জাতীয় পার্টিতে এরশাদের অবস্থান জিরো, সব ক্ষমতা রওশনের হাতে

0
23

কাজিরবাজার ডেস্ক :
দরজায় কড়া নাড়ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। হাতে সময় মাত্র আর ২৩ দিন। দল ও মাঠ গোছাতে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলো। তেমনি জোটবদ্ধ নির্বাচন হওয়ায় আসন বণ্টন নিয়ে অনেকটা দিশেহারা অবস্থা প্রার্থীদের। দলের নীতি-নির্ধারকদের অবস্থা আরও নাজুক হওয়ার কথা, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশের তৃতীয় প্রধান রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এরশাদ। এর মধ্যে হঠাৎ করেই দলের মহাসচিব পরিবর্তন। এরশাদ অসুস্থ থাকায় জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি।
প্রশ্ন হলো, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন বণ্টন, দলীয় প্রচার, ইশতেহার, কোন্দল নিরসন, নেতাদের পদত্যাগ, বিদ্রোহী প্রার্থী, সমঝোতার বাইরের আসনগুলোতে দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কে পালন করবেন এ নিয়ে দুশ্চিন্তা নেতাকর্মীদের মধ্যে। তবে অনেকেই বলছেন, নির্বাচন এলেই এরশাদ হাসপাতালে ভর্তি হবেন এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে এরশাদের হাতে দলের কোন কর্তৃত্ব নেই। অদৃশ্য ইশারায় চলছে জাপা। তবে পর্দার অন্তরালে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন রওশনপন্থীরা। এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। দলটির নেতারা মনে করেন, জোট নির্ভর রাজনীতির কারণে এরশাদকে নিয়ে রাজনীতির মাঠে বারবার খেলা চলে।
জাপার একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যা হচ্ছে তা আগে থেকেই টের পেয়েছিলেন তারা। মূলত আসন ভাগাভাগি নিয়েই পার্টিতে দুটি পক্ষ হয়। তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাপের মুখে এরশাদ মহাজোটের অন্যতম শরিক হিসেবে ৭০টি আসনের কম মানতে সম্মত ছিলেন না। তাছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকেও এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। দেয়া হয়েছিল লোভনীয় প্রস্তাব। এই দুই সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে এরশাদকে অসুস্থ বানিয়ে দলে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই এবারও সবকিছুর বাইরে রাখা হবে দল প্রধানকে। ফলাফল যাই হোক নির্বাচনের পর এরশাদের হাতেই সবকিছু ফিরিয়ে দেয়া হবে।
জাপায় রওশনপন্থীরা চায় আগামী নির্বাচনে তারা ফের বিরোধী দলে থাকবে। রওশন হবেন বিরোধী দলের নেতা। যা এরশাদের হাত দিয়ে অনেকটা অসম্ভব বা অনিশ্চিত মনে করেন রওশন এরশাদের অনুসারীরা। দলের নেতারা মনে করেন, একেবারে পরিকল্পিত নীলনকশার বাস্তবায়ন করতেই দলে নানা ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে। তবে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী থেকে শুরু করে নেতারা অনেকটাই হতাশ। তারা নির্বাচন নিয়ে কোন ধরনের দিক-নির্দেশনা পাচ্ছেন না। মহাসচিব পরিবর্তন করায় সঙ্কট আরও বেড়েছে। রওশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছেন না অনেক এমপি প্রার্থী। ভাই হিসেবে জিএম কাদেরও অনেকটা বেকায়দায়। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নেতাকর্মীরা বনানী ও কাকরাইল কার্যালয়ে ভিড় করছেন। কাকরাইল কার্যালয় খোলা হলেও সেখানে তৃণমূলের নেতাদের নির্দেশনা দেয়ার মতো একেবারেই কেউ নেই।
সব মিলিয়ে বর্তমানে জাপায় এরশাদের অবস্থান কার্যত জিরো। এক সময়ের প্রতাবশালী সামরিক শাসকের নিজ দলে ক্ষমতাহীন থাকার বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। সব নিয়ন্ত্রণ এখন দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের হাতে। তার সঙ্গে রয়েছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও নতুন মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাসহ সংসদ সদস্যদের অনেকেই। দলে এরশাদপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। নানা কারণে হাওলাদারকে পছন্দ করতেন না রওশন। তাই সময় সুযোগ বুঝে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার হাওলাদারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল রওশনের কারণে।
দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তনের পর থেকেই জাপায় কর্তৃত্বের মেরুকরণ শুরু হয়। যা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে প্রার্থীরা নির্দেশনা পেতে রওশন এরশাদের গুলশানের বাড়ি, আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বাড়িতে কিংবা বনানীতে পার্টি অফিসে বেশি আসছেন।
দলের নতুন মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা পার্টি অফিসে সময় দিতে শুরু করেছেন। তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, সকালে বারিধারায় দলীয় চেয়ারম্যানের বাসায় তিনি একবার করে যাচ্ছেন বটে, তবে দলের অধিকাংশ কাজ নিজের মতো করেই করতে শুরু করেছেন।
দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম জহির জানান, দলের কাজগুলো পরিচালনায় তারা এখন অনেকাংশেই রওশন এরশাদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মশিউর রহমান রাঙ্গার ওপর নির্ভরশীল। তার ভাষায়, চেয়ারম্যান হিসেবে থাকলেও এইচএম এরশাদ এখন কার্যত জিরো হয়ে পড়েছেন। এদিকে দলের সঙ্গে মহাজোটের নতুন টানাপোড়েন শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছেন এই সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টিকে সেইসব আসনই দেয়া হচ্ছে- যেগুলোতে বিএনপির শক্ত প্রার্থী রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দেন-দরবার শুরু হয়েছে। সরকারের সঙ্গে এসব যোগাযোগ রওশন এরশাদের সঙ্গে সরাসরি হচ্ছে বলেও জানান জহিরুল ইসলাম।
জাপার আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আবদুস সবুর আসুদ জানান, জাতীয় পার্টি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দল। এখানে কোন কাজ থেমে নেই।
জাপায় নাটকের ইতিহাস : জাতীয় পার্টিতে নাটকের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। দলের নেতাকর্মীরা এসব বিষয়ে অনেকটা অভ্যস্থ। অনেক ক্ষেত্রে এসব নাটকীয়তার ঘটনাকে তারা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়ার চেষ্টা করেন। তারা মনে করেন, ঝড় আসে আবার সময় মতো সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।
জাতীয় সংসদের ভোট এলেই নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটে জাপায়। ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদ। দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ৩ ডিসেম্বর। পাঁচ বছরের মাথায় ঠিক একই দিনে, ৩ ডিসেম্বর হঠাৎ করেই তিনি দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে বাদ দিলেন। যখন এরশাদ ও হাওলাদার দুজনের বিরুদ্ধেই মনোনয়ন নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন দলের নেতাদের অনেকে। তাছাড়া ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকারে জাপার কয়েকজন নেতাকে মন্ত্রী করা হয়েছিল। হঠাৎ করে তাদেরকেও মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন এরশাদ। এরপর এরশাদকে রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় নির্বাচন হয়। নির্বাচন শেষে হাসপাতাল থেকে মুক্ত হন তিনি। এরপর যোগ দেন প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে। পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দূতের দায়িত্বও পালন করেন এরশাদ।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন নিয়ে দর-কষাকষির মধ্যেই অসুস্থ হয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) যান জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। অসুস্থতা নিয়েও দলের ভেতরে-বাইরে নানা কথা আছে। বাসায় ফেরার দু’দিনের মধ্যে তাকে ফের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অথচ সর্বশেষ বাসায় ফেরার পর হাওলাদার বলেছিলেন, স্যার এখন নিয়মিত অফিস করবেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাত করবেন। নিয়মিত বসবেন বনানী কার্যালয়ে। জানা গেছে, দেড় মাসের ব্যবধানে তাকে চারবার এই হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। আগামী ১০ ডিসেম্বরের পর তাকে উন্নত চিকিৎসার নামে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা আছে। দলের অনেকের ধারণা এরশাদকে ব্যাঙ্কক রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
জানা গেছে, অন্তত ১০ নেতা জাপার শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। কয়েকজন নেতা পদত্যাগও করেছেন। এর মধ্যে ঢাকা-১ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন না পেয়ে সবচেয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান জাপার সাংসদ সালমা ইসলাম। এই আসনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে আলোচিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানকে।
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আবদুর রশীদ সরকার, এরশাদের উপদেষ্টা রিন্টু আনোয়ার ও রোকন উদ্দিন পদত্যাগ করেন। তারা ছাড়াও আরও কয়েকজন নেতা মনোনয়ন না পেয়ে পদত্যাগ করেছেন। নীলফামারী-৪ আসনের দলীয় সাংসদ শওকত চৌধুরী, দিনাজপুর-৫ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী মোঃ সোলায়মান সামি, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের শেখ শরিফুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের কাজী মামুনুর রশীদ ও জয়পুরহাট-২ আসনে আবুল কাশেমসহ আরও কয়েকজন গণমাধ্যমে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন।
জাপার শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মসিউর রহমান এই মুহূর্তে হাওলাদারের চেয়ে শক্তিশালী। কারণ, তিনি সরকারে আছেন, সরকারী মহলের সঙ্গে যোগাযোগও ভাল। রওশনের বিশ^স্ত। আবার দলেও তার ভাল অবস্থান আছে।
এর আগে জাপায় টানাপোড়েনের মধ্যে ২০১৩ সালের এপ্রিলে রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব করেন এরশাদ। তিন বছরের মাথায় ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি তাকে বাদ দিয়ে আবার হাওলাদারকে মহাসচিব পদে ফিরিয়ে আনেন এরশাদ। তিনি হাওলাদারকে সব সময় সন্তানতুল্য বলতেন। হঠাৎ? পদ থেকে অব্যাহতির বিষয়ে রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, চেয়ারম্যানের চিঠি পেয়েছি এবং আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছি। তিনি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনিই অব্যাহতি দিয়েছেন। তার দেয়া দায়িত্ব আমি সততার সঙ্গে পালন করেছি। আমার অব্যাহতিতে যদি দল উপকৃত হয়, আমি খুশি হব।