বিভাগ: ভেতরের পাতা

ক্যাম্পাসে ঈদ আনন্দ

মাসুদ আল রাজী
মুক্ত মঞ্চ, বি-বিল্ডিং এর টং কিংবা লাইব্রেরী বিল্ডিং এর সামনে প্রাণোচ্ছল কোনো আড্ডা নেই । ইউ সি কিংবা শহিদ মিনারের সিঁড়িতে জটলাও চোখে পড়ে না। সন্ধার পর “এক কিলো”তে দল বেঁধে হাঁটাও দেখা যায় না। সুনশান নীরবতা সবখানে।
গত ৩১ মে থেকে ভার্সিটির হলগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকে এমনই থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিলো শাবিপ্রবি ক্যা¤পাসে। দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদের বন্ধে হল খোলা থাকলেও শাবিপ্রবির হলগুলো ছিলো বন্ধ। তাই ক্যা¤পাস ঈদের আগ পর্যন্ত জনশূন্য থাকলেও ঈদের দিন দেখা গেলো ভিন্ন এক চিত্র ।
ঈদ এবং ঈদের পরের দুদিন ক্যা¤পাসে ছিল অগণিত পর্যটকদের ভিড়। ছাত্র-ছাত্রীরা না থাকলেও ৩২০ একরের সৌন্দর্যে ঘেরা এই ক্যা¤পাসে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। ক্যা¤পাসের আই.সি.টি বিল্ডিং, শহিদ মিনারসহ এক কিলোতে শহর থেকে আগত মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। কেউ এসেছেন প্রিয় মানুষকে সাথে নিয়ে ঘুরতে, কেউ এসেছেন ক্যা¤পাসের জনপ্রিয় ফুচকা খেতে, কেউবা বন্ধুদের সাথে দলবেঁধে এসেছেন ফটো তুলতে।
ঈদে ক্যা¤পাসে পরিবারসহ ঘুরতে আসেন সিলেটে অবস্থানরত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাই আবার ঈদের ছুটিতে সিলেট এসে প্রিয় ক্যা¤পাসকে এক নজর দেখার জন্য আসেন। ক্যা¤পাস ঘুরতে এসে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাসান জাকারিয়া বলেন, “চাকরি করা হয় ঢাকায়, অনেকদিন ক্যা¤পাস দেখি না, তাই ফ্যামেলির সবাইকে নিয়ে চলে আসলাম ক্যা¤পাসটাকে দেখতে।” শহরের অনেক আকর্ষণীয় পর্যটন ¯পট বাদ দিয়ে শাবিপ্রবিতে কেন ?? এমন প্রশ্নের জবাবে অনেকই জানান যে, “শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিকতা বাদ দিয়ে এমন সবুজে ঘেরা কোলাহল বিহীন জায়গা আসলেই অনেক ভালো লাগে, তাই ঈদের দিনটাকে সুন্দরভাবে উৎযাপন করতে এখানে আসা ।”
রোজা ও ঈদের ছুটিতে প্রায় এক মাস ক্যা¤পাস বন্ধ থাকায় ক্যা¤পাসের ভ্রাম্যমান খাবার দোকানগুলোও ছিল বন্ধ। কিন্তু ঈদে পর্যটকদের আগমনে ক্যা¤পাসের টং এবং চটপটি-ফুচকার দোকানগুলোতে অনেক ভিড় দেখা যায়। ঈদের আমেজে দর্শনার্থীদের পেয়ে দোকানীরাও অনেকটাই উচ্ছ্বাসিত।
৩২০ একরের সবুজ শ্যামলিমায় ঢাকা ক্যা¤পাসে প্রতিনিয়ত পর্যটকরা ভিড় করুক, দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হোক স্বপ্নের “এক কিলো”- এটাই সবার প্রত্যাশা।

নগরীতে উদ্ধার হওয়া যুবতী এখনও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে

স্টাফ রিপোর্টার :
নগরীর রায়নগর থেকে উদ্ধার হওয়া ভিকটিম বুলবুলি (৩০) নামে যুবতী এখনও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রয়েছে। গত বছরের ৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭ টার দিকে স্থানীয় জনতা তাকে আটক করে সিলেট এসএমপি কোতোয়ালী থানা পুলিশকে খবর দেন। পরে বিস্তারিত

আল-কোরআন ও রমজানে মানবজাতির হেদায়ত

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
কুরআনের গবেষক : আহনাফ ইবনে কায়েস। আরব মরুর এক জানবাজ মুজাহিদ। শৌর্য আর সাহসে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। আরবি সাহিত্যেও তিনি ছিলেন এক উঁচু মাপের সমঝদার ব্যক্তি। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র চেহারা মোবারক দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। কিন্তু পেয়েছেন নবী (সা.)-এর হাতে গড়া বহু সাহাবীর একান্ত সান্নিধ্য। একদিন তার সামনে এক ব্যক্তি কুরআনের এই আয়াতটি পড়ালেন: “আমি তোমাদের কাছে এমন একটি কিতাব নাজিল করেছি, যাতে তোমাদের কথা আছে, অথচ তোমরা চিন্তা গবেষণা করো না।” (সূরা আম্বিয়া : ১০) এই আয়াতটি তাঁকে যেন নতুন দিগন্তের দিকে আহবান জানালো। তিনি বুঝতে চেষ্টা করলেন, ‘যাতে শুধু তোমাদের কথাই আছে’ এই কথার অর্থ কী? তিনি চিন্তা করছিলেন আর অভিভূত হচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল কেউ যেন নতুন কিছু শোনাল। তিনি কুরআন নিয়ে বসে গেলেন। একে একে বিভিন্ন দল, গ্র“পের বর্ণনা তিনি পেতে শুরু করলেন। যেমন একদলে পরিচয় পেলেন, “এরা রাতের বেলায় খুব কম ঘুমায়, শেষ রাতে তারা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ মাফের জন্য মাগফেরাত কামনা করে।” (সূরা যারিয়াত : ১৭-১৮) আবার একদলের পরিচয় পেলেন এভাবে, “তাদের পিঠ রাতের বেলায় বিছানা থেকে আলাদা থাকে, তারা নিজেদের প্রতিপালককে ডাকে ভয় ও প্রত্যাশা নিয়ে, তারা অকাতরে আমার দেয়া রিজিক থেকে খরচ করে।” (সূরা আস সাজদা : ১৬) কিছু দূর এগিয়ে যেতেই আবার পরিচয় পেলেন আরেক দলের। যাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে, “রাতগুলো তারা নিজেদের মালিকের সিজদা ও দাঁড়িয়ে থাকার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেয়।” (সূরা আল ফুরকান : ৬৪) “যারা ব্যয় করে সচ্ছল এবং অসচ্ছল অবস্থায়, যারা রাগ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল এবং কোমল, আল্লাহ তো কল্যাণকামীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান ১৩৪) এরপর এলো আরেক দলের পরিচয়, “এরা (দুনিয়ার প্রয়োজনের সময়) অন্যদেরকে নিজেদেরই ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়, যদিও তাদের নিজেদের রয়েছে প্রচুর অভাব ও ক্ষুধার তাড়না। যারা নিজেদেরকে কার্পণ্য থেকে দূরে রাখতে পারে, তারা বড়ই সফলকাম।” (সূরা হাশর : ৯) অধ্যয়ন চলছে আর চিন্তার গভীরে ডুবে যাচ্ছেন আহনাফ। এবার পেলেন আরেক দলের পরিচয়, “এরা বড় বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, যখন এরা রাগান্বিত হয়, তখন (প্রতিপক্ষকে) মাফ করে দেয়, এরা আল্লাহর হুকুম মেনে চলে, এরা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, এরা নিজেদের মধ্যকার কাজকর্মগুলোকে পরামর্শের ভিত্তিতে আঞ্জাম দেয়। আমি তাদের যা দান করেছি, তা থেকে তারা অকাতরে ব্যয় করে।” (সূরা আশ শুরা : ৩৭-৩৮) হযরত আহনাফ ছিলেন একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ। নিজের সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল স্বচ্ছ। আর কুরআনে পাওয়া মুমিনদের পরিচয়ের সাথে তিনি নিজেকে মেলাতে পারলেন না। বরং বলেই ফেললেন: হায় আল্লাহ! আমি তো এই কুরআনের কোথাও ‘আমাকে’ খুঁজে পেলাম না। আমার কথা কোথায়? আমার চরিত্র তো কোথাও নেই? অথচ এ কুরআনে তো তুমি সবার কথাই বলেছো। কিন্তু থামলেন না তিনি। বরং এগিয়ে চললেন নতুন উদ্যমে। এবার পেলেন আরও কতক মানুষের পরিচয়, যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই, তখন তারা গর্ব ও অহংকার করে বলে, আমরা কি একটি পাগল ও কবির জন্য আমাদের মাবুদদের পরিত্যাগ করবো?” (সূরা সাফফাত : ৩৫-৩৬) তিনি এগিয়ে চললেন, পেলেন আরেক দলের পরিচয়, “যখন এদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন এদের অন্তর অত্যন্ত নাখোশ হয়ে পড়ে, অথচ যখন এদের সামনে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্যদের কথা বলা হয়, তখন অন্তর খুশিতে ভরে যায়।” (সূরা যুমার : ৪৫) আরেক দলের পরিচয়ও এলো তাঁর সামনে, “তোমাদের কিসে জাহান্নামের এই আগুনে নিক্ষেপ করলো? তারা বলবে- আমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করতাম না, আমরা গরিব মিসকিনদের খাবার দিতাম না, কথা বানানো যাদের কাজ আমরা তাদের সাথে মিশে সে কাজে লেগে যেতাম। আমরা শেষ বিচারের দিনটিকে অস্বীকার করতাম, এভাবে একদিন মৃত্যু আমাদের সামনে এসে গেল। (সূরা মুদ্দাসসির : ৪২-৪৭)হযরত আহনাফ এভাবে কুরআনে আঁকা এক একে অনেক দলের লোকদের চেহারার সাথে নিজেকে মেলাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু মিলল না। শেষের গ্রুপের সাথেও মিলল না। শেষ গ্রুপের ব্যাপারে তো তিনি বলেই ফেললেন, আয় আল্লাহ! এ ধরনের লোকদের ওপর তো আমি খুবই অসন্তুষ্ট। আমি এদের ব্যাপারে তোমার আশ্রয় চাই। এ ধরনের লোকদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তিনি যেমন নিজের ঈমানের ব্যাপারে আস্থাশীল ছিলেন, তেমনি গুনাহের ব্যাপারেও ছিলেন তিনি সমান সজাগ। কুরআনের পাতায় তাই তিনি এমন একটি চেহারা খুঁজে ফিরছিলেন, যাকে তিনি একান্ত নিজের বলে মনে করতে পারেন। তিনি মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলার ক্ষমা ও দয়ার ব্যাপারেও ছিলেন গভীর বিশ্বাসী। তাই তিনি কুরআনের পাতায় খুঁজে ফিরছিলেন এমন এক চেহারার, যেখানে তিনি পাবেন ভালো-মন্দ মেশানো মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি গভীর মনোযোগের সাথে আবার গবেষণায় লেগে গেলেন।তিনি পেলেন এমন একদল মানুষের বর্ণনা, যাঁদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, “হ্যাঁ! এমন ধরনের কিছু লোকও আছে, যারা নিজেদের গুনাহ স্বীকার করে। এরা ভালো-মন্দ মিশিয়ে কাজ-কর্ম করে, কিছু ভালো কিছু মন্দ। আশা করা যায়, মহান আল্লাহ এদের ক্ষমা করে দেবেন। অবশ্যই আল্লাহতায়ালা বড়ই দয়ালু-ক্ষমাশীল।” (সূরা আত তওবা ১০২) হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস এ আয়াতের সাথে নিজের অবস্থাকে ভালোভাবে বুঝতে চাইলেন, মেলাতে চাইলেন তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের সাথে। যখন হুবহু মিল খুঁজে পেলেন, বললেন, হ্যাঁ! এতক্ষণ পর আমি আমাকে উদ্ধার করেছি। আমি আমার গুনাহের কথা অকপটে স্বীকার করি, আমি যা কিছু ভালো কাজ করি তাও আমি অস্বীকার করি না। এটা যে মহান আল্লাহর একান্ত মেহেরবানি তা-ও আমি জানি। আমি মহান আল্লাহর দয়া ও রহমত থেকে নিরাশ নই। কেননা এই কুরআনেরই আরেক স্থানে বলা হচ্ছে : “আল্লাহর দয়া ও রহমত থেকে তারাই নিরাশ হয়, যারা গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট।” (সূরা আল হিজর : ৫৬) হযরত আহনাফ কুরআনের মর্ম অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে বুঝার পর নীরবে বলে উঠলেন, হে মালিক- তুমি মহান, তোমার কুরআন মহান, সত্যিই তোমার এই কুরআনে দুনিয়ার জ্ঞানী-গুণী, পাপী-তাপী, ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন সবার কথাই আছে। তোমার কুরআন সত্যিই অনুপম, সুন্দর। পাক-ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন শায়েখ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) তার এক রচনায় হযরত আহনাফ ইবনে কায়েসের এ ঐতিহাসিক গল্পটি বর্ণনা করেছেন। আসুন, আমরাও প্রত্যেকে খুঁজে ফিরি কুরআনে বর্ণিত দল-উপদলের সাথে আমাদের চরিত্রের। বুঝে নিই আমাদের প্রত্যেককে স্ব স্ব চরিত্র, কুরআনের সাথে হুবহু মেলানোর তৌফিক দান করুন আমিন।
খুব সহজেই কুরআনের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার বলেছেন (আল-কামার ৫৪: ১৭, ২২, ৩২, ৪০) “আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি?” (অনুবাদ : মুহিউদ্দীন খান) কুরআনের এই আয়াতটি পড়ার পর আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যাদের মাতৃভাষা আরবি নয় তাদের জন্য কুরআন বুঝা কেমন করে সহজ হতে পারে? তার মানে আল্লাহর এই বাণীতে এমন কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে যা আমরা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি। ভারতের ভূ-পদার্থবিদ এবং বিশিষ্ট কুরআন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আজিজ আব্দুর রহীম দীর্ঘ ২০ বছর গবেষণা করে কুরআন শিক্ষার যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন তার মাধ্যমে যে কোনো সাধারণ মুসলিমের পক্ষে খুব সহজেই কুরআনের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব। ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘আন্ডারস্ট্যান্ড কুরআন একাডেমি’। কুরআনের মোট শব্দ সংখ্যা হলো প্রায় ৭৮,০০০। ড. আব্দুল আজিজ গবেষণা করে দেখেছেন, আমরা নিয়ত থেকে শুরু করে নামাজের মধ্যে যেসব দোয়া-দরুদ, সূরা ফাতিহাসহ কুরআনের শেষ পারার ছোট ছোট সূরা এবং কুরআনের সুপরিচিত আয়াত হামেশা তেলাওয়াত করি, তাতে যতগুলো শব্দ রয়েছে সেগুলো কুরআনে ৫৫,০০০ বার এসেছে, যা কুরআনের মোট শব্দ সংখ্যার ৭০ শতাংশ। কুরআনের মোট মৌলিক শব্দের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৮৫০। ড. আব্দুল আজিজের হিসাব মতে মাত্র ২৫০টি মৌলিক শব্দ শিখতে পারলেই কুরআনের ৭০ শতাংশ শব্দ জানা হয়ে যায়। সবচেয়ে আনন্দের কথা হলো, নামাজের প্রয়োজনীয় দোয়া ও সূরা পড়তে গিয়ে আমরা প্রায় ৫০টি বাক্য তেলাওয়াত করি, যার মধ্যে রয়েছে আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০টি শব্দ। কেবল এই বাক্যগুলো বোঝার চেষ্টা করলেই বাড়তি কোনো পরিশ্রম ছাড়া আরবি ভাষার কাঠামো সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। ড. আব্দুল আজিজ হিসাব কষে দেখিয়েছেন, মনোযোগ ও আন্তরিকতার সাথে তার পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাত্র ২০০ ঘণ্টার মধ্যে পুরো কুরআনের অর্থ আয়ত্তে আনা যায়। কেউ যদি সপ্তাহে কুরআন শিক্ষার জন্য মাত্র ৪ ঘণ্টা করে সময় বের করতে পারেন তাহলে এক বছরের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। কুরআন তেলাওয়াত করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি নাজিল হয় (মুসলিম শরিফ ১১৬৭)। রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের প্রতি আমি দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত এ দু’টি জিনিস আঁঁকড়ে ধরে রাখবে। এ দু’টি জিনিস হলো, আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং আমার সুন্নাহ। (আবু দাউদ ৪৫৩৩)আল কুরআন অনুধাবন করলে জাতি যেসব সুবিধা লাভ করতে পারে মুসলিম হিসেবে সমাজের অধিকাংশ মানুষ যদি আল কুরআন অনুধাবন করতো তবে তাদের মধ্যে এমন কতিপয় গুণাবলি অর্জিত হতো, যাতে তারা সৎ মানুষে পরিণত হতে পারতো। সুতরাং কুরআন অনুধাবন করা মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে সমাজ তত সুখী ও সমৃদ্ধ হবে। কুরআন অনুধাবনের মাধ্যমে সামাজিক যেসব উন্নয়ন সম্ভব তার কতিপয় দিক হলো : ১. মৌলিক সৎ গুণাবলি সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে;২. মৌলিক দোষ-ত্র“টি সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা কমে আসবে; ৩. মদ, জুয়া, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই ও ধর্ষণের মত ভয়াবহ অন্যায় সমাজ থেকে হ্রাস পাবে; ৪. সমাজে সৎ ও ভালো ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়বে, ফলে ভোক্তাগণ বিভিন্ন ধরনের ভেজাল, ওজনে কম দেয়া, মুনাফাখোরি, চোরাকারবারি, প্রতারণা ইত্যাদি থেকে অনেকাংশে মুক্তি পাবে;৫. সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দুর্নীতি ও ঘুষ থেকে মানুষ পরিত্রাণ পাবে। অফিস-আদালতে যে হয়রানি হচ্ছে সাধারণ মানুষ তা থেকে অনেকাংশে পরিত্রাণ পাবে;৬. অসৎ টেন্ডারবাজির কারণে মানুষ আজ সরকারি যেসব সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং জনগণ উপকৃত হবে; ৭. রাজনীতির নামে আমাদের দেশে যেসব অনাচার এবং জনগণের অর্থ লুণ্ঠনের মহোৎসব চলে আসছে তা হ্রাস পাবে, ফলে জনগণ লাভবান হবে;৮. সমাজ থেকে ভেজাল ও প্রতারণা কমলে মানুষের খাদ্যের মান উন্নত হবে, দেশের মানুষ সুস্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম হবে, গড় আয়ু বৃদ্ধি পাবে। ৯. দুর্নীতি কমলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো বেগবান হবে; ১০. মানুষের মধ্যে সামাজিক শান্তি ফিরে এলে তাদের হতাশা হ্রাস পাবে, ফলে তা মানুষকে আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে, সমাজ থেকে আত্মহত্যার পরিমাণ হ্রাস পাবে;১১. শুধু মুসলিমরাই নয়, যদি কোন অমুসলমানও কুরআনের পার্থিব শৃঙ্খলা সম্পর্কিত নির্দেশনা মেনে চলে তবে তারাও এর কল্যাণ ও শান্তি ভোগ করবে।
কুরআন অনুধাবনে আমাদের করণীয় : আমরা সমাজের একজন মুসলিম নাগরিক হিসেবে, যার যার অবস্থান থেকে বাংলা ভাষায় কুরআন অনুধাবনের ক্ষেত্রে কী করতে পারি সে বিষয়ে কতিপয় সুপারিশমালা পেশ করা হলো। ১. দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি ধারায় (সাধারণ, ইংরেজি মাধ্যম, কারিগরি ও মাদরাসা) প্রথম শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত কমপক্ষে ১০০ নম্বরের আল-কুরআন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং তাতে কুরআন পড়তে শেখা ও বুঝতে শেখার মত প্রয়োজনীয় বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করা;২.সরকারিভাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রত্যেক জুমার মসজিদে বড়দের জন্য কুরআন পড়া ও অনুধাবনের জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রোগ্রাম চালু করা; ৩. বাংলাদেশের হিফজ মাদরাসাসমূহে কুরআন মুখস্থের পাশাপাশি ন্যূনতম কুরআন বুঝার মত কতিপয় কুরআনিক শব্দার্থ ও মৌলিক প্রয়োজনীয় আয়াতগুলোর অর্থ শেখানোর ব্যবস্থা চালু করা; ৪. দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে এবতেদায়ি প্রথম শ্রেণি থেকে ন্যূনতম শরহে বেকায়া শ্রেণি পর্যন্ত ১০০ নম্বরের বাংলাভাষা চালু করা। ভালো বাংলা বুঝতে পারলে তা কুরআন অনুধাবনে সহায়তা করবে; ৫. কুরআন অনুধাবনের মাধ্যমে ইহ ও পারলৌকিক কল্যাণের বিভিন্ন দিক দেশের প্রচার মিডিয়ায় ইতিবাচকভাবে প্রচার করা; ৬. কুরআন পড়ি ও কুরআন বুঝি শ্লোগানে দেশকে মুখরিত করা; ৭. পরিবারের একজন সদস্যও যদি এমন থাকেন যিনি কুরআন পড়তে ও বাংলা অর্থ পড়ে বুঝতে পারেন তিনি প্রতিদিন অন্যদের নিয়ে আধা ঘণ্টার এমন একটি বৈঠক করা যেখানে ২/৩টি আয়াত পড়ে তার বাংলা অর্থ সকলকে বুঝিয়ে দেয়া যায়; ৮. সহজ ভাষায় সংক্ষিপ্ত আকারে তাফসির লেখা ও প্রকাশ করার চেষ্টা করা, মানুষের পকেটে বহনযোগ্য স্ব-স্ব তাফসির মুদ্রণ ও প্রচারের ব্যবস্থা করা; ৯. মসজিদের ইমাম সাহেবদের কুরআনকেন্দ্রিক ধারাবাহিক আলোচনার আয়োজন করা, জুম্মার খুতবার মাধ্যমে কুরআনের ব্যাখ্যা যথাযথভাবে তুলে ধরা; ১০. প্রত্যেকটি জুম্মার মসজিদে একটি করে তাক রাখা এবং তাতে কুরআনের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা সংবলিত পর্যাপ্ত তাফসির রাখার ব্যবস্থা করা; ১১. কুরআনের ব্যাপারে যারা আন্তরিক তাদেরকে কুরআনের যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদেরকে অন্যের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যাতে অন্যরা কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
আল কুরআন প্রজ্ঞাময় ও হিকমাহপূর্ণ : কুরআন হলো জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তরের উপলব্ধি যার জন্য রাসূল (সা.)কে পাঠানো হয়েছে এবং এর ব্যবহারিক দিকের দয়া, রাহমাহ ও সৌন্দর্য আমরা রাসূল (সা.) এর যুগ থেকে সোনালি যুগের ইতিহাসে দেখতে পাই। সুবহানাল্লাহ!! আল্লাহর এতো এতো দয়া (সূরা আর রাহমান ১-২) যে তিনি একে প্রজ্ঞাময় কুরআন (সূরা ইয়াসিন ২) করে দিয়ে আমাদের চিন্তার, গবেষণার (সূরা মুহাম্মাদ) এবং এর থেকে সর্বোচ্চ উপকারের বাণী নাজিল করেছেন।আর এ কুরআনের সর্বোচ্চ হিকমাহর উপকারিতা পাওয়ার জন্য আল্লাহ পথও দেখিয়ে দিয়েছেন চিন্তার লেভেলের বিভিন্ন মাধ্যমে। সেগুলো-১. তাজাক্কুর-চিন্তা-ভাবনা করা। ২. আকল খাটানো- সহজাত (ফিতরাত) সত্য-মিথ্যার পার্থক্য উপলব্ধি। ৩. ফিকর করা- চিন্তাকে আরো গভীরে নিয়ে যাওয়া। ৪. তাদাব্বুর করা- সর্বোচ্চ লেভেলের চিন্তা-গবেষণা করা যা প্রজ্ঞার কাছে নিয়ে যাবে। এভাবে সমস্ত কুরআন জুড়েই শত শত আয়াতের শেষেই পাবেন আল্লাহ বিভিন্ন চিন্তাসূচক শব্দের মাধ্যমে আমাদের চিন্তাধারাকে শাণিত করে উপলব্ধির জন্য আহবান জানাচ্ছেন। লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন তা’কিলুন, তাজাক্কারুন, তাফাক্কারুন শব্দগুলো প্রায় প্রত্যেক বড় বড় সূরাতেই আছে।“তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?” (সূরা মুহাম্মাদ : ৩৩) হযরত উমর (রা.)-এর সূরা বাকারাহ শেষ করতে ৩ বছর লাগার কারণ কী? চিন্তা, ফিকির, গভীরতর চিন্তা ও গবেষণা এবং প্রাজ্ঞতার উপলব্ধির মাধ্যমে আমল। তাঁরা কুরআন বুঝতে এসেছিলেন আল্লাহর (অসমাপ্ত)

চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে রোজার উপকারিতা

যুবায়ের আহমাদ

পৃথিবী জুড়ে ১৬০ কোটি মুসলমান রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে নিজেদের নিবেদন করেন। তাঁদের এ আত্মনিবেদনের পেছনে থাকে না কোনো ইহলৌকিক চাওয়া। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিই কেবল চেয়ে থাকেন মুমিনরা। আল্লাহ তাআলাও মুমিনদের এ ভালোবাসাকে কবুল করে নিয়ে জান্নাতি প্রতিদান দিয়ে তাঁদের জীবনকে কানায় কানায় পূর্ণ করে দেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, আল্লাহ তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)
রোজাদারদের সংবর্ধিত করতে জান্নাতে থাকবে একটি বিশেষ গেট। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতে রাইয়ান নামে একটি দরজা আছে। ওই দরজা দিয়ে কেবল রোজাদাররাই প্রবেশ করবে। ঘোষণা করা হবে, রোজাদাররা কোথায়? তখন তারা উঠে দাঁড়ালে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করতে বলা হবে। তারা প্রবেশ করার পর ওই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি) ইহলৌকিক কোনো প্রাপ্তির আশায় মুসলমানরা রোজা না রাখলেও বর্তমান পৃথিবীর গবেষকরা রোজা নিয়ে গবেষণা করে রোজার দৈহিক অনেক উপকার আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন।
রোজার ব্যাপারে ইসলাম কঠোর অবস্থানে। রোজা অস্বীকারকারী কাফির। রোজা পরিত্যাগকারী ফাসেক। কেউ যদি ইচ্ছাকৃত একটি রোজাও ছেড়ে দেয়, তাহলে তাকে এর জন্য কাফফারা দিতে হবে। কাজাও আদায় করতে হবে। কেন এত কঠোরতা? কারণ রোজায় রয়েছে মানুষের জন্য প্রভূত কল্যাণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা রাখো, তোমরা সুস্থ থাকবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস বলে, রোজায় সুস্থ থাকার অনেক উপাদান রয়েছে। ১৯৯৭ সালে ‘দেহের সজীব পুষ্টির ইতিবৃত্ত’ শিরোনামে পরিচালিত একটি গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, রোজা মানবদেহের খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমিয়ে নিয়ে আসে এবং ভালো (উপকারী) কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়। আর এর মাধ্যমে মানুষের হার্টকে কার্ডিওভাসকুলার রোগ থেকে রক্ষা করে। (দৈনিক আল আরাবিয়া : ৮ জুলাই ২০১৪)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর মতে, রোজা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রোগীদের জন্য বিশেষ রহমত। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল উপায় হলো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ। রোজা মানেই খাদ্য নিয়ন্ত্রণ। যারা ইনসুলিননির্ভর নয়, তাদের ক্ষেত্রে রোজা রাখা এক আদর্শ চিকিৎসাব্যবস্থা। আর যারা ইনসুলিন নেয় তাদের ওষুধের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে রোজা। রক্তের গ্লুকোজ ও চর্বি নিয়ন্ত্রণে রোজা মোক্ষম ভূমিকা পালন করে। রোজা ডায়াবেটিস রোগীকে সংযম, পরিমিতিবোধ ও সৃঙ্খলা শিক্ষা দেয়, যা ডায়াবেটিস চিকিৎসায় অপরিহার্য। আর রোজার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ হওয়ার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায় এবং উচ্চরক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
একসময় মানুষ ধারণা করত, পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীরা রোজা রাখতে পারবে না। তাদের ঘন ঘন খেতে হবে। অনেকক্ষণ পেট খালি রাখা যাবে না, এতে এসিডের মাত্রা বেড়ে যায়। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। বরং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, রোজায় নিয়ন্ত্রিত খাবারের ফলে এসিডের মাত্রা কমে যায়। সঠিকভাবে রোজা রাখলে এবং নিয়ম মতো সাহরি ও ইফতার গ্রহণ করলে আলসারের উপশম হয়। এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে আলসার একেবারেই সেরে যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান জাপানের ডা. ইয়োশিনোরি ওহশুমি। টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ইয়োশিনোরি ওহশুমির গবেষণার বিষয় ছিল, ‘গবপযধহরংসং ঁহফবৎষুরহম ধঁঃড়ঢ়যধমু’। কোষ কিভাবে নিজের আবর্জনা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে সুস্থ ও সজীব থাকে, সে রহস্যে আলো ফেলে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন তিনি। কোষের এ প্রক্রিয়ার নাম অটোফাজি (অঁঃড়ঢ়যধমু)। অটোফাজি হলো কোষঘটিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একটি পদ্ধতি, যা কোষের বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ ও এর দেহকে সংরক্ষণ করে এবং কোষ তার ভেতরে থাকা বর্জ্য ভেঙে সেটিকে আবার ব্যবহার উপযোগী উপাদানে পরিণত করে। অটোফাজি প্রক্রিয়ায় অসংগতি দেখা দিলে মানবদেহের কোষগুলো বাঁচে না। এই প্রক্রিয়ায় কোনো রকমের ঝামেলা হলে ক্যান্সার ও স্নায়ুবিক অনেক রোগে আক্রান্ত হয় মানবদেহ।
ডা. ওহশুমি তাঁর গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে অটোফাজি (অঁঃড়ঢ়যধমু)) প্রক্রিয়াকে সচল করে রোজা। মানুষ রোজা রাখলে তার দেহ মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে দেহে প্রয়োজনীয় পরিমাণ খাবার নেই। মস্তিষ্কের দেখানো পথে দেহ তখন রক্ষিত খাবারের সন্ধানে বের হয়ে দেহকোষ তার ভেতরে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন কণা খুঁজে বের করে। তারপর সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে কোষ তার সুস্থতায় কাজে লাগায়। আর অটোফাজি প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করতে হলে সে মানুষকে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা ঋধংঃরহম (রোজা) পালন করতে হবে। ডা. ওহশুমি বলেন, যদি এ রোজার ভেতরে সামান্য পরিমাণ খাবার গ্রহণ করলেও অটোফাজি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। (ঝধঁফর এধুবঃঃব : ঙপঃড়নবৎ ২৮, ২০১৬)
ডা. ওহশুমির গবেষণায় যে উপবাসযাপনের কথা বলা হয়েছে, তা একেবারেই ইসলাম নির্দেশিত রোজা। কারণ রোজায় ১২ ঘণ্টার মতো না খেয়ে থাকতে হয় আর এর ভেতরে সামান্য খাবার গ্রহণ করলেও রোজা ভেঙে যায়।

লা-মাযহাবীদের অপতৎপরতা বন্ধে উলামা পরিষদের মতবিনিময় সভা ॥ লা-মাযহাবীদের মূলোৎপাটন করা ঈমানের দাবী

ইসলামের মৌলিক আক্বিদাহগুলো মুসলমানদের অস্তিত্বের মূল সম্পদ। মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে বিভ্রান্তিমূলক ও অহেতুক চিন্তা-চেতনা প্রবেশ করলেই ইসলামের ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়। তথাকথিত আহলে হাদীস নামধারী লা-মাযহাবীরা সেই বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে বিস্তারিত

জেলা প্রশাসক বরাবরে আজ স্মারকলিপি প্রদান ॥ ভার্থখলায় যানজট নিরসনের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা

দক্ষিণ সুরমা নছিবা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রাস্তার সামন থেকে কীনব্রিজ পয়েন্ট হয়ে বাবনা পয়েন্ট পর্যন্ত যানজট নিরসনের লক্ষ্যে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২০ মে রবিবার রাতে দক্ষিণ সুরমা নছিবা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হল রুমে ২৬নং বিস্তারিত

বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি সিলেট সদর উপজেলা শাখা গঠিত

বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি সিলেট সদর উপজেলা শাখার ৩১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য গত ১৭ মে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় সিলেট মহানগরীর পাঠানটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক সভা বিস্তারিত

রমজানে মনীষীরা যেভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতেন

মাহফুয আহমদ

রমজান কোরআন নাজিলের মাস। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘রমজান মাস হলো সেই মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে।’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
সুতরাং কোরআনের সঙ্গে এই মাসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। স্বয়ং নবীজী (সা.)-এর নিয়মে পরিণত হয়েছিল যে পুরো বছর কোরআনের যে অংশগুলো নাজিল হতো; তিনি সবটুকু জিবরাইল (আ.)-কে পুনর্বার পড়ে শোনাতেন এবং জিবরাইল (আ.)ও তাঁকে পড়ে শোনাতেন। যে বছর নবীজী ইন্তেকাল করেন, সে বছর একে অন্যকে দুবার পড়ে শুনিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬২৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪৫০)
তাই এই মোবারক মাসে সলফে সালেহিন তথা পুণ্যবান লোকেরা রোজা রাখার মহান হুকুম পালনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য নফল ইবাদতের মধ্যে কোরআন তিলাওয়াতকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
রমজানের পুরো মাস পবিত্র কোরআনের জন্য ওয়াকফ করে দিতেন। তাঁদের কেউ কেউ সাধ্যানুযায়ী অধিকবার কোরআন খতমের প্রতি মনোনিবেশ করতেন আর কারো কারো মনোযোগ থাকত কোরআনের গভীরে গিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিগূঢ় তথ্য ও রহস্যগুলো উদ্ঘাটন করা, কোরআনের মণিমুক্তাগুলো সংগ্রহ করার প্রতি। তাঁদের জীবনের এসব দিক আমাদের সামনে এলে, আমরাও এমনটা করতে অনুপ্রাণিত হতে পারি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এরা এমন ছিল, যাদের আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেছিলেন। অতএব, তুমিও তাদের পথ অনুসরণ করো।’ (সূরা : আনআম, আয়াত : ৯০)
কারো মনে সংশয় জাগতে পারে যে এত কম সময়ে দ্রুত কোরআন খতমের কারণ ও বৈধতা কী? মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে রাজাব হাম্বলি (রহ.) বলেন, তিন দিনের কম সময়ে কোরআন খতম করতে হাদিসে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা সব সময় এমনটা করার বেলায় প্রযোজ্য। কিন্তু ফজিলতপূর্ণ সময় যেমন রমজান, বিশেষত রমজানের রাত্রি; যেখানে কদরের রাত অনুসন্ধান করা হয় অথবা ফজিলতপূর্ণ স্থান যেমন মক্কা, বিশেষত তাদের জন্য যারা বাইরে থেকে মক্কায় প্রবেশ করে। এসব ক্ষেত্রে অধিক হারে কোরআন তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব। ইমাম আহমাদ ও ইসহাক প্রমুখ ইমামের মন্তব্য ও অন্যান্য আলিমের কর্মপন্থা এর সমর্থন করে। (লাতায়িফুল মাআরিফ, ইবনে রাজাব, ১৭১)
রমজানে দুই রাতে কোরআন খতম : আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে কায়স আবু আমর আন নাখায়ি। ইমাম ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। ইবরাহিম নাখায়ি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আসওয়াদ রমজানের প্রতি দুই রাতে কোরআন খতম করতেন। তিনি মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নিদ্রা যেতেন। আর রমজান ছাড়া অন্য মাসে তিনি প্রতি ছয় রাতে কোরআন খতম করতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, জাহাবি, ৪/৫১)
মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন খতম : সাঈদ ইবনে জুবাইর ইবনে হিশাম একজন প্রথিতযশা আলিম। তাঁর সম্পর্কে হাসান ইবনে সালিহ বর্ণনা করেন, ইবনে হিশাম রমজান মাসে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে কোরআন খতম করতেন। অবশ্য তখনকার যুগে লোকেরা এশার নামাজ বিলম্ব করে আদায় করত। (প্রাগুক্ত, ৪/৩২৪)
এক দিন ও এক রাতে তিন খতম : আবুল হুসাইন ইবনে হুবাইশ একদা আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সাহল ইবনে আতার আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, প্রত্যহ তাঁর এক খতম হতো। আর রমজানে প্রতি এক দিন ও এক রাতে তিন খতম হতো। শেষ বয়সে কোরআনের নিগূঢ় রহস্য এবং সূক্ষ্ম জ্ঞান আবিষ্কার করার মানসে এক খতম শুরু করেছিলেন। ১০ বছর পর্যন্ত পড়েছেন। তবে খতম হওয়ার আগেই তিনি এ পৃথিবী ত্যাগ করেন। (আল মুনতাজাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম, ইবনুল জাওজি : ৬/১৬০)
তিন দিনে এক খতম : আবু আওয়ানা বর্ণনা করেন, আমি কাতাদা ইবনে দিআমা (রহ.)-কে রমজানে কোরআনে কারিমের দারস দিতে দেখেছি। সালাম ইবনে আবি মুতি (রহ.) বলেন, কাতাদা প্রতি সাত দিন অন্তর কোরআন খতম করতেন। রমজান এলে প্রতি তিন দিনে এক খতম করতেন। আর রমজানের শেষ দশকে তিনি কোরআন খতম করতেন প্রতি রাতে। (প্রাগুক্ত : ৫/২৭৬)
রমজানে ৯০ খতম : মুহাম্মাদ ইবনে জুহাইর ইবনে কুমাইর বলেন, আমার আব্বাজান রমজান মাসে কোরআন খতম হওয়ার সময় আমাদের সবাইকে একত্র করতেন। তিনি প্রতি রাত-দিনে তিন খতম, এভাবে পুরো মাসে ৯০ বার কোরআনে কারিম খতম করতেন। (আল মুনতাজাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম, ইবনুল জাওজি : ৫/৪)
সাত দিনে কোরআন খতম : ইবনে আবি শায়বা (রহ.) সূত্রে বর্ণিত, আবু মিজলাজ (রহ.) রমজানে মহল্লার মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি সাত দিনে কোরআনে কারিম খতম করতেন। (আস সিকাত, ইবনে হিব্বান : ৫/৫১৮)
রমজানে ৬০ খতম : ইয়াহইয়া ইবনে নাসর বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অনেক সময় রমজান মাসে কোরআনে কারিম ৬০ বার খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদি : ১৩/৩৫৭)
আবু বকর ইবনুল হাদ্দাদ (রহ.) বলেন, আমি এ কথা শুনে আশ্চর্য বোধ করলাম আবার মুগ্ধও হলাম যে ইমাম শাফিয়ি (রহ.) রমজানে নামাজের ভেতরের তিলাওয়াত ছাড়াও ৬০ বার কোরআন খতম করতেন। আমিও চেষ্টা করেছিলাম। তবে সর্বোচ্চ ৫৯ বার খতম করতে সক্ষম হয়েছি। আর রমজান ছাড়া অন্য মাসে ৩০ খতম করেছি।
প্রত্যহ এক খতম : ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল বুখারি (রহ.) রমজানে প্রত্যহ দিনের বেলায় এক খতম করতেন এবং তারাবির পর (তাহাজ্জুদ) সালাতে প্রতি তিন রাতে এক খতম তিলাওয়াত করতেন। (তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদি, ২/১২; তাবাকাতুস সুবকি, ২/২২৩; হাদয়ুস সারি মুকাদ্দামাতু ফাতহিল বারি; ইবনে হাজার, পৃষ্ঠা ৪৮২)
৩৩ খতম : খলিফা মামুন রমজানে ৩৩ বার কোরআনে কারিম তিলাওয়াত করে খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ : ১০/১৯০)
রমজানে প্রতি রাতে কোরআন খতম : উবাইদা ইবনে হুমাইদ মানসুর থেকে, তিনি মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন আলী ইবনে আবদুল্লাহ আল আজদি (রহ.) রমজানে প্রতি রাতে কোরআন খতম করতেন। (তারিখে বাগদাদ : ৫/১৬৪)
সারা দিনে এক আয়াত : অন্যদিকে এমনও বহু তথ্য পাওয়া যায় যে মনীষীরা কোরআনের অর্থ ও মর্ম নিয়ে চিন্তা ও গবেষণাকর্মে রমজান কাটিয়েছেন।
উদাহরণস্বরূপ বিগত শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.)-এর কথা উল্লেখ করা যায়। তাঁর সুযোগ্য ছাত্র আল্লামা ইউসুফ বানুরি (রহ.) বলেন, রমজানে কখনো কখনো এমন হতো যে হযরত কাশ্মীরি (রহ.) সকালে কোরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করতে শুরু করেছেন এবং বিকাল পর্যন্ত একই আয়াত পুনরাবৃত্তি করে চলেছেন। লক্ষ্য ছিল, ওই আয়াত নিয়ে গবেষণা এবং আয়াত থেকে শিক্ষা ও সূক্ষ্মতর তথ্য উদ্ঘাটন। তাঁর ওই সব গবেষণার একটি লিখিত রূপ হলো তাঁর লেখা ‘মুশকিলাতুল কোরআন’ গ্রন্থটি।

রমজান মাসের তারাবির নামাজ ও এর ফজিলত

মুফতি মুহাম্মাদ যুবাইর খান

মাহে রমজানের আমলগুলোর মধ্যে তারাবির নামাজ একটি বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল। গোটা মুসলিম জাহানে তারাবির নামাজ অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনার সঙ্গে আদায় হয়ে থাকে। তারাবি অতি বরকতময় সুন্নত নামাজ। তারাবি নামাজ পড়ার দ্বারা রমজান ও কোরআনের হক আদায় হয়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বিশেষ রহমত ও মাগফিরাত, সর্বোপরি আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।
তাই আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য উচিত একনিষ্ঠতার সঙ্গে এই ইবাদতে মশগুল থাকা। রমজানের দিনে রোজা রাখাকে ফরজ আর রাতের বেলা তারাবি নামাজকে করা হয়েছে সুন্নত। রাসূল (সা.) তারাবির ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রাতে কিয়াম করবে (তারাবি পড়বে) তার অতীতের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস নং-১৯০৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৮১৫)।
তারাবির গুরুত্ব এ থেকেও বোঝা যায় যে, সুন্নত ও নফল নামাজ সাধারণত জামাতে আদায় করা নিষেধ, অথচ তারাবি নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার বিধান এসেছে। তবে রাসূল (সা.) নিজে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জামাতের ব্যবস্থা করেননি, উম্মতের ওপর তা ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। এ থেকে বোঝা যায়, তারাবির মর্যাদা সাধারণ নফল নামাজ থেকে অনেক বেশি।
তারাবি আরবি শব্দ, যা তারবিহাতুন শব্দের বহুবচন। যার অর্থ হলো, আরাম, প্রশান্তি অর্জন ও বিরতি দেওয়া। রমজান মাসে এশার নামাজের পর বিতর নামাজের আগে অতিরিক্ত যে সুন্নত নামাজ আদায় করা হয় তাকে তারাবির নামাজ বলে। এই নামাজের নিয়ম হলো, প্রতি দুই রাকাতের পর সালাম ফেরানো। এভাবে মোট ১০ সালামে ২০ রাকাত আদায় করা।
তারাবির নামাজের বিধান : রমজান মাসে এশার নামাজের পর তারাবি নামাজ আদায় করা নারী-পুরুষ সবার জন্যই সুন্নতে মোয়াক্কাদা। তবে পুরুষরা মসজিদে জামাতের সঙ্গে আর মহিলারা ঘরে এই নামাজ আদায় করবে। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মাত্র তিন দিন জামাতের সঙ্গে তারাবি আদায় করার পর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় জামাতের সঙ্গে তারাবি পড়া ছেড়ে দিলেন। অতঃপর রাসূল (সা.) বাকি জীবনে, আবুবকর (রা.) এর খিলাফতকালে এবং ওমর (রা.) এর খিলাফতের প্রথমদিকে এই অবস্থাই বিদ্যমান ছিল। (সহিহ বোখারি ১/২৬৯, সহিহ মুসলিম ১/২৫৯)।
আরেকটি বিষয় হলো, জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজ আদায় করা। এ ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজ আদায় করা সুন্নতে কেফায়া। কোনো মহল্লায় যদি কেউ-ই জামাতের সঙ্গে না পড়ে, তাহলে সবাই গোনাহগার হবে। আর যদি কিছু লোক মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করে আর কেউ কেউ ঘরে একা একা আদায় কওে, তাহলে এতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে এ কথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, যারা একা একা পড়ল তারা জামাতে পড়ার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হলো (কামুসুল ফিকহ- ২/৪৫০)। আর পবিত্র রমজান মাসে তারাবির নামাজে একবার কোরআন শরিফ খতম করা সুন্নত (রাদ্দুল মুহতার- ২/৪৯৭)। তবে অবশ্যই তারাবিতে কোরআনুল কারিম ধীরে ধীরে পড়তে হবে, আমাদের দেশে হাফেজ সাহেবরা যেভাবে ফোরজি স্পিডে অর্থাৎ দ্রুত গতিতে পড়েন, এটা অবশ্যই ত্যাগ করা উচিত। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, তোমরা কোরআনকে তারতিলের সঙ্গে ধীরে ধীরে সহিহ-শুদ্ধভাবে পড় (সুরা মুযযাম্মিল, আয়াত-৪)। আল্লাহ তা’আলা আমাদের রমজানের হক আদায় করার, প্রতিদিন সুন্দরভাবে গুরুত্বসহ জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজসহ সব ইবাদত-বন্দেগি সঠিকভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

রামাদান মাসের ফযীলত আদায়ে সঠিক নিয়ম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

রমজান মাসের ফযিলত, এ মাসের রহমত, বরকত ও মাগফিরাত এ সব কিছু হাছিল করার জন্যে নবী (সাঃ) কয়েকটি শর্তারোপ করেছেন যে শর্তগুলো যে মু’মিনের মধ্যে পাওয়া যাবে ঐ মু’মিনই শুধু রামাদান মাসের ফযিলত, রহমত, বরকত ও মাগফিরাত পাবেন। আর এ শর্তগুলো যে মু’মিনের মধ্যে পাওয়া যাবে না সে মু’মিন শুধু কষ্ট করেই রামাদান মাসের সিয়াম (রোজা) পালন করবেন, তারাবীহ্ আদায় করবেন কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে কোন প্রকার ফযিলত, রহমত, বরকত ও মাগফিরাত পাবেন না। তাহলে ঐ শর্তগুলো জানা আমাদের জন্যে খুবই জরুরী। নবী (সা:) আমাদেরকে যেভাবে সিয়াম (রোজা), কিয়ামুল লাইল (তারাবীহ্) ও লাইলাতুল ক্বাদর করতে বলেছেন, আমাদেরকে ঠিক সেভাবেই পালন করার চেষ্টা করতে হবে। নবী (সা:) যে কয়েকটি শর্তারোপ করেছেন এরকম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক শর্ত হলো ৩ টি আর তা হলো ১. ঈমান ২. এহতেছাব, ৩. হালাল উপার্জন। এ তিনটি বিষয় সম্পর্কে আমরা আলোচনা করবো ইন্শা’আল্লাহ।
রামাদান মাসের খাছায়েছ তথা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এ মাসে আল্লাহ তা’য়ালা ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত দান করেছেন যে গুলো অন্য কোন মাসে দেন নাই। সহীহ আল বোখারী ও সহীহ আল মুসলিমে বর্ণিত ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ হিসেবে হাদিসটিতে রাসূল (সাঃ) রামাদান মাসের ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের কথা উল্লেখ করেছেন আর সেগুলো হলো ১. ফরজ সিয়াম (রোজা), যা আল্লাহ তা’য়ালা কেবল রামাদান মাসেই উম্মতে মোহাম্মদীকে দান করেছেন, ২. ক্বিয়ামুল লাইল তথা তারাবীহ এর নামাজ। ক্বিয়ামুল লাইল অন্যান্য মাসেও আছে কিন্তু রামাদান মাসের ক্বিয়ামুল লাাইলের গুরুত্বটা আলাদা। এই মাসের ক্বিয়ামুল লাইলকে/ক্বিয়ামে রমাদানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ৩. লাইলাতুল ক্বদর, যেটি রামাদান মাস ব্যতীত বছরের আর কোন মাসে পাওয়া যায় না। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদিস রাসূল (সাঃ) এ ৩ (তিন) টি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতকে এক বাক্যে না বলে তিনটি বাক্যে আলাদা আলাদাভাবে বলেনঃ “যে ব্যক্তি রামাদান মাসে সিয়াম (রোজা) পালন করবেন ঈমান ও এহতেছাবের সাথে, আল্লাহ তা’য়ালা তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন”। “যে ব্যক্তি রামাদান মাসে ক্বিয়ামুল লাইল (তারাবীহ এর নামায) আদায় করবেন ঈমান ও এহতেছাবের সাথে, আল্লাহ তা’য়ালা তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন”। “যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরের রাত্রে ক্বিয়ামুল লাইল করবেন ঈমান ও এহতেছাবের সাথে, আল্লাহ তা’য়ালা তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন”। শুধু সিয়াম তথা রোজা পালন করলেই হবে না, শুধু ক্বিয়ামুল লাইল (তারাবীহ এর নামাজ) পড়লেই হবে না, শুধু লাইলাতুল ক্বাদরে ক্বিয়ামুল লাইল পড়লেই হবে না, মাগফিরাত পাবার জন্যে এ দুইটি জিনিস ঠিক থাকতে হবে। যদি এ দুটি জিনিস ঠিক না থাকে তাহলে তিনি রোজা পালন করবেন, তারাবীহ এর নামাজ আদায় করবেন, লাইলাতুল ক্বদরে ক্বিয়াম করবেন কিন্তু কোন ফায়দা পাবেন না, গুনাহ থেকে মাফও পাবেন না। তিনটি ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর বান্দাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দিবেন। তিনটির ক্ষেত্রেই রাসূল (সাঃ) শর্ত দিয়েছেন দুটি, একটি হলো ঈমান অপরটি হলো এহতেছাব। ঈমান ও এহতেছাবের সাথে সিয়াম (রোজা) পালন করতে হবে, ঈমান ও এহতেছাবের সাথে ক্বিয়াম (তারাবীহ) আদায় করতে হবে, ঈমান ও এহতেছাবের সাথে লাইলাতুল ক্বাদরে ক্বিয়াম আদায় করতে হবে। তাহলে আমাদেরকে বুঝতে হবে ঈমান ও এহতেছাব কী জিনিস?
ঈমানের ব্যাপারে আমরা কম বেশী জানি, কারণ আমরা সবাই ঈমানদার, মু’মিন। কিন্তু ঈমানের দাবি করা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে আমরা শির্ক করে থাকি, যে শির্ককে আমরা শির্ক বলে জানি না বা র্শিক বলে মনে করি না অথচ সেগুলো আমাদের জন্যে র্শিক। হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদিস যে হাদিসকে আমরা ‘হাদীসে জিবরাঈল’ বলে জানি, একবার হযরত জিবরাঈল (আঃ) মানুষের আকৃতি ধারণ করে নবী (সাঃ) এর কাছে আসলেন যেখানে অনেক সাহাবায়ে কেরাম বসা ছিলেন। এসে হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী (সাঃ) কে যে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন তন্মধ্যে একটি ছিল, ‘আমাকে বলেন ঈমান কাকে বলে? ঈমান কী জিনিস’? হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য হলো উম্মতকে, সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দেয়া। নবী (সাঃ) এর উত্তরে বললেন, ঈমান হলো বিশ্বাস স্থাপন করা, আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি, সকল ফেরেশতার প্রতি, সকল আসমানী কিতাবের প্রতি, সকল রাসূলের প্রতি, আখেরাতের প্রতি ও তাক্বদীরের প্রতি। উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেন, আপনি সঠিক কথা বলেছেন। তাহলে আমরা বুঝতে পারি ঈমান হলো এ ৬টা জিনিসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা যেভাবে কোরআন ও সুন্নাহ আমাদেরকে বিশ্বাস স্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছে। (অসমাপ্ত)