প্রধানমন্ত্রীকে সালাম করে ডাকসু ভিপি নূর বলেন, ‘আপনার মাঝে মাকে খুঁজি’

0
44
ডাকসুর নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কাজিরবাজার ডেস্ক :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নবনির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভবিষ্যত নেতৃত্ব উঠে আসবে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই। সেজন্য স্কুল ক্যাবিনেট চালু করা হয়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। ডাকসুর নির্বাচিত নেতাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সাহস থাকা ভালো; তবে আন্দোলনে সুযোগসন্ধানীরা থাকে, তাদের ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে ছাত্রনেতাদের।
শনিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারী বাসভবন গণভবনে ডাকসুর নেতাদের সঙ্গে এ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠান মঞ্চে ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নূর। অনুষ্ঠানে ডাকসুর জিএস ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, এজিএস সাদ্দাম হোসেনসহ ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিত আড়াই শতাধিক ছাত্রনেতা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ভবিষ্যত নেতৃত্ব খুঁজি। আর ছাত্রজীবন থেকেই তা গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য স্কুল পর্যায়ে ক্যাবিনেট চালু হয়েছে। আগে রাজনীতির পরিবেশ এত সুষ্ঠু ছিল না, এখন সুন্দর পরিবেশ ফিরে এসেছে। নেতৃত্ব তুলে আনতে এই ডাকসু নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোটা আন্দোলনের নামে ভিসির বাড়িতে আগুন দেয়া কোনভাবেই কাম্য নয়।
সেই সময় ছাত্রী হলগুলোতে অস্থিতিশীলতার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে রাতে ঘুমোতে পারিনি। যখন জেনেছি ছাত্রীরা নিরাপদে হলে ফিরে গেছে তখন বিশ্রামে গিয়েছি। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ডাকসু নির্বাচনের সময় সংঘাতের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এখন এটা স্বস্তির যে, গত ১০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে তার সঙ্গে দেখা করতে শনিবার উবারের একটি প্রাইভেট কারযোগে গণভবনে যান ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূর। তার সঙ্গে ছিলেন নবনির্বাচিত সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চড়ে গণভবনে যান ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী, এজিএস সাদ্দাম হোসেনসহ আড়াই শতাধিক নবনির্বাচিত ছাত্রনেতা।
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ভিপি নুরুল হক নূর গণভবনে প্রবেশ করেন। গণভবনের ফটকে নেমেই জিএস গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে কোলাকুলি করেন নূর। এরপর একে একে সবাই ভেতরে প্রবেশ করেন। ডাকসুর পাশাপাশি বিভিন্ন হল সংসদের নির্বাচিত নেতারাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গণভবনে উপস্থিত ছিলেন। হল ও কেন্দ্রীয় সংসদ মিলিয়ে আড়াই শতাধিক নির্বাচিত ছাত্রনেতার পদচারণায় গণভবন মুখরিত হয়ে ওঠে।
নবনির্বাচিত ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূর, জিএস গোলাম রাব্বানী ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হল ছাত্র সংসদের ভিপি-জিএসরা বক্তব্য রাখেন। বৈঠক সূত্র জানায়, সাক্ষাতকালে ভিপি নুরুল হক নূর ডাকসু কার্যকরে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘আমি আড়াই বছর বয়সে মাকে হারাই। ছোটবেলায় আমার একজন স্কুল শিক্ষিকার মাঝে মায়ের ছায়া দেখতে পেয়েছি। আর একজনের মধ্যে আমি মাতৃত্বকে খুঁজে পেয়েছি, প্রধানমন্ত্রীর মাঝে আমি মাতৃত্বের ছায়া খুঁজে পেয়েছি। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্ব ও উন্নয়নকাজ বিশ্বে তাকে প্রশংসনীয় অবস্থানে নিয়েছে উল্লেখ কর তিনি ডাকসু কার্যকরে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী তাকে পাশে বসান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পা ছুঁয়ে সালাম করেন নবনির্বাচিত ডাকসুর ভিপি নূর। প্রধানমন্ত্রীও তার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন।
সূত্র জানায়, ডাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডাকসু নির্বাচন যে শান্তিপূর্ণ হয়, এটা সবসময় বলেছি। ছাত্রছাত্রীরা যা চাইবে, তাই হবে। ভোট কে কত পেল, সেটা বড় নয়। যারা জয়লাভ করেছে সবার কিন্তু এই বিবেচনায় রাখতে হবে, কে ভোট দিল বা কে দিল না সেটা বিষয় নয়। নির্বাচনে ভিপি পদে হেরে যাওয়া ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ভোটে হারার পর শোভন আমার কাছে এসেছিল। আমি শোভনকে বলেছি, ভোটে হেরেছ এবার যাও তাকে (ভিপি নূর) অভিনন্দন জানাও। সে তাই করেছে। আমি এজন্য শোভনকে ধন্যবাদ জানাই। সে রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার দাদাও এমপি ছিলেন, বাবা উপজেলা চেয়ারম্যান। সে তার রাজনৈতিক উদারতা দেখিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল। গুলি-বোমা ছিল প্রতিদিনকার ব্যাপার। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, এক দলের নেতাকর্মীরা অন্য দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করত। আমরা ক্ষমতায় এসে চিন্তা করলাম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় অস্ত্রের ঝনঝনানি কেন থাকবে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো লেখাপড়ার জায়গা। ২০০৮ থেকে ২০১৮ এই দশ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অস্ত্রের ঝনঝনানি হয়নি, শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির আমল থেকে ডাকসু নির্বাচন বন্ধ ছিল। ডাকসু নির্বাচনটা চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের জন্য। আমরা সেটা করতে পেরেছি। খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগকে শিক্ষা দিতে ছাত্রদলই যথেষ্ট। আমি ছাত্রলীগের হাতে কলম তুলে দিয়ে জবাব দিয়েছিলাম, অসির চেয়ে মসির জোর বেশি। সেটাই আমাদের প্রমাণ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
কোটা আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কোটা আন্দোলন করছে, যুক্তি দিয়ে আন্দোলনে বিষয়টি বলতে হবে। কিন্তু ভিসির বাড়িতে আক্রমণ। তার বেডরুম পর্যন্ত ঢুকে যাওয়া, ভিসির গাড়িতে আগুন দেয়া কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের সময়ও ভিসির বাড়ির সামনে অবস্থান ধর্মঘট করা হতো। কিন্তু ভিসির বাড়িতে হামলার কথা কেউ চিন্তাও করতে পারত না। তিনি বলেন, সেই ১৯৪৮ থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন হয়েছে বার বার। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ সব বড় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু কখনও ভিসির বাসায় আক্রমণ, অগ্নি সংযোগ, লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটেনি। যা এবার কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় আমরা দেখেছি। এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য এ নির্বাচন (ডাকসু) কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা মনে রাখতে হবে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, আমি যখন দেশে ফিরে আসি- আমার একটা লক্ষ্যই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অস্ত্রের ঝনঝনানি দূর করব। আগে এমন কোন দিন ছিল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুলি-বোমার আওয়াজ আসত না। আমার অনেক বন্ধু দেখা যাচ্ছে তারা তখন শিক্ষক, তাদের জিজ্ঞাসা করতাম তোমরা এগুলার মধ্যে থাকো কিভাবে? তারা বলত-আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে, গুলি-বোমার আওয়াজ না শুনলে আমাদের ঘুম আসে না।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা থাকবে কেন? তখনই আমি লক্ষ্য স্থির করে রেখেছিলাম দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যেভাবেই হোক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করব। আজ সেটা সম্ভব হয়েছে। ২০০৮ সালে আমরা ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সেই গুলি-বোমার আওয়াজ আর পাওয়া যায় না। অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়েছে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতি তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, এখন সময় বদলেছে। সবাইকে মনে রাখতে হবে আন্দোলন হলে একটি শ্রেণী সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। ভিসির বাড়িতে হামলা চালানোর সিসিটিভির ফুটেজ আমি দেখেছি। চায়ের দোকানদার-বিড়ির দোকানদাররাও আন্দোলনে মিশে গেছে! আমাদের যেকোন আন্দোলনে আগে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোন মতলবি মহল সুযোগ নিতে না পারে। এ ব্যাপারে ছাত্রনেতাদের সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নূর। সাধারণ সম্পাদক পদে জয়লাভ করেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এছাড়া সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নির্বাচিত হন ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন।