সিলেটে ৩৬০ আউলিয়া ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যবাদের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন

0
4

॥ মনির উদ্দিন মাষ্টার ॥

শেষ হয়ে গিয়েছে ওরস। প্রতিবারের ন্যায় এবারও অনেক ভক্ত ভিড় জমান। নাচ, গান, দোয়া, দরূদ সবই হয়েছে। দেশ-বিদেশ হতে ভক্তবৃন্দ এসেছিলেন। হিন্দু কি মুসলিম বৌদ্ধ কি খৃষ্টান কোন বাছ বিচার নেই। এখানে নানা জাতি ধর্মের লোক সবসময় সমবেত হন। নারী, পুরুষ, কোনো ভেদাভেদ নাই। এভাবে প্রায় ৭ শত বছর ধরে মানুষ ধরে রেখেছেন তাদেরকে। তাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন তারা নয়। কিন্তু প্রেম ও আত্মত্যাগকে মানুষ স্মরণ করে যাচ্ছেন। মানুষ, পশু, জীব-জন্তুর প্রেমে শাহজালাল (রহ.) সহ ৩৬০ আউলিয়া তাদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাই আজ পর্যন্ত মানুষ ভুলে যাননি তাদের প্রিয় নেতাদেরকে। বিপদে আপদে জাতি, ধর্ম, নির্বিশেষে প্রাণ দিয়ে স্মরণ করে যাচ্ছেন। তারা মানুষের কাছে অমর হয়ে আছেন। এখনো প্রতিটি মাজারে মানুষ তাদের মুশকিল, আছান খোঁজছেন কিন্তু বর্তমানে গ্রাম দেশের অনেক মাজার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ধর্ম প্রচারের ফলে। কোনো কোনো জায়গায় মানুষে মানুষে মারধর করে মরছেনও। ৩৬০ আউলিয়া যারা কোনো ধর্ম প্রচার করেননি। তারা গোপনে ধর্মের কাজ করতেন, মানুষ দেখানো কোন কাজ তারা করতেন না। তাদের মধ্যে ধর্মীয় গৌরব ছিল না। তারা ধর্ম নিয়ে বড়াই করতেন না। শুধু তারা অত্যাচারী রাজা বাদশার বিরুদ্ধে ছিলেন। তারা রাজা গৌড় গোবিন্দকেও ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন নি। ধর্ম প্রচারও করেননি, কোনো মসজিদ মাদ্রাসাও তৈরী করেননি। তারা কোনো ওয়াজ নছিহতও করেননি। জলসা করেননি। মানুষকে দাওয়াতও দেননি। কোনো জাতের পশু মেরে মেজবানীও করেননি। তারা শুধু মানবতাবাদ বিরোধীকে ঘৃণা করতেন। তারা পানি ও মাটির মত ধর্ম নিরপেক্ষ ছিলেন। তবুও অনেক মানুষ এমনিতে মুসলমান হয়েছিলেন। তাদের চরিত্র গুণ ছিল মহামানবতা সম্পন্ন। রাজা মেরে, রাজা-বাদশা হতে যাননি তারা। তারা কোনো চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র, মন্ত্রী হতে যাননি। তারা ঝুপড়িতে, বনে, জঙ্গলে বাস করতেন। তারা ছিলেন সংসার ত্যাগী। তারা কোনো ঘর বাড়ি সম্পত্তির তোয়াক্কা করেননি। বনের পশুরাও তাদেরকে মানত। তারা সকল মানুষ ও পশুর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তারা মানুষের উপকারে জীবন কাটাতেন। তারা নিজ হাতে কাজ করে সামান্য আহার, নিরামিশ খেতেন। তারা ছিলেন মানুষের মত মানুষ। তারা চাঁদা তুলে ধর্মের কাজ করেননি। অপরের হাতের কাজের ফসল হারাম তারা খাননি। কাউকে কোনো কটু কথাও বলেননি। তারা যে, খুব জ্ঞানী তাও জাহির করেননি। কেউ গালি গালাজ করলে মুখে হাত বোলাতেন। তারা কোনো পান্ডিত্য জাহির করেননি। তারা কোনো দল করে দল নেতা হয়ে ব্যক্তি সম্পদ বানিয়ে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতেও চান নাই। তারা বিবাহ করে বংশ বিস্তার করে স্মরণীয় হয়ে থাকারও চেষ্টা করেননি। সে সময়েও অনেক অত্যাচারী লোক ছিল, মানুষের জিহ্বা কেটে ফেলত অনেকে। ধর্ম সে সময়ও ছিল কিন্তু তারা ধর্মের প্রতি অন্ধ ছিলেন না। তারা ছিলেন একেবারে নিরপেক্ষ, ধর্ম পক্ষপাতি কাজ তারা সহ্য করতেন না। তারা প্রকৃতির সহিত মিলে গিয়েছিলেন। তারা বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহিত বন্ধুত্ব বন্ধনেও আবদ্ধ হতেন। কোনো ধর্মকে তারা আঘাত দেননি। যার যার ধর্ম ও মানবতা এক, সর্বেসর্বা মনে করতেন। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতায় মানুষ মারা, ফাঁসি দেওয়া তো দূরের কথা তরা ঐ ধর্ম খারাপ আর আমার ধর্ম একেবারে ভাল তাও তারা গুণগান গাইতেন না। কেউ কোনো দিন তাদের কাছে গেলে হিংসা করতেন না। পানির মত চলতেন, মানবতা বুকে ধারণ করে। তারা ত্যাগী মানুষকে ভালবাসতেন। হিন্দু মুসলিম ধার ধারতেন না। তারা কোনো ধর্মকে ঘৃণা করেন নি। আবার কেউ কোনো ধর্ম না মানলেও তাকে জোরে মানাতে যেতেন না। ধর্ম নাই, সৃষ্টিকর্তা নাই বললেও তারা তাদের বিরুদ্ধে কটুক্তি করতেন না। তারা সব মানুষের মনের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলেন। তারা ছিলেন গণতন্ত্রের উজ্জ্বল প্রেরণা। তাই মানুষ তাদের প্রেমে পাগল হয়ে ঘুরে ঘুরে মুসলমান হয়েছিলেন, কিন্তু তাদের মত মানুষ হতে পারিনি আমরা। আমরা সামান্য কারণে, অকারণে, লাঠালাঠি করে মানুষকে বিগড়িয়ে দেই। তাদের দেশপ্রেম ও মানব প্রেমে বা ধর্ম প্রেমে কোনো স্বার্থ ছিলনা। মানুষ বহুরূপী তা তারা বুঝতেন, কেউ কিছু বললেই ধর্ম যায় না, ধর্ম এত পাতলা নয় যে ধর্ম উড়ে যাবে। সৃষ্টিকর্র্তা সৃষ্টিকে ভালোবেসেই সৃষ্টি করেছেন তা তারা বুঝতেন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রেমে তারা মত্ত ছিলেন। স্রষ্টার সৃষ্টবস্তু তুচ্ছ হলেও তারা তা ধ্বংস করতেন না। ১টি পিপিলিকা হতে শুরু করে ১টি বনের ক্ষুদ্র চারা গাছও ধ্বংস হতে দিতেন না। তারা আস্তে আস্তে পা ফেলে হাঁটতেন। সব মানুষের মনকে জয় করেই তারা অনন্তকাল অমর হয়ে আছেন। তাদের ধৈর্যের বাঁধ কেউ ভাঙ্গতে পারেনি। স্রষ্টার সৃষ্টি প্রকৃতি, তার সাথে তাদের জীবনকে সাজিয়ে ছিলেন বলে তারা আজ এত সম্মানী। তারা ছিলেন আলো, বাতাস, মাটি, পানি, পাহাড়, পর্বত ও শিশুর মত নিরপেক্ষ সাম্যবাদ ছিল তাদের প্রাণশক্তি। তারা ইচ্ছা করলে বড় বড় জমিদার হতে পারতেন। তারা ব্যক্তি সম্পত্তি চাননি। তারা নিজেরা প্রভাব বিস্তার করেননি। তারা বড় বড় বক্তব্য দিয়ে ধর্ম গুরু হতেও চাননি। তাদের কী সম্মান কম?
কত লাঠালাঠি হলো নেতাদের নামে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য। কিন্তু হযরত শাহজালাল (রহ.) এর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করায় আন্দোলন থেমে গেল। জিয়া বিমান বন্দরকে শাহজালাল বিমান বন্দর নাম দেওয়ায় সবই চুপচাপ হয়ে গেলেন। তাদের ওফাতের ৭শ’ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও মানুষ তাদের স্মরণ করে, সম্মান করে এবং শ্রদ্ধার সাথে ভক্তি করেন। তারা সম্পূর্ণভাবে সংসার ত্যাগী ছিলেন। প্রকৃতির লীলা সৌন্দর্যে তারা মুগ্ধ থাকতেন। মানুষের জীবনের গান, বাজনায় সুখে, দুখে তারা মুগ্ধ থাকতেন। তাদের আচার-আচরণ ছিল সম্পূর্ণ রূপে মানবিক। প্রকৃতির বিচিত্রকে তারা ধ্বংস করতে যাননি। তারা উগ্র ধার্মিক ছিলেন না। ধর্ম রক্ষায় মানুষ হত্যার মতো ঘৃণিত কাজ তারা করতেন না। তারা সামান্য আহার করতেন। তারা শোষণ করতেন না। কারো সম্পদ কেড়ে নিয়ে হজ্ব, যাকাত ও দান, খয়রাত করতেন না। তারা হারাম টাকা চাঁদা তুলে ধর্মের বড় বড় কাজ করেননি, ধর্ম প্রচারও করেননি। যারা ধর্ম মানে না, তাদেরকে কাতল করেননি, দেশ ছাড়াও করেননি। তারা শুধু অত্যাচারী শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিলেন। আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর নিয়ে বা শিয়া-সুন্নি কুর্দি নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেননি। তারা সৃষ্টিকে মেনে, সৃষ্টিকর্তার সব প্রাণীকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। তারা সৃষ্টিকূলে বিভাজন সৃষ্টি ও মারধর লাগাতেন না। তারা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট জীবদের ভালবাসতেন। কোনো মতবাদ নিয়ে ঝগড়া সৃষ্টি করেননি। তারা প্রকৃতির মত সব সৃষ্ট বস্তুর উপকারে দিন কাটাতেন। তাই শাহজালাল (রহ.) নাকি বাঘের বিচারও করতে পেরেছিলেন। সবই তাঁর আত্মত্যাগের ফসল ও পরোপকারীতার নিদর্শন। সাম্যবাদকে জীবনের সবচেয়ে মোক্ষম গুণ মনে করতেন। তারা সিলেট দখল করেননি। তারা কাউকেও কাফের নাস্তিক-মুরতাদ বলেননি।
তাই বিভিন্ন দেশেই তারা দয়ার সাগর হয়ে যান। তারা ধর্মীয় উগ্রতা মোটেই দেখাতে যাননি। তাদের সঠিক ধর্ম ছিল মানবতা ও জীবে প্রেম করা। তারা ছিলেন জীবপ্রেমের ঈশ্বর। তারা বলতেন হাজার এবাদত এক আদালত। কেউ ধর্ম না করলে আল্লাহর কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু তার সৃষ্ট বস্তুর ক্ষতি তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করেন বলে তারা জানতেন। কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক বেশ্যা মেয়ে পার পেয়েছিলেন বলে তারা জানতেন। তারা সৃষ্টিকর্তার মত সাম্যবাদী প্রেমিক ছিলেন। তাই তারা সমস্ত মানুষের মন জয় করার কারণে প্রতিদিন মানুষ দেশ-বিদেশ হতে এসে ভিড় জমান তাদের মাজারে। যে কাজ করলে একজন মানুষ মনে কষ্ট পাবে সে কাজ করেন নি তারা। তারা মনে করতেন সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষকে আঘাত দিলে সে আঘাতের জবাব সৃষ্টিকর্তার কাছে দিতে হবে। কেহ ধর্মের কাজ না করলেও তাকে ঘৃণা করতেন না। একটু তেড়া চোখে তাকানো মহাপাপ মনে করতেন। কারণ প্রতিটি মানুষের সহিত সৃষ্টিকর্তা বিরাজমান। সৃষ্টিকর্তা কোনো মানুষকে প্রাণে মারা বা প্রকৃতি পশু-পাখি বধ করার ক্ষমতা দেননি। দুনিয়াবী আইনেও পাপ প্রমাণ হলে প্রাণদন্ড নিশ্চিত। সৃষ্টিকর্তার খুশীর জন্য যারা ধর্মে হাজারও মানুষ হত্যা করেছেন তারাও কোন মানুষ নয়, পাশবিক বলে পীর আউলিয়ারা মনে করতেন। তারা স্রষ্টার বস্তুভান্ডারই মূল্যবান মনে করতেন। স্রষ্টার বা সৃষ্টির কোনো জাত ধর্ম নাই তারা তা জানতেন। প্রাণ আছে এমন বস্তু পশুই ছিল তাদের কাছে বড়। বর্তমান স্রোতের টানে তারা চলতেন না। তারা জীবনের গভীরে কাল কাটাতেন। তারা ছিলেন বস্তুবাদী। তারা মনে করতেন সৃষ্টির প্রেমে মুগ্ধ হয়ে সব বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন। কোনো ধর্ম বলে তা ধ্বংস করার অর্থাৎ তাকে অমান্য করা পাপ মনে করতেন। কিন্তু এখন দেখা যায় ধর্মাশ্রয়ীরা মানুষ মেরে ধর্ম রক্ষায় ব্যস্ত। আল্লাহর এক ধর্ম জীবে প্রেম। তাই দিবারাত্রি আলো, বাতাস ও আহার দিয়ে বস্তু জগৎকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। যে কাজ করলে ব্যাপক মানুষের মধ্যে উত্তেজনা আসবে সে কাজ বা সে ধর্ম তারা করতেন না।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাহজালাল সাহেবের মাজারে ওরস ও নাচ গান, বাদ্যযন্ত্র বন্ধ করার জন্য কতেক মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক বড় আন্দোলন শুরু করেন, লাঠালাঠিও হয় কিন্তু যারা ইনকামে শরিক তারা কিন্তু তাদের সাথে ছিলেন না। সে সময়ে মুক্তিযোদ্ধা নেতা ও স্বেচ্ছাসেবকের কাছে বিচার আসলে বৈঠক হয়, তখন বিচারীরা উভয়ের ভাব বুঝে যারা মোকামের ইনকামে শরিক তাদেরকে দাওয়াত করা হলো। ধর্ম রক্ষার্থে নাচ গান বাজনা কি বন্ধ করা হবে? তখন তারা বলেছিলেন হাজার বছর ধরে নাচ, গান, বাজনা চলছে ওরস হচ্ছে মেয়েছেলে সবাই আসছে। শাহজালাল তো জিন্দাপীর তারা যখন বাধা দিচ্ছেন না তাহলে বন্ধের কি আছে? তাহলে দেখা যায় শরিক হলে যাইজ, আর শরিক না হলে না জায়েজ বলে সব ধর্মের কার্যক্রম চলছে। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে কেউ নাই। কিন্তু পীর আউলিয়ারা কি এমন ছিলেন? তাই তারা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। বস্তু প্রেমিকরা জাতি, ধর্ম কখনো মানেন নি। তাদের মধ্যে ধর্মের গন্ধ পাওয়া যায় না। আমাদের গোয়াইনঘাট রাতারগুল সুন্দর বনের নিকট দুইজন পীর আউলিয়া ছিলেন তাদের মধ্যে একজন মুসলমান, অন্যজন হিন্দু ছিলেন। আজ পর্যন্ত তারা তো ধর্মান্ধ হয়ে আলাদা হননি মটরঘাটের মোকামে।
প্রকৃতি ও পাহাড় পর্বতের মত ছিল তাদের ধর্ম নিরপেক্ষতা। ধর্ম ছিল তাদের মানবতা। তারা মানুষের মন জয় করে অমর হয়ে আছেন। বন-জঙ্গল, মানুষ, বৃক্ষ, পশু-পাখি, পোকা মাকড় তো একই সৃষ্টির লীলা তা সৃষ্টিকর্তা পালন করে যাচ্ছেন সমভাবে। তাতে অন্য মানুষ মতবাদ দিয়ে কেন ঝগড়া লাগাবে? তাদের স্বার্থ কোথায়? সৃষ্টির প্রতিটি বস্তু জীবকে শিকার ধরার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছেন মহান প্রকৃতি। কোনো স্কুল মাদরাসায় তো জীব-জন্তু প্রাণীকে পড়তে হয়না। পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্র তো প্রাণী কুলের। আজকে সাম্প্রদায়িক বিশ্ব কি স্রষ্টার তৈরী? মানুষ কি ভিন্ন ভিন্ন রক্ত নিয়ে জন্মেছেন? সাদা কালো সব মানুষতো এক, সুখ-দুঃখ, রোগজরা চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে আছেন। বিশ্বে যারা রাষ্ট্রনায়ক তারা কি বোঝেন না প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ এক ও অভিন্ন জাতি? মানুষের অধিকার কি মানুষ দেবে না? আজকে দীর্ঘ কয়েক বছর যাবৎ ফিলিস্তিনীকে অধিকার বঞ্চিত রাখা কি উচিত? বিশ্বের দেশে দেশে ধর্মকে নিয়ে এত উগ্র হয় কেন মানুষ? তা কি স্বার্থ রক্ষা নয়? মানুষ বিভাজনের সকল কার্যকলাপ কি বন্ধ করা যায় না? ধর্ম, বর্ণ নিয়ে রাজনীতি কেন হবে? ধর্ম তো যার যার ব্যাপার, পীর ফকিরদের কাছ হতে কি শিক্ষা নেওয়া যায় না? মুসলিম বিশ্ব, হিন্দু-খৃষ্টান বিশ্ব বলতে কি লজ্জা হয় না? সকল মানুষের বিশ্ব কী সৃষ্টিকর্তা করেন নাই? মানবতা বিসর্জন দিয়ে যারা ধর্ম কোন্দল করে তারা স্বীয় সৃষ্টি মানে না। তারা পক্ষপাতিত্ব করে বিশ্ব ধ্বংস করছে। তারা ধ্বংসকারী নাস্তিকতাবাদী। যারা দুনিয়ার সকল প্রাণীকুলকে ধ্বংস করে তারাই নাস্তিক। আর যারা জীব জগৎকে ধরে রাখতে চায়, তারাই আস্তিক। কিন্তু আজ উল্টো চলছে জনস্রোত।
মহান ব্যক্তিরা যে, মানবতায় প্রেম করেছিলেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমি বালাগঞ্জের সিকন্দরপুর গিয়ে পেয়েছিলাম। একদিন মখতার খান লন্ডনী সাহেব আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তার মেজরটিলা দীপিকায় আমি ভাড়া থাকতাম। সে সুবাদে আমি তার গ্রামে গিয়ে দেখতে পাই একটি বড় মাজার। তখন আমি সেই মাজারে গিয়ে দেখি আরো একটি মাজার পাশে। তখন জনগণকে জিজ্ঞাসা করলাম ওই দুটি মাজার কার কার? তখন লোকজন বললেন, একটি সিকন্দর শাহ মাজার আর অপরটি তার জানের দোস্ত ঠাকুর কলমন্দর আলীর। তিনি ছিলেন হিন্দু। আমি আরো জানতে পারলাম ওই মাজারে প্রতি বছর ওরস হয়। কিন্তু বন্ধ করা হয়না। কারণ সিকন্দর শাহ নাকি আদেশ দিয়ে গিয়েছেন বদ্ধ না করার জন্য। কারণ তার দোস্ত হিন্দু। তিনির মনে আঘাত পাবেন তাই। তারা দশ গ্রামের লোক প্রতি বছর তোষা ও গুড়ের শিরণী করে থাকেন। এত বছর ধরে সিলেটের এই সিকন্দরপুরে ধর্ম নিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তকে ধরে রেখেছেন তা আমরা জানি? এক কথায় মহান ব্যক্তিরা একটি মানুষের মনকে একটি ভুবন মনে করতেন। ধর্ম নামধারীরা নিজ স্বার্থে হানাহানী করে বিশ্ব ধ্বংস করছেন।
আমরা মানুষ হয়ে কি পাশবিকতা করছিনা? মানুষ রাষ্ট্র ক্ষমতা পেল কোথায়? ধর্ম, জাত, পাত, বর্ণবাদ কি মানুষের তৈরী নয়? সৃষ্টিকর্তার আরাধনা কি মানুষ হত্যা, বোমাবাজি, ধ্বংসলীলা, প্রতিহিংসা? মানুষ বিভাজননীতি কি স্রষ্টার কাম্য? মানুষ কি সৃষ্টিকর্তার তৈরী নয়? সৃষ্টি যাই হোক, তা কি মানুষের শত্র“? কখনো না। সৃষ্টি বা প্রকৃতি আদিকাল হতে যেভাবে মানুষ, পশু, গাছ-পালা, ফল-মূল, জীব বৈচিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সক্রিয় দেখতে পাওয়া যায়, তা কি সত্য নয়? গবেষণা করে সৃষ্টির ও প্রকৃতির কার্যকলাপ থেকে কি মানুষের শিক্ষা নেওয়া উচিত নয়? মানুষ আমরা যতই হিংস্র হচ্ছি তা কি সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য? ধর্মীয় কোন্দল করে মানুষ নিধন কি সৃষ্টির ইচ্ছা। সৃষ্টিকর্তা কি কোনো ধর্ম বিভাজন চান? ধর্ম বিভাজন, জাত, পাত, মানুষের মধ্যে পুঞ্জিভূত শুধু পুঁজিবাদ রক্ষার জন্য। যারা পুঁজিবাদ তারা সকল জাত, পাত, বিরোধী। হাওয়া বাতাসে, আলো-আঁধারে, মাটি, পানিতে তো কোনো ধর্মীয় উগ্র ভ্রান্ত ধারণা নাই? মানুষ কেন সৃষ্টিকে নিয়ে ঝগড়া করে, বিবাদ করে? এ পৃথিবীর মানুষের জন্য একই ধর্ম মানবতা। আজ যে রাষ্ট্রনায়করা বিভিন্ন ধর্মে রাষ্ট্র ভাগ করে যাচ্ছেন তা কি মানবতা? মানুষের রাষ্ট্র একটাই তা কি আমরা মানুষ বুঝিনা? সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষ কোন ধর্ম নাই। তিনি সকলের পালনকর্তা। সকল জীব-জন্তুর প্রতি তার সমান আচরণ। তাই বিশ্বের মানুষকে চিন্তা করে প্রকৃতির শিক্ষায় এগিয়ে যেতে হবে এবং বিশ্বকে অস্থিরতা হতে রক্ষা করতে হবে। তাছাড়া কোন উপায় নেই। রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ করা উচিত। যার যার ধর্ম যার যার বিশ্বাস মতো পালন করেই পার পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিষ্ট।