অগ্নিঝরা মার্চ

0
34

কাজিরবাজার ডেস্ক :
দিনটি ছিল মঙ্গলবার। উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের ১৫ তম দিন। শেখ মুজিবের সঙ্গে মিটিংয়ের জন্য আগেরদিন (১৫ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা এসে পৌঁছেন। আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকালে ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাত করতে যান। সেদিন থেকে ইপিআর জওয়ানদের অস্ত্র সামরিক কর্তৃপক্ষ তুলে নেয়; যার কারণে প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে সেদিন বাঙালী ইপিআরদের হাতে অস্ত্রের বদলে বাঁশের দীর্ঘ লাঠি ছিল। ইয়াহিয়া খান পরিষদ স্থগিত করার ক্ষেত্রে তার পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করে আলোচনা শুরু করেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে ইয়াহিয়া বলেন, তিনি বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে চান। উত্তরে শেখ মুজিব তাকে বলেন, জনগণের যে মনোভাব এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মার্চ তিনি যে দাবি উত্থাপন করেছেন, তার চেয়ে কম কোন কিছু মেনে নেয়া সম্ভব নয় এবং জনগণও সেটা মানবে না। আলোচনাকালে ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের ছয় দফার মৌলিক দাবিগুলো নীতিগতভাবে মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর ও অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছেন এমন ভাব দেখান। দুই নেতার আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বের হয়ে অপেক্ষমাণ দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের জানান, আমি রাজনৈতিক এবং অন্যান্য সমস্যা সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আরও আলোচনা হবে। কাল সকালে আমরা আবার বসছি। এর চেয়ে বেশি কিছু আমার বলার নেই। প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে নিজ বাসভবনে ফিরে বঙ্গবন্ধু দলের শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা চলে। ভারত সরকার তার ভূখ-ের ওপর দিয়ে সমস্ত বিদেশী বিমানের পূর্ব পাকিস্তানে যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিদেশী বিমানে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য পরিবহন বন্ধ করার জন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ নয়াদিল্লীতে বলেন, জনসাধারণের গণতান্ত্রিক অধিকারে বিশ্বাসী বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ও সরকারের উচিত শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়া। তিনি এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ নেতৃত্বের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। ময়মনসিংহে এক জনসভায় ন্যাপ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আহ্বান জানান। চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সভা করেন। সভাশেষে মিছিল বের করা হয়। মিছিলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন নেতৃত্ব দেন। শাসনতন্ত্র প্রণয়নের আগে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টির সমন্বয়ে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন সংক্রান্ত পিপিপি চেয়ারম্যান ভুট্টোর প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা পৃথক পৃথক বিবৃতি দেন। করাচীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কাজী ফয়েজ মোহাম্মদ বলেন, গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল একটি। অতএব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, অন্যের কাছে নয়। আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে আহসান হাবীব তার সিতারা-ই-খেদমত খেতাব বর্জন করেন। অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। দেশব্যাপী আন্দোলন অব্যাহত থাকে। জয়দেবপুরে জনতার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ, ড. জোহা হল, মুন্নুজান হল, যশোর, রংপুর সেনানিবাস এলাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা পিলখানা, ফার্মগেট, রামপুরা, কচুক্ষেত এলাকায় সামরিক বাহিনী অসহযোগ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন চালায়।