চলে গেলেন কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ

0
66

কাজিরবাজার ডেস্ক :
রাজধানীর বনানীর সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত নন্দিত কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। বারিধারার ৯ নম্বর রোডের পার্ক মসজিদে রবিবার বাদ জোহর জানাজা শেষে বেলা ২টা ৪০ মিনিটে দাফন করা হয় এ শিল্পীকে। শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে বারিধারায় নিজ বাসাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। এ সময় তার পাশে ছিলেন স্বামী মেজর (অব) আবুল বাশার রহমতুল্লাহ।
শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহর মেয়ে নাহিদ রহমতুল্লাহ লন্ডনে আর ছেলে সায়েফ রহমতুল্লাহ থাকেন কানাডায়। ছেলে-মেয়ের অপেক্ষায় না থেকে দাফনের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে শাহনাজ রহমতুল্লাহর স্বামী মেজর (অব) আবুল বাশার রহমতুল্লাহ বলেন, যে গেছে তাকে তো আর ফেরানো যাবে না। ছেলে কবে আসতে পারছে তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ টিকেট পাওয়ার বিষয় আছে। সে এলে দোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নেবে। আপনারা সবাই দোয়া করবেন। তবে একমাত্র মেয়ে লন্ডন থেকে আসছেন কি না সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি তিনি। ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘আমার দেশের মাটির গন্ধে’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে আমায় বল’, ‘সাগরের তীর থেকে’, ‘ খোলা জানালা’, ‘পারি না ভুলে যেতে’, ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’, ‘আমি তো আমার গল্প বলেছি’ এ রকম অসংখ্য গান দিয়ে শ্রোতার মন জয় করেছেন কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। নিজের গানের মতোই এক আকাশ হাহাকার ছড়িয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। হঠাৎ করেই কিংবদন্তি এই শিল্পীর প্রস্থানে স্তব্ধ পুরো সঙ্গীতাঙ্গন। বেদনায় কাতর শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় প্রতিটি মানুষ।
শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইং সূত্র এ তথ্য জানায়। শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। শোক জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা বলেন, আমাদের সঙ্গীতের জন্য এ এক বিরাট ক্ষতি। কিংবদন্তি মানে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা। আমাদের আকাশ থেকে আরও একটি তারা খসে গেল। আমি জানি না, আর কত সেরা শিল্পীকে আমাদের হারাতে হবে। আল্লাহ তার আত্মাকে শান্তিতে রাখুক।
গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, বিশ্বের প্রতিটি দেশের ব্র্যান্ড এ্যাম্বাসেডর থাকে। আপনি যদি খুঁজে দেখেন, তাহলে পাবেন। শাহনাজ রহমতুল্লাহ বাংলাদেশের তেমনই একজন। বাংলাদেশের নাম তিনি উজ্জ্বল করেছেন গানের মাধ্যমে। তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া খুব বেদনার।
কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী বলেন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ অভিমান বুকে নিয়ে চলে গেলেন! কেন করেছিলেন, তা আমি বলব না। এখন তা বলার সময়ও নয়। তবে ধীরে ধীরে তার মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের চলে যাওয়ার যে ক্ষতি, তা আর পূরণ হচ্ছে না। হবেও না।
কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, চলে যেতে হয়, এটাই স্বাভাবিক। তবে এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়াটা খুবই বেদনার। শাহনাজ রহমতুল্লাহ আমাদের মাথার ওপর ছাতার মতো ছিলেন। সেই ছাতাটা সরে গেল। মাথার ওপর থেকে ছাতাটা সরে গেলে কেমন লাগে সেটা যার যায় সেই বোঝে। এই কষ্টটা বোঝাতে পারব না।
কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা বলেন, তিনি এভাবে হুট করে চলে যাবেন সত্যিই ভাবিনি। এটা আমার জন্য বিশাল একটা ধাক্কা। এটা তো সত্যি, আমরা যারা গান শিখেছি এবং এখনও গান করার চেষ্টা করছি তারা এই মানুষটাকে সরাসরি ফলো করেছি। তিনি ছিলেন আমাদের মায়ের মতো। তিনি ছিলেন আমাদের গার্ডিয়ানের মতো। আজ সেই মানুষটা হুট করে চলে গেলেন। নিজেকে বড় একা আর অসহায় লাগছে। শিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ আর আমাদের মধ্যে নেই। তার দুই ভাই সঙ্গীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ আর নায়ক-গায়ক জাফর ইকবাল আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। শাহনাজ রহমতুল্লাহর মৃত্যুর মধ্যদিয়ে শেষ আলোটিও নিভে গেল। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী বলেন, একজন প্রকৃত শ্রেষ্ঠ কিংবদন্তি চলে গেলেন। কিছু বুঝতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে। শুনলাম এশার নামাজ পড়ে নামাজের পার্টিতেই তার মৃত্যু হলো! আল্লাহতায়ালা তাকে সম্মানের সঙ্গে নিয়ে গেলেন। যার গান শুনে, গান গেয়ে বড় হয়েছি, যার গানে সরলতা পেয়েছি তাকে হারিয়েছি একটু আগে! তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
কণ্ঠশিল্পী সামিনা চৌধুরী বলেন, আমি আর নিতে পারছি না। এটাও মেনে নিতে হবে! আমি আর ফাহমিদা আপা যখন একেবারে ছোট, তখন তার গান গাইতে গাইতে আমাদের বেড়ে ওঠা। সেই ছোটবেলায় যে আদর তিনি আমাদের করতেন, তা বড়বেলাতেও পেয়েছি! শুধু গায়িকা নন, তিনি আমার আদর্শ ছিলেন, অভিভাবক ছিলেন। তিনি সব সময় বলতেন, তুই গান গেয়ে যাবি। থামবি না। আমার সব গান তুই গাইবি।
গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, অনেক শিল্পীর কিছু গান ফ্লপ হয়। কিন্তু শাহনাজ রহমতুল্লাহর ক্যারিয়ারে এটা নেই। দেশের গান, সিনেমার গান, আধুনিক গান- সবখানেই শাহনাজ রহমতুল্লাহ ছিলেন সফল। তিনি একাধিক ভাষায় গাইতে পারতেন। তিনি ছিলেন বাঙালীর গর্ব। যতদিন আমরা বেঁচে থাকব, আমাদের পরের প্রজন্ম ও বাংলা ভাষাভাষীর অনুভূতি যতদিন থাকবে, ততদিন শাহনাজ রহমতুল্লাহ বেঁচে থাকবেন।
শিল্পী আলিফ আলাউদ্দিন বলেন, বাবা (আলাউদ্দিন আলী) ও শাহনাজ আন্টির যে কত সুন্দর কালজয়ী গান আছে, তা হয়ত গুণে বলা সম্ভব নয়। মা’র (সালমা সুলতানা) অমূল্য সম্পদ যা আমি সব সময় আমার কাছে রাখি তা হলো মা’র গানের খাতা। ১৯৭৫ থেকে যত গান মা অথবা বাবার সৃষ্টি তার প্রায় সব গানই মার খাতায় দিন তারিখসহ মা’র নিজ হাতে লেখা আছে। আমার অসম্ভব পছন্দের গান, মা’ও সব সময় গাইতেন। আজ সেই মানুষটি চলে গেলেন হুট করেই! খুব কষ্ট হচ্ছে।
শিল্পী ইমরান মাহমুদুল বলেন, ঝরে গেল আরেক তারা! এক নদী রক্ত পেরিয়ে, একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়, একতারা তুই দেশের কথা বলরে বল, আমায় যদি প্রশ্ন করে, যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের নন্দিত কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তার মতো কিংবদন্তিকে হারানো মানে মাথা থেকে ছায়া সরে যাওয়া। প্রার্থনা করি, তার আত্মা শান্তিতে থাকুক।
কিংবদন্তি শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র জন্ম ১৯৫২ সালের ২ জানুয়ারি। মাত্র ১১ বছর বয়সে রেডিও ও চলচ্চিত্রের গানে তার যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৩ সালে। তিনি ‘নতুন সুর’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। পাকিস্তানে থাকার সুবাদে করাচি টিভি-রেডিওসহ উর্দু ছবিতেও অনেক গান করেছেন এই শিল্পী। গান শিখেছেন গজল সম্র্রাট মেহেদী হাসানের কাছে। গানের জগতে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে রেডিও, টেলিভিশন আর চলচ্চিত্রের অসংখ্য গানের পাশাপাশি তার এ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে চারটি। প্রথমটি ছিল প্রণব ঘোষের সুরে ‘বারটি বছর পরে’, তারপর প্রকাশিত হয় আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘শুধু কি আমার ভুল’।
সঙ্গীতে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতুল্লাহর গাওয়া চারটি গান স্থান পায়। এরমধ্যে আনোয়ার পারভেজের সুর করা দুটি গান, খান আতাউর রহমান ও আবদুল লতিফের সুরে দুটি ভিন্ন গান রয়েছে। অসংখ্য গান দিয়ে বাংলাদেশের অগণিত শ্রোতার মন জয় করেছেন তিনি। উল্লেখ্য, শাহনাজ রহমতুল্লাহর বড় ভাই সুরকার আনোয়ার পারভেজ, আরেক ভাই নায়ক ও গায়ক জাফর ইকবাল।