বিভাগ: ভেতরের পাতা

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস, নিরক্ষরমুক্ত সোনার বাংলা চাই

অধ্যাপক জ্যোতিষ মজুমদার

আজ ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ১৯৬৫ সালের ৮ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা বিষয়ক সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কোর উদ্যোগে ইরানের রাজধানী তেহরানে বিশ্ব সাক্ষরতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৬৫ সাল থেকে ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বর সাক্ষরতা দিবস পালন করে আসছে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সমাজের মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য তুলে ধরার জন্য এ দিবসটি নির্ধারণ করা হয়।
দেশে দেশে সাক্ষরতর সংজ্ঞা অনেক আগ থেকেই প্রচলিত থাকলেও ১৯৬৭ সারে ইউনেস্কো প্রথম সাক্ষরতার সংজ্ঞা চিহ্নিত করে এবং পরবর্তীসময়ে প্রতি দশকেই এই সংজ্ঞার রূপ পাল্টেছে। এক সময় কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। কিন্তু বর্তমানে সাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য অন্তত তিনটি শর্ত মানতে হবে। ১) ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারা, ২) সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারা এবং ৩) দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারা। ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো এই সংজ্ঞাটি নির্ধারণ করে তবে বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক ফোরাম বা কনফারেন্স থেকে সাক্ষরতা সংজ্ঞা নতুনবাবে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। সাক্ষরতাকে এখন সরাসরি ব্যক্তির জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।
সাক্ষরতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবীয় অধিকার হিসেবে বিশ্বে গৃহীত। সাক্ষরতার মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক মুক্তি নয়, বরং সামাজিক সাংস্কৃতিক ও মানসিক মুক্তি আনয়নের মাধ্যমে প্রত্যাহিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এর লক্ষ্য। এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণযোগ্য। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশু মৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি বিকশিত করণের ক্ষেত্রে সাক্ষরতা প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মা-বাবা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে প্রেরণে উৎসাহিত হন।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম সাক্ষরতা দিবস উদযাপিত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংস স্তুপে পরিণত হওয়া দেশটিকে টেনে তুলতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতির বাইরেও শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়ে খুবই মনোযোগী ছিলেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) জানতেন নিরক্ষরতা একটি অভিশাপ এবং জাতির উন্নতির চাকার প্রধান প্রতিবন্ধক। তাই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের চাহিদা পূরণে সক্ষম একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-এ-খুদা’র নেতৃত্বে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একযোগে জাতীয়করণ করেন। এই পদক্ষেপের কারণেই দারিদ্র্যের পর্ণকুটির থেকে জীর্ণ বস্ত্র পরিধান করা শিশুরা প্রাইমারি স্কুলে ছুুটে এসেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক ও সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়ে গেলে উক্ত কমিশন আর আলোর মুখ দেখেনি।
২০০৮ সারে জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় গেলে ২০১ সালের মধ্যে দেশে সাক্ষরতার হার শতভাগ উন্নীত করর যে অঙ্গীকার করেছিল তা এখন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও পিতার পদাংক অনুসরণ করে ২০১৩ সালে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের ঘোষণা দেন যা প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে মাইলফলক। বাংলাদেশকে তথ্য নির্ভর পৃথিবীর সামনে মাথা উঁচু করে দাড়াতে হলে আগামী প্রজন্মকে সাক্ষর ও ডিজিটাল প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে। আর এ বিষয়টিকে সামনে রেখেই বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, দারিদ্র্যের কারণে ঝড়ে পড়া রোধে উপবৃত্তি প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচীসহ বহুভিত্তিক কর্মসূচী গ্রহণ করেছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
সরকার কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান কিন্তু প্রতি বছরই জরিপ কাজ চালিয়ে সাক্ষরতার হার নির্ধারণ করেনা। সাক্ষরতার হার নিয়ে ২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যা ব্যুরো (বিবিএস) জরিপে দেখা যায় দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৫৯ দশমিক ৮২ শতাংশ, ২০১১ সালে ৫৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, ২০১২ সালে ৬০ দশমিক ০৭ শতাংশ, এ্যাসেসম্যান্ট সার্ভে নামের একটি সংস্থার ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৫১ দশমিক ০৩ শতাংশ, (এখানে বয়স ১৫ থেকে ৪৫ বছর)। ইউএনডিপির (জাতি সংঘের উন্নয় কর্মসূচী) সর্বশেষ ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রাপ্ত বয়স নিরক্ষর জনগোষ্ঠী হচ্ছে ৫৭ দশমিক।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন বলেছিলেন, দেশে সাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশে পৌঁছেছে। ঠিক এর পরের বছর (২০১৪ সাল) একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে ৬৫ শতাংশ মানুষ স্বাক্ষর, আবার ২০১৪ সালে জুলাই মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) নির্বাহী কমিটির পরিকল্পনামন্ত্রী আ.হ.ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, দেশে সাক্ষরতার হার ৬৭ শতাংশ। গত বছর (২০০৭ সাল) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে ২০১৬ সালের তথ্যানুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ০৩ শতাংশ। যদি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যাটি সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয় তাহলে এটা খুব আনন্দের বিষয় এবং এতে সরকারের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলে একটু অবাকই হতে হয় যে, এই আধুনিক যুগেও প্রায় ২৮% মানুষ নিরক্ষর। স্বপ্নে ভরা একটি উন্নয়নশীল দেশের বুকে ২৮% নর-নারী নিরক্ষর এটা ভাবাই যায় না। নিরক্ষর লোক এক ধরনের প্রতিবন্ধী। নিজের নামটা লিখতে না পারার মতো এতো লজ্জা এবং গ্লানি আর কী হতে পারে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ ও হাই স্কুল জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা মনে করি গোটা শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের ঘোষণা প্রদান করে শিক্ষাক্ষেত্রে সকল বৈষম্য দূর করে আমাদের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতা প্রদানসহ তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করে সরকারের রুপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

সারাদেশে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ১শ’টি মামলা তদন্তাধীন

কাজিরবাজার ডেস্ক :
সারাদেশে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ক্যাডারের বিরুদ্ধে ১ হাজার ১শ’ মামলা তদন্তাধীন। খুন, সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্রলুট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, সহিংস সন্ত্রাসের অভিযোগ মাথায় নিয়ে ৫০ হাজার আসামি প্রকাশ্যে ও গোপনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিস্তারিত

“উন্নয়নের মাঝে বেঁচে আছেন এম. সাইফুর রহমান”

ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক

মৃত্যুর একদিন আগেও তিনি বলেছিলেন “আমি সিলেটের মাটি দেখে মরতে চাই”। শীর্ষক সংবাদটি দেখে মনে হয়েছিল এম. সাইফুর রহমান যে কতটা সিলেট প্রেমিক ছিলেন। জীবনের শেষ জুম্মার নামাজ বন্দর বাজার মসজিদে আদায় করে সাইফুর রহমান বলেছিলেন, “সিলেট আসলে আমি লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারি আর মৌলভীবাজার গেলে আমাকে লাঠি নিয়ে হাঠতে হয়”। তিনি বলেছিলেন, “যত দিন বেঁচে থাকব সিলেটকে নিয়েই বাচতে চাই-সিলেটই আমার শেষ ঠিকানা”।
আজ ৫ সেপ্টেম্বর সিলেট তথা বাংলাদেশের জন্য একটি দুঃখ গাঁথা দিন। ২০০৯ সালের এ দিনেই মায়াময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যান শতাব্দির শ্রেষ্ঠ সিলেট প্রেমিক, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, উন্নয়নের বরপুত্র সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ”সিলেট বন্ধু” এম. সাইফুর রহমান। যাকে আজও খোঁজে বেড়ান বৃহত্তর সিলেটের মানুষ। সুনামগঞ্জের ভাটির জনপদ সেই তাহিরপুর ধর্মপাশা থেকে হবিগঞ্জের আজমীরিগঞ্জ পর্যন্ত বৃহত্তর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ খোঁজে বেড়ান তাদের প্রিয় নেতাকে।
এম. সাইফুর রহমানের জীবদ্দশায় দেখিয়ে গেছেন বড় মনের অনুপম দৃষ্টান্ত। যিনি নিজ হাতে মরহুম স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর নামে ”হুমায়ুন রশীদ চত্বর” নামকরণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
সিলেটের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আপোষহীন সাইফুর রহমান ছিলেন প্রচলিত রাজনীতিবিদদের চেয়ে ব্যতিক্রম চরিত্রের। সরকারী দলে থাকেন আর বিরোধী দলে থাকেন সব সময়ই তিনি ছিলেন হরতাল বিরোধী। সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর কাছ থেকে শুনা সাইফুর রহমান সম্পর্কে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। অর্থমন্ত্রী থাকাবস্থায় তিনি একদিন সিলেট সার্কিট হাউসে অবস্থান করছেন। খাবার মেনুতে ছিল ছোট মাছ আর সাতকরা। দুপুরে সুস্বাদু খাবার খেয়ে অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের বলেছিলেন উদ্বৃত তরকারী রেখে দিতে যেন রাতেও খেতে পারেন। পরে রাতে খাবার টেবিলে বসে সাতকরার তরকারী না পেয়ে তিনি জিজ্ঞেস করণে সাতকরার তরকারী কোথায় ? একজন বললেন, স্যার সাতকরা শেষ হয়ে গেছে। সে সময় অর্থমন্ত্রী অনেকটা রাগত সুরে বললেন, “সবতা খাইতে খাইতে আমার হাতখরাও খাইলিছ নি” ? চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে সিলেটে বিএনপির বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন “তোমাদের হলো শুরু-আমাদের হলো সারা”।
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের সফল অর্থ মন্ত্রী, সিলেট বিভাগের উন্নয়নের রূপকার, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করার গৌরব অর্জন করেন এম. সাই্ফুর রহমান। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে তলা বিহীন ঝুড়ি থেকে অর্থনীতির চাকাকে করেছিলেন সচল। এম. সাইফুর রহমানের পেশ করা সর্বশেষ বাজেটে বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে আনার যথা সাধ্য চেষ্টা চালান। তাই তো ঐ বাজেটে মাত্র ১২% বৈদেশিক সাহায্য আর ৮৮% দেশীয় বা আভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যাবহারের গুরুত্বারোপ করেন। আর এরই লক্ষ্যে বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে তার খোলামেলা কথা হত। তিনি স্বপ্ন দেখতেন- গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, বেকার সমস্যা দূরকরণ, দেশের আভ্যন্তরীণ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, মানব সম্পদকে দক্ষ করে গড়ে তোলা। তার প্রবর্তিত অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন নীতিমালার কারণেই আজ পোল্ট্রি, হ্যাচারী, দুগ্ধ খামার, গরু মোটা তাজা করণ, যুব প্রশিক্ষণ সহ অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ দেশের অর্থনীতির বেহাল দশা, সোনালী ব্যাংক কেলেংকারী, শেয়ার বাজার কেলেংকারী, পদ্মা সেতু, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে যখন বিতর্ক হচ্ছে তখন অনেকেই একজন সাইফুর রহমানের জন্য আফসোস করেন।
সিলেটের উন্নয়নে সাইফুর রহমান ছিলেন এক আপোষহীন পুরুষ।একনেক থেকে শুরু করে কেবিনেটেও ছিলেন স্টেইট কাট। “এই কাজ এ ভাবে হবে, হওয়া উচিত-অনুমোদন সমর্থন দিলে দেও না দিলে নাই, “সব ছেড়ে ছুড়ে মৌলভীবাজার গিয়া বরী বাইমু”। প্রায় প্রোগ্রামেই তিনি সিলেটবাসীর উদ্দেশ্যে বলতেন, “যা চাইবার চাইলাও, আর আমিও যা দিবার দিলাইয়ার”। একনেক থকে কেবিনেট আর সংসদ যেখানেই যে প্রকল্প পাশ হোক ঐ সংশ্লষ্ট সিলেটের একটি প্রজক্টে থাকতেই হবে। এটিই ছিল তাঁর সংগ্রাম। সিলেট শহর তথা সিলেট বিভাগের যে দিকে তাকাই সে দিকেই দেখি সাইফুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক উন্নয়নের বাস্তব নমুনা।
যে সিলেট নগরীর প্রবেশ পথে সুরমা পারে ছিলো ঝুপড়ি ঘর আর পুরনো সার্কিট হাউস। সেগুলো সাইফুর রহমানের বদৌলতে পাল্টে গেছে সেখানকার পুরো দৃশ্য। ‘পুলের তল’ বলে যে স্থান সিলেটের মানুষের কাছে সবচেয়ে নিন্দিত ছিলো সেই পুলের তলে এখন থাকে ভ্রমণ পিয়াসী মানুষের ভিড়। তার ইচ্ছায় সুরমা নদীর উভয় তীরে টেমস নদীর তীরের প্রকল্পে কীনব্রীজের নিচে দু’ধারে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দৃষ্টিনন্দন স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। ভিভিআইপি সার্কিট হাউস নির্মাণ, সংস্কারকৃত সারদা হল, কীনব্রীজ ও আলী আমজাদের ঘড়ি, পাঠাগারের পাশে সুরমা নদীর তীর এখন সিলেটবাসীর জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান।
শুধু এখানেই নয় সিলেট নগরীর হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার সংস্কার, মানিক পীর (রহ.) মাজার সংস্কার, ভিভিআইপি সার্কিট হাউস থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি, সোডিয়াম বাতি, সিলেট-তামাবিল সড়ক নির্মাণ, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এর উন্নয়ন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর এর উন্নয়ন, এসএমপি প্রতিষ্ঠা, নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপন, টিএন্ডটির নতুন এক্সচেঞ্জ স্থাপন, ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, মডেল স্কুল, বিভাগীয় সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা উল্লেখযোগ্য। শিক্ষার প্রসারে তার আন্তরিকতার কারণে সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ ছাত্রী নিবাস ও নতুন ভবন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হোস্টেল নির্মাণ, বিকেএসপির আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠা, শাহপরান ব্রীজ, তৃতীয় শাহজালাল সেতু, কাজিরবাজারে সুরমা সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন, দক্ষিণ সুরমা টার্মিনালের পরিকল্পনা গ্রহণ ছিলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
এছাড়া শত বছরের ঐতিহ্যের স্মারক প্রতিষ্ঠান সিলেট প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণ সহ সিলেটের অধিকাংশ উন্নয়ন এর মাঝে অম্লান হয়ে আছেন এম. সাইফুর রহমান।
মৌলভীবাজারের একটি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতধরে রাজনীতিতে অভিষেক হওয়ার পর শুধু বাংলা দেশের সফল অর্থ মন্ত্রীই নন এমনকি আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এম. সাইফুর রহমান। সিলেটবাসীর প্রিয় নেতা এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু সংবাদটি সেদিন যেন কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়েছে মাথায়। কারণ তিনি ছিলেন সিলেটবাসীর আত্মার আত্মীয়। সিলেটের মানুষ সাইফুর রহমানকে কতটা আপন করে নিয়েছিলেন তার প্রমাণ তাঁর নামাজে জানাযা। লক্ষাধিক মানুষ, শিশু কিশোর, আবাল বৃদ্ধ বনিতার চেখের পানি আর কান্নার আওয়াজে সিলেটের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল সেদিন। গোটা সিলেট শহর যেন যাদুর ছোয়ায় ছবির মত নিশ্চল থেমে গেল। জানাযার নামাজের পর সাইফুর রহমানকে চির বিদায় জানিয়ে হাজারো প্রশ্ন আর হিমালয় সমান বেদনা নিয়ে ধিরে ধিরে ঘরে ফিরে যান সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ¯¦র্ণাক্ষরে লিখা থাকবে, যাকে হারিয়ে হৃদয়ের মাঝে এক শূন্যতা আজও অনুভব করছে, তিনি সিলেটবাসীর আপনজন মরহুম এম. সাইফুর রহমান। আর কোন দিন ফিরে আসবেন না। কোর্ট পয়েন্ট কিংবা আলীয়া মাদ্রাসা মাঠ আর সংসদে দাঁড়িয়ে খাটি সিলেটি, শুদ্ধ বাংলা আর ইংরেজী ভাষা একত্রিত করে বক্তব্য দিবেন না। আমরা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু জাতির অপূরণীয় ক্ষতি।
মরহুম এম. সাইফুর রহমান উন্নয়নের যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় সিলেটকে এগিয়ে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী সিলেটের আরেক কৃতি সন্তান এ.এম.এ মুহিত। এম. সাইফুর রহমানের শুরু করা কাজিরবাজার ব্রীজ, সুনামগঞ্জ সুরমা নদীর উপর ব্রীজের কাজ সহ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী। অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করেছেন রিকাবী বাজার-মিরের ময়দান সড়ক সহ অসংখ্য উন্নয়নের মহাযজ্ঞ।
যানজট নিরসনের জন্য জিন্দাবাজার-চৌহাট্টা-আম্বরখানা সড়ক প্রশস্ত করা হোক। কোন ছুঁতোয় বন্ধ নয়, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রমাণ হোক উন্নয়নই সিলেটের রাজনৈতিক দর্শন। উন্নয়নই হোক সিলেটের রাজনীতির মূল শক্তি। এগিয়ে নেয়া হোক মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ও এম. সাইফুর রহমান এর অসমাপ্ত কাজ। তবেই তাঁদের প্রতি জানানো হবে সঠিক সম্মান। আজকের এই দিনে মরহুম এম সাইফুর রহমানের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। সকলের প্রিয় এই মানুষটি যেন পরপারে সুখে থাকেন।
মরহুম স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, মরহুম অর্থ মন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরীয়া. মরহুম পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু সিলেটবাসীকে অভিভাবক শূন্য করে দিয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের মাঝে স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবেন এম. সাইফুর রহমান। তাই তো বলতে হয় “যত দিন রবে সুরমা,মনু,খোয়াই নদী বহমান-তত দিন তুমি বেঁচে থাকবে এম. সাইফুর রহমান”।

যুক্তরাজ্যে বিয়ানীবাজারবাসীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হুইপ সেলিম উদ্দিন ॥ দল চাইলে দু’টি আসন থেকে নির্বাচনে প্রস্তুত

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির মাননীয় চেয়ারম্যানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদষ্টো আলহাজ্ব সেলিম উদ্দিন এমপি বলেন, ২০০৬ ও ২০০৮ সালে আমি সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে জাতীয় পার্টি থেকে বিস্তারিত

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে ————- কামরুল হাসান শাহীন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে বিয়ানীবাজার উপজেলার ১নং আলীনগর ইউনিয়ন বিএনপি। গত শনিবার সন্ধ্যায় রামধাবাজারস্থ তেমুখি দলীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনাসভা ও কেক কাটা অনুষ্ঠিত হয়। বিস্তারিত

মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্টের ১৪২৫ বাংলার কার্যকরী পরিষদ গঠন

মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্ট-১৪২৫ বাংলার কার্যকরী পরিষদ গঠন উপলক্ষে এক সাধারণ সভা গত ৩১ আগষ্ট শুক্রবার নগরীর মীরাবাজারস্থ শ্রীশ্রী বলরাম জিউর আখড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্টের যুগ্ম সমন্বয়কারী বিস্তারিত

খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া দেশে কোন নির্বাচন হবে না – ফয়সল চৌধুরী

সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপি নেতা ফয়সল আহমদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম গেঁথে আছে। ফ্যাসিবাদ সরকারের কোন ষড়যন্ত্রেই বাংলাদেশ থেকে জিয়াউর রহমানের নাম মুঁছে ফেলা বিস্তারিত

কানাইঘাট মুশাহিদ সেতুর বাইপাসকে শহীদ নজরুল চত্বর করার দাবী

কানাইঘাট থেকে সংবাদদাতা :
কানাইঘাট আল্লামা মুশাহিদ (র.) সেতুর বাইপাসকে সরকারী উদ্যোগে শহীদ নজরুল চত্বর করার দাবী জানিয়েছেন কানাইঘাট উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। গত বৃহস্পতিবার উপজেলা তৃণমূল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মুশাহিদ সেতু বিস্তারিত

অদম্য স্বত:স্ফূর্ত বীর

খালেদ উদ-দীন

একবার এক আড্ডায় কথা প্রসঙ্গে মহম্মদ আশরাফ আলীর (মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নিজে যুদ্ধও করেছেন, সাবেক সাংসদ) কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন বঙ্গবীর ওসমানী সাহেবকে ব্যতিক্রমী যুদ্ধনেতা বলা হয়ে থাকে? বা তাঁর যুদ্ধকৌশলে এমনকী ছিল যা আপনাদের চমকে দিয়েছিল? এই প্রশ্ন শুনে তাঁর চোখ চকচক করে ওঠে। এক অপার আহ­াদ এসে চেহারায় মূর্তিমান হয়। একটু চেয়ার টেনে সোজা হয়ে বসেন। তারপর জনাব আশরাফ আলী বলতে শুরু করেন এভাবে-‘একবার ভাবুন তো, একটা প্রশিক্ষিত বিশাল শক্তিধর সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার মতো কোনও শক্তি আমাদের ছিল? না ছিল তেমন কোনও অস্ত্র। নিয়মিত বাহিনীর অল্প কয়েকজন আর কিছু আবেগী তরুণ; যাদের কেবল মনোবল ছাড়া সঙ্গে আর কিছু ছিল না। একদম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া প্রথম দিন থেকেই আমাদের লড়াই শুরু করতে হয়েছে। সে অবস্থায় তীক্ষè বুদ্ধিস¤পূর্ণ ওসমানী সাহেব কৌশলী হলেন। তিনি যে কৌশলগুলো একে একে ব্যবহার করতে লাগলেন তার প্রত্যেকটিই ছিল চমকপ্রদ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল দক্ষ এবং সংখ্যায় অনেক বেশি। এই বিবেচনায় ওসমানীর রণকৌশল ছিল প্রথমে শত্র“কে নিজেদের ছাউনিতে আটকে রাখা এবং তাদের যোগাযোগের সব মাধ্যম হতে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। যেমন, ছোটো ছোটো কালভার্ডগুলো এবং কোথাও স¤পূর্ণ ব্রিজ ভেঙে কৃত্রিমভাবে খরপাতা দিয়ে ব্রিজের আদলে আটকে রাখা হত। পাকিস্তানি বাহিনী এগুলো একদম আঁচ করতে পারতো না। ফলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে অনেকে হতাহত হত। পুনরায় এসব রাস্তা দিয়ে চলাচলের কোনও সাহস করত না। আবার নদী পারাপারের সাঁকোও মধ্যখানে এভাবে ভেঙে রাখা এবং অনেক নদীতে যেখানে সাঁতরানো ছাড়া কোনও উপায় থাকতো না, সেখানে সাঁতরানো পথে পানির নিচে ধারালো বাঁশ বা গাছের খুঁটি পুঁতে রাখা। এসব গুপ্তকৌশলে পাকিস্তানী বাহিনী হকচকিয়ে যেত। প্রথম প্রথম এই কৌশলগুলো খুব কাজে লেগেছিল। মে মাস পর্যন্ত এইসব পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মে মাসের পর তাঁর মনে হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমসংখক সৈন্য নিয়ে শত্র“কে ছাউনিতে আটকে রাখা গেলেও ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এ বিষয়টি তিনি সরকারকে জানিয়ে যুদ্ধের কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। প্রাক্তন ইপিআর এর বাঙালি সদস্য, আনসার, মোজাহেদ, পুলিশ বাহিনী ও যুবকদের নিয়ে একটি গণবাহিনী বা গেরিলাবাহিনী গঠন করেন।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা মহম্মদ আশরাফ আলীর কাছে আরও জানতে চেয়েছিলাম যে, আপনার স্মৃতিতে থাকা অসংখ্য ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে খুশির একটা ঘটনা বলুন? স্মৃতির ফ্রিজারে তাঁর উঁকি দেয় অসংখ্য বীরত্বগাথা। বলেন, ‘যুদ্ধদিনে তখন উত্তেজনাপূর্ণ অপারেশন চলছিল একের পর এক। একবার এক সম্মুখযুদ্ধে আমাদের তিন থেকে চারশ বাঙালি অফিসার শহিদ হন। আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। তখন জেনারেল ওসমানীর যুদ্ধকৌশল অনুসারে যোদ্ধারা কমলপুর পাহাড়ে পাঞ্জাবীদের ক্যা¤েপ আক্রমণ করে নিজেদের আত্মগোপন করে রাখে। কৌশলটি না-বোঝে এক ক্যা¤েপর পাঞ্জাবীরা অন্য ক্যা¤েপর পাঞ্জাবীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে অনেক পাঞ্জাবী হতাহত হয়। আজও ঘটনাটি যখন মনে পড়ে ওসমানী সাহেবের এই কৌশলের কথা মনে করে হাসি।’
মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। অদম্য স্বত:স্ফূর্ত এই বীর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তাঁর জন্ম ১৯১৮ সালের ১ সেপটেম্বর। পৈতৃকবাড়ি সিলেট জেলার ওসমানীনগর থানার দয়ামিরে। বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান। মা জোবেদা খাতুন। তাঁর বাবা তৎকালীন আসামের সুনামগঞ্জ সদর মহকুমায় সাব-ডিভিশনাল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখানেই জন্ম হয় ওসমানীর। বাবার চাকুরি সূত্রে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। জন্মের কিছুদিন পর তাঁরা বদলি হয়ে চলে যান ভারতের গুয়াহাটিতে। আর সেখানেই শুরু হয় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। তিনি খুব মেধাবী ছিলেন। ১৯৩২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৩৯ সালে তিনি রয়্যাল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। দেরাদুনে ব্রিটিশ ভারতীয় মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন কমিশন প্রাপ্ত অফিসার হিসেবে। ১৯৪১ সালে ক্যাপটেন এবং ১৯৪২ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। তৎকালীন তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর ছিলেন। মাত্র তেইশ বছর বয়সেই তিনি এক ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হয়ে যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মির হয়ে বার্মা রণাঙ্গনে তাঁকে এক ব্যাটালিয়ন সেনার নেতৃত্ব দিতে হয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নেন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিহস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন। সেনাবাহিনীর এই সাহসী বীর ১৯৬৭ সালে অবসরগ্রহণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯৭০ সালে। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম বৃহত্তম নির্বাচনি এলাকা সিলেটের গোলাপগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ থেকে বিপুল ভোটে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর পশ্চিম পাকিস্তানিরা তখন ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। চলতে থাকে নানান আলোচনা। বাঙালিরা সহিষ্ণু হতে থাকে। মিছিল মিটিংয়ে উত্তপ্ত হতে থাকে বাংলার প্রান্তর। সামগ্রিক বিষয়াদির ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ করছিলেন ওসমানী। এক সাক্ষাৎকারে ওসমানী জানান, ‘যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তেলো’-বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণের অন্তরালে ছিল একটি সুচিন্তিত রণকৌশল। বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সৈনিকদের কাছে ছিল বিরাট তাৎপর্যময়। বস্তুত এই আহ্বানকে তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত বলেই মনে করেন।’ সাত মার্চের ভাষণের সময়ই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার কথা ঠিক করে ফেলেছিলেন মনে মনে। তিনি শুধু সুযোগ খুঁজছিলেন, এখানেও আমরা তাঁর সুক্ষ্ম রণকৌশল টের পাই। তিনি কাউকে মনের কথা জানতে দেননি। কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণে ঠিক বলেছিলেন, ‘তোমোদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’
২৫ মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পরে ওনমানী সে রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য। কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে ছুটে এসেছিলেন। কিছু আলাপ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তারপরই আবার দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনিই ছিলেন নেতৃত্বস্থানীয় সর্বশেষ ব্যক্তি, যিনি সবার পরে এ বাড়ি ছেড়েছিলেন। তারপর কোথায় কোথায় গা ঢাকা দিয়েছিলেন এই বীর সেনা, সে ব্যাপারে কেউ কিছু জানতো না। পরে জানা যায়, ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাতেই ছিলেন ওসমানী। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বছর চারেক আগে অবসর নেওয়া ওসমানীর সামরিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতা স¤পর্কে পাকিস্তান সরকার অবগত ছিল। তাই ওই রাতেই ওসমানীকে হত্যার চেষ্টায় হন্যে হয়ে খোঁজে। কিন্তু একেবারেই ভাগ্যগুণে অনেকটা অলৌকিভাবে প্রাণে বেঁচে যান ওসমানী। ঢাকা থেকে তিনি পালিয়েছিলেন ২৯ মার্চ। এর আগে চারদিন ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফাঁকা বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। খানসেনারা তাঁর খুঁজে ধানমন্ডির বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। ২৯ মার্চে নদীপথে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধরত ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যোগ দেন। শুরু হয় ওসমানীর জীবনের নতুন এক অধ্যায়।
১১ এপ্রিল ১৯৭১ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন। ওই ভাষণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের উল্লেখ করে এম এ জি ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। ওইদিন গঠিত মুজিবনগর সরকারে ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি।
ওসমানীর নির্দেশনা অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এক একজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মাঝে সমন্বয়সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি কাজ সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন ওসমানী। মুক্তিসংগ্রামে তাঁর হাতে কোনও নৌবাহিনী ছিল না। নিয়মিত নৌবাহিনীর কিছু অফিসার যারা তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন তাঁদেরকে নিয়ে এবং কিছু সংখ্যক গেরিলা যুবক নিয়ে একটি নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করেন। আগষ্টের মাঝামাঝিতে তাঁরা নদীপথে শত্রুর চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেন। নৌবাহিনী গঠনের ফলে একটা বড়ো ধরনের সংকটের অবসান হলেও দেশ স্বাধীন হবার আগে আরও একটা সংকট ওসমানী অনুভব করেন। সেটা হচ্ছে তাঁর হাতে কোনও বিমানবাহিনী ছিল না। শেষের দিকে দুটি হেলিকপ্টার, একটি অটার ও একটি ডাকোটা নিয়ে ছোট্ট একটি বিমানবাহী গঠন করেছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নিজ দক্ষতা ও কৌশল প্রয়োগ করে তিনি মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করেন। তিনি দিক নির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণা দান করে গেরিলাযোদ্ধাদের এবং প্রয়োজনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণও করতেন। পাকবাহিনী পরাজিত হতে বাধ্য হয়। বাংলার মানুষ স্বাধীনতার সূর্য দেখতে পায়। অতঃপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে।
জেনারেল ওসমানী অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল সফর করে জাতির বিজয়কে ত্বরান্বিত করায় জাতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে ‘বঙ্গবীর’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই আতœসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন। কেন অনুপস্থিত ছিলেন এমন বিতর্কের জবাব তিনি দিয়েছেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানী উপস্থিত না থাকার কারণ ছিল আর্মি প্রোটোকল। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্ব ফ্রন্টের প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজী। এরা দুজনই ছিলেন আঞ্চলিক প্রধান। অন্যদিকে ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান। তাই সেনাবাহিনীর প্রটোকল রক্ষার্থে কোনও সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধানের সঙ্গে তিনি কোনও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেন না।
স্বাধীন দেশে ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সের জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয় ওসমানীকে। তাঁর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন, সর্বস্তরের জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল তাঁকে চার তারকাযুক্ত জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে জেনারেল পদটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক বাহিনী থেকে অবসরগ্রহণ করেন। তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশগঠনের কাজে নিজেকে জড়িয়ে নেন।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনে ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হন। তাঁকে মন্ত্রিসভায় ‘ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জীবনের সব অভিজ্ঞতা নিয়ে নেমে পড়লেন দেশ গঠনের কাজে। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি সংসদসদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। আবার ১৯৭৫ সালেই যখন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন সে সময় ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ডের পরেই পদত্যাগ করেন।
১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওসমানী ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন।
বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী ওসমানী শৈশব থেকেই রুটিন বাঁধা জীবনযাপন করতেন। তিনি আদর্শ দেশপ্রেম ও মূল্যবোধের ছিলেন এক অনন্য প্রতীক। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে তাঁর ছিল অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। জীবনে কারও সঙ্গে তিনি কখনও আপোশ করেননি। অতি সাধারণ জীবন, সাধারণ জামা-কাপড়, সাধারণ সৈনিকের খাবার, সেনাবাহিনী থেকে বরাদ্দকৃত আসবাবই ব্যবহার করে এসেছেন বার বার। তিনি তাঁর দায়িত্ব থেকে বেশ কয়েকবার পদত্যাগও করেন। যখন কোনও বিষয়ে তিনি মতের মিল খুঁজে পাননি, পদত্যাগ করেছেন। এমনি কঠোর আর দৃঢ় মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর জীবনে তেমন কোনও ব্যর্থতা নেই। যখন যে কাজে হাত দিয়েছেন, সফলতা ছিনিয়ে এনেছেন। কখনও কোনও পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হননি। এক সফল জীবনের অধিকারী ছিলেন এই অদম্য স্বত:স্ফূর্ত বীর জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী।

কোরবানী ॥ ত্যাগের অনুপম উপমা

এহতেশামুল আলম জাকারিয়া

হযরত ইব্রাহীম (আ:) আল্লাহর প্রিয় পয়গাম্বর! ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় যিনি বারবার সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে উপাধি পেয়েছেন খলিলুল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু)। কোরবানী ইব্রাহীম (আ:) এর স্মৃতিময় একটি অগ্নি পরীক্ষার নাম। তার বয়স তখন শতবছর পেরিয়ে, তখনো তিনি নিঃসন্তান। জীবন সায়াহ্নে একটি সন্তান লাভের জন্য দোয়া করতে লাগলেন। অনেক বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে দিলেন অশ্র“সজল নয়নে।দোয়া করলেন আল্লাহর দরবারে “হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর”। সূরা -আস সাফফাত : ১০০। প্রবল আত্মবিশ্বাসী তিনি, অশ্যই প্রভু তাঁর দোয়া কবুল করবেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন। (এ দোয়ার জবাবে) “আমি তাঁকে একটি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।” সূরা-আস সাফফাত: ১০১। জন্ম নিলেন হযরত ইসমাঈল (আ:)। ইব্রাহীম (আ:) সেজদা অবনত চিত্তে শুকরিয়া আদায় করলেন মহান রবের দরবারে। শিশু ইসমাঈল বড় হতে লাগলেন। ইব্রাহীম (আ.) ভালোই কাটিয়ে দিচ্ছিলেন বৃদ্ধ বয়সের শেষ সময়গুলো। কিন্তু কে জানত পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন প্রিয় বস্তু কোরবানি করার। নবীদের স্বপ্ন অহীর মর্যাদাসম্পন্ন। তিনি চিন্তা করে দেখলেন তার কাছে নিজ সন্তানের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কিছু নেই।” সে পুত্র যখন তার সাথে কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছলো তখন একদিন ইবরাহীম তাঁকে বললেন, “হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে আমি জবেহ করছি, এখন তুমি বল তুমি কি মনে করো?” সে বললো, “হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে তা করে ফেলুন, আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ সবরকারীই পাবেন।” সূরা আস সাফফাত : ১০২। পিতা-পুত্র মিলে প্রভুর আদেশ বাস্তবায়নে চললেন নির্জন মিনা প্রান্তরে। পুত্র প্রস্তুত খোদার আদেশে জীবন দিতে। পিতা ইব্রাহীম ছুরি চালাতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি শেষ করলেন। এ এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা! “নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা।” সূরা সফফাত ঃ১০৬। খোদাপ্রেমের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। আল্লাহর সন্তুষ্টি নিমিত্তে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার এ এক বিরল উপমা। ত্যাগের কি মহিমান্বিত কাহিনী। আল্লাহর পথে জান-মাল, সহায়-সম্পদ, প্রিয়জন সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার কি অপূর্ব দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তার নবীদের দিয়ে এই শিক্ষা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন যাতে পৃথিবীর মানুষও দীনের জন্য প্রয়োজনে সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তত থাকে। সন্তান পিতামাতার কাছে কতটা প্রিয় তা কোন বাপ-মায়ের কাছেই ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ রাখে না। সে সন্তানকেই যে আল্লাহর পথে কুরবানী করতে পারে তার কাছে আল্লাহর রাহে অদেয় আর কিছুই থাকতে পারে না। কামনা-বাসনা, সহায়-সম্পদ এসব তো তুচ্ছ বিষয়। বস্তু বান্দাকে লোভ ও মোহের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই আল্লাহ এ বিধান জারি করেছেন। কারণ লোভ ও মোহ-ই পৃথিবীতে অশান্তিও বিপর্যয় সৃষ্টির অন্যতম কারণ। পুত্রের পরামর্শেই চোখ বেঁধে উপুড় করে পিতা ছুরি চালালেন প্রাণপ্রিয় সন্তানের ঘাড়ে। খুব শক্তভাবে চালালেন। জবাইও সম্পন্ন হলো। আল্লাহতায়ালা আরসে আজিম থেকে দেখছিলেন তার প্রিয় হাবিবের আল্লাহপ্রেমের নমুনা, মুহূর্তের মধ্যে ইসমাঈলের স্থালে একটি দুম্বা নিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন হযরত জিব্রাইল (আ:)কে। পিতা চোখ খুলে দেখেন কুরবানী হয়েছে পুত্র নয় বরং জান্নাতি দুম্বা। অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন তার কলিজার টুকরা ঈসমাঈল (আ:)। আল্লাহতায়ালা শুধু পরীক্ষা নিতে চাইছিলেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন হযরত ইব্রাহীম ও তাঁর আদরের সন্তান ইসমাঈল (আ:)। আল্লাহ রাজি হয়ে গেলেন তাদের উভয়ের প্রতি। আল্লাহর কাছ থেকে ইব্রাহীম (আ:) উপাধি পেয়ে গেলেন খলিলুল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু)। তাকে ঘোষণা দেয়া হল মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসেবে। “তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছো। আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি।” সূরা আস সফফাত : ১০৫
ইবরাহীম (আ:) এর এই আল্লাহ প্রেমের নজরানাকে দুনিয়াবাসীর জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করলেন আর সামর্থ্যবান মুসলিম মিল্লাতের জন্য পশু কোরবানিকে ওয়াজিব করে দেয়া হল। আর সে কুরবানীই মুসলমানরা করে চলছে অদ্যাবধি এবং তা চলতে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত। এটাই হলো কোরবানির প্রকৃত ইতিহাস। আরবি জিলহজ্ব মাসের দশ, এগার, বার তারিখে প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের আশায় যে পশু জবাই করা হয় তাকেই কুরবানী বলে। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানই এ কুরবানী করে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কুরবানীর মূল কথা কী? এর কি আছে কোনো ইতিহাস বা অত্যুজ্জ্বল কাহিনী, যা হৃদয় মাঝে কোনো শিহরন জাগায়। সাড়া জাগায় তনু-মনে। কিংবা আন্দোলিত করে। নাকি শুধু আনন্দ ফূর্তি, মার্কেটে কেনাকাটার ভিড়। ডিপ ফ্রিজ কেনার প্রতিযোগিতা বা কোরবানি উপলক্ষে বিভিন্ন সামগ্রীর মূল্য হ্রাসকেই বুঝায়? এসব প্রশ্নের জবাবে বলতে হয় অবশ্যই এ কোরবানির পেছনে রয়েছে একটি গৌরবের ইতিহাস। একটি হৃদয়স্পর্শী কাহিনী। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর আল্লাহ প্রেমের অপূর্ব নিদর্শন। আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে কিভাবে নিজের জান -মাল বিলিয়ে দিতে হয় তা হাতে কলমে শিখিয়ে দিলেন হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ:)। কিন্তু বর্তমান মুসলীম মিল্লাতের অবস্থাা খুবই শোচনীয়। তারা ভুলতে বসেছে কোরবানির মূল চেতনা। পোষা পশুকে কোরবানি দিলেও আমরা আমাদের ভেতরের পশুত্বটা জবাই করতে পারি নাই। দিন দিন আমাদের ভেতরের পশুত্বটা আরো মোটা-তাজা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ভেতরের হিংসা-বিদ্বেষের পরশ্রীকাতরতার জন্তুটা আরো হিংস্র হয়ে উঠছে। কে কত বড় পশু কুরবানী দিচ্ছি তার প্রদর্শনী আর ড্রিপ ফ্রিজ কিনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছি, পারলে যেন আস্ত গরুটাকে ফ্রিজে ভরে দেই! আমরা সরে পড়ছি কোরবানির মূল উদ্দেশ্য থেকে। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বদলে আমরা আজ প্রত্যাশা করি অন্য কিছু। অথচ এসব কিছুই প্রভুর দরবারে পৌঁছে না। পৌঁছে তো শুধু তাকওয়া, খোদাভীতি। আল্লাহর কাছে কুরবানীর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ্ব: আয়াত ৩৭)। কোরবানির মাধ্যমে সেই তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনে সক্ষম হলেই আমাদের কোরবানি সার্থক হবে। কোরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত: কোরবানির পশুর শরীরে যত পশম থাকে, প্রত্যেকটা পশমের পরিবর্তে এক একটি নেকি পাওয়া যায়। নেক আমল সমূহের মধ্যে কুরবানী একটি বিশেষ আমল। এ জন্যই রাসূল (স:) সব সময় কুরবানী করেছেন এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। ইবনে মাজাহর হাদীসে আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স:) বলেছেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। কাদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব : ১০ জিলহজ্বের ফজর থেকে ১২ জিলহজ্বের সন্ধ্যা পর্যন্ত অর্থাৎ কোরবানির দিনগুলোতে যার নিকট নিসাব পরিমাণ সম্পদ অর্থাৎ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য বা এর পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। মুসাফিরের ওপর কোরবানি করা ওয়াজেব নয়। যার ওপর কোরবানি ওয়াজেব নয়, সে কোরবানির নিয়তে পশু কোরবানি করলে সেই পশু কোরবানি করা তার ওপর ওয়াজিব হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা:) বিদায় হজ্বে তাঁর পরিবারের সবার পক্ষ থেকে একটি মাত্র কুরবানী করেন। (ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ৩১৩৫)। আবু দাউদের অপর বর্ণনা সূত্রে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ায় আমরা রাসূলুল্লাহ (স:) এর সাথে এক একটি উট সাতজনে এবং এক একটি গরুও সাতজনে অংশীদার হয়ে কুরবানী করেছি। (হাদীস নং ২৮০৯)।এ সুযোগ আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের অনুমোদিত। অতএব প্রয়োজন পড়লে এ সুযোাগ গ্রহণ করে কুরবানীতে অংশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কারো দ্বিধা থাকা উচিত নয়। তবে একটি কুরবানী নিজের ও পরিবারের সবার পক্ষ থেকে করা যথেষ্ট। কোন কোন জন্তু কোরবানি করা যায় : বকরী, খাসি, ভেড়া, ভেড়ী, দুম্বা, গাভী, ষাঁড়, বলদ, মহিষ, উট এই কয় প্রকার গৃহপালিত জন্তু দ্বারা কোরবানি করা যায়। বকরী, খাসি, ভেড়া, ভেড়ী, দুম্বা কমপক্ষে ১ বছর বয়সের হতে হবে। বয়স যদি কমও হয় কিন্তু এরূপ মোটা তাজা যে ১ বছর বয়সীদের মধ্যে ছেড়ে দিলেও তাদের থেকে ছোট মনে হয় না। তবে সেই পশু কোরবানি চলে। অন্তত ছয় মাস বয়স হতে হবে। বকরী কোন অবস্থাায় এক বছরের কম হতে পারবে না। কারবানির পশু ভাল এবং হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম। লেংড়া পশু কোরবানি জায়েয নয়। যে পশুর দাঁত নেই তার দ্বারা কোরবানি জায়েয নয়। যে পশুর কান জনম থেকেই নেই তা জায়েয না। তবে কান ছোট হলে সমস্যা নেই। যে পশুর শিং মূল থেকে ভেঙ্গে যায় কোরবানি জায়েয না। তবে শিং ওঠেইনি বা কিছু ভেঙ্গে গেছে এরূপ পশু জায়েয আছে। অতিশয় কৃশকায় ও দুর্বল পশু যার এতটুকু শক্তি নেই। যে জবেহের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না, তার দ্বারা কোরবানি জায়েয নয়। “খোঁড়া জন্তু যার খোঁড়ামী সুস্পষ্ট, অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রুগ্ন জন্তু যার রোগ সুস্পষ্ট এবং ক্ষীণকায় পশু যার হাঁড়ের মজ্জা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে তা কুরবানী করা যাবে না।” (তিরমিযী: হাদীস নং ১৪৩৭)
কোরবানির গোশত খাওয়া এবং বণ্টনের নিয়ম : অংশীদারীগণ গোশত অনুমান করে বণ্টন করবেন না। বাটখারা দিয়ে ওজন করে বণ্টন করতে হবে। অবশ্য কোন অংশীদার পাঁয়া ইত্যাদি বিশেষ কোন অংশ না নিয়ে তার ভাগে গোশত কিছু কম হলেও তা হবে। কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, পরিবারকে খাওয়ানো, আত্মীয়স্বজনকে দেয়া এবং গরীব মিসকিনকে দেয়া সবই জায়েজ। মোস্তহাব ও উত্তর তরিকা হলো তিন ভাগে করে একভাগ নিজেদের জন্য রাখা। এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেয়া এবং এক ভাগ গরিব মিসকিনকে দেয়া। কোরবানির গোশত বা বিশেষ কোন অংশ পরিশ্রমিক রূপে দেয়া জায়েজ নয়। কোরবানির চামড়া খয়রাত করা যায়, তবে বিক্রি করলে সে পয়সা নিজে ব্যবহার করা যায় না। খয়রাত করা জরুরী এবং ঠিক ঐ পয়সাটাই গরীবদের মধ্যে খয়রাত বা গরীব ছাত্রকল্যাণে দান করতে হবে। কোরবানির চামড়ার টাকা মসজিদ, মাদ্রাসার নির্মাণ কাজে পরিশ্রমিক বাবদ খরচ করা যাবে না। মিছকিনদের মধ্যে খয়রাতই করতে হবে। কোরবানির পরে যাতে পশুর রক্তে পরিবেশ দূষিত না হয় সেজন্য রক্ত, আবর্জনা মাটিতে গর্ত করে ঢেকে রাখতে হবে। আসুন আমরা কুরবানীর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লার সন্তুষ্টি বিধানে প্রয়োজনে নিজের জান-মালের কুরবানী দিতে যেন প্রস্তুত থাকি।এই হোক কুরবানীর প্রকৃত চেতনা।