আসন বণ্টন নিয়ে জোট-মহাজোটে জট ॥ সব জোটেই ছোট দলগুলোর সাথে আসন ভাগাভাগিতে ব্যস্ত

0
25

কাজিরবাজার ডেস্ক :
আসন বণ্টন নিয়ে জট বেঁধেছে মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। জোট-মহাজোটে চলছে শেষ মুহূর্তের দর কষাকষি। বড় দলগুলো চাচ্ছে কত কম আসন ছাড় দিয়ে ছোট দলগুলোকে সঙ্গে নেয়া যায়। আর ছোট দলগুলো চাচ্ছে সর্বোচ্চ সুযোগ। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়াকে কেন্দ্র করে ঘরে-বাইরে ত্রিমুখী সঙ্কটে পড়েছে শাসক দল আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি। শরিক আর নিজ দলের নেতাদের খুশি করার পাশাপাশি দলের ভেতরের কোন্দল দমন করে তিন শ’ আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা করাই বড় এই দল দুটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ রয়েছে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে। নির্বাচনী আদর্শিক জোট ১৪ দলে আসন বণ্টন নিয়ে তেমন কোন চাপ নেই আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডে। তবে প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি এবং নতুন জোটে আসা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় যুক্তফ্রন্টের চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটিকে। তবে আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের শরিকদের ৬০ থেকে ৬৫ আসন ছেড়ে দিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে আসন বণ্টন নিয়ে চরম বেকায়দায় রয়েছে বিএনপি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য শরিক দল এবং ২০ দলীয় জোটের বিপুল চাহিদা নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছে দলটির নীতিনির্ধারকদের। একদিকে একেকটি আসনের বিপরীতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রায় ১৫ জন করে। অন্যদিকে শরিক দলগুলোর দেড় শতাধিক আসনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে চরম বেকায়দায় পড়তে হয়েছে দলটিকে। কেউ কাউকে ন্যূনতম ছাড় দিতে নারাজ। দলটির আশঙ্কা, শরিকদের বিপুল পরিমাণ আসনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে দলের চেইন অব কমান্ডই ভেঙ্গে পড়তে পারে। বিপুলসংখ্যক আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বিএনপি। সবকিছু সামাল দিয়ে একক প্রার্থী ঘোষণা বিএনপির সামনে পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিএনপিও শরিকদের ৬০ থেকে ৬৫ আসন ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে।
শরিকদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে আওয়ামী লীগ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুব একটা সুখে নেই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। জোট-মহাজোটে চলছে শেষ মুহূর্তের দর কষাকষি। আসন বণ্টন নিয়ে ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা এখনও হয়নি। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এবং বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় যুক্তফ্রন্টের চাহিদা মেটাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটিকে। অন্যদিকে শক্তিশালী প্রার্থী না থাকলেও নিবন্ধন বজায় রাখার স্বার্থে ১৪ দলের কিছু শরিক দলের একটি করে হলেও আসন দাবি এবং কিছু ইসলামী দলের বেশ কয়েকটি আসনের দাবি নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে নেই দলটি।
জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের শরিক দলগুলোর চাহিদা বেড়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে সব মিলিয়ে ৬০ থেকে ৭০টি আসন ছাড় দেয়া হয়েছিল। এবার শুধুমাত্র জাতীয় পার্টিই ৬০-৭০ আসনে তাদের প্রার্থীর তালিকা দিয়েছে। যুক্তফ্রন্ট দিয়েছে অর্ধশতাধিক প্রার্থীর তালিকা। জোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি-জেপি, তরিকত ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপসহ বিভিন্ন জোটের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে তাদের চাহিদার কথা জানিয়েছে আওয়ামী লীগকে। সব মিলিয়ে দেড় শতাধিক আসন চাচ্ছে শরিকরা। জোটের শরিকদের চাহিদা মেটাতে গেলে আওয়ামী লীগকে নিজ দলের প্রার্থীদের নিবৃত্ত করতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করতে আসা ছোট ছোট জোটগুলো চাইছে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুযোগ আদায় করে ক্ষমতার অংশীদার হতে। শরিক আর নিজ দলের নেতাদের খুশি করার পাশাপাশি বড় দুই জোটের অধিক আসনের দাবি পূরণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলটির। জাতীয় পার্টি চাইছে গত নির্বাচনে যে কটি আসন ছাড় দেয়া হয়েছিল এবার এর চেয়ে বেশি আসন ছাড় দিতে হবে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা বেশকিছু আসনও দাবি করছে তারা। অন্যদিকে যেসব আসনে শরিক দলের প্রার্থী আছেন সেসব আসনেও দলের নেতারা মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। সবকিছু সামাল দিয়ে প্রার্থী ঘোষণাই দলটির সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পষ্টই করেই বলেছেন, শরিক দলগুলোর জন্য ৬৫ থেকে ৭০ আসনে ছাড় দেয়া হবে। কিন্তু সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় পার্টি ও জাতীয় যুক্তফ্রন্ট আওয়ামী লীগের কাছে দেড় শতাধিক আসন দাবি করেছে। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, যেসব আসনে আওয়ামী লীগের এমপি রয়েছে, সেগুলোতে কোন ছাড় দেয়া হবে না। তবে বেশি শক্তিশালী প্রার্থী পাওয়া গেলে সেক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিতে সম্মত হবে আওয়ামী লীগ। শরিকদের চাহিদা ও মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই এবার তাদের প্রার্থীদের ছাড় দেবে আওয়ামী লীগ।
তবে কে কত আসন দেয়া হবে তা নিয়ে দু’একদিনের মধ্যে শরিক দল, জাতীয় পার্টি ও জাতীয় যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসবেন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। শরিক দলগুলোর চাহিদা নিয়েই সেখানে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা। ইতোমধ্যে দলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছে আওয়ামী লীগ। সেখানে স্থান পাননি বিতর্কিত কিছু এমপি ও মন্ত্রিসভার সদস্য। যুক্ত হয়েছেন দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত এবং ক্লিন ইমেজের কিছু নতুন মুখ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব টিম, দলীয় জরিপ, কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার একাধিক জরিপের ভিত্তিতেই সারাদেশে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। আর সেই জরিপের ভিতিতেই জোটের শরিকদেরও আসন ছাড় দেবে আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েই এবার কোন ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না আওয়ামী লীগ। এ কারণে যেসব আসনে শরিক দলের শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে, বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে শুধুমাত্র সেসব আসবেই ছাড় দেবে দলটি। জোটের স্বার্থ বিবেচনা করতে গিয়ে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন কোন প্রার্থীকে কোনভাবেই ছাড় দেবে না আওয়ামী লীগ। তবে দলটির সংসদীয় বোর্ডের নেতারা বলছেন, আসন বণ্টন নিয়ে কোন অসুবিধা হবে না।
আসন বণ্টন নিয়ে সঙ্কটে বিএনপি : একদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও আরেক দিকে ২০ দলীয় ঐক্যজোট। এ দুই জোটের শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে নিয়ে বিএনপি এখন চরম সঙ্কটে। সঙ্কট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এ নিয়ে চলছে দফায় দফায় মিটিং-সিটিং। কিন্তু সমাধানের পথ খুঁজে পাচ্ছে না দলীয় হাইকমান্ড। তবে নিজ নিজ দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার শেষে জোটের বৈঠকে বিষয়টি সুরাহা করার চেষ্টা করা হবে।
সূত্র মতে, একদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও অন্যদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোট। কাউকেই অখুশি করতে চায় না বিএনপি। আবার এমন কিছু আসন রয়েছে যেখানে অন্য দলকে ছাড়ও দেয়া যায় না। তবে জোটের সব দল ধানের শীর্ষ মার্কায় নির্বাচন করায় বিএনপি হাইকমান্ড আসন বণ্টনে অনেকটাই ছাড় দিচ্ছে। তারপরও জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে দর কষাকষি করে যত বেশি সংখ্যক আসন বিএনপির জন্য রাখার চেষ্টা চলছে। প্রথমে ২৬০ আসনে নির্বাচন করার বিষয়ে অটল থাকলেও এখন আরও কিছু আসন ছাড় দেয়ার বিষয়ে নমনীয় অবস্থানে বিএনপি।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আরও ৩ রাজনৈতিক দল যোগ দেয়ায় এটি এখন কার্যত ২৩ দলীয় জোট। আর নির্বাচনকে সামনে রেখে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, আসম আব্দুর রবের জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য ও বিএনপিকে নিয়ে গঠিত হয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩ দলের পাশাপাশি শীর্ষ রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যেফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে এখন চলছে চরম জটিলতা। অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের শরিক দল। কেউ কাউকে আসন ছাড়তে চাচ্ছে না। এ নিয়ে চলছে ধারাবাহিক দেনদরবার। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার শেষে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠক করে আসন বণ্টন জটিলতা দূর করে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে চায় বিএনপি হাইকমান্ড।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় থাকা বিএনপি এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। এ নির্বাচনে বিজয় লাভ করে তারা দলীয় চেয়ারপার্সনের মুক্তি নিশ্চিত করতে চায়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দলে যে দুরাবস্থা চলছে তাও কাটিয়ে ওঠতে চায়। আর এ নির্বাচনে দলের ভাল ফলের জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের শরিকদের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এ জন্যই নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে জোটের সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতে চায় না। জোটের যেখানে ভাল প্রার্থী আছে সেখানেই ছাড় দিতে চায়। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা এ ব্যাপারে ছাড় দিতে নারাজ। মূলত এ কারণেই আসন বণ্টন নিয়ে সঙ্কটের মুখে পড়েছে বিএনপি।
ঢাকা-৩ আসনে অতীতেও নির্বাচন করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। এবারও তিনি এই আসন থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু একই আসনে নির্বাচন করতে চান গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য মোস্তফা মহসিন মন্টু। এই আসনের পাশাপাশি ঢাকা-২ আসনেও নির্বাচন করতে চান মোস্তফা মহসিন মন্টু। কিন্তু এ আসন থেকে আগেও নির্বাচন করেছেন এবারও করতে চান বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক ডাকসু ভিপি আমানউল্লাহ আমান। বর্তমানের ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ আসন ২টি আসন যখন ১টি আসন ছিল তখন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সেখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তাই ঢাকা-৩ ও ঢাকা-২ এ ২টি আসন থেকেই মন্টু এবার নির্বাচন করতে চান। এ নিয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আমানউল্লাহ আমান চরম ক্ষুব্ধ। আবার মন্টুও বিএনপিকে ছাড় দিতে নারাজ। এ পরিস্থিতিতে এ ২টি আসন বণ্টন নিয়ে চরম সঙ্কটে বিএনপি।