মিসওয়াক : বাস্তবতা ও ফজিলত

0
12

আতিকুর রহমান নগরী

প্রকৃতি কখনো মানুষের স্বভাব বিরোধী নয়। বরং তা সর্বদাই মানব স্বভাবের অনুকূলে। শুধু তাই নয়, মানুষ যখন দুনিয়ার চাকচিক্য ভোগ বিলাসিতায় ডুবে গিয়ে কোন এক সময় নানাবিধ বিপদ আপদের সম্মুখিন হয় এবং তা থেকে বেঁচে থাকার কোন উপায় না দেখে পুনরায় প্রকৃতির দিকে ফিরে আসে, প্রকৃতি তখনও পূর্বের ন্যায় মানুষের উপকারে আসে। চমৎকার ও মহামূল্যবান হীরার টুকরোকে ফেলে দিয়ে সামান্য এক টুকরো কাঁচ গ্রহণ করা যেমনিভাবে বুদ্ধিহীনতা ও বোকামির কাজ, ঠিক তেমনিভাবে মুসলমানদের জন্য নবীজীর (স:) মহান সুন্নাত মিসওয়াকের ন্যায় স্বভাব অনুকূলের আমলটিকে পরিত্যাগ করে ব্রাশ ইত্যাদি গ্রহণ করাও তদ্রƒপ অজ্ঞতা ও বোকামীর কাজ। যখন থেকে আমরা এ মহান নেয়ামতটিকে হাতছাড়া করেছি, তখন থেকে আমরা নানাবিধ পেরেশানিতে ভোগছি। হাজার হাজার টাকা ব্যয় করেও দৈহিক সুস্থতার উৎস ফিরে পেতে সক্ষম হচ্ছি না। মিসওয়াক সম্পর্কে একজন জ্ঞানী তার উক্তি এভাবে করেছেন ‘যেদিন থেকে আমরা মিসওয়াকের ব্যবহার ত্যাগ করেছি, সেদিন থেকেই ‘ডেন্টাল সার্জন’ এর সূত্রপাত হয়েছে।’ নবী (সা:) এর সুন্নাত মানুষের স্বভাব সুলভ এই সুন্নাত আমাদের উন্নতির পাথেয়। রাতে মিসওয়াকঃ রাসূল (সা:) রাতে ঘুম থেকে জেগে মিসওয়াক করতেন। রাতে শয়নকালে মিসওয়াক করা ছিল নবী করীম (সা:) এর মহান অভ্যাস (যাদুল মায়াদ)। জনৈক ইঞ্জিনিয়ার বলেন, ‘‘ওয়াশিংটনে (আমেরিকার) একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার একদা আমাকে বললেন, আপনি শয়নকালেও মিসওয়াক করবেন। আমি বললাম এর কারণ কী? উত্তরে তিনি বললেন, বর্তমান যুগের বিসার্চ একথা বলে যে, মানুষ খাবার ভক্ষণ করে, যার ময়লা কুলির দ্বারা ভালোভাবে পরিষ্কার হয় না। তিনি আরো বলেন যে, সাধারণত মানুষের দাঁত নষ্ট হয় শয়নকালে। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরই বা কারণ কী? তিনি বললেন, আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন যে, দিনের বেলা মানুষ কখনো কথা বলছে, কখনো আহার করছে, আবার কখনো পান করছে, তাই দিনের বেলা মুখের গতিশলীতার দরম্নন রক্ত, রস, এসব কাজ করার সুযোগ পায় না। কিন্তু রাতের বেলা যখন মুখ বন্ধ হয়ে যায়, তখন তার সুযোগ এসে যায় কাজ করার। এ কারণেই দাঁত রাতের বেলা ভীষণ খারাপ হয়। তিনি আরো বলেন, সকালে ‘টুথপেষ্ট’ ব্যবহার করুন বা নাই করুন রাতের বেলা অবশ্যই মিসওয়াক করে ঘুমাবেন।’ বিজ্ঞ ডাক্তার সাহেবের মুখে এ কথাগুলো শুনে আমি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ‘আলহামদু লিল্লাহ’ পড়েছিলাম। কেননা মহানবী (সা:) এর সুন্নত হচ্ছে রাসূল (স:) সর্বদা অজু অবস্থায় শয়ন করতেন, আর মিসওয়াক ব্যতিত কখনো তিনি অজু করতেন না। যদি কেউ খাবার শেষে অজু করে এবং মিসওয়াক করে তাহলে সে দন্ত রোগ থেকে রেহাই পাবে।
নামাজের পূর্বে মিসওয়াক : প্রকৃতপক্ষে নামাজ যেহেতু কুল মাখলুকের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাববুল আলামিনের ইবাদত। তাই নামাজের সময় মুখ পরিষ্কার হওয়া আবশ্যক। যদি আহারের পরে মিসওয়াকবিহীন অজু করা হয়, তাহলে দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো জিহবায় লেগে নামাজের একাগ্রতায় বিঘœ ঘটায়। তাছাড়া নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় নামাজী ব্যক্তির মুখ থেকে যদি দুর্গন্ধ বের হয়, তাহলে এর দ্বারা অন্য মুসলস্নীর কষ্ট হয়। তাই মিসওয়াক দ্বারা মুখের দুর্গন্ধ দূর করে নেয়া উচিত। মিসওয়াক করার সময় মুখ এমনভাবে হিল্লোলিত হয়, যদ্দারা কোরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ তাহলীল ইত্যাদিতে অনাবিল সুখ-শান্তি ও মনের প্রশান্তি লাভ হয়। নামাজ হয় মহান প্রভুর সম্মুখে হাজিরা দেয়া।
মুখের দুর্গন্ধ দূরীকরণে মিসওয়াক : এক ব্যক্তির মুখে ছিল খুবই দুর্গন্ধ। এর জন্য সে উন্নতমানের টুথপেষ্ট, ঔষধ, মাজন এবং দুর্গন্ধ নাশক বিভিন্ন ঔষধ ব্যবহার করে। কিন্তু তাতে সে উপকৃত হয় না। অতঃপর সে এ ব্যাপারে জনৈক আলিমের কাছ থেকে পরামর্শ চাইলে তিনি তাকে পিলু গাছের মিসওয়াক ব্যবহার করার পরামর্শ দেন এবং সাথে সাথে ব্যবহার পদ্ধতিও বলেন যে, মিসওয়াকের আগার চিকন অংশগুলি প্রত্যেহ নতুন হওয়া বাঞ্চনীয়। এ পদ্ধতিতে মিসওয়াক ব্যবহারের পর অতি অল্পদিনের মধ্যেই সে আরোগ্য লাভ করে।
গলার রোগ নিরাময়ে মিসওয়াক : টনসিলের রোগীদের জন্য মিসওয়াক ব্যবহারে যথেষ্ট ফল পাওয়া যায়। এক ব্যক্তির গলায় মাংস গ্রন্থি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে খুব পেরেশান ছিল। তাকে তুত ফলের শরবত ও মিসওয়াক ব্যবহার করতে দেয়া হল, অর্থাৎ তুতের শরবত পান করবে এবং তাজা মিসওয়াক ব্যবহার করবে এবং মিসওয়াক টুকরো টুকরো করে ফুটন্ত পানিতে জাল দিয়ে গড় গড় করবে। এ পন্থা অবলম্বন করার পর রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করল।
মস্তিষ্ক সতেজকরণে মিসওয়াক : হযরত আলী (রা:) বলেন, মিসওয়াক দ্বারা মস্তিষ্ক সতেজ হয়। প্রকৃত পক্ষে মিসওয়াকের মধ্যে থাকে ফসফরাস জাতীয় পদার্থ। রিসার্চ ও সন্ধানের মাধ্যমে একথা স্বীকৃত যে, যে জমিতে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস অধিক বিদ্যমান থাকে সেখানেই পিলু, নিম, বাবলা এ সমস্ত বৃক্ষরাজী অধিক হারে জন্মায়। দাঁতের প্রধান খাদ্যই হল ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। আর বিশেষ করে পিলু বৃক্ষের জড়ে এই উপাদানগুলো সাধারণত বেশী পাওয়া যায়। অভিজ্ঞতা দ্বারা একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, পিলু বৃক্ষের মিসওয়াক তাজা ও নরম অবস্থায় চাবালে তার মধ্য হতে তিক্ত তেজষ্ক্রিয় এক প্রকার পদার্থ বেরিয়ে আসে।
ব্রাশ ও মিসওয়াকের পার্থক্য : এখানে একটি প্রশ্ন জাগে যে, দাঁতের পরিচ্ছন্নতা ও সুরক্ষার জন্য ব্রাশ বেশী প্রয়োজনীয় না জীবাণু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দীর্ঘ দিনের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এ কথা চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে যে, একবার ব্যবহার করা ব্রাশ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কেননা ব্যবহারের দ্বারা তার মধ্যে জীবাণুর ভিত্তি স্থাপিত হয়। পানি দ্বারা পরিষ্কার করলেও তা ক্রমবর্ধমান থাকে। তাছাড়া ব্রাশের দ্বারা দাঁতের উপরের স্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি হয়। এরপর ধীরে ধীরে দাঁতগুলো মাড়ি থেকে বিচ্যুত হতে থাকে। আর খাবারের ক্ষুদ্র কণাগুলো দাঁতের ফাঁকে জমে মাড়ি ও দাঁতের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। এমন বৃক্ষের মিসওয়াক দাঁতের জন্য উপযোগী যার আঁশগুলো হয় কোমল, যা দাঁতের মাঝে ফাঁক বৃদ্ধি করে না এবং মাড়িতে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারেনা। এ হিসেবে মোটামুটি ৩টি গাছের ডাল মিসওয়াকের জন্য উপযোগী (১) পীলু গাছের মিসওয়াক (২) নীম গাছের মিসওয়াক (৩) বাবলার মিসওয়াক।
পীলু গাছের মিসওয়াক : পীলু বৃক্ষের উপকারিতা হল (ক) এর আঁশগুলি মসৃণ (খ) এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এই বৃক্ষ পাওয়া যায়। বিশেষ করে লবণাক্ত ও বিরাণ ভূমিতে। ভূ-তত্ত্বের আধুনিক রিসার্চ একথা বলে যে, মস্তিষ্কের অসংখ্য খাদ্য এবং সহায়ক বস্তুর  মধ্যে ফসফরাস অন্যতম।
সর্দি, কাশি ও মিসওয়াক : স্থায়ী সর্দি কাশি রোগের শ্লেষ্মা যদি জমাট বেঁধে থাকে, সে ক্ষেত্রে মিসওয়াক ব্যবহার করলে শ্লেষ্মা ভিতর থেকে বের হয়ে মস্তিষ্ককে হাল্কা করে। একজন প্যাথলজিষ্ট বলেছেন, পরীক্ষা নিরীক্ষা আমাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মিসওয়াক হল সর্দি ও কাশির সর্বোচ্চ প্রতিরোধক। এমনকি মিসওয়াক সর্বদা ব্যবহার করলে নাক ও গলার অপারেশন করার মতো পরিস্থিতি খুবই কম সৃষ্টি হয়। মহান আল্লাহর সত্ত্বার দরবারে প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাদের সবাইকে যেন মহানবীর (সা:) সুন্নাত মিসওয়াক ব্যবহার করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।