হারাম সম্পদের পরিণতি ও তার প্রতিকার

0
24

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
মদ এবং নেশা জাতীয় দ্রব্য ছাড়াও এ আয়াতে আরো যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাহলো: মূর্তি তৈরি, মূর্তি বিক্রয় ও মূর্তি উপাসনালয়ের সেবালব্ধ আয়, ভাগ্য গণনা ও জোতিষির ব্যবসা। এ সম্পর্কে আলোচ্য নিবন্ধের যথাস্থানে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হবে।
পৃথিবীতে দু’ধরনের উপার্জন পরিলক্ষিত হয়। একটি হলো বৈধ পন্থায় উপার্জন। আর অপরটি হলো অবৈধ পন্থায় উপার্জন। মানবজীবনে এ অবৈধ পন্থায় উপার্জনকে কুরআন ও হাদীসে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। আর তোমরা নিজদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু।’’ রসূল (স.) বলেছেন ‘‘এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলিধুসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘‘হে প্রভু! বলে মুনাজাত করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। তার মুনাজাত কীভাবে কবুল হবে?’’ “পূর্ণাঙ্গ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত : সাদ (রা.) বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন আমার দুআ কবুল হয়। রসূল (স.) বললেন: হে সাদ! তোমার উপার্জনকে হালাল রাখ, তোমার দুআ কবুল হবে। মনে রেখ, কেউ যদি হারাম খাদ্যের একগ্রাসও মুখে নেয়, তাহলে চল্লিশ দিন যাবৎ তার দুআ কবুল হবে না।’’
অপর এক হাদীসে উল্লেখ আছে : ‘‘যে ব্যক্তি দশ দিরহাম দিয়ে কোন কাপড় কিনলো এবং তার মধ্যে এক দিরহাম অসৎ উপায়ে অর্জিত, সে যতদিন ঐ কাপড় পরিহিত থাকবে ততদিন তার নামায কবুল হবে না।’’ ইমাম ইবনুল ওয়ারদ বলেন, তুমি যদি জিহাদের ময়দানে যোদ্ধা অথবা প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত থাক, তাতেও কোন লাভ হবে না, যতক্ষণ তুমি যা খাচ্ছ তা হালাল না হারাম, তা বিবেচনায় না রাখ।’’
এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আবু বকর (রা.) এর একজন গোলাম ছিল। সে আবু বকরকে মুক্তিপণ হিসাবে কিছু অর্থ নেয়ার শর্তে মুক্তি চাইলে তিনি তাতে সম্মত হন। অতপর সে প্রতিদিন তার মুক্তিপনের কিছু অংশ নিয়ে আসতো। আবু বকর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে এটা উপার্জন করে এনেছ? সে যদি সন্তোষজনক জবাব দিত তবে তিনি তা গ্রহণ করতেন, নচেত করতেন না। একদিন সে রাতের বেলায় তাঁর জন্য কিছু খাবার নিয়ে এলো। সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। তাই তাকে ঐ খাদ্যের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেলেন এবং এক লোকমা খেয়ে নিলেন। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ খাবার তুমি কীভাবে সংগ্রহ করেছো? সে বললো, আমি জাহেলিয়াত যুগে লোকের ভাগ্য গণনা করতাম। আমি ভালো গণনা করতে পারতাম না। কেবল ধোঁকা দিতাম। এ খাদ্য সেই ভাগ্য গণনার উপার্জিত অর্থ দ্বারা সংগৃহীত। আবু বকর (রা.) বললেন ঃ কী সর্বনাশ! তুমি তো আমাকে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম করেছো। তারপর গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বমিতে খাদ্য বের হবে না। উপস্থিত লোকেরা তাকে বললো, পানি না খেলে খাওয়া জিনিস বের হবে না। তখন তিনি পানি চাইলেন। পানি খেয়ে খেয়ে সমস্ত ভুক্ত দ্রব্য পেট এক লোকমা খাওয়ার কারণেই কি এত সব? আবু বকর (রা.) বললেন: খাদ্য বের করার জন্য যদি আমাকে মৃত্যুবরণও করতে হতো, তবুও আমি বের করে ছাড়তাম। কেননা আমি রসূলুল্লাহ (স.) কে শুনেছি: ‘‘যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে ওঠে তার জন্য জাহান্নামের আগুনই উত্তম।’’ এখন মানবজীবনে সম্পদ উপার্জনের কতিপয় অবৈধ পন্থা সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
অবৈধ পন্থায় অর্থোপার্জনের বহুল প্রচলিত একটি প্রধান মাধ্যম হলো সুদের আদান প্রদান, যা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনীতির শিরা উপশিরায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সুদ অর্থনীতির সবচেয়ে পুরাতন ও জটিল একটি বিষয়। মিসর, রোম, গ্রীস ও ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশে প্রাচীনকালে সুদ সম্পর্কে আইন রচনার প্রয়োজন হয়। বেদ, তাওরাত ও ইঞ্জিলে সুদকে একটি সমস্যা হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টেটলের মতো প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এবং হিন্দু ও ইয়াহুদী সংস্কারকগণ সুদী কারবারের নিন্দা করেছেন। আর এটি ইসলামের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। সুদ অর্থনৈতিক শোষণ ও জুলুমের অন্যতম হাতিয়ার। এটি মানুষের মানসিকতাকে সংকীর্ণ করে দেয়, মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক গতিকে শ্লথ করে দেয়, অর্থবণ্টনে বৈষম্য সৃষ্টি করে। যদিও বিভিন্ন প্রাচ্যবিদ বিভিন্ন ধরণের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষিত সুদকে বৈধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সুদের আরবী প্রতিশব্দ হলো ‘রিবা’। যার আভিধানিক অর্থ কয়েকটি হতে পারে। যেমন: বৃদ্ধি “আয-যামাখশারী, আসাসুল বালাগাত, বৈরূত: মাতবাতুল আওলাদিল আওরিফান, এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন : যে সুদ তোমরা দিয়েছ এই উদ্দেশ্যে যে, মানুষের ধন বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না।”Ñ অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ বলেন : অতিরিক্ত “এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন : “ফলে তিনি কঠোর হস্তে পাকড়াও করলেন।” ইমাম আল-জাওহারী ও ফাররা (র.) আয়াতে বর্ণিত এর অর্থ করেছেন বা অতিরিক্ত বস্ত। যেমন যখন কেউ প্রাপ্যের চেয়ে বেশি পায় তখন বলে : “আমি অতিরিক্ত পেয়েছি।”
পরিভাষিক অর্থে- ঋণ গ্রহণ বাবদ ঋণের পরিমাণের হিসাবে যে অতিরিক্ত হিসাব নির্ণয় করা হয় তাকে সুদ বলে। আর এ অতিরিক্ত অর্থ ভোগকারীকে সুদখোর বলে।
‘‘সুদ বা রিবা হচ্ছে সেই বাড়তি অর্থ যার বিনিময়ে ঋণদাতা ঋণ পরিশোধের সময়টা আরো কিছু দিনের জন্য বাড়িয়ে দেয়।’’ ইবনুল আরাবী র. বলেন: ‘‘রিবা তথা সুদ হচ্ছে সে বাড়তি দাম, যা কোন মালের বিনিময় নয়।’’
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (র.) বলেন: ‘‘পারস্পরিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া মালের প্রবৃদ্ধিই সুদ বা রিবা।’’
আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালীন (র.) বলেন: ‘‘পণ্য বা অর্থের বিনিময়ে প্রদেয় অতিরিক্ত পন্য বা অর্থই রিবা বা সুদ।’’
সুদ যে কোন অবস্থাতেই হোক না কেন ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে হারাম। তাছাড়া সুদ সর্বযুগে এবং সবসময় ঘৃণিত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে, যা আমরা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও সভ্যতার দিকে দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট জানতে পারি। যেমন: ইয়াহুদী ধর্মে সুদকে হারাম করা হয়, “সিফরুল খুরুজের ২২ তম অধ্যায়ের ২৪ তম স্তবক; সিফরুল আহবারের ২৫ তম অধ্যায়ের ৩৫ তম স্তবক; সিফর তাছনীয়ার ২৩ তম অধ্যায়ের ১৯ তম স্তবক; সিফরুর আমছালের ২৮ তম অধ্যায়ের ৮ম স্তবক। ড. মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আবূ সাহেবাহ, হুলূল লি মুশকিলাতুর রিবা, আল-কাহেরা : মাকতাবাতুস সুন্নাহ, তা.বি., পৃ. ২৬৪” যা আল-কুরআনের বর্ণনা থেকে জানা যায়।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিও আল্লাহ্ একই বিধান দিয়েছিলেন যেমনটি দিয়েছিলেন ইয়াহুদীদের প্রতি। এ প্রসঙ্গে ইঞ্জিল শরীফে বলা হয়েছে: ‘‘যাহারা তোমাদের মঙ্গল করে, তোমরা যদি তাহাদেরই মঙ্গল করিতে থাক, তবে তাহাতে প্রশংসার কি আছে? খারাপ লোকেরাও তো তাহা করিয়া থাকে। যাহাদের নিকট হইতে তোমরা ফিরিয়া পাইবার আশা কর, যদি তাহাদেরই টাকা ধার দাও তবে তাহাতে প্রশংসার কি আছে? ফিরিয়া পাইবার আশা কর, যদি তাহাদেরই টাকা ধার দাও তবে তাহাতে প্রশংসার কি আছে? ফিরিয়া পাইবে বলিয়াই তো খারাপ লোকেরা খারাপ লোকদের ধার দিয়া থাকে। কিন্তু তোমরা তোমাদের শত্রুদের মহব্বত করিও এবং তাহাদের মঙ্গল করিও। কিছুই ফিরিয়া পাইবার আশা না রাখিয়া ধার দিও। তাহা হইলে তোমাদের জন্য মহাপুরুষ্কার আছে।’’
শুআইব (আ.) এর উম্মত আইকা “আল-কুরআনে শুআইব (আ.) এর সম্প্রদায়কে ‘আসহাবুল আইকা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। আব্দুল ওহহাব নাজ্জার, কাসাসুল কুরআন, পৃ. ১৮৬; ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফীত তারিখ, তা.বি. খ. ১, পৃ. ৮৮৮; ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ. ১, পৃ. ২২৬; মুহাম্মদ জামীল আহমাদ, আম্বিয়ায়ে কুরআন, খ. ২, পৃ. ৬২; সাবূনী, আন-নবুওয়াতুল আম্বিয়া, পৃ. ২৮২; ইব্ন ‘আসাকির, তাহযীব তারীখে দিমাশ্ক, খ. ৬, পৃ. ৩১৯” সম্প্রদায়ের জন্যও সুদ হারাম ছিল।
গ্রিক সভ্যতার মত রোমান সভ্যতায়ও সুদকে প্রকৃতি বিরোধী উপার্জন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জাহেলী যুগে ও আরব কুরাইশরা সুদকে সম্পদ অর্জনের অনিষ্টকর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করতো। দেখা যায় রসূল (স.) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে যখন কাবা সংস্কার করা হচ্ছিল তখন আবূ ওয়াহাব সকলকে এ কাজে সুদের অর্থ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছিল।
জাহিলী যুগে কাফির, ইয়াহুদী এবং মুশরিকরা সুদকে ব্যবসা মনে করতো, অথচ ব্যবসা ও সুদ এক জিনিস নয়, যা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ৭টি আয়াতের মাধ্যমে সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং সুদের সাথে সংশ্লিষ্টদের মন্দ পরিণতি, হাশরের ময়দানে তাদের লাঞ্জনা, ভ্রষ্টতা ও কঠোর শাস্তির বাণী শুনিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘যারা সুদ খায়, তারা সে ব্যক্তির ন্যায় দ-ায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলে, নিশ্চয় ব্যবসা তো সুদেরই অনুরূপ, অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন, আর সুদকে করেছেন হারাম। অতএব যার নিকট তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে উপদেশ এসেছে, অনন্তর সে বিরত রয়েছে তবে যা অতীত হয়েছে তা তারই এবং তার কৃতকর্ম আল্লাহর প্রতি নির্ভর। আর যারা পুনরায় সুদ গ্রহন করতে, তারা দোযখবাসী হবে। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে।’’
অন্য এক আয়াতে সুদ ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকার কথা উল্লেখ আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ভক্ষণ করো না, আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা সুফল প্রাপ্ত হও। আর ভয় কর ঐ আগুনের যা কাফিরদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে’’।
সুদ খাওয়া আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার নামান্তর। পবিত্র কুরআনে মোট ৭টি আয়াত, আর ৪০টিরও অধিক হাদীস এবং ইজমা দ্বারা সুদ হারাম প্রমাণিত। সুদের অবৈধতা এবং সুদের সাথে সংশ্লিষ্টদের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কিত হাদীস নিুে উল্লেখ করা হলো-
আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় হতে বিরত থাক। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, যে আল্লাহর রসূল! সাতটি বিষয় কী কী? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে র্শিক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধ হতে পরায়ন করা এবং সতী-সাধবী মুমিন স্ত্রীগণের প্রতি অপবাদ আরোপ করা’’।
রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কোন সমাজে সুদের প্রচলন হলে সেখানে মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, ব্যভিচারের প্রচলন হলে মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে এবং মাপে কম দেয়ার প্রথা চালু হলে আল্লাহ সেখানে বৃষ্টি বন্ধ করে দেবেন। এটা অবধারিত।’’
রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘সুদের ৭০টি গুনাহ। তন্মধ্যে সর্বনিু গুনাহটি হলো আপন মাকে বিয়ে করার গুনাহর সমান। আর সবচেয়ে জঘন্য সুদ হলো, সুদের পাওনা আদায় করতে গিয়ে কোন মুসলমানের সম্ভ্রম নষ্ট করা বা তার সম্পত্তি জবর দখল করা’’। রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কোন সুদখোর যদি এক দিরহাম পরিমাণও সুদ আদায় করে তবে তার গুনাহ ৩৬ বার ব্যভিচার করার সমান।’’
রসূল (স.) আরো বলেছেন: ‘‘আল্লাহ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের সাক্ষী, সুদের লেখক সকলেরই ওপরই অভিশাপ বর্ষণ করেছেন।’’
ইসলামে সুদ ও সুদী কারবার নিষিদ্ধ। যদি কেউ এ গর্হিত কাজ করে তবে তার অপরাধের মাত্রানুযায়ী মুসলিম শাসক সুদের অর্থ ফেরত নেয়া, আর্থিক জরিমানা, আটকাদেশ, বেত্রাঘাত, নির্বাসন, মৃত্যুদন্ড এমনকি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাও করতে পারেন। ইমাম আল-জাস্সাস (র.) বলেন: সুদের মাধ্যমে যেহেতু মানুষের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে কুক্ষিগত করা হয়, সেহেতু তার শাস্তি ছিনতাইকারীর শাস্তির মত হবে।
সম্পদ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণ করা বা কাউকে ঘুষ দেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ‘‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের অর্থ আত্মসাৎ করো না, শাসকদের কাছে অর্থ নিয়ে যেও না, যাতে তোমরা মানুষের অর্থের একাংশ অন্যায় পন্থায় ভোগ করতে পার, অথচ তোমরা জান।’’ তোমরা শাসকদের উৎকোচ দিয়ে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার ব্যবস্থা করো না অথচ তোমরা তো জান যে, এ রকম করা বৈধ নয়।
রসূল (স.) বলেছেন: আল্লাহ ঘুষদাতা ও ঘুষখোর উভয়কে অভিশম্পাত দিয়েছেন’’। রসূল (স.) আরো বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করলো, অতঃপর যার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, সে তাকে কোন হাদিয়া বা উপহার দিল, সে যদি এই হাদিয়া গ্রহণ করে, তবে তা হবে একটি বড় ধরণের সুদ খাওয়ার পর্যায়ভুক্ত’’। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: ‘‘তোমরা ভাই-এর প্রয়োজন পূরণ করে দিয়ে তার কাছ থেকে যদি উপহার গ্রহণ করো তবে তা হবে হারাম।’’
যে ব্যক্তি কোন কাজের জন্য বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত হয়, সে যদি তার দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত কোন কাজ করে দিয়ে যার জন্য কাজ করেছে তার কাছ থেকে কোন বিনিময় গ্রহণ করে, তবে সেটা সর্বসম্মতভাবে ঘুষ বিবেচিত হবে, তা উপহার, উপঢৌকন, হাদিয়া বা বখশিশ যে নামেই প্রদত্ত হোক না কেন। আর যদি দায়িত্বের অতিরিক্ত হয় এবং চাকুরীর সময়ের বাইরে করা হয় তবে সে জন্য পারিশ্রমিক নিলে তা ঘুষ হবে না।
জুয়াকে ইসলাম অবৈধ উপার্জন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু ভাগ্যগণনা শয়তানের কাজ। সুতরাং এসব থেকে দূরে থাক। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।
যে কোন ধরণের জুয়াই এ আয়াতের ঘোষণার মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা দাবা, তাস, পাশা, গুটি অথবা অন্য কোন জিনিসের দ্বারা খেলা হোক। এটা আসলে অবৈধ পন্থায় মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন করার আওতাভূক্ত। রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কেউ যদি এরূপ প্রস্তাব দেয় যে, এসো তোমার সাথে জুয়া খেলবো, তবে তার সদকা করা উচিত।’’
জুয়া সম্বন্ধে শুধু কথা বললেই যদি সাদকা বা কাফ্ফারা দিতে হয়, তবে কাজ করলে কী পরিণতি হতে পারে সে সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। তাস ও দাবা ইত্যাদি খেলা যদি আর্থিক হারজিত থেকে মুক্ত হয় এবং নিছক চিত্ত বিনোদনমূলক হয়, তবে তাও বৈধ হওয়ার বিষয় নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে হারাম, কারো মতে হালাল। কিন্তু আর্থিক হারজিত যুক্ত থাকলে তা যে হারাম, সে ব্যাপারে সকল মাযহাবের ইমামগণ একমত। পাশা জাতীয় জুয়া খেলা হারাম হওয়া সম্পর্কে ইমামগণ একমত হয়েছেন। কারণ রসুল স. বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি পাশা খেললো সে যেন নিজের হাতকে শূকরের গোশত ও রক্তের মধ্যে ডুবিয়ে রঙিন করলো।’’
দাবা খেলা তো অধিকাংশ আলিমের মতে হারাম, তাতে কোন কিছু বন্ধক রাখা তথা আর্থিক হারজিতের বাধ্যবাধকতা থাক বা না থাক। তবে বন্ধক রাখা এবং হেরে যাওয়া খেলোয়আড়ের বন্ধক রাখা ও আর্থিক হারজিত যুক্ত না থাকলেও অধিকাংশ আলিমের মতে দাবা খেলা হারাম। কেবল ইমাম শাফেঈ একে হালাল মনে করেন শুধু এ শর্তে যে, তা ঘরোয়াভাবে খেলা হবে এবং নামায কাযা অথবা অন্য কোন ফরজ ওয়াজিব বিনষ্ট হওয়ার কারন হবে না। ইমাম নববী ইমাম শাফেঈর এই মতানুসারে ফতোয়া দিতেন। সেই সাথে তিনি পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের বিনিময়ে দাবা খেলাকে জুয়ার অন্তর্ভূক্ত বলে রায় দেন।
ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী ও ওয়াকী ইবনুল জাররাহ ব্যাখ্যা দেন যে, ‘আযলাম’ অর্থ দাবা খেলা। আলী (রা.) বলেন: ‘‘দাবা হলো অনারবদের জুয়া। আলী (রা.) একদিন দাবা খেলায় রত একদন লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: ‘‘তোমরা যা নিয়ে এরূপ ধ্যানে মগ্ন আছ তা কী? এগুলো স্পর্শ করার চেয়ে জ্বলন্ত আগুন স্পর্শ করাও ভালো। আল্লাহর কসম, তোমাদেরকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি। আলী (রা.) আলো বলেন: ‘‘দাবাড়–র ন্যায় মিথ্যাবাদী আর কেউ নেই। সে বলে আমি হত্যা করছি, অথচ সেহ হত্যা করেনি। সে বলে, ওটা মরেছে, অথচ কোন কিছুই মরেনি।
ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াহকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, দাবা খেলার ব্যাপারে আপনার কি আপত্তি আছে? তিনি বললেন: দাবা পুরোপুরি আপত্তিকর। মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কারযী দাদা খেলা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন: দাবা খেলার ন্যূনতম ক্ষতি এই যে, দাবাড়– কিয়ামাতের দিন বাতিলপন্থীদের সাথে একত্র হবে। (অসমাপ্ত)