বিভাগ: ভেতরের পাতা

জেলা প্রশাসক বরাবরে আজ স্মারকলিপি প্রদান ॥ ভার্থখলায় যানজট নিরসনের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা

দক্ষিণ সুরমা নছিবা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রাস্তার সামন থেকে কীনব্রিজ পয়েন্ট হয়ে বাবনা পয়েন্ট পর্যন্ত যানজট নিরসনের লক্ষ্যে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২০ মে রবিবার রাতে দক্ষিণ সুরমা নছিবা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হল রুমে ২৬নং বিস্তারিত

বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি সিলেট সদর উপজেলা শাখা গঠিত

বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি সিলেট সদর উপজেলা শাখার ৩১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য গত ১৭ মে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় সিলেট মহানগরীর পাঠানটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক সভা বিস্তারিত

রমজানে মনীষীরা যেভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতেন

মাহফুয আহমদ

রমজান কোরআন নাজিলের মাস। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘রমজান মাস হলো সেই মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে।’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
সুতরাং কোরআনের সঙ্গে এই মাসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। স্বয়ং নবীজী (সা.)-এর নিয়মে পরিণত হয়েছিল যে পুরো বছর কোরআনের যে অংশগুলো নাজিল হতো; তিনি সবটুকু জিবরাইল (আ.)-কে পুনর্বার পড়ে শোনাতেন এবং জিবরাইল (আ.)ও তাঁকে পড়ে শোনাতেন। যে বছর নবীজী ইন্তেকাল করেন, সে বছর একে অন্যকে দুবার পড়ে শুনিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬২৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪৫০)
তাই এই মোবারক মাসে সলফে সালেহিন তথা পুণ্যবান লোকেরা রোজা রাখার মহান হুকুম পালনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য নফল ইবাদতের মধ্যে কোরআন তিলাওয়াতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
রমজানের পুরো মাস পবিত্র কোরআনের জন্য ওয়াকফ করে দিতেন। তাঁদের কেউ কেউ সাধ্যানুযায়ী অধিকবার কোরআন খতমের প্রতি মনোনিবেশ করতেন আর কারো কারো মনোযোগ থাকত কোরআনের গভীরে গিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিগূঢ় তথ্য ও রহস্যগুলো উদ্ঘাটন করা, কোরআনের মণিমুক্তাগুলো সংগ্রহ করার প্রতি। তাঁদের জীবনের এসব দিক আমাদের সামনে এলে, আমরাও এমনটা করতে অনুপ্রাণিত হতে পারি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এরা এমন ছিল, যাদের আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেছিলেন। অতএব, তুমিও তাদের পথ অনুসরণ করো।’ (সূরা : আনআম, আয়াত : ৯০)
কারো মনে সংশয় জাগতে পারে যে এত কম সময়ে দ্রুত কোরআন খতমের কারণ ও বৈধতা কী? মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে রাজাব হাম্বলি (রহ.) বলেন, তিন দিনের কম সময়ে কোরআন খতম করতে হাদিসে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা সব সময় এমনটা করার বেলায় প্রযোজ্য। কিন্তু ফজিলতপূর্ণ সময় যেমন রমজান, বিশেষত রমজানের রাত্রি; যেখানে কদরের রাত অনুসন্ধান করা হয় অথবা ফজিলতপূর্ণ স্থান যেমন মক্কা, বিশেষত তাদের জন্য যারা বাইরে থেকে মক্কায় প্রবেশ করে। এসব ক্ষেত্রে অধিক হারে কোরআন তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব। ইমাম আহমাদ ও ইসহাক প্রমুখ ইমামের মন্তব্য ও অন্যান্য আলিমের কর্মপন্থা এর সমর্থন করে। (লাতায়িফুল মাআরিফ, ইবনে রাজাব, ১৭১)
রমজানে দুই রাতে কোরআন খতম : আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে কায়স আবু আমর আন নাখায়ি। ইমাম ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। ইবরাহিম নাখায়ি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আসওয়াদ রমজানের প্রতি দুই রাতে কোরআন খতম করতেন। তিনি মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নিদ্রা যেতেন। আর রমজান ছাড়া অন্য মাসে তিনি প্রতি ছয় রাতে কোরআন খতম করতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, জাহাবি, ৪/৫১)
মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন খতম : সাঈদ ইবনে জুবাইর ইবনে হিশাম একজন প্রথিতযশা আলিম। তাঁর সম্পর্কে হাসান ইবনে সালিহ বর্ণনা করেন, ইবনে হিশাম রমজান মাসে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন খতম করতেন। অবশ্য তখনকার যুগে লোকেরা এশার নামাজ বিলম্ব করে আদায় করত। (প্রাগুক্ত, ৪/৩২৪)
এক দিন ও এক রাতে তিন খতম : আবুল হুসাইন ইবনে হুবাইশ একদা আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সাহল ইবনে আতার আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, প্রত্যহ তাঁর এক খতম হতো। আর রমজানে প্রতি এক দিন ও এক রাতে তিন খতম হতো। শেষ বয়সে কোরআনের নিগূঢ় রহস্য এবং সূক্ষ্ম জ্ঞান আবিষ্কার করার মানসে এক খতম শুরু করেছিলেন। ১০ বছর পর্যন্ত পড়েছেন। তবে খতম হওয়ার আগেই তিনি এ পৃথিবী ত্যাগ করেন। (আল মুনতাজাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম, ইবনুল জাওজি : ৬/১৬০)
তিন দিনে এক খতম : আবু আওয়ানা বর্ণনা করেন, আমি কাতাদা ইবনে দিআমা (রহ.)-কে রমজানে কোরআনে কারিমের দারস দিতে দেখেছি। সালাম ইবনে আবি মুতি (রহ.) বলেন, কাতাদা প্রতি সাত দিন অন্তর কোরআন খতম করতেন। রমজান এলে প্রতি তিন দিনে এক খতম করতেন। আর রমজানের শেষ দশকে তিনি কোরআন খতম করতেন প্রতি রাতে। (প্রাগুক্ত : ৫/২৭৬)
রমজানে ৯০ খতম : মুহাম্মাদ ইবনে জুহাইর ইবনে কুমাইর বলেন, আমার আব্বাজান রমজান মাসে কোরআন খতম হওয়ার সময় আমাদের সবাইকে একত্র করতেন। তিনি প্রতি রাত-দিনে তিন খতম, এভাবে পুরো মাসে ৯০ বার কোরআনে কারিম খতম করতেন। (আল মুনতাজাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম, ইবনুল জাওজি : ৫/৪)
সাত দিনে কোরআন খতম : ইবনে আবি শায়বা (রহ.) সূত্রে বর্ণিত, আবু মিজলাজ (রহ.) রমজানে মহল্লার মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি সাত দিনে কোরআনে কারিম খতম করতেন। (আস সিকাত, ইবনে হিব্বান : ৫/৫১৮)
রমজানে ৬০ খতম : ইয়াহইয়া ইবনে নাসর বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অনেক সময় রমজান মাসে কোরআনে কারিম ৬০ বার খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদি : ১৩/৩৫৭)
আবু বকর ইবনুল হাদ্দাদ (রহ.) বলেন, আমি এ কথা শুনে আশ্চর্য বোধ করলাম আবার মুগ্ধও হলাম যে ইমাম শাফিয়ি (রহ.) রমজানে নামাজের ভেতরের তিলাওয়াত ছাড়াও ৬০ বার কোরআন খতম করতেন। আমিও চেষ্টা করেছিলাম। তবে সর্বোচ্চ ৫৯ বার খতম করতে সক্ষম হয়েছি। আর রমজান ছাড়া অন্য মাসে ৩০ খতম করেছি।
প্রত্যহ এক খতম : ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল বুখারি (রহ.) রমজানে প্রত্যহ দিনের বেলায় এক খতম করতেন এবং তারাবির পর (তাহাজ্জুদ) সালাতে প্রতি তিন রাতে এক খতম তিলাওয়াত করতেন। (তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদি, ২/১২; তাবাকাতুস সুবকি, ২/২২৩; হাদয়ুস সারি মুকাদ্দামাতু ফাতহিল বারি; ইবনে হাজার, পৃষ্ঠা ৪৮২)
৩৩ খতম : খলিফা মামুন রমজানে ৩৩ বার কোরআনে কারিম তিলাওয়াত করে খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ : ১০/১৯০)
রমজানে প্রতি রাতে কোরআন খতম : উবাইদা ইবনে হুমাইদ মানসুর থেকে, তিনি মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন আলী ইবনে আবদুল্লাহ আল আজদি (রহ.) রমজানে প্রতি রাতে কোরআন খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ : ৫/১৬৪)
সারা দিনে এক আয়াত : অন্যদিকে এমনও বহু তথ্য পাওয়া যায় যে মনীষীরা কোরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা ও গবেষণাকর্মে রমজান কাটিয়েছেন।
উদাহরণস্বরূপ বিগত শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.)-এর কথা উল্লেখ করা যায়। তাঁর সুযোগ্য ছাত্র আল্লামা ইউসুফ বানুরি (রহ.) বলেন, রমজানে কখনো কখনো এমন হতো যে হযরত কাশ্মীরি (রহ.) সকালে কোরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করতে শুরু করেছেন এবং বিকাল পর্যন্ত একই আয়াত পুনরাবৃত্তি করে চলেছেন। লক্ষ্য ছিল, ওই আয়াত নিয়ে গবেষণা এবং আয়াত থেকে শিক্ষা ও সূক্ষ্মতর তথ্য উদ্ঘাটন। তাঁর ওই সব গবেষণার একটি লিখিত রূপ হলো তাঁর লেখা ‘মুশকিলাতুল কোরআন’ গ্রন্থটি।

রমজান মাসের তারাবির নামাজ ও এর ফজিলত

মুফতি মুহাম্মাদ যুবাইর খান

মাহে রমজানের আমলগুলোর মধ্যে তারাবির নামাজ একটি বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল। গোটা মুসলিম জাহানে তারাবির নামাজ অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনার সঙ্গে আদায় হয়ে থাকে। তারাবি অতি বরকতময় সুন্নত নামাজ। তারাবি নামাজ পড়ার দ্বারা রমজান ও কোরআনের হক আদায় হয়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বিশেষ রহমত ও মাগফিরাত, সর্বোপরি আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।
তাই আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য উচিত একনিষ্ঠতার সঙ্গে এই ইবাদতে মশগুল থাকা। রমজানের দিনে রোজা রাখাকে ফরজ আর রাতের বেলা তারাবি নামাজকে করা হয়েছে সুন্নত। রাসূল (সা.) তারাবির ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রাতে কিয়াম করবে (তারাবি পড়বে) তার অতীতের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস নং-১৯০৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৮১৫)।
তারাবির গুরুত্ব এ থেকেও বোঝা যায় যে, সুন্নত ও নফল নামাজ সাধারণত জামাতে আদায় করা নিষেধ, অথচ তারাবি নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার বিধান এসেছে। তবে রাসূল (সা.) নিজে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জামাতের ব্যবস্থা করেননি, উম্মতের ওপর তা ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। এ থেকে বোঝা যায়, তারাবির মর্যাদা সাধারণ নফল নামাজ থেকে অনেক বেশি।
তারাবি আরবি শব্দ, যা তারবিহাতুন শব্দের বহুবচন। যার অর্থ হলো, আরাম, প্রশান্তি অর্জন ও বিরতি দেওয়া। রমজান মাসে এশার নামাজের পর বিতর নামাজের আগে অতিরিক্ত যে সুন্নত নামাজ আদায় করা হয় তাকে তারাবির নামাজ বলে। এই নামাজের নিয়ম হলো, প্রতি দুই রাকাতের পর সালাম ফেরানো। এভাবে মোট ১০ সালামে ২০ রাকাত আদায় করা।
তারাবির নামাজের বিধান : রমজান মাসে এশার নামাজের পর তারাবি নামাজ আদায় করা নারী-পুরুষ সবার জন্যই সুন্নতে মোয়াক্কাদা। তবে পুরুষরা মসজিদে জামাতের সঙ্গে আর মহিলারা ঘরে এই নামাজ আদায় করবে। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মাত্র তিন দিন জামাতের সঙ্গে তারাবি আদায় করার পর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় জামাতের সঙ্গে তারাবি পড়া ছেড়ে দিলেন। অতঃপর রাসূল (সা.) বাকি জীবনে, আবুবকর (রা.) এর খিলাফতকালে এবং ওমর (রা.) এর খিলাফতের প্রথমদিকে এই অবস্থাই বিদ্যমান ছিল। (সহিহ বোখারি ১/২৬৯, সহিহ মুসলিম ১/২৫৯)।
আরেকটি বিষয় হলো, জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজ আদায় করা। এ ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজ আদায় করা সুন্নতে কেফায়া। কোনো মহল্লায় যদি কেউ-ই জামাতের সঙ্গে না পড়ে, তাহলে সবাই গোনাহগার হবে। আর যদি কিছু লোক মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করে আর কেউ কেউ ঘরে একা একা আদায় কওে, তাহলে এতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে এ কথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, যারা একা একা পড়ল তারা জামাতে পড়ার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হলো (কামুসুল ফিকহ- ২/৪৫০)। আর পবিত্র রমজান মাসে তারাবির নামাজে একবার কোরআন শরিফ খতম করা সুন্নত (রাদ্দুল মুহতার- ২/৪৯৭)। তবে অবশ্যই তারাবিতে কোরআনুল কারিম ধীরে ধীরে পড়তে হবে, আমাদের দেশে হাফেজ সাহেবরা যেভাবে ফোরজি স্পিডে অর্থাৎ দ্রুত গতিতে পড়েন, এটা অবশ্যই ত্যাগ করা উচিত। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, তোমরা কোরআনকে তারতিলের সঙ্গে ধীরে ধীরে সহিহ-শুদ্ধভাবে পড় (সুরা মুযযাম্মিল, আয়াত-৪)। আল্লাহ তা’আলা আমাদের রমজানের হক আদায় করার, প্রতিদিন সুন্দরভাবে গুরুত্বসহ জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজসহ সব ইবাদত-বন্দেগি সঠিকভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

রামাদান মাসের ফযীলত আদায়ে সঠিক নিয়ম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

রমজান মাসের ফযিলত, এ মাসের রহমত, বরকত ও মাগফিরাত এ সব কিছু হাছিল করার জন্যে নবী (সাঃ) কয়েকটি শর্তারোপ করেছেন যে শর্তগুলো যে মু’মিনের মধ্যে পাওয়া যাবে ঐ মু’মিনই শুধু রামাদান মাসের ফযিলত, রহমত, বরকত ও মাগফিরাত পাবেন। আর এ শর্তগুলো যে মু’মিনের মধ্যে পাওয়া যাবে না সে মু’মিন শুধু কষ্ট করেই রামাদান মাসের সিয়াম (রোজা) পালন করবেন, তারাবীহ্ আদায় করবেন কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে কোন প্রকার ফযিলত, রহমত, বরকত ও মাগফিরাত পাবেন না। তাহলে ঐ শর্তগুলো জানা আমাদের জন্যে খুবই জরুরী। নবী (সা:) আমাদেরকে যেভাবে সিয়াম (রোজা), কিয়ামুল লাইল (তারাবীহ্) ও লাইলাতুল ক্বাদর করতে বলেছেন, আমাদেরকে ঠিক সেভাবেই পালন করার চেষ্টা করতে হবে। নবী (সা:) যে কয়েকটি শর্তারোপ করেছেন এরকম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক শর্ত হলো ৩ টি আর তা হলো ১. ঈমান ২. এহতেছাব, ৩. হালাল উপার্জন। এ তিনটি বিষয় সম্পর্কে আমরা আলোচনা করবো ইন্শা’আল্লাহ।
রামাদান মাসের খাছায়েছ তথা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এ মাসে আল্লাহ তা’য়ালা ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত দান করেছেন যে গুলো অন্য কোন মাসে দেন নাই। সহীহ আল বোখারী ও সহীহ আল মুসলিমে বর্ণিত ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ হিসেবে হাদিসটিতে রাসূল (সাঃ) রামাদান মাসের ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের কথা উল্লেখ করেছেন আর সেগুলো হলো ১. ফরজ সিয়াম (রোজা), যা আল্লাহ তা’য়ালা কেবল রামাদান মাসেই উম্মতে মোহাম্মদীকে দান করেছেন, ২. ক্বিয়ামুল লাইল তথা তারাবীহ এর নামাজ। ক্বিয়ামুল লাইল অন্যান্য মাসেও আছে কিন্তু রামাদান মাসের ক্বিয়ামুল লাাইলের গুরুত্বটা আলাদা। এই মাসের ক্বিয়ামুল লাইলকে/ক্বিয়ামে রমাদানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ৩. লাইলাতুল ক্বদর, যেটি রামাদান মাস ব্যতীত বছরের আর কোন মাসে পাওয়া যায় না। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদিস রাসূল (সাঃ) এ ৩ (তিন) টি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতকে এক বাক্যে না বলে তিনটি বাক্যে আলাদা আলাদাভাবে বলেনঃ “যে ব্যক্তি রামাদান মাসে সিয়াম (রোজা) পালন করবেন ঈমান ও এহতেছাবের সাথে, আল্লাহ তা’য়ালা তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন”। “যে ব্যক্তি রামাদান মাসে ক্বিয়ামুল লাইল (তারাবীহ এর নামায) আদায় করবেন ঈমান ও এহতেছাবের সাথে, আল্লাহ তা’য়ালা তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন”। “যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরের রাত্রে ক্বিয়ামুল লাইল করবেন ঈমান ও এহতেছাবের সাথে, আল্লাহ তা’য়ালা তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন”। শুধু সিয়াম তথা রোজা পালন করলেই হবে না, শুধু ক্বিয়ামুল লাইল (তারাবীহ এর নামাজ) পড়লেই হবে না, শুধু লাইলাতুল ক্বাদরে ক্বিয়ামুল লাইল পড়লেই হবে না, মাগফিরাত পাবার জন্যে এ দুইটি জিনিস ঠিক থাকতে হবে। যদি এ দুটি জিনিস ঠিক না থাকে তাহলে তিনি রোজা পালন করবেন, তারাবীহ এর নামাজ আদায় করবেন, লাইলাতুল ক্বদরে ক্বিয়াম করবেন কিন্তু কোন ফায়দা পাবেন না, গুনাহ থেকে মাফও পাবেন না। তিনটি ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর বান্দাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দিবেন। তিনটির ক্ষেত্রেই রাসূল (সাঃ) শর্ত দিয়েছেন দুটি, একটি হলো ঈমান অপরটি হলো এহতেছাব। ঈমান ও এহতেছাবের সাথে সিয়াম (রোজা) পালন করতে হবে, ঈমান ও এহতেছাবের সাথে ক্বিয়াম (তারাবীহ) আদায় করতে হবে, ঈমান ও এহতেছাবের সাথে লাইলাতুল ক্বাদরে ক্বিয়াম আদায় করতে হবে। তাহলে আমাদেরকে বুঝতে হবে ঈমান ও এহতেছাব কী জিনিস?
ঈমানের ব্যাপারে আমরা কম বেশী জানি, কারণ আমরা সবাই ঈমানদার, মু’মিন। কিন্তু ঈমানের দাবি করা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে আমরা শির্ক করে থাকি, যে শির্ককে আমরা শির্ক বলে জানি না বা র্শিক বলে মনে করি না অথচ সেগুলো আমাদের জন্যে র্শিক। হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদিস যে হাদিসকে আমরা ‘হাদীসে জিবরাঈল’ বলে জানি, একবার হযরত জিবরাঈল (আঃ) মানুষের আকৃতি ধারণ করে নবী (সাঃ) এর কাছে আসলেন যেখানে অনেক সাহাবায়ে কেরাম বসা ছিলেন। এসে হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী (সাঃ) কে যে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন তন্মধ্যে একটি ছিল, ‘আমাকে বলেন ঈমান কাকে বলে? ঈমান কী জিনিস’? হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য হলো উম্মতকে, সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দেয়া। নবী (সাঃ) এর উত্তরে বললেন, ঈমান হলো বিশ্বাস স্থাপন করা, আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি, সকল ফেরেশতার প্রতি, সকল আসমানী কিতাবের প্রতি, সকল রাসূলের প্রতি, আখেরাতের প্রতি ও তাক্বদীরের প্রতি। উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেন, আপনি সঠিক কথা বলেছেন। তাহলে আমরা বুঝতে পারি ঈমান হলো এ ৬টা জিনিসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা যেভাবে কোরআন ও সুন্নাহ আমাদেরকে বিশ্বাস স্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছে। (অসমাপ্ত)

কেন দিনের বেলা রোজা রাখতে হয়?

মাওলানা কাসেম শরীফ

রোজা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। মুসলমানদের আগে অন্য ধর্মেও রোজার বিধান ছিল। আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা (এ রোজার মাধ্যমে) মুত্তাকি (খোদাভীরু) হতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, রোজা রাখার বিধান বহুকাল আগে থেকে প্রচলিত। বর্তমানেও বহু ধর্মে রোজার প্রথা ভিন্ন আঙ্গিকে চালু আছে। প্রশ্ন হলো, ইসলামে কেন দিনের বেলা রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে? এর জবাব হলো, বেঁচে থাকার তাগিদে সম্পূর্ণরূপে পানাহার বর্জন করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কেবল দিনের বেলা রোজা রাখতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে আরামদায়ক রাতকে আরামের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কেননা রাতের সৃষ্টি হয়েছে আরাম ও বিশ্রামের জন্য। আবার রোজা সব মানুষের ওপর ফরজ নয়। শিশুদের রোজার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। অক্ষম-বৃদ্ধদের জন্যও ‘ফিদয়া’র অবকাশ রাখা হয়েছে। মুসাফির, অসুস্থ ও সন্তান প্রসব, স্তন্যদান ও ঋতুকালে নারীদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। সাময়িক অসুবিধা দূর হওয়ার পর তাদের জন্য এ রোজা কাজা রাখার বিধান দেওয়া হয়েছে।
রমজান মাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে সৌরপঞ্জিকার স্থলে চন্দ্রপঞ্জিকা গ্রহণ করা হয়েছে। এর সুবিধা হলো, সৌর হিসেবে মৌসুমের পরিবর্তন ও ঋতুর পালাবদল হয় না। তেমনি এর দিন-রাতের আকারেও বিশেষ কোনো পরিবর্তন বা ব্যত্যয় দেখা যায় না। তাই সৌরবর্ষের হিসাবে রোজা পালন করতে গিয়ে কোনো দেশে গ্রীষ্মকালে রোজা পালন করা হলে, সেখানে সর্বদাই রমজান আসত গ্রীষ্মকালে, কোথাও শীতকালে রমজান হলে সব সময় তা শীতকালেই আসত। চান্দ্রমাস এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এর মৌসুম বছরে বছরে বদলাতে থাকে। দিন-রাতের আয়তনও কম-বেশি হয়। এভাবে রোজার মাস দেশে দেশে বছরভেদে প্রতি ঋতুতেই আগমন করে। ফলে সবাই গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত কিংবা বড় ও ছোট আকারের দিনে রোজা রাখার সুযোগ পায়।

যেভাবে কাটাবেন রমজান

যুবায়ের আহমাদ

মুমিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমার মহান বারতা নিয়ে স্বমহিমায় হাজির হয়েছে পবিত্র রমজান। এ মাসে প্রতিটি ইবাদতের প্রতিদান যেমন বহুগুণে বেড়ে যায় তেমনি সব পাপ ছেড়ে দিয়ে ভালো মানুষ হিসেবে নিজের জীবনকে নতুন করে সাজাবার সুযোগও এনে দেয় রমজান। কোরআনে নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে ‘না’ বলে সেগুলো ত্যাগ করা এবং নির্দেশিত বিষয়গুলোর চর্চার প্রশিক্ষণরও এক মহাসুযোগ রমজান। এ রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমা ও সৌভাগ্য অর্জনে নিম্নের বিষয়গুলো অনুসরণ করা যেতে পারে :
হক আদায় করে রোজা রাখা : রমজানের মূল ফরজই হলো রোজা। মহান আল্লাহ বলেন, সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে রোজা পালন করে। (সুরা বাকারা : আয়াত : ১৮৫)। রোজা শুধু পানাহার এবং স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকাই নয় বরং সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, স্ত্রী সম্ভোগ এবং সব ধরণের গুনাহ থেকে বিরত থাকা। হাদিসেও এমনটিই এসেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পাপ, মিথ্যা কথা, অন্যায় কাজ ও মূর্খতাসুলভ কাজ ত্যাগ করতে না পারবে তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লহ তায়ালার কোনো প্রয়োজন নেই। (বোখারি: ৫/২২৫১)। পাপ, মিথ্যা কথা, অন্যায় কাজ ও মূর্খতাসুলভ কাজ ত্যাগ করে এভাবে রোজা রাখলেই তা হবে হক আদায় করে রোজা রাখা। রোজার মাধ্যমে ক্ষমা পেতে হলে সে রোজা হতে হবে পাপমুক্ত। শুধু পানাহার ত্যগ করে গুনাহের কাজ না ছাড়লে তা কিছুতেই রোজা হবে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, পানাহার বর্জনের নাম সিয়াম নয়; সিয়াম হলো অনর্থক ও অশ্লীল কথা এবং কাজ বর্জন করা। (বায়হাকি: ৪/২৭০)। অর্থাৎ রোজার মাধ্যমে পবিত্র কোরআনে নিষিদ্ধ জিনিসগুলো ছেড়ে দেয়ার প্রশিক্ষণ নিতে হবে। নিজেকে বিরত রাখতে হবে সব ধরণের মিথ্যা ও পাপাচার থেকে। অনেক সময় রোজা রেখেও আড্ডায় বসে আমরা অন্যের গিবত করি। এটিও পরিহার করতে হবে। রমজানে দিনের বেলায় খাবারকে যেমন ‘না’ বলা হয় তেমনি গিবত, পরনিন্দা, সুদ, ঘুষ, সন্ত্রাসসহ সব গুনাহের কাজকেও ‘না’ বলে গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার প্রশিক্ষণ হিসেবে রোজাকে গ্রহণ করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। রমজানের প্রথম দিনে আজই আমরা শপথ করি যে গুনাহ করব না।
তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা : রমজানে কিয়ামুল্লাইলের ব্যাপারে নবীজি নির্দেশ দিয়েছেন। ‘কিয়ামুল লাইল’ অর্থ রাতের নামাজ। তারাবিহও কিয়ামুল্লাইলেরই অন্তর্ভূক্ত। তবে কিয়ামুল্লাইলের সর্বোচ্চ পর্যায় হলো তাহাজ্জুদ। রমজানে আমাদেরকে সাহরি খাওয়ার জন্য শেষ রাতে জাগতে হয়। সাহরির সময় সামান্য সময় আগে উঠে সহজেই চাইলে কয়েক রাকাত তাহাজ্জুদের অভ্যাস করে নিতে পারি।
কোরআন খতম ও তিলাওয়াত : পবিত্র রমজানে প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাই কোরআন নাজিলের মাস রমজানে যথাসাধ্য বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। কারণ রোজা ও কোরআন বান্দাদের জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে সুপারিশ করবে। মহানবী (সা.) বলেছেন : ‘রোজা ও কোরআন কিয়ামতের দিন মানুষের জন্য সুপারিশ করবে…।’ (আহমাদ : হাদিস ৬৬২৬)। অফিসে যেতে অনেক সময় জ্যামে পড়ে আমাদের সময় কেটে যায়। এ সময়টুকুও কাজে লাগাতে পারি। এ সময়টুকুও ইবাদতে ব্যবহার করতে মোবাইলে কোরআন শরিফসহ বিভিন্ন ইসলামিক এ্যাপস চালু করে তা কাজে লাগাতে পারি। রমজানে অফিসের কাজের ফাঁকে গল্প করে সময় না কাটিয়ে তিলাওয়াত, জিকির, দরূদ শরিফ পড়াসহ বিভিন্ন আমলের মাধ্যমে সে সময়টাও কাজে লাগানো যেতে পারে। অনেকে রমজান মাসে খতম উঠানোর জন্য খুব তাড়াহুড়ো করে তিলাওয়াত করে। ফলে তিলাওয়াতটা বিশুদ্ধ হয় না। ‘যেভাবেই হোক এক খতম দিতে হবে’ এই ধরণের মানসিকতা পরিহার করে ধীরেসুস্থে তারতীলের সাথে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। আস্তেধীরে পড়ে খতম করার চেষ্টা করতে হবে। নয়তো যতোটুক হয় তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। পরিমাণের চেয়ে তিলাওয়াতের গুণগতমান বেশি গরুত্বপূর্ণ।
বেশি বেশি ইসতিগফার করা : ইসতিগফার হলো ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ তাআলা ক্ষমার দরজা খুলে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদেরকে সে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। ইফতারির আগ মুহর্তে দুআ কবুল হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই ইফতারির ব্যবস্থাপনাগত কাজকর্ম আগেভাগে শেষ করে ইফতার সামনে নিয়েই দুআ করতে পারি।
বেশি বেশি দান করা : রমজানে নবীজি (সা.), সাহাবায়ে কেরাম এবং পূর্ববর্তী বুজুর্গরা বেশি বেশি দান করতেন। প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন : ‘মহানবী (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজানে তাঁর বদান্যতা আরো বেড়ে যেত।’ (মুসলিম : হাদিস ৩২০৮)। দান সদকা ক্ষমারও বড় কারণ। দান সদকা করলে আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে ক্ষমা পাওয়া যায়। আমরা সামান্য কিছু টাকা জমা করে হলেও আমাদের অভাবী প্রতিবেশীর ঘরে সামান্য ইফতার সামগ্রী দিয়ে আসতে পারি। একজন অভাবী মানুষ সারাদিন রোজা রেখে যখন আমাদের দেয়া ইফতার দিয়ে ইফতার করে আনন্দিত হবে তখন সে আনন্দটা শুধু তার ঘইে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সে আনন্দ আল্লাহ তায়ালার আরশে পৌঁছে যাবে। আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে ইফতারদাতাকে সে রোজাদারের রোজার সওয়াবের সমান সওয়াব দান করে ধন্য করবেন।
জিকির আজকার করা : ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’’, ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজিম’ এ দুয়াসহমূহ পড়া যেতে পারে। এগুরো ছাড়াও হাদিসে বর্ণিত দুয়া, তাসবিহ ও দরুদ পড়ে সময় কাটানো উচিত।
ইতিকাফের প্রস্তুতি নেয়া : ইবাদতের বসন্তকাল রমজানের বড় একটি প্রাপ্তি হলো লাইলাতুল কদর। হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুল কদর পাওয়ার বড় একটি মাধ্যম হলো ইতিকাফ করা। নবীজি (সা.) ইতিকাফ করতেন। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘মহানবী (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।’ (মুসলিম : হাদিস ১১৭১)। আল্লহর সান্নিধ্য লাভে লাইলাতুল কদর পেতে রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফের প্রস্তুতি এখন থেকেই নেয়া উচিত।
ওমরাহ আদায় : সম্পদশীল হলে রমজানে উমরা করা উচিত। রমজানে একটি ওমরা আদায় করলে অন্য মাসে ৭০টি ওমরাহ করার সওয়াব হয়। রমজানের উমরায় হজের সমান সওয়াব। এ প্রসঙ্গে এক বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসে ওমরাহ আদায় আমার সঙ্গে হজ আদায়ের সমতুল্য।’ (মাজমাউল কাবির : হাদিস ৭২২, জামেউল আহাদিস : হাদিস ১৪৩৭৯)। ওমরাহর নিয়ত করলে রমজানের আগেই কিংবা রমজানের শুরু থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত।

 

সুরভী সমাজ কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সমন্বয় সভা

নগরীর আম্বরখানাস্ত সুরভী সমাজ কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সমন্বয় সভা গত ১১ মে শুক্রবার বাদ জুম্মা আম্বরখাস্থ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সমিতির সভাপতি শিরিন আক্তার চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক বিপ্রজিত দত্ত শুভ’র পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিস্তারিত

পবিত্র শবে বরাত এর ফজিলত ও ইবাদত

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী

মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের ওপর দয়া ও ক্ষমার কেবল অসিলা তালাশ করেন, যেকোনো পথেই হোক ক্ষমা করার বাহানা খোঁজেন। তাই দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর গুনাহগার বান্দাদের ক্ষমা করার জন্য বিভিন্ন স্থান ও সময়-সুযোগ বাতলে দিয়েছেন, যাতে বান্দা নিজ কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়, আর আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেবেন।
সেসব সময়ের একটি হলো শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যাকে আমাদের প্রচলিত ভাষায় শবে বরাত বলা হয়। কোরআনুল কারিমের ভাষায় একে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাত, আর হাদিস শরিফে এটি ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান’ বলে উল্লেখ রয়েছে।
আমাদের বর্তমান সমাজে মানুষ পক্ষান্তরে বিরোধিতা করতে গিয়ে শবে বরাতের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসেছে এবং তারা এ রাতের কোনো বৈশিষ্ট্যই মানে না; বরং এ রাতের সব কিছুকেই বিদআত বলে থাকে। বাস্তবে এ দলটিও ভ্রষ্টতায় রয়েছে, কেননা শবে বরাতের একাধিক ফজিলত, তাৎপর্য ও বিভিন্ন করণীয় কোরআনুল কারিমে ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে অতি সংক্ষেপে এর বিবরণ পেশ করা হলো।
ক্ষমা ও রহমতের রজনী শবে বরাত
হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, অর্ধ শাবানের রাতে অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকূলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক-বিদ্বেষী লোক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫, আল মু’জামুল কাবীর ২০/১০৯, শুআবুল ইমান, হা. ৬৬২৮)।
অষ্টম শতাব্দীর যুগশ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামি (রহ.) বলেন, হাদিসটির সূত্রের সব বর্ণনাকারী ‘নির্ভরযোগ্য’। (মাজমাউজ জাওয়াইদ ৮/৬৫)।
এছাড়া এ মর্মে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), আলী ইবনে আবি তালিব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.), আবু মুসা আশআরি (রা.), আবু হুরাইরা (রা.), আয়েশা (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকেও হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন, এতে এত দীর্ঘ সময় ধরে সিজদা করলেন যে আমার ভয় হলো তিনি মারাই গেছেন কি না। এ চিন্তা করে আমি বিছানা থেকে উঠে রাসুল (সা.)-এর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিই, এতে আমার বিশ্বাস হলো তিনি জীবিত আছেন। তারপর নিজ বিছানায় ফিরে এলাম। এরপর তিনি সিজদা থেকে মাথা ওঠালেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি ধারণা হয়েছে যে নবী তোমার সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করেছে? আমি বলি, জি না, হে আল্লাহর রাসুল! তবে আপনার দীর্ঘ সময় ধরে সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজকের এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এ বিষয়ে অধিক জ্ঞাত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এ রাতটি অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের দয়া করেন। তবে হিংসুক লোকদের তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন। (শুআবুল ইমান, হা. ৩৮৩৫)। যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম বায়হাকি (রহ.) বলেন, এটি উত্তম মুরসাল হাদিস। (শুআবুল ইমান ৩/৩৮৩)।
শবে বরাতে রাত জেগে ইবাদত করা ও পরদিন রোজা রাখা
হযরত আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘১৪ শাবানের রাত যখন হয়, তোমরা রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে পালন করো এবং দিনের বেলা রোজা রাখো। কেননা এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে এসে বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।
কোনো রিজিক অন্বেষণকারী আছে কি? আমি তাকে রিজিক প্রদান করব। আছে কি কোনো রোগাক্রান্ত? আমি তাকে আরোগ্য দান করব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে তাদের ডাকতে থাকেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ১৩৮৮)।
হাদিস বিশারদগণের গবেষণা মতে, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। তবে এতে শুধু ইবনে আবি সাবরা নামের এক ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে হাদিসটি সামান্য দুর্বল বলে গণ্য হবে। আর এ ধরনের দুর্বল হাদিস ফাজায়েলের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য।
এছাড়া শবে বরাত সম্পর্কীয় হাদিসগুলোকে যুগশ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ ইমামগণ সমষ্টিগতভাবে ‘সহিহ’ বা বিশুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন, যাঁদের মধ্যে ইমাম ইবনে হিব্বান, হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলি, হাফেজ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
বছরব্যাপী ভাগ্যনির্ধারণের রজনী শবে বরাত
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এই রাতে হেকমতপূর্ণ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত করা হয়।’ (সুরা দুখান, আয়াত ২-৩) কোরআনের ব্যাখ্যাকারদের অনেকে আয়াতে উল্লিখিত ‘লাইল’ থেকে শবেকদর উদ্দেশ্য বললেও কয়েকজন ব্যাখ্যাকার এর অর্থ শবেবরাত বলেছেন।
এ ব্যাপারে ইকরামা (রহ.) সূত্রে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা অর্ধশাবানের রাতে যাবতীয় সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ফয়সালা করেন। আর শবে কদরে তা নির্দিষ্ট দায়িত্বশীলদের অর্পণ করেন। (তাফসিরে কুরতুবি ১৬/১২৬)।
হযরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, অর্ধশাবানের রাতের কার্যক্রম হলো, এ বছর যারা জন্মগ্রহণ করবে এবং যারা মারা যাবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতেই মানুষের আমল পৌঁছানো হয়। এতেই তাদের রিজিকের বাজেট করা হয়। (ফাজায়েলে আওক্বাত, বায়হাকি, হা. ২৬)।
তাই এ রাতে তসবিহ-তাহলিল, ইসতিগফার, কোরআন তেলাওয়াত বেশি বেশি করতে হবে। কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে হবে। এছাড়া উমরি কাজা ও নফল নামাজ অধিক পরিমাণে পড়তে হবে। এ রাতে কবর জিয়ারতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। আল্লাহ আমাদের নেক আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন আল্লাহুম্মা আমিন ছুম্মা আমিন।

‘মহান মে দিবস’ প্রতিষ্ঠিত হোক শ্রমজীবী মানুষের অধিকার

প্রভাষক জ্যোতিষ মজুমদার

এ পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর, সৌন্দর্যময় সৃষ্টিশীল এবং নান্দনিক শিল্প, সবকিছুর মূলেই রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের অবদান। পৃথিবীর মেহনতি শ্রমজীবী মানুষরাই আমাদের মহান সম্পদ এবং অহংকার। কিন্তু কৃষি সভ্যতা বিকাশের সময় থেকে দাসপ্রথা, বেগারখাটা এবং উৎপন্ন শষ্যভান্ডার কুক্ষিগত করার প্রবণতা সমাজে শ্রমজীবী মানুষদের বঞ্চিত করে চলছে প্রতিনিয়ত। স্ফীতকায় ধনতান্ত্রিক অচলায়তনে শ্রমিকদের চোখের জল আর বুকের রক্ত কোন মানবিক স্বীকৃতি পায়নি। ১৭৮০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দাবী দাওয়া, প্রতিবাদ এবং কাজ বন্ধ করে দেওয়া সহ বিভিন্ন আন্দোলনে ব্যাপৃত থাকে জুতা প্রস্তুতকারী শ্রমিক, ছুতার ও মুদ্রণ শিল্পে নিয়োজিত বিভিন্ন শ্রমিকরা। মূলতঃ এ সময়টা ছিল শ্রমিক ও মালিকে মতানৈক্যের ইতিহাস।
১৮০৬ সালে আমেরিকায় ফিলাডেলফিয়ার জুতা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা কার্যঘন্টা কমানোর দাবীতে ধর্মঘট করেন এবং ১৮২৭ সালে কর্মঘন্টা কমানোর দাবীতে ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয় ফিলাডেলকিয়ার মেকানিক শিল্পের শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে।
আটঘন্টা কাজের সময়ের দাবীতে আন্দোলনের সর্বপ্রথম উদ্যোগ নিয়েছিল ইংল্যান্ডের ‘গ্রান্ড ন্যাশনাল কনসোলিডেটেড ট্রেডস ইউনিয়ন’। প্রথমে ২রা জুন ১৮৩৩ এবং তারপর সময় পিছিয়ে ১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা ওই দাবীতে ধর্মঘটের ডাক দেয়। ওই একই দাবীতে ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৭ থেকে ২৫ এপ্রিল ১৮৩৪ সালে লন্ডনে। আবার ১৮৩৬ সালেও লন্ডনে বিভিন্ন বৃত্তির সোসাইটিগুলোর জয়েন্ট কমিটি সপ্তাহে ৬০ ঘন্টার দাবিতে ৬ মাস সফলতার সাথে ধর্মঘট চালিয়েছিল।
১৮৪৫ সালে বিভিন্ন তুলা শিল্পে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, স্যানিটেশন, ও কার্য্য সময় নিয়ে ম্যাচাচুয়েস্ট এ “দি ফিমেল লেবার রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশন” গঠিত হয়। মে দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ১৮৫৭ খ্রি: ৮ই মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সুচ কারখানায় নারী শ্রমিকগণ তাদের প্রাপ্য মজুরীর বৈষম্য ও দৈনিক ১২ ঘন্টা কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠে।
১৮৬০ সালে নিউ ইংল্যান্ডে ২০ সহ¯্রাধিক জুতা তৈরীর শ্রমিক দাবী আদায়ের লক্ষ্যে সফল ধর্মঘট করেন। শ্রমিকদের দাবী আদায়ের লক্ষ্যে দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের দাবীতে বিশ্বের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট হয়েছিল অবিভক্ত বঙ্গে ১৮৬২ সালের মে মাসে অর্থাৎ শিকাগো ঘটনায় আরো ২৪ বৎসর পূর্বে। ঐ ধর্মঘট ডেকেছিল রেলওয়ে শ্রমিকেরা। ১৮৬১-৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ক্রীতদাসদের মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত আমেরিকায় শ্রমিক আন্দোলনে জোয়ার বয়ে দিয়েছিল। ৮ ঘন্টা কাজের দাবীতে আন্দোলন এ সময় থেকেই সেখানে তীব্রতা লাভ করে। ১৮৬৬ সালে বাল্টিমোরে ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিগণ কর্মঘন্টা ৮ ঘন্টা নির্ধারণের দাবিতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন ১৮৮৪ সালে আমেরিকাার শিকাগো শহরে একদল শ্রমিক দৈনিক আট ঘন্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য ১৮৮৬ সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় সীমা রেখে দেন।
১৮৬৮ সালে আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন সভায় সরকারি শ্রমিকদের কার্যসময় ৮ ঘন্টা নির্ধারনের আইন পাস করা হয়, কিন্তু বেসরকারি শ্রমিকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।
এক সময় অমোঘ নিয়মে আবির্ভূত হলেন কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হল পৃথিবীব্যাপী শ্রমিকদের ঐক্য ঘোষণা। ১৮৪০ এর দশকে কাল মার্ক্স এবং ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের দ্বারা পুঁজিবাদের উত্থান এবং নিয়মাবলী আবিষ্কার, এবং নিয়মাবলী অধিকার ১৮৬৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংঘঠনের প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমিক আন্দোলনের বৈজ্ঞানিক প্রণালীসমূহের সূত্রায়ন, ১৮৭১ সালে ঐতিহাসিক প্যারি কমিউন এবং তার প্রথম আন্তর্জাতিক কেন্দ্রীয় দপ্তর আমেরিকাতে স্থানান্তরের ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে সমাজ তান্ত্রিক ভাবধারায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন প্রসারের প্রথম শর্তাবলী গড়ে উঠে।
১৮৮১ সালে জর্জিয়া আটলান্টায় লন্ড্রি শিল্পের কাজে নিয়োজিত তিন সহ¯্রাধিক কৃষাঙ্গ নারী শ্রমিক প্রভাববিস্তারকারী আন্দোলনের জন্ম দেয়। ১৮৮৪ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে একদল শ্রমিক দৈনিক আট ঘন্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন এবং তাদের এ দাবী কার্য্যকর করার জন্য ১৮৮৬ সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় সীমা বেঁধে দেন।
মালিক আর মজুতদারদের অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে এবং নিজেদের ন্যূনতম প্রয়োজন সিদ্ধির দাবীতে আজ থেকে ১৩২ বছর পূর্বে ১৮৮৬ সালের মে মাসের প্রথম দিবসে শ্রমিকদের সমবেত পদাঘাতে প্রকম্পিত হয়েছিল শিকাগো শহর। শ্রমিকেরা কারখানায় না গিয়ে নেমে এলেন রাজপথে। আমেরিকার প্রায় ১৩ হাজার কল-কারখানায় তিন লক্ষাধিক শ্রমিক নানা রঙের ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে সমবেত হলেন। সফল সমাবেশ করে যার যার বাড়ী ফিরে গেলেন।
মে মাসের ৩ তারিখ সোমবার ধর্মঘট চলছে। ম্যাককর্মিক হার্ভেস্টার ওয়াকর্সের শ্রমিকরা ধর্মঘট ভাঙ্গতে আসা মালিক পক্ষ ও সরকারি পুলিশ বাহিনীর মোকাবিলা করতে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। স¤্রাজ্য লোভী ধন-তান্ত্রিক রাজশক্তির চন্ডাল নৃত্য সেদিন প্রকাশিত হয়েছিল জান্তব নগ্নতায়। পুলিশের গুলিতে ৬ জন শ্রমিক নিহত ও আহত হন অনেক। এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে আগস্ট স্পাইসের সংগ্রামী আহ্বানে পরের দিন ৪ঠা মে শিকাগো শহরের হে মার্কেটে স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বোমা হামলায় আরো ৪ জন নিহত হন। পুলিশ শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার করতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ ও ধর্মঘটকারীরা মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। উক্ত সংঘর্ষে অনেক শ্রমিক মারা যায় এবং শিকাগো হে মার্কেট স্কোয়ারে চরম গণবিদ্রোহের ফলশ্র“তিতে কয়েকজন পুলিশ অফিসার সহ একজন বেসাময়িক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। পুলিশ হত্যা মামলায় ৮ জন শ্রমিক নেতাকে অভিযুক্ত করা হয়। বিচারের নামে হয় প্রহসন। ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লু্যুইস লিং একদিন আগেই জেলের ভিতরে আত্মহত্যা করেন। ফাঁসির মঞ্চে স্পাইস বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলেন আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে। ১৩ নভেম্বর তাদের শেষকৃত্যে আমেরিকার বৃহত্তম মিছিলে সমবেত হয়েছিল প্রায় ৫ (পাঁচ) লক্ষাধিক মানুষ।
আগস্ট স্পাইসদের যারা অন্যায় ভাবে ফাঁসি দিয়েছিল তারা আজ ঐতিহাসের আদালতে অভিযুক্ত হয়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে আঁস্তাকুড়ে আর আগস্ট স্পাইসরা অভিষিক্ত হন বীরের আসনে। ১৮৯৩ সালে ইলিয়নের গভর্ণর অভিযুক্ত ৮ জনকেই নিরাপরাধ ঘোষণা করেন এবং রায়ের হুকুম দাতা পুলিশ কমান্ডারকে অভিযুক্ত করা হয়।
মার্ক্সবাদের মহান পথ প্রদর্শক কার্ল মার্ক্সের অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহকর্মী ফেডারিক এঙ্গেলসের নেতৃত্বে ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের ১০০ বছর পুর্তিতে ১৪ জুলাই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ২০ টি দেশের কমিউনিস্ট প্রতিনিধিরা এ কংগ্রেসে যোগদান করেন। সেই কংগ্রেসে ‘পহেলা মে’ কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস বা ‘মে দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করেন। ঘোষণাতে বলা হয় ১৮৯০ সালের ‘পহেলা মে’ থেকে প্রতিবছর ‘পহেলা মে’ কে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। ঐতিহাসিক এ মে দিবসে বিশ্বের শ্রমজীবী জনতার প্রতি অভিনন্দন জ্ঞাপন করছি।