দিয়েছিল? এই প্রশ্ন শুনে তাঁর চোখ চকচক করে ওঠে। এক অপার আহ­াদ এসে চেহারায় মূর্তিমান হয়। একটু চেয়ার টেনে সোজা হয়ে বসেন। তারপর জনাব আশরাফ আলী বলতে শুরু করেন এভাবে-‘একবার ভাবুন তো, একটা প্রশিক্ষিত বিশাল শক্তিধর সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার মতো কোনও শক্তি আমাদের ছিল? না ছিল তেমন কোনও অস্ত্র। নিয়মিত বাহিনীর অল্প কয়েকজন আর কিছু আবেগী তরুণ; যাদের কেবল মনোবল ছাড়া সঙ্গে আর কিছু ছিল না। একদম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া প্রথম দিন থেকেই আমাদের লড়াই শুরু করতে হয়েছে। সে অবস্থায় তীক্ষè বুদ্ধিস¤পূর্ণ ওসমানী সাহেব কৌশলী হলেন। তিনি যে কৌশলগুলো একে একে ব্যবহার করতে লাগলেন তার প্রত্যেকটিই ছিল চমকপ্রদ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল দক্ষ এবং সংখ্যায় অনেক বেশি। এই বিবেচনায় ওসমানীর রণকৌশল ছিল প্রথমে শত্র“কে নিজেদের ছাউনিতে আটকে রাখা এবং তাদের যোগাযোগের সব মাধ্যম হতে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। যেমন, ছোটো ছোটো কালভার্ডগুলো এবং কোথাও স¤পূর্ণ ব্রিজ ভেঙে কৃত্রিমভাবে খরপাতা দিয়ে ব্রিজের আদলে আটকে রাখা হত। পাকিস্তানি বাহিনী এগুলো একদম আঁচ করতে পারতো না। ফলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে অনেকে হতাহত হত। পুনরায় এসব রাস্তা দিয়ে চলাচলের কোনও সাহস করত না। আবার নদী পারাপারের সাঁকোও মধ্যখানে এভাবে ভেঙে রাখা এবং অনেক নদীতে যেখানে সাঁতরানো ছাড়া কোনও উপায় থাকতো না, সেখানে সাঁতরানো পথে পানির নিচে ধারালো বাঁশ বা গাছের খুঁটি পুঁতে রাখা। এসব গুপ্তকৌশলে পাকিস্তানী বাহিনী হকচকিয়ে যেত। প্রথম প্রথম এই কৌশলগুলো খুব কাজে লেগেছিল। মে মাস পর্যন্ত এইসব পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মে মাসের পর তাঁর মনে হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমসংখক সৈন্য নিয়ে শত্র“কে ছাউনিতে আটকে রাখা গেলেও ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এ বিষয়টি তিনি সরকারকে জানিয়ে যুদ্ধের কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। প্রাক্তন ইপিআর এর বাঙালি সদস্য, আনসার, মোজাহেদ, পুলিশ বাহিনী ও যুবকদের নিয়ে একটি গণবাহিনী বা গেরিলাবাহিনী গঠন করেন।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা মহম্মদ আশরাফ আলীর কাছে আরও জানতে চেয়েছিলাম যে, আপনার স্মৃতিতে থাকা অসংখ্য ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে খুশির একটা ঘটনা বলুন? স্মৃতির ফ্রিজারে তাঁর উঁকি দেয় অসংখ্য বীরত্বগাথা। বলেন, ‘যুদ্ধদিনে তখন উত্তেজনাপূর্ণ অপারেশন চলছিল একের পর এক। একবার এক সম্মুখযুদ্ধে আমাদের তিন থেকে চারশ বাঙালি অফিসার শহিদ হন। আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। তখন জেনারেল ওসমানীর যুদ্ধকৌশল অনুসারে যোদ্ধারা কমলপুর পাহাড়ে পাঞ্জাবীদের ক্যা¤েপ আক্রমণ করে নিজেদের আত্মগোপন করে রাখে। কৌশলটি না-বোঝে এক ক্যা¤েপর পাঞ্জাবীরা অন্য ক্যা¤েপর পাঞ্জাবীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে অনেক পাঞ্জাবী হতাহত হয়। আজও ঘটনাটি যখন মনে পড়ে ওসমানী সাহেবের এই কৌশলের কথা মনে করে হাসি।’
মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। অদম্য স্বত:স্ফূর্ত এই বীর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তাঁর জন্ম ১৯১৮ সালের ১ সেপটেম্বর। পৈতৃকবাড়ি সিলেট জেলার ওসমানীনগর থানার দয়ামিরে। বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান। মা জোবেদা খাতুন। তাঁর বাবা তৎকালীন আসামের সুনামগঞ্জ সদর মহকুমায় সাব-ডিভিশনাল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখানেই জন্ম হয় ওসমানীর। বাবার চাকুরি সূত্রে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। জন্মের কিছুদিন পর তাঁরা বদলি হয়ে চলে যান ভারতের গুয়াহাটিতে। আর সেখানেই শুরু হয় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। তিনি খুব মেধাবী ছিলেন। ১৯৩২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৩৯ সালে তিনি রয়্যাল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। দেরাদুনে ব্রিটিশ ভারতীয় মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন কমিশন প্রাপ্ত অফিসার হিসেবে। ১৯৪১ সালে ক্যাপটেন এবং ১৯৪২ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। তৎকালীন তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর ছিলেন। মাত্র তেইশ বছর বয়সেই তিনি এক ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হয়ে যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মির হয়ে বার্মা রণাঙ্গনে তাঁকে এক ব্যাটালিয়ন সেনার নেতৃত্ব দিতে হয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নেন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিহস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন। সেনাবাহিনীর এই সাহসী বীর ১৯৬৭ সালে অবসরগ্রহণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯৭০ সালে। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম বৃহত্তম নির্বাচনি এলাকা সিলেটের গোলাপগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ থেকে বিপুল ভোটে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর পশ্চিম পাকিস্তানিরা তখন ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। চলতে থাকে নানান আলোচনা। বাঙালিরা সহিষ্ণু হতে থাকে। মিছিল মিটিংয়ে উত্তপ্ত হতে থাকে বাংলার প্রান্তর। সামগ্রিক বিষয়াদির ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ করছিলেন ওসমানী। এক সাক্ষাৎকারে ওসমানী জানান, ‘যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তেলো’-বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণের অন্তরালে ছিল একটি সুচিন্তিত রণকৌশল। বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সৈনিকদের কাছে ছিল বিরাট তাৎপর্যময়। বস্তুত এই আহ্বানকে তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত বলেই মনে করেন।’ সাত মার্চের ভাষণের সময়ই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার কথা ঠিক করে ফেলেছিলেন মনে মনে। তিনি শুধু সুযোগ খুঁজছিলেন, এখানেও আমরা তাঁর সুক্ষ্ম রণকৌশল টের পাই। তিনি কাউকে মনের কথা জানতে দেননি। কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণে ঠিক বলেছিলেন, ‘তোমোদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’
২৫ মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পরে ওনমানী সে রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য। কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে ছুটে এসেছিলেন। কিছু আলাপ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তারপরই আবার দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনিই ছিলেন নেতৃত্বস্থানীয় সর্বশেষ ব্যক্তি, যিনি সবার পরে এ বাড়ি ছেড়েছিলেন। তারপর কোথায় কোথায় গা ঢাকা দিয়েছিলেন এই বীর সেনা, সে ব্যাপারে কেউ কিছু জানতো না। পরে জানা যায়, ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাতেই ছিলেন ওসমানী। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বছর চারেক আগে অবসর নেওয়া ওসমানীর সামরিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতা স¤পর্কে পাকিস্তান সরকার অবগত ছিল। তাই ওই রাতেই ওসমানীকে হত্যার চেষ্টায় হন্যে হয়ে খোঁজে। কিন্তু একেবারেই ভাগ্যগুণে অনেকটা অলৌকিভাবে প্রাণে বেঁচে যান ওসমানী। ঢাকা থেকে তিনি পালিয়েছিলেন ২৯ মার্চ। এর আগে চারদিন ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফাঁকা বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। খানসেনারা তাঁর খুঁজে ধানমন্ডির বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। ২৯ মার্চে নদীপথে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধরত ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যোগ দেন। শুরু হয় ওসমানীর জীবনের নতুন এক অধ্যায়।
১১ এপ্রিল ১৯৭১ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন। ওই ভাষণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের উল্লেখ করে এম এ জি ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। ওইদিন গঠিত মুজিবনগর সরকারে ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি।
ওসমানীর নির্দেশনা অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এক একজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মাঝে সমন্বয়সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি কাজ সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন ওসমানী। মুক্তিসংগ্রামে তাঁর হাতে কোনও নৌবাহিনী ছিল না। নিয়মিত নৌবাহিনীর কিছু অফিসার যারা তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন তাঁদেরকে নিয়ে এবং কিছু সংখ্যক গেরিলা যুবক নিয়ে একটি নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করেন। আগষ্টের মাঝামাঝিতে তাঁরা নদীপথে শত্রুর চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেন। নৌবাহিনী গঠনের ফলে একটা বড়ো ধরনের সংকটের অবসান হলেও দেশ স্বাধীন হবার আগে আরও একটা সংকট ওসমানী অনুভব করেন। সেটা হচ্ছে তাঁর হাতে কোনও বিমানবাহিনী ছিল না। শেষের দিকে দুটি হেলিকপ্টার, একটি অটার ও একটি ডাকোটা নিয়ে ছোট্ট একটি বিমানবাহী গঠন করেছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নিজ দক্ষতা ও কৌশল প্রয়োগ করে তিনি মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করেন। তিনি দিক নির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণা দান করে গেরিলাযোদ্ধাদের এবং প্রয়োজনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণও করতেন। পাকবাহিনী পরাজিত হতে বাধ্য হয়। বাংলার মানুষ স্বাধীনতার সূর্য দেখতে পায়। অতঃপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে।
জেনারেল ওসমানী অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল সফর করে জাতির বিজয়কে ত্বরান্বিত করায় জাতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে ‘বঙ্গবীর’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই আতœসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন। কেন অনুপস্থিত ছিলেন এমন বিতর্কের জবাব তিনি দিয়েছেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানী উপস্থিত না থাকার কারণ ছিল আর্মি প্রোটোকল। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্ব ফ্রন্টের প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজী। এরা দুজনই ছিলেন আঞ্চলিক প্রধান। অন্যদিকে ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান। তাই সেনাবাহিনীর প্রটোকল রক্ষার্থে কোনও সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধানের সঙ্গে তিনি কোনও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেন না।
স্বাধীন দেশে ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সের জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয় ওসমানীকে। তাঁর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন, সর্বস্তরের জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল তাঁকে চার তারকাযুক্ত জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে জেনারেল পদটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক বাহিনী থেকে অবসরগ্রহণ করেন। তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশগঠনের কাজে নিজেকে জড়িয়ে নেন।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনে ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হন। তাঁকে মন্ত্রিসভায় ‘ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জীবনের সব অভিজ্ঞতা নিয়ে নেমে পড়লেন দেশ গঠনের কাজে। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি সংসদসদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। আবার ১৯৭৫ সালেই যখন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন সে সময় ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ডের পরেই পদত্যাগ করেন।
১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওসমানী ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন।
বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী ওসমানী শৈশব থেকেই রুটিন বাঁধা জীবনযাপন করতেন। তিনি আদর্শ দেশপ্রেম ও মূল্যবোধের ছিলেন এক অনন্য প্রতীক। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে তাঁর ছিল অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। জীবনে কারও সঙ্গে তিনি কখনও আপোশ করেননি। অতি সাধারণ জীবন, সাধারণ জামা-কাপড়, সাধারণ সৈনিকের খাবার, সেনাবাহিনী থেকে বরাদ্দকৃত আসবাবই ব্যবহার করে এসেছেন বার বার। তিনি তাঁর দায়িত্ব থেকে বেশ কয়েকবার পদত্যাগও করেন। যখন কোনও বিষয়ে তিনি মতের মিল খুঁজে পাননি, পদত্যাগ করেছেন। এমনি কঠোর আর দৃঢ় মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর জীবনে তেমন কোনও ব্যর্থতা নেই। যখন যে কাজে হাত দিয়েছেন, সফলতা ছিনিয়ে এনেছেন। কখনও কোনও পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হননি। এক সফল জীবনের অধিকারী ছিলেন এই অদম্য স্বত:স্ফূর্ত বীর জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী।

কোরবানী ॥ ত্যাগের অনুপম উপমা

এহতেশামুল আলম জাকারিয়া

হযরত ইব্রাহীম (আ:) আল্লাহর প্রিয় পয়গাম্বর! ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় যিনি বারবার সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে উপাধি পেয়েছেন খলিলুল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু)। কোরবানী ইব্রাহীম (আ:) এর স্মৃতিময় একটি অগ্নি পরীক্ষার নাম। তার বয়স তখন শতবছর পেরিয়ে, তখনো তিনি নিঃসন্তান। জীবন সায়াহ্নে একটি সন্তান লাভের জন্য দোয়া করতে লাগলেন। অনেক বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে দিলেন অশ্র“সজল নয়নে।দোয়া করলেন আল্লাহর দরবারে “হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর”। সূরা -আস সাফফাত : ১০০। প্রবল আত্মবিশ্বাসী তিনি, অশ্যই প্রভু তাঁর দোয়া কবুল করবেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন। (এ দোয়ার জবাবে) “আমি তাঁকে একটি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।” সূরা-আস সাফফাত: ১০১। জন্ম নিলেন হযরত ইসমাঈল (আ:)। ইব্রাহীম (আ:) সেজদা অবনত চিত্তে শুকরিয়া আদায় করলেন মহান রবের দরবারে। শিশু ইসমাঈল বড় হতে লাগলেন। ইব্রাহীম (আ.) ভালোই কাটিয়ে দিচ্ছিলেন বৃদ্ধ বয়সের শেষ সময়গুলো। কিন্তু কে জানত পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন প্রিয় বস্তু কোরবানি করার। নবীদের স্বপ্ন অহীর মর্যাদাসম্পন্ন। তিনি চিন্তা করে দেখলেন তার কাছে নিজ সন্তানের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কিছু নেই।” সে পুত্র যখন তার সাথে কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছলো তখন একদিন ইবরাহীম তাঁকে বললেন, “হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে আমি জবেহ করছি, এখন তুমি বল তুমি কি মনে করো?” সে বললো, “হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে তা করে ফেলুন, আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ সবরকারীই পাবেন।” সূরা আস সাফফাত : ১০২। পিতা-পুত্র মিলে প্রভুর আদেশ বাস্তবায়নে চললেন নির্জন মিনা প্রান্তরে। পুত্র প্রস্তুত খোদার আদেশে জীবন দিতে। পিতা ইব্রাহীম ছুরি চালাতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি শেষ করলেন। এ এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা! “নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা।” সূরা সফফাত ঃ১০৬। খোদাপ্রেমের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। আল্লাহর সন্তুষ্টি নিমিত্তে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার এ এক বিরল উপমা। ত্যাগের কি মহিমান্বিত কাহিনী। আল্লাহর পথে জান-মাল, সহায়-সম্পদ, প্রিয়জন সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার কি অপূর্ব দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তার নবীদের দিয়ে এই শিক্ষা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন যাতে পৃথিবীর মানুষও দীনের জন্য প্রয়োজনে সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তত থাকে। সন্তান পিতামাতার কাছে কতটা প্রিয় তা কোন বাপ-মায়ের কাছেই ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ রাখে না। সে সন্তানকেই যে আল্লাহর পথে কুরবানী করতে পারে তার কাছে আল্লাহর রাহে অদেয় আর কিছুই থাকতে পারে না। কামনা-বাসনা, সহায়-সম্পদ এসব তো তুচ্ছ বিষয়। বস্তু বান্দাকে লোভ ও মোহের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই আল্লাহ এ বিধান জারি করেছেন। কারণ লোভ ও মোহ-ই পৃথিবীতে অশান্তিও বিপর্যয় সৃষ্টির অন্যতম কারণ। পুত্রের পরামর্শেই চোখ বেঁধে উপুড় করে পিতা ছুরি চালালেন প্রাণপ্রিয় সন্তানের ঘাড়ে। খুব শক্তভাবে চালালেন। জবাইও সম্পন্ন হলো। আল্লাহতায়ালা আরসে আজিম থেকে দেখছিলেন তার প্রিয় হাবিবের আল্লাহপ্রেমের নমুনা, মুহূর্তের মধ্যে ইসমাঈলের স্থালে একটি দুম্বা নিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন হযরত জিব্রাইল (আ:)কে। পিতা চোখ খুলে দেখেন কুরবানী হয়েছে পুত্র নয় বরং জান্নাতি দুম্বা। অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন তার কলিজার টুকরা ঈসমাঈল (আ:)। আল্লাহতায়ালা শুধু পরীক্ষা নিতে চাইছিলেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন হযরত ইব্রাহীম ও তাঁর আদরের সন্তান ইসমাঈল (আ:)। আল্লাহ রাজি হয়ে গেলেন তাদের উভয়ের প্রতি। আল্লাহর কাছ থেকে ইব্রাহীম (আ:) উপাধি পেয়ে গেলেন খলিলুল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু)। তাকে ঘোষণা দেয়া হল মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসেবে। “তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছো। আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি।” সূরা আস সফফাত : ১০৫
ইবরাহীম (আ:) এর এই আল্লাহ প্রেমের নজরানাকে দুনিয়াবাসীর জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করলেন আর সামর্থ্যবান মুসলিম মিল্লাতের জন্য পশু কোরবানিকে ওয়াজিব করে দেয়া হল। আর সে কুরবানীই মুসলমানরা করে চলছে অদ্যাবধি এবং তা চলতে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত। এটাই হলো কোরবানির প্রকৃত ইতিহাস। আরবি জিলহজ্ব মাসের দশ, এগার, বার তারিখে প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের আশায় যে পশু জবাই করা হয় তাকেই কুরবানী বলে। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানই এ কুরবানী করে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কুরবানীর মূল কথা কী? এর কি আছে কোনো ইতিহাস বা অত্যুজ্জ্বল কাহিনী, যা হৃদয় মাঝে কোনো শিহরন জাগায়। সাড়া জাগায় তনু-মনে। কিংবা আন্দোলিত করে। নাকি শুধু আনন্দ ফূর্তি, মার্কেটে কেনাকাটার ভিড়। ডিপ ফ্রিজ কেনার প্রতিযোগিতা বা কোরবানি উপলক্ষে বিভিন্ন সামগ্রীর মূল্য হ্রাসকেই বুঝায়? এসব প্রশ্নের জবাবে বলতে হয় অবশ্যই এ কোরবানির পেছনে রয়েছে একটি গৌরবের ইতিহাস। একটি হৃদয়স্পর্শী কাহিনী। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর আল্লাহ প্রেমের অপূর্ব নিদর্শন। আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে কিভাবে নিজের জান -মাল বিলিয়ে দিতে হয় তা হাতে কলমে শিখিয়ে দিলেন হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ:)। কিন্তু বর্তমান মুসলীম মিল্লাতের অবস্থাা খুবই শোচনীয়। তারা ভুলতে বসেছে কোরবানির মূল চেতনা। পোষা পশুকে কোরবানি দিলেও আমরা আমাদের ভেতরের পশুত্বটা জবাই করতে পারি নাই। দিন দিন আমাদের ভেতরের পশুত্বটা আরো মোটা-তাজা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ভেতরের হিংসা-বিদ্বেষের পরশ্রীকাতরতার জন্তুটা আরো হিংস্র হয়ে উঠছে। কে কত বড় পশু কুরবানী দিচ্ছি তার প্রদর্শনী আর ড্রিপ ফ্রিজ কিনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছি, পারলে যেন আস্ত গরুটাকে ফ্রিজে ভরে দেই! আমরা সরে পড়ছি কোরবানির মূল উদ্দেশ্য থেকে। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বদলে আমরা আজ প্রত্যাশা করি অন্য কিছু। অথচ এসব কিছুই প্রভুর দরবারে পৌঁছে না। পৌঁছে তো শুধু তাকওয়া, খোদাভীতি। আল্লাহর কাছে কুরবানীর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ্ব: আয়াত ৩৭)। কোরবানির মাধ্যমে সেই তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনে সক্ষম হলেই আমাদের কোরবানি সার্থক হবে। কোরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত: কোরবানির পশুর শরীরে যত পশম থাকে, প্রত্যেকটা পশমের পরিবর্তে এক একটি নেকি পাওয়া যায়। নেক আমল সমূহের মধ্যে কুরবানী একটি বিশেষ আমল। এ জন্যই রাসূল (স:) সব সময় কুরবানী করেছেন এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। ইবনে মাজাহর হাদীসে আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স:) বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। কাদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব : ১০ জিলহজ্বের ফজর থেকে ১২ জিলহজ্বের সন্ধ্যা পর্যন্ত অর্থাৎ কোরবানির দিনগুলোতে যার নিকট নিসাব পরিমাণ সম্পদ অর্থাৎ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য বা এর পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। মুসাফিরের ওপর কোরবানি করা ওয়াজেব নয়। যার ওপর কোরবানি ওয়াজেব নয়, সে কোরবানির নিয়তে পশু কোরবানি করলে সেই পশু কোরবানি করা তার ওপর ওয়াজিব হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা:) বিদায় হজ্বে তাঁর পরিবারের সবার পক্ষ থেকে একটি মাত্র কুরবানী করেন। (ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ৩১৩৫)। আবু দাউদের অপর বর্ণনা সূত্রে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ায় আমরা রাসূলুল্লাহ (স:) এর সাথে এক একটি উট সাতজনে এবং এক একটি গরুও সাতজনে অংশীদার হয়ে কুরবানী করেছি। (হাদীস নং ২৮০৯)।এ সুযোগ আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের অনুমোদিত। অতএব প্রয়োজন পড়লে এ সুযোাগ গ্রহণ করে কুরবানীতে অংশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কারো দ্বিধা থাকা উচিত নয়। তবে একটি কুরবানী নিজের ও পরিবারের সবার পক্ষ থেকে করা যথেষ্ট। কোন কোন জন্তু কোরবানি করা যায় : বকরী, খাসি, ভেড়া, ভেড়ী, দুম্বা, গাভী, ষাঁড়, বলদ, মহিষ, উট এই কয় প্রকার গৃহপালিত জন্তু দ্বারা কোরবানি করা যায়। বকরী, খাসি, ভেড়া, ভেড়ী, দুম্বা কমপক্ষে ১ বছর বয়সের হতে হবে। বয়স যদি কমও হয় কিন্তু এরূপ মোটা তাজা যে ১ বছর বয়সীদের মধ্যে ছেড়ে দিলেও তাদের থেকে ছোট মনে হয় না। তবে সেই পশু কোরবানি চলে। অন্তত ছয় মাস বয়স হতে হবে। বকরী কোন অবস্থাায় এক বছরের কম হতে পারবে না। কারবানির পশু ভাল এবং হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম। লেংড়া পশু কোরবানি জায়েয নয়। যে পশুর দাঁত নেই তার দ্বারা কোরবানি জায়েয নয়। যে পশুর কান জনম থেকেই নেই তা জায়েয না। তবে কান ছোট হলে সমস্যা নেই। যে পশুর শিং মূল থেকে ভেঙ্গে যায় কোরবানি জায়েয না। তবে শিং ওঠেইনি বা কিছু ভেঙ্গে গেছে এরূপ পশু জায়েয আছে। অতিশয় কৃশকায় ও দুর্বল পশু যার এতটুকু শক্তি নেই। যে জবেহের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না, তার দ্বারা কোরবানি জায়েয নয়। “খোঁড়া জন্তু যার খোঁড়ামী সুস্পষ্ট, অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রুগ্ন জন্তু যার রোগ সুস্পষ্ট এবং ক্ষীণকায় পশু যার হাঁড়ের মজ্জা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে তা কুরবানী করা যাবে না।” (তিরমিযী: হাদীস নং ১৪৩৭)
কোরবানির গোশত খাওয়া এবং বণ্টনের নিয়ম : অংশীদারীগণ গোশত অনুমান করে বণ্টন করবেন না। বাটখারা দিয়ে ওজন করে বণ্টন করতে হবে। অবশ্য কোন অংশীদার পাঁয়া ইত্যাদি বিশেষ কোন অংশ না নিয়ে তার ভাগে গোশত কিছু কম হলেও তা হবে। কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, পরিবারকে খাওয়ানো, আত্মীয়স্বজনকে দেয়া এবং গরীব মিসকিনকে দেয়া সবই জায়েজ। মোস্তহাব ও উত্তর তরিকা হলো তিন ভাগে করে একভাগ নিজেদের জন্য রাখা। এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেয়া এবং এক ভাগ গরিব মিসকিনকে দেয়া। কোরবানির গোশত বা বিশেষ কোন অংশ পরিশ্রমিক রূপে দেয়া জায়েজ নয়। কোরবানির চামড়া খয়রাত করা যায়, তবে বিক্রি করলে সে পয়সা নিজে ব্যবহার করা যায় না। খয়রাত করা জরুরী এবং ঠিক ঐ পয়সাটাই গরীবদের মধ্যে খয়রাত বা গরীব ছাত্রকল্যাণে দান করতে হবে। কোরবানির চামড়ার টাকা মসজিদ, মাদ্রাসার নির্মাণ কাজে পরিশ্রমিক বাবদ খরচ করা যাবে না। মিছকিনদের মধ্যে খয়রাতই করতে হবে। কোরবানির পরে যাতে পশুর রক্তে পরিবেশ দূষিত না হয় সেজন্য রক্ত, আবর্জনা মাটিতে গর্ত করে ঢেকে রাখতে হবে। আসুন আমরা কুরবানীর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লার সন্তুষ্টি বিধানে প্রয়োজনে নিজের জান-মালের কুরবানী দিতে যেন প্রস্তুত থাকি।এই হোক কুরবানীর প্রকৃত চেতনা।

সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ৭১’র জাতীয় শোক দিবস পালন

স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহাদাত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ-’৭১ কেন্দ্রিয় কমিটির উদ্যোগে ১৫ আগষ্ট বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর ধোপাদীঘিরপারস্থ কার্যালয়ে এক শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিস্তারিত

ফিরে এসো বঙ্গবন্ধু

নুশরাত রুমু

চেতনার নিমীলিত চোখে ঘুমিয়ে পড়েছে বাঙালি,
প্রতারণার আখড়া হয়েছে স্বপ্নের সোনার বাংলা।
লিপ্সার বৃষ্টি ডুবিয়ে দিচ্ছে জাতির বিবেক।
দুর্নীতির দমকা হাওয়ায় ছিঁড়েছে সততার পাল।
কৃত্রিম আবেগের কাছে নন্দিত স্বপ্নগুলোর দাফন হলো সম্পন্ন।

বসন্তের পলাশ দেখে ভাবুক হয় না মানুষ।
বরং দুমড়ে মাড়িয়ে চলে যায় উন্মাদ চোখে।
একাত্তরের হায়েনার মতো নারীর সম্ভ্রম খুবলে খাচ্ছে পথভ্রষ্ট কামার্তের দল অস্তিত্বের বসতভিটায় লেগেছে তীব্র সংকট।

নৈতিক বিচ্যুতির গ্রহণের কালে তোমাকে আবার বড় প্রয়োজন ওগো বঙ্গবন্ধু!
উদয়ের বাণী নিয়ে তুমি আসবে…
সেই প্রতীক্ষায় বিষাদ রোদনে অপেক্ষারত দিশেহারা জাতি।
তোমার মহান কীর্তিকে জানাই লাখো সালাম।
হাজার বঙ্গবন্ধু হয়ে প্রতিটি মায়ের ক্রোড়ে ফিরে এসো হে চিরভাস্বর!

ভালো থেকো বঙ্গপিতা

মাযহারুল ইসলাম অনিক

জাতির পিতা অমর তুমি রবে চিরদিন,
সত্যি বলছি ফুরোবেনা কভু তোমার ঋণ।
তুমি যেদিন এ ধরাতে এলে শিশু রূপে,
বড়ো গোঁফা শত্রুগুলো ছিলো না নিশ্চুপে।
রক্ত আশে এদিকওদিক ছুটেছিলো তারা,
বুড়ো-বুড়ি শিশু-কিশোর গিয়েছিলো মারা।
গাড়ি -বাড়ি কলকারখানা নিয়েছিলো লুটে,
শত্রুগুলো চলছিলো ভাই কালো কালো বুটে।
শাসন বারণ কেউ মানেনি সব করেছে ছাপ,
বৃদ্ধ পিতাও তাদের থেকে পায় নি কভু মাফ।
এমন ভাবেই অনেক বছর হলো একাই পার,
সাহস নিয়ে তুমিই তখন দেখাও স্বাধীন দ্বার।
তর্জনীটা উঁচোয় ধরে দিলে তেজি ভাষণ,
সেই ভাষণে কাঁপলো ধরা কাঁপলো পাকির আসন।
তারপরেতে বঙ্গ জাতি পেলো স্বাধীন স্বাদ,
হঠাৎ করে ভাঙালো দেখো সকল দুঃখ বাঁধ।
তোমার দেওয়া সেই ভাষণে স্বাধীন হলো জাতি,
ঘরে ঘরে জ্বলছে দেখো খুব যে আলো বাতি।
ভালো থেকো সুখে থেকো বঙ্গ জাতির পিতা,
শত্রু বুকে জ্বলবে দেখো বিশাল অনল চিতা।

মুজিব

জিল্লুর রহমান পাটোয়ারী

টঙ্গী পাড়ার সেই ছেলেটি,
মুজিব নামে জানি –
জ্ঞানগরিমায় বিদ্যা বুদ্ধিতে,
ছিলেন অনেক জ্ঞানী
সেই ছেলেটির ছড়ায় সুনাম,
খ্যাতি আর সম্মান –
গর্বে মোদের বুক ভরে যেতো,
হইনি মোরা অপমান ।
স্বপ্ন তাহার সোনার বাংলা,
গড়িয়েছেন নিজ হাতে –
সোনার বাংলার মানুষগুলো,
নিয়েছিলেন তার সাথে।
তাদের নিয়ে চালায় এদেশ,
চলেছিল বেশ ভালো –
হঠাৎ করে কোন ছোবলে,
নিভায় যেন তার আলো।
শোকের ছায়া সোনার দেশে,
শোকের বইছে ঢল –
কোন পাষণ্ড ঘটাল হায়,
সবার ভাঙ্গল বাহুবল।

মানুষের কল্যাণই হোক শোক দিবসের অঙ্গীকার

তরিকুল ইসলাম
১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস। এই দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার। এই দিনে হত্যা করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলার স্থপতি, আধুনিক বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টাকে। যার জন্ম না হলে আমরা পেতাম না সবুজের মাঝে লাল পতাকা, আমরা পেতাম না আমাদের জাতীয় সঙ্গীত, আমরা পেতাম না একটি মানচিত্র, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির রাখাল রাজা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আজ এই মহান নেতার ৪৩তম শাহাদাত বার্ষিকী। এই দিনটি বাঙালি জাতিকে বিশ্বের কাছে অকৃতজ্ঞ জাতিতে পরিণত করেছে। এই দিনে আরও হত্যা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে যিনি পিছন থেকে উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে সৃষ্টি সকল আন্দোলন সংগ্রামে বিভিন্নভাবে যিনি পরামর্শ দিতেন। যার ত্যাগ শেখ মুজিবকে জাতির পিতা বানিয়েছে সেই মহীয়সী নারী জাতির পিতার সহধর্মিনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে। হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, মেজো পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেলকে হত্যা করেছিল। পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতিআব্দুর রব সেরনিয়াবাত, মুক্তিযোদ্ধা ও যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, আরজু মনি, শহীদ সেরিনিয়াবাত, শিশু বাবু, কর্নেল জামিল, আরিমা রিন্টু খানসহ আরও অনেককে।
১৫ আগষ্ট হঠাৎ করে ঘটা কোন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিনের লালিত লিপ্সা ও পরাজিত পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের সমন্বয়ে সংঘটিত একটি ঘটনা। পাকিস্তান একাত্তর সালের তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বীর বাঙালিদের দাবাতে পারেনি। যখন দেখল বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির শক্তি। তখন তারা তাদের পুরনো বন্ধু রাজাকারদের দিয়ে ষড়যন্ত্রের শুরু করে। পাকিস্তান চিন্তা করল এবার যদি বঙ্গবন্ধুকে মারা যায় তাহলে আর পাকিস্তানের ওপর দায়ভার যাবে না যাবে বাঙালির ওপর। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আরও অনেকে দেশ জড়িত ছিল। বিশেষ করে পাকিস্তান চিন্তা করল এভাবে যদি শেখ মুজিবকে হত্যা করা যায় তাহলে একসঙ্গে দুটি স্বার্থ সিদ্ধি হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধ্বংস হয়ে যাবে অপরদিকে আস্তে আস্তে একটি সময় বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানের শাসনে চলে আসবে। পাকিস্তানসহ বিদেশী অনেক দেশ মিলে এই ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। অকৃতজ্ঞ বাঙালি এবং বেইমান রাজাকার সবাই ক্ষমতার লোভে পড়ে যায়। জাতির পিতার অন্যতম ঘনিষ্ঠতা অর্জন করে তারা জাতির পিতার সঙ্গে বেইমানি শুরু করে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা জাতির পিতাকে অনেকবার সেটি হুঁশিয়ার করেছেন কিন্তু জাতির পিতা বলত পাকিস্তানীরা যেখানে আমাকে হত্যা করতে পারেনি আর সেখানে যে বাঙালির জন্য আমি এত কিছু করে দেশ স্বাধীন করেছি তারা আমাকে হত্যা করবে এটা হতে পারে না। জাতির পিতাকে রাষ্ট্রপতির বাসভবন থাকতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বাংলার জনগণকে অনেক ভালবাসতেন বলে তিনি চিন্তা করতেন বঙ্গভবনে থাকলে সবাই সবসময় দেখা তার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না তাই ৩২নং বাড়িতে থাকতেন। জনগণের প্রতি জাতির পিতার এত ভালবাসা যে একদিন কাল হয়ে দাঁড়াবে সেটা তিনি কখনও বুঝতে পারেননি। ঘরের মধ্যে থেকে মোস্তাকরা যে তার সঙ্গে এত বড় বেইমানি করবে সেটা তিনি কখনও কল্পনাও করতে পারেননি। ১৫ আগষ্ট সকালে জাতির পিতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু সে অনুষ্ঠানে তার আর যাওয়া হলো না।
১৫ আগষ্ট কালরাতে সেনাবাহিনীর কিছু বিপদগামী সদস্য জাতির পিতার ৩২নং বাড়িসহ তার বিভিন্ন আত্মীয় বাড়িতে হামলা করে। ৩২নং বাড়িতে প্রথম যখন গুলি করে সেটি শেখ কামাল শুনতে পেয়ে সেখানে এগিয়ে যায়। শেখ কামাল দেখতে পায় একদল সৈনিক তাদের বাড়িতে হামলা করেছে শেখ কামাল বঙ্গবন্ধুকে সংবাদ দেয়। তারপর শেখ কামাল নিচে নামেন। যাওয়া মাত্রই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জাতির পিতা সংবাদ শোনার পর সেনাপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য টেলিফোনে চেষ্টা করে কিন্তু টেলিফোনের লাইন কেটে ফেলায় তিনি যোগাযোগ করতে পারেননি। জাতির পিতা তখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলতে থাকে এই তোরা কারা, তোরা কী চাস। তখন কিছু কুলাঙ্গার জাতির পিতাকে গুলি করে হত্যা করে। পরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ পরিবারের সবাইকে হত্যা করে। সেদিন স্বামী-সন্তানসহ জার্মানিতে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
১৫ আগষ্ট বাঙালির জন্য একটি কলঙ্কিত রাত আর এই জঘন্য ঘটনার জন্য আজও পৃথিবীর কাছে বাঙালি একটি অকৃতজ্ঞ ও খুনী জাতি হিসেবে পরিচিত। জার্মানি থেকে ফেরার পথে এয়ারপোর্টে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পাসপোর্ট দেখে সেখানকার লোকেরা বলেছিল তোমরা বাঙালিরা এত খারাপ যে তোমরা তোমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করেছ। কিন্তু সেদিন আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী তাকে বলতে পারেন নেই যে আমরাই সেই জাতির পিতার কন্যা। জাতির পিতাকে হত্যার পর ঘাতকরা এই দেশকে আবারও পাকিস্তানের পরামর্শে পাকিস্তানের একটি রাজ্যে পরিণত করতে থাকে। কিন্তু ১৯৮১ সালে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তারপর থেকে বাঙালিরা আবার প্রাণ ফিরে পায় এবং আবার বাংলার জনগণ জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা এই দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য নিজের জীবনবাজি রাখার প্রতিজ্ঞা করেন।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, আমার মা-বাবা-ভাই কেউ আজ বেঁচে নেই কিন্তু আপনাদের মাঝে আমি আমার মা-বাবা-ভাইদের খুঁজে পেয়েছি। এই দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে প্রয়োজন হলে বাবার মতো আমি আমার জীবন উৎসর্গ করে দেব। সেই থেকে তিনি তার জীবনবাজি রেখে জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনা ১৫ আগষ্ট থেকে শক্তি নিয়ে পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। আজ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনার স্বপ্ন ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে রূপান্তর করবেন। আজকের পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভারসহ সকল প্রকল্প ১৫ আগষ্টের শোক থেকে নেয়া শক্তি। আজকের প্রযুক্তি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ১৫ আগষ্টের শোক থেকে নেয়া শক্তি।

 

ব্যর্থ হবে ষড়যন্ত্র

মাহমুদুল আলম খান (বেনু)
অন্যের মতো আমি তাকে ষড়যন্ত্রকারী বলব না, যা আমি জানি না। এও বলব যে, তিনি নামকরা আইনবিদ এবং বাংলাদেশের সংবিধান তৈরিতে তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে. যা মাত্র ৯ মাসে বাংলাদেশের গণপরিষদ সম্পাদন করতে পেরেছে। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তিনি বিপ্লবীও নন, যোদ্ধাও নন। নিরেট সত্য হলো যে, তিনি ভীতু। শহীদ বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ আমাকে বলেছিলেন, তিনি ও কামাল হোসেন ২৫ মার্চ রাত ৯টার দিকে বঙ্গবন্ধুকে অনেক বলার পরও যখন ধানমন্ডির ৩২নং বাড়ি থেকে বের করতে পারলেন না (বরঞ্চ তিনি তাদের বলেছিলেন তোরা ঢাকা শহর ছেড়ে চলে যা এবং নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়, সব ব্যবস্থা করা আছে), তখন তিনি, ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিষ্টার আমীর-উল ইসলামসহ তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় গিয়ে চাচিকে বললেন, আমি চললাম, সন্তানদের নিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সঙ্গে মিশে যেও। পথিমধ্যে ড. কামাল হোসেন তার বাসায় গিয়ে কাপড় চোপড় আনার কথা বলে আর ফিরলেন না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে ব্যারিষ্টার আমীর-উল ইসলামসহ কেরানীগঞ্জের আওয়ামী লিগ নেতা গগন ভাইয়ের বাড়ি হয়ে কুষ্টিয়া দিয়ে ভারতে গমন করেন তারা। পরবর্তীতে কামাল হোসেন পাকিস্তানে চলে যান, কারণ সিন্ধুতে তার শ্বশুরবাড়ি। সেখানে তিনি অন্তরীণ ছিলেন, না বহাল তবিয়তে ছিলেন, সেটা তিনিই ভাল জানেন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ যখন চূড়ান্ত বিজয় লাভ করল এবং পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মিনওয়ালি জেল থেকে লয়ালপুরের রেষ্ট হাউসে স্থানান্তর করলেন, তখন জনাব ভুট্টো তার সঙ্গে দেখা করলেন এবং বঙ্গবন্ধুর খেদমত করতে চাইলেন। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে আসতে। কারণ বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝোলানোর মামলায় যখন সওয়াল জবাব চলছিল, বিশিষ্ট আইনজীবী মি. ব্রোহীর কাছে তিনি শুনেছিলেন, ড. কামাল হোসেন পশ্চিম পাকিস্তান আছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসাধারণ মেধাবী এবং প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তার পরের ইতিহাস সবার জানা। বঙ্গবন্ধু ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে লন্ডন হয়ে ঢাকা ফিরলেন। ড. কামাল হোসেনকে প্রথমে আইনমন্ত্রী ও পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন ও ভালবাসতেন, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বভাবজাত ধর্ম। বাকশাল করার পর ড. কামাল হোসেন নানা ছল-ছুতায় বিদেশে যাওয়া-আসা শুরু করলেন। সবশেষে ১৫ আগষ্টের কয়েকদিন আগে বঙ্গবন্ধুকে না জানিয়ে সপরিবারে বিদেশে চলে গেলেন। বিদেশ থেকে জানালেন, শীঘ্রই ফিরবেন না, পড়াশোনা করবেন। আমার প্রশ্ন, তিনি কি ১৫ আগষ্টের ঘটনা পূর্বেই জানতেন? কিংবা তিনি যদি বাকশালের পক্ষে নাই থাকতেন, তা হলে জেনারেল ওসমানীর মতো পদত্যাগ করতে পারতেন। তাহলে বুঝতাম, তার সৎসাহস আছে। ইতিহাসের নিকৃষ্টতম হত্যাকা-ের পর যখন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এতিম হয়ে গেলেন, পেশাদার আমলা হয়েও যখন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী দুই বোনকে আশ্রয় দিলেন, তখন বার বার অনুরোধ সত্ত্বে¡ও কিংবা বিবেকের তাড়নায় ড. কামাল হোসেন একবারও দুই বোনের সঙ্গে দেখা করলেন না বা হত্যার নিন্দা করে কোন বিবৃতি দিলেন না বা প্রতিবাদ সভা করলেন না। বিশিষ্ট সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভাষ্যমতে, বহুবার ওয়াদা সত্ত্বেও ড. কামাল হোসেন লন্ডনের কোন প্রতিবাদ সভায় যোগদান করেননি। এই হলো ড. কামাল হোসেন! আর তিনি করবেন বিপ্লব! দুনিয়ার সবাই বিশ্বাস করলেও কোন বাঙালি এটা বিশ্বাস করে না। তিনি এখন চান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে। তার উচিত হবে না বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা। কারণ বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে তিনি বেইমানি করেছেন। স্বাধীনতাবিরোধী, মানবতাবিরোধী এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের নিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন এবং শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করবেন- সে আশায় গুড়ে বালি। বাংলার মানুষ কোনদিন বঙ্গবন্ধুর খুনীদের এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা দিবসে নিজেদের জন্মদিবস পালনকারীদের ক্ষমতায় আসতে দেবে না। মনে রাখবেন, ১৯৮১ সালের শেখ হাসিনা আর ২০১৮ সালের শেখ হাসিনা এক নন। ইতোমধ্যে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনায় অনেক জল গড়িয়ে গেছে। বাংলার মানুষ বুঝতে পেরেছে এবং তাদের অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, তাদের প্রকৃত বন্ধু কে? মায়েরা-বোনেরা বুঝতে পেরেছে সত্যিকার অর্থে এ দেশের মঙ্গল করতে পারবেন কে? কে পারবে তাদের মায়ের স্নেহে, বোনের স্নেহে আগলে রাখতে? কে পারবে দেশের-দশের সত্যিকার উন্নয়ন করতে? কে পেরেছে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে! কে পেরেছে ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দিতে। কে পেরেছে নিজস্ব অর্থায়নে বিশাল পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করতে।
সবশেষে বলি, এই মুহূর্তে বাঙালি জাতির আশা-ভরসার স্থল একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তিনিই পারেন ত্রিশ লাখ শহীদের, ৩ লাখ নির্যাতিত মা-বোনের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে। তিনিই পারেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে।

ছাত্র মৈত্রীর ৬ দফার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী কেন্দ্রীয় ঘোষিত ৬ দফার দাবিতে ১২ আগষ্ট রবিবার সিলেট জেলা কমিটির উদ্যোগে এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিস্তারিত

খাদিমনগর এলাকাবাসীর সাথে চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের মতবিনিময়

সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আশফাক আহমদের সাথে উপজেলার ধাপনাটিলা, নাকছাপড়া, বাওয়াইর বাড়ী ও হিন্দুবস্তী গ্রামের এক মতবিনিময় সভা রবিবার (১২ আগস্ট) বিকেলে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিস্তারিত